পৌষ সংক্রান্তির মেলা বসেছে অজয় নদের চরে। এ মেলা জয়দেব- কেন্দুলির মেলা নামে পরিচিত। শুধু 'জয়দেবের মেলা'ও বলে অনেকেই । বীরভূম জেলায় যতগুলি মেলা অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে জয়দেব কেন্দুলির মেলা সাধারণ মানুষের জনসমাগমে উত্তরোত্তর মহামিলন ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে ।এ মেলা গ্রামীণ মেলা। শহুরে মেলার মত এর জৌলুস নেই, চাকচিক্য নেই, নেই সফিস্টিকেশন। এ মেলা মানুষের মেলা,এ মেলা প্রানের মেলা। ভক্ত কবি জয়দেবের স্মৃতি বিজড়িত এই মেলায় তাই ভিড় জমায় আউল-বাউল, বৈষ্ণব সাধক আর ভক্তিরস পিপাসু নর-নারীর দল। এ মেলায় ভিড় জমায় শয়ে শয়ে ভিখারি আর গৃহহারা গৃহ ছাড়া মানুষের দল।

প্রত্যেক মেলাতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দোকানপাটের ভিড় যেমন থাকে তেমনি বিনোদনের প্রয়োজনে ম্যাজিক সার্কাস নাগরদোলা ইত্যাদির আয়োজন থাকে। জয়দেব মেলা ও তার ব্যতিক্রম নয়। জয়দেব মেলার বৈশিষ্ট্য সারা মেলা জুড়ে আউল বাউল সাধুসন্তদের ভিড়। বৈষ্ণব সমাজে ও বাউল দের মধ্যে নবরসিকের উল্লেখ আছে। জয়দেব নব রসিকের অন্যতম। আর তাই দলে দলে বাউলরা জমায়েত হয় কবি জয়দেবের স্মৃতিবিজড়িত পূণ্যভূমি জয়দেব কেন্দুলি তে।

মেলার সময় প্রচন্ড শীতকে উপেক্ষা করে পুণ্য লোভাতুর হাজার হাজার মানুষ সাধুসন্ত ও বাউলদের পাশাপাশি বটবৃক্ষের তলে বা যেকোনো জায়গায় অস্থায়ী আস্তানা তৈরি করে।

 কারো কোনো সংকোচ নেই লোভ নেই আসক্তি নেই-- পরম উদাসীনতায় কি এক অজানা প্রাপ্তির নেশায় ভিড় জমায় এই মেলায়। সাধু-সন্তরা ধুনি জ্বালিয়ে ধীর স্থির ভাবে বসে থাকেন কোন বড় গাছের নিচে নয়তো অজয় নদের তীরে।

সারা মেলা জুড়ে এই সময় তৈরি হয় ছোট-বড় অসংখ্য অস্থায়ী ছাউনি। সেই ছাউনির নিচে কোথাও বসে বাউল গানের আসর তো কোথাও কীর্তনের। এইসব ছাউনিতে শ্রোতারঅভাব হয়না কখনোই।

মেলায় আগত হাজার হাজার মানুষের একটা আশ্রয়ের দরকার হয় রাত্রিবেলায়। পৌষের শেষ মাঘের শুরুতে অজয়ের ধুধু বালুচরে শীতটা বেশ জাঁকিয়ে আসে। আর সেই শীতের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এই অস্থায়ী তাঁবুগুলোয় ঠাঁই পাওয়া খুব জরুরী। মেলায় যে সমস্ত আশ্রম বা অন্যান্য সেবা প্রতিষ্ঠানের তরফে অস্থায়ী তাঁবু তৈরি করা হয় ,তারা এই ব্যাপারটি খুব ভালোভাবে অবগত আছেন। তাই এই ধরনের প্রায় প্রতিটি অস্থায়ী শিবিরে শিবির কর্তৃপক্ষ মেলায় নিজেদের থাকার জন্য আস্তানা তৈরীর পাশাপাশি ভক্ত বা শ্রোতাদের জন্য বেশ বড়সড় একটা ছাউনির ব্যবস্থা করেন মঞ্চের সামনে। হ্যাঁ,মঞ্চ একটা থাকেই, প্রায়প্রতিটি ছাউনিতে । ওই মঞ্চেই কোথাওধর্মীয় আলোচনা হয়, কোথাও হয় বাউল গান , কোথাও বা বসে কীর্তনের আসর। শ্রোতারা মঞ্চের সামনে বসে বাউল শোনেন, ,কীর্তন শোনেন আর আশ্রম কর্তৃপক্ষের তরফে নিখরচায় ভোগের প্রসাদ পান।

অজয় নদীর এপারে অর্থাৎ জয়দেব কেন্দুলি অবস্থিত বীরভূম জেলায় আর অজয় নদীর ওপারেবর্ধমান জেলা। বীরভূম এবং বর্ধমান জেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে যে সমস্ত পুণ্যার্থীরা প্রায় প্রতি বছর মেলাতে আসেন, তাঁরা জয়দেব মেলার এই ব্যবস্থার বিষয়ে সম্যক অবহিত আছেন।পুণ্যার্থীরা জানেন যে, কোন একটা তাঁবুতে আশ্রয় জোগাড় করতে পারলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা হবে। শীতের কামড়ের হাত থেকে শরীর বাঁচিয়ে গান শোনা হবে আবার গানের শেষে আশ্রম কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ভক্তদের জন্য আয়োজিত প্রসাদ পেলে রাতের খাবারটা ও হয়ে যাবে। এই ব্যাপারে জয়দেব মেলার খুব সুনাম । এখানে কোন দর্শনার্থী, পুণ্যার্থী , বাউল, বৈষ্ণব ,ভিখারি কেউ না খেয়ে থাকেনা। অনেকটা মা অন্নপূর্ণার কাশীধামের মতই। কোনো না কোনো আশ্রমের অর্থাৎ ছাউনীর তরফে ঠিক জুটে যায় প্রসাদ। এখানে অনেকগুলি স্থায়ী আশ্রমও আছে। যাদের তরফ থেকেও ভক্তদের জন্য প্রসাদ বিলির আয়োজন করা হয় দিনের বেলায়। তারা শুধু ভক্তদের মাঝেই নয়, প্রসাদ বিলি করেন মেলায় আগত অগণিত ভিখারিদেরও।

কাজেই অস্থায়ী ছাউনি গুলির ভেতরে মঞ্চে যে গানের আয়োজন করা হয়, তা বাউল হোক বা কীর্তন, সেখানে শ্রোতা ভিন্ন ভিন্ন রুচির হলেও তার অভাব হয়না কখনোই। শ্রোতারা ছাউনির নিচে মাটিতে বিছানো খড়ের উপরে পাতা চট বা ছেঁড়া ত্রিপলের উপর বেশ আয়েশ করে বসে গান শোনে। আর অনুষ্ঠানের শেষে পেয়ে যান গরম গরম প্রসাদ ।

ছোট বা বড় অবস্থা ভেদে একটা ছাউনী বা আখড়ার তরফ থেকে আয়োজিত প্রসাদের কোয়ালিটি বা মেনু আলাদা হলেও তিনটি মেনু প্রায় কমন থাকে। আর সেটা হল খিচুড়ি বাঁধাকপির তরকারি আর চাটনি বা টক। কেউ কেউ এর সঙ্গে পায়েস বা বোঁদের ব্যবস্থাও রাখেন।

সাধকেরা বলেন প্রকৃতি ও পুরুষের মিলন কথা। রাধা ও কৃষ্ণ বৈষ্ণব বাউল সাধকদের কাছে প্রকৃতি এবং পুরুষের--- জীবাত্মা ও পরমাত্মার মিলন লীলা। একই পরমাত্মা রসাস্বাদনের জন্য দুই হয়েছেন, বহু হয়েছেন।' এই অজয় নদের তীরেই সাধক কবি জয়দেব সিদ্ধিলাভ করেছিলেন । পরম ভক্তিমতী পদ্মাবতী ছিলেন তার সাধন সঙ্গিনী।

কবি জয়দেব অমর কাব্য গীতগোবিন্দ রচনা সময় অনুভব করেছিলেন যে, রাধা ও কৃষ্ণ অভিন্ন--- 'পরস্পরের পদ ধারণে মান খোওয়া যায় না কারো, বাড়ে প্রেমের মহিমা। লোপ পায় প্রেমিক প্রেমিকার মনে ভিন্নতার ভাবনা।'

কাব্য রচনা করতে গিয়ে ভক্ত কবি জয়দেব থমকে গেছেন এক জায়গায়। যেখানে কাব্যের প্রয়োজনে স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ কে শ্রীরাধিকার মানভঞ্জন করার জন্য তার পায়ে ধরার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। কিন্তু কবি কিভাবে তার আরাধ্য কে এভাবে অসম্মানিত করেন? থমকে গেছে কবির কলম। রচনা অসম্পূর্ণ রেখে তিনি গেলেন অজয় নদী তে স্নান করতে। ফিরে এসে প্রত্যক্ষ করলেন এক অলৌকিক ঘটনা। তাঁর আরাধ্য দেব কৃষ্ণ তাঁর রূপ ধরে তাঁরই গৃহে এসে নিজের হাতে সমাপ্ত করেছেন ভক্তের অসমাপ্ত কাজ। পুঁথির বুকে স্বহস্তে লিখে গেছেন--"স্মর-গরল- খন্ডনং   মম শিরসি মন্ডন‌ং  দেহি পদ-পল্লবমুদারম্।"

কবির মনে যতক্ষণ লৌকিক সংস্কার ছিল ততক্ষণ কবি সংকোচে পদ রচনাসম্পূর্ণ করতে পারেননি। একটি অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে কবি'র বোধোদয় হয়েছে যে, রাধা ও কৃষ্ণ অভিন্ন । কবির পূর্ণ সিদ্ধি হয়েছে।

অজয় তীরে গঙ্গা যখন উজানে আসে তখন মকর সংক্রান্তিতে পুণ্যস্নান করা হয়। জয়দেব ঐদিন পুণ্য স্নান করে পূর্ণ বিকশিত হয়েছেন। কদমতলীর ঘাটের একটু দূরে কুশেশ্বর শিব মন্দিরে জয়দেব সাধনা করেছেন বলে কথিত আছে। ওইখানে সযত্নে রক্ষিত আছে কবির পদ্ম অঙ্কিত সিদ্ধাসন । জয়দেবের স্ত্রী বা সাধনসঙ্গিনী পদ্মাবতী। বৈষ্ণব তন্ত্রে এবং বাউল সাধনায় মূলত যে মিলটা পাওয়া যায়,তা হল- সবই দেহ সাধনা। বাউলরা পদ্মাবতী জয়দেবের সাধন স্থলে 'রসের ভিয়ান' দেখতে পান। তাই জয়দেব কে 'মধুর রস সাধনার' গুরু হিসেবে মান্য করে বাউলরা। আর তাই শ্রদ্ধাভরে প্রতিবছর বাউল- বৈষ্ণবরা আসেন এই মেলায়।

জয়দেবের জীবন কাহিনী নিয়ে অনেক রকম জনশ্রুতি বাগবিতণ্ডা আছে। তবুও মোটামুটি বলা চলে যে, রাজা লক্ষণ সেনের সভাকবি ছিলেন তিনি। অর্থাৎ তিনি দ্বাদশ শতাব্দীর মানুষ। জয়দেব এবং কেন্দুবিল্ব নিয়ে‌ সারা ভারতবর্ষের অনেক এলাকা থেকে দাবি জানালেও বীরভূমের অজয় নদীর তীরে কেন্দুবিল্ব বা কেঁদুলি গ্রামে বহু বছর ধরে চলে আসা জয়দেব স্মৃতিবাহী মেলা প্রতিবছর বসে।

আরো অনেকগুলি কারণে বীরভূমের দাবিকেই অগ্রগণ্য মনে হয়।

জয়দেব কেন্দুলী তে তিনদিনের উৎসবে বাউল সমাবেশ হয়। মেলা চলে আরো দশ -পনেরো দিন। তাই সারা মেলাজুড়ে তৈরি হয় অনেক অস্থায়ী আখড়া বা ছাউনি। এমনই এক ছাউনিতে সন্ধ্যাবেলায় কীর্তন গানের আসর বসেছে।

ছাউনির বাইরে আধুনিক সুদৃশ্য ফ্লেক্স ব্যানারে বড় বড় হরফে লেখা আছে-- গোবিন্দ দাস গোঁসাইয়ের আশ্রম , কাটোয়া, পূর্ব বর্ধমান।

এই ছাউনির আকৃতি দেখলেই বোঝা যায় যে, আশ্রম টি বেশ ধনী। ছাউনির ভিতরে ঢুকলে ব্যাপারটা আরও পরিষ্কার হয়। গানের আসর এর জন্য গড়া ছাউনির পশ্চিম প্রান্তে সুন্দর করে তৈরি হয়েছে একটি মঞ্চ। গাঁদা ফুলের মালা দিয়ে সাজানো হয়েছে মঞ্চ। মঞ্চের পিছনে রাধাকৃষ্ণের একটি বিশাল ফটো টাঙানো। ওই ফটোটার নিচে অর্থাৎ রাধা কৃষ্ণের পায়ের নিচে সাধক গোবিন্দ দাস গোঁসাইয়ের এক বিশাল কাটআউট, শ্রোতাদের মুখোমুখি। এই মঞ্চটা শ্রোতাদের বসার জায়গা থেকেউঁচুতে। মঞ্চে সুদৃশ্য গালিচা পাতা। গালিচার উপরে সাদা ধবধবে চাদর বিছানো। আর তার উপরে ততোধিক সাদা কভার লাগানো তাকিয়ায় ঠেস দিয়ে বসে আছেন আশ্রম জননী হরিপ্রিয়া মা। গোবিন্দ দাস গোঁসাই গতকাল থেকেহঠাৎ একটু অসুস্থ হয়ে পড়ায় আজ মঞ্চে উপস্থিত থাকতে পারেননি।

মঞ্চের এক পাশে বেশ উঁচু একটা ধূপকাঠির স্ট্যান্ডে গোঁজা একগোছা জ্বলন্ত ধূপকাঠি থেকে নিঃসৃত সুগন্ধি ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে উপরে উঠছে। গোবিন্দ দাস গোঁসাইয়ের সাধনসঙ্গিনী আশ্রম মাতা হরিপ্রিয়া দেবীর পরনে দুধসাদা গরদের শাড়ি। গায়ে হরিদ্রা বর্ণ সিল্কের উত্তরীয়, চোখে রিমলেস চশমা। হরিপ্রিয়া মায়ের অধরে স্মিত হাসি।

এই আশ্রমের ভক্ত শিষ্যেরা শুধু বর্ধমানে নয়, ,পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে আছেন। এই মেলা উপলক্ষে তাঁরা অনেকেই এসেছেন সপরিবারে। এই আশ্রম ছাউনির এলাকার ভিতরে তৈরি অস্থায়ী আস্তানায় ঠাঁই মিলেছে তাঁদের । এরা অধিকাংশই ধনী ভক্ত।

সাধারণ ভক্তদের থাকার জন্য মঞ্চের সামনে বিশাল এলাকা ঘিরে অস্থায়ী থাকার জায়গা তৈরি হয়েছে। অনেকেই আছেন সেখানে ব্যাগ, পোঁটলাপুঁটলি ইত্যাদি নিয়ে। মাটির উপরে বেশ পুরু করে খড় বিছিয়ে তার উপরে কোথাও বড় শতরঞ্চি, কোথাও মোটা চট, কোথাও ত্রিপল বিছিয়ে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। এক এক এলাকা থেকে আসা ভক্তরা এক এক জায়গায় দলবদ্ধভাবে আছেন।

পৌষ সংক্রান্তির ভোরে উঠে সকলেই পুণ্য স্নান সেরে নিয়েছে। দুপুরে আশ্রমে প্রসাদ খাওয়া হয়েছে। অনেকেই ক্লান্ত, তাই শুয়ে একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। অনেকে আবার বসে বসে ঝিমুচ্ছে। সন্ধে হয়ে আসছে। একটু পরেই মঞ্চে শুরু হবে কীর্তন গান। আজকে কীর্তন গানের আসরের প্রধান আকর্ষণ জনপ্রিয় কীর্তন গায়িকা মঞ্জু দাসীর কীর্তন। মঞ্জু দাসী এই আশ্রমে এবছর প্রথম গান গাইবে। মঞ্জু দাসী এসেছে অম্বিকা কালনা থেকে। মঞ্জু দাসীরবয়স খুব কম। এত অল্প বয়সে কীর্তন গানে এমন অসামান্য পারদর্শিতা খুব কম দেখা যায়। মঞ্জু দাসী শুধু অসাধারণ কীর্তন গান করেনা, দেখতেও নাকিসুন্দরী। মঞ্জুর সম্পর্কে এমন বহু কথা শুনে আজ কীর্তন প্রেমী শ্রোতারা ভিড় করেছে এই আসরে। মঞ্জুকে দেখার জন্য ও তার গান শোনার জন্য সবাই উৎসুক । মঞ্জুর গান শোনার জন্য অন্যান্য ছাউনি থেকেও শ্রোতারা এসে ভিড় করেছে এই ছাউনিতে।

এই মঞ্চে গতকাল থেকে দফায় দফায় হয়েছে বাউল গান, কীর্তন ও অন্যান্য অনুষ্ঠান। মঞ্চের বাম দিকে একধারে নামানো আছে হারমোনিয়াম ,শ্রীখোল, খঞ্জনি ইত্যাদি।

মাইকে বারংবার ঘোষণা হচ্ছে যে, একটু পরেই শুরু হতে চলেছে স্বনামধন্য কীর্তন গায়িকা মঞ্জু দাসীরকীর্তন।

আগ্রহী শ্রোতাদের ভিড়ে এক কোণে একটা শতছিন্ন কম্বলে কোনমতে শরীর ঢেকে বসে আছে সুবল দাস ।সুবল এর বয়স পঞ্চাশ অতিক্রান্ত। এক মাথা রুক্ষ উস্কোখুস্কো কাঁচাপাকা চুল। কাঁচা পাকা দাড়ি গোঁফে সারা মুখটাই প্রায় ঢাকা। সুবলের গায়ের রঙ আগে বেশ ফর্সা ছিল কিন্তু এখন তা রোদে পুড়ে তামাটেহয়ে গেছে। সুবল দাস এর পাশে শোয়ানো একটা বাঁশের লাঠি আর একটা ছোট্ট পুটুলি।

বছর তিনেক আগে একটি দুর্ঘটনায় পা ভেঙেছিল সুবলের। কিন্তু চিকিৎসা-বিভ্রাটে পা ঠিক মতো জোড়া লাগেনি। সেই থেকে সুবল দাস লাঠিতে ভর দিয়ে কোন মতে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলাফেরা করে। তার এই অবস্থায় তৃতীয় পক্ষের বোষ্টুমী বৃন্দা তাকে ফেলে রেখে পালিয়ে গেছে আরেকজনের হাত ধরে।

এই গানের আসরের ছাউনি ছাড়াও আরো অনেকটা জায়গা বাঁশ ,দড়ি , মোটা কাপড় ইত্যাদি দিয়ে ঘিরে রাখার ব্যবস্থা করেছে আশ্রম কর্তৃপক্ষ। সেই এলাকার ভিতরে আশ্রমের বিশেষ বিশেষ ভক্তদের সপরিবারে থাকার জন্য ব্যবস্থা করা হয়েছে ।এছাড়া আশ্রমের দেবতা শ্রীশ্রী শ্যামসুন্দরের থাকার জন্য অস্থায়ী মন্দির তৈরি হয়েছে। তৈরি হয়েছে রান্নার জায়গা, ভাঁড়ার ঘর, আশ্রম মাতা ও গোপাল দাস গোঁসাইয়ের থাকার জন্য ঘর ইত্যাদি।

সুবল জয়দেবের মেলাতে এসেছে দিন দুয়েক আগে। তখন সাধারণ ভক্তদের থাকা তথা গানের আসরের শ্রোতাদের বসার জন্য বিশাল ছাউনিটা তৈরী হয়ে গেছিল। আশ্রমের বেশ কয়েকজন সাধারণ ভক্ত ও এসে জুটেছিল তদ্দিনে। তারা আশ্রমের বিভিন্ন কাজে সাহায্য ও তদারকি করছিল।

সুবল দাস কে সেখানে মেলা শুরুর আগে থেকে থাকতে দিতে কিছুতেই রাজি হচ্ছিল না আশ্রমের অস্থায়ী ছাউনি তৈরির প্রস্তুতিপর্বের  তদারকিতে নিযুক্ত ভক্তের দল। সুবল দাস ও নাছোড়বান্দা। সে বিভিন্ন ভাবে ভক্তদের বোঝানোর চেষ্টা করলো যে সে এ আশ্রমের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে যুক্ত। আগে প্রত্যেক বছর এই আশ্রমের গানের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করত সে। এখন অসুস্থ হয়ে পড়েছে বলে আর গান গাইতে পারে না। কাজেই এই আশ্রম এর উপর তার একটা হক আছে।

গোলমাল তুমুলে পৌঁছাতেই আশ্রমের কয়েকজন প্রবীণ ভক্ত সেখানে আসেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন হরিরাম‍  গোঁসাই। তিনি সুবল দাস কে ভালো করে চিনতেন। শেষ পর্যন্ত তার হস্তক্ষেপেই সুবলের ছাউনিতে থাকা ও আশ্রম এ প্রসাদ প্রাপ্তি অনুমোদিত হলো।

হরিরাম গোঁসাই সুবল কে দীর্ঘদিন ধরে চেনেন। এক কালে সুবল এর কন্ঠে গান শোনার জন্য উদগ্রীবহয়ে থাকতো শ্রোতারা। আর আজ সেই সুবলেরএকি দুরবস্থা! মনে মনে দুঃখিত হন হরিরাম।

আবার এটাও ভাবেন যে সুবলের এই দুরবস্থার জন্য সে নিজেই দায়ী। টগর বোষ্টুমী সঙ্গে বেইমানি করেছিল সুবল। কে জানে সুবলের এই ভোগান্তি তার ই শাস্তি কি না! এই জন্মের পাপ- পুণ্য- ভালো-মন্দ সমস্ত কাজের ফলাফল মানুষকে বুঝি এই জন্মেই ভোগ করতে হয়।

মঞ্জু দাসীর গান শোনার জন্য আগ্রহী শ্রোতারা অধৈর্য হয়ে পড়ে। এখনো গায়িকা আসছেন না কেন? তবে কি তিনি এখনো এসে পৌঁছাননি এখনো? তিনি কি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন? এমনি হাজারো প্রশ্ন আর তার সম্ভাব্য উত্তর নিয়ে শ্রোতারা আলোচনা শুরু করতেই আসলে গুনগুনানি শুরু হলো।

হরি প্রিয়া মায়ের অধরের স্মিত হাসি মিলিয়ে গেল। ভ্রূ কুঞ্চন দেখা দিল কপালে। মঞ্চ থেকে উঠে ভিতরের দিকে গেলেন হয়তো কাউকে কিছু নির্দেশ দেওয়ার জন্য।

কিছুক্ষণ পরেই একজন ঘোষক এসে মাইক ধরে ঘোষণা করলেন, আশ্রম বিগ্রহ শ্রী শ্যাম সুন্দরের সন্ধ্যারতির জন্য আমাদের গানের অনুষ্ঠানের সাময়িক বিরতি দেওয়া হয়েছিল। একটু পরে আবার গান ‌শুরু হবে এতক্ষণ যারা গান শোনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন তাদের অবগতির জন্য জানাই যে আর কিছুক্ষণ পরেই অসাধারণ কীর্তন গায়িকা মঞ্জু দাসীর কীর্তন শুরু হবে। তবে তার আগে আপনাদের গান শোনাবেন কাটোয়ার স্বনামধন্য কীর্তনীয়া মদন দাস বৈরাগ্য। ঘোষকের কন্ঠ ছাপিয়ে শ্রোতারা সমস্বরে চিৎকার করে উঠল----মঞ্জু দাসী ---মঞ্জু দাসী--- আমরা মঞ্জু দাসীর গান শুনতে চাই।

ঘোষক শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে করজোড়ে বললেন,

দয়া করে আরও একটু সময় ধৈর্য ধরুন আপনারা । মঞ্জু দেবী অনেক দূর থেকে এসেছেন। উনি একটু সময় বিশ্রাম করেই গান শুরু করবেন। আপনাদের কাছে আমি ততক্ষণ অনুমতি চাইছি মদন দাস বৈরাগ্যের কন্ঠে কীর্তন শোনানোর। কীর্তনীয়া মদন দাস যে আপনাদের হতাশ করবেন না এটা আমি জোর গলায় বলতে পারি। দয়া করে আপনারা মদন দাস এর গান শুনুন।

শ্রোতারা চুপ করেন। মঞ্চে আসেন মদন দাস বৈরাগ্য যুবক। লম্বা ফর্সা এক মাথা ঝাঁকড়া চুল,গলায় তুলসী মালা, কপালে চন্দনের তিলক।

 মদন দাস তার সঙ্গীদের নিয়ে মঞ্চে আসীন হয়ে করজোড়ে বিনীত ভঙ্গিতে শ্রোতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, দয়া করে আমাকে গান গাইতে দিন। আমি আপনাদের নতুন গান শোনাবো। শ্রীশ্রী জয়দেব গোঁসাইয়ের গীতগোবিন্দ থেকে গান গাইবো আমি আশা করি আমার গান আপনাদের ভালো লাগবে। একটু সময় পরে গান ধরেন মদন দাস বৈরাগ্য---ঐঐঐ--

" নিন্দতি চন্দন মিন্দু কিরণমনুবিন্দতি খেদমধীরম্।

ব্যল-নিলয়-মিলনেন গরলমিব কলয়তি মলয় সমীরম্।।

সা বিরহে তব দীনা।

মাধব-মনসিজ-বিশিখ ভয়াদিব

ভাবনায় ত্বয়ি লীনা।।"

সুললিত কন্ঠে জয়দেবের শ্লোক সুর করে গিয়ে মদন দাস ক্ষণিকের বিরতি দেন।

শ্রোতাদের মধ্যে উসখুসানি শুরু হওয়ার আগেই মদন দাস বললেন, এবার আমি ভক্ত কবি জয়দবের

লেখা এই সংস্কৃত শ্লোকটির বঙ্গানুবাদটি গেয়ে শোনাব।

গান ধরেন‌ মদন দাস বৈরাগ্য।

"আজি দুখিনী হয়েছে রাধা

হয়েছে অধরা,--

নিন্দা করে চন্দনের

আর শশধর ধারা।

সহিতে নাহি পারে রাই

সবই লাগে আগুনের গোলা,

দখিনা পবনও লাগে বিষময়

জুড়াইতে নাহি পারে শরীরের জ্বালা।

হে শ্যাম মাধব---

রাধিকা হয়েছে তব বিরহেতে দীনা

ধ্যানময়ী তোমাতেই ওগো,

তব অঙ্গে লীনা।'

মঞ্চের ঠিক পিছনে একটি ছাউনিতে নিজের দলের সহশিল্পীদের নিয়ে অপেক্ষা করছিল মঞ্জু দাসী। মুগ্ধ হয়ে সে শুনছিল মদন দাস বৈরাগ্যের সুললিত কন্ঠের গান।

যুবক শিল্পীর কন্ঠে মাধুর্য এবং গায়কীতে মুগ্ধ হচ্ছিল সে।