সমীরণ সরকার ১৯৫৩ সালের ১৭ই এপ্রিল বীরভূম জেলার ময়ূরেশ্বরে জন্মগ্রহণ করেন। বর্তমানে তিনি সাঁইথিয়ার বাসিন্দা। পিতা প্রয়াত ডাঃ রণজিৎ কুমার সরকার ছিলেন একজন চিকিৎসক এবং মাতা প্রয়াতা বন্দনা সরকার ছিলেন শিক্ষিকা। শৈশব কেটেছে গ্রামবাংলার নির্মল প্রকৃতির সান্নিধ্যে, মা-বাবার স্নেহ, শিক্ষকদের সুশাসন এবং বন্ধুদের আন্তরিকতায় সমৃদ্ধ এক পরিবেশে।
ছোটবেলা থেকেই বই পড়ার প্রতি তাঁর ছিল প্রবল আকর্ষণ। ময়ূরেশ্বর হাইস্কুলের গ্রন্থাগার এবং শিক্ষক আব্দুল মাবুদ মহাশয়ের উৎসাহ তাঁকে সাহিত্যজগতের অমূল্য ভাণ্ডারের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। অল্প বয়সেই দেশি-বিদেশি সাহিত্যের বিস্তৃত পাঠ তাঁর কল্পনাশক্তি ও সাহিত্যবোধকে সমৃদ্ধ করে। সেই থেকেই লেখক হওয়ার স্বপ্নের বীজ রোপিত হয় তাঁর মনে।
মাত্র সতেরো বছর বয়সে তাঁর প্রথম গল্প ‘পতিতা’ প্রকাশিত হয় মাসিক চন্দ্রভাগা পত্রিকায়। পরবর্তীকালে নাটক, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, কিশোর সাহিত্য, ছড়া এবং ধর্মীয় গ্রন্থ— সাহিত্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তিনি স্বচ্ছন্দ বিচরণ করেছেন। আজ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত রচনার সংখ্যা কয়েক শতাধিক। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, কিশোর সাহিত্য ও প্রবন্ধে তিনি একটি স্বতন্ত্র সাহিত্যিক পরিচয় নির্মাণ করেছেন।
পেশাগত জীবনে তিনি একজন ব্যাংক আধিকারিক হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। কর্মব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যচর্চাকে কখনও বিস্মৃত হননি। স্ত্রী ছবি সরকার, পুত্র অনির্বাণ সরকার এবং নাতনি ভাস্বতী (তানিয়া)-র উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা তাঁর সাহিত্যসাধনার অন্যতম শক্তি।
সাহিত্যক্ষেত্রে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বহু সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। উল্লেখযোগ্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কার, রামশঙ্কর স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, সমরেশ বসু স্মৃতি সম্মাননা, রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মাননা, তরুণ তপন স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার, মাতৃভাষা জয়ী কৃতি বাঙালি সম্মাননা, হাজারদুয়ারি সাহিত্য সম্মাননা, সরস্বতী রায় স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার এবং স্বপ্ন উড়ান সাহিত্য কৃতি সম্মাননা সহ অসংখ্য স্বীকৃতি।
লেখালেখির সুবাদে তিনি নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ি, নলিনী বেরা, হিমাদ্রি কিশোর দাশগুপ্ত, রতন কাহার, সিদ্ধার্থ সিংহ প্রমুখ বিশিষ্ট সাহিত্যিক ও সংস্কৃতিবিদদের সান্নিধ্য লাভ করেছেন।
সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সাহিত্য ও সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। অবসরের সময় ফুলচাষ, কিচেন গার্ডেনিং এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।
তাঁর বিশ্বাস— সাহিত্য মানুষের জীবনবোধকে সমৃদ্ধ করে এবং শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে সময়, সমাজ ও মানুষের চিরন্তন গল্প। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি আজও নিষ্ঠার সঙ্গে লিখে চলেছেন।
"খুঁজতে গিয়ে সুখের ঘরের চাবি,
প্রিয়, তোমার কথাই গেলাম ভুলে,
আঁধার নেমে আসছে চারিধারে—
বৃথা সময় বয়েই গেল চলে।"
— ‘চাবির খোঁজে’, গোধূলি বেলার গান