(প্রথম পর্ব)

কটু আগেই দিনমণি দিনের শেষ রশ্মি টুকু ছড়িয়ে দিতে দিতে হঠাৎ দিগ্বলয়ের আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। কিছুক্ষণ আগে পৌষের অপরাহ্ণে পশ্চিমের যে আকাশটা সূর্যের বুক থেকে লাল রঙ চুরি করে রাঙিয়েছিল নিজেকে, হঠাৎই সে যেন হয়ে পড়ল তমসাবৃত। বনস্পতির শাখে শাখে ঘরে ফেরা বিহগদে‌র কলকাকলি ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে আসছে। পৌষের হিমেল ধূসর চাদর মুড়ি দিয়ে পায়ে পায়ে নেমে আসছে সন্ধ্যা। গৃহস্থ ঘরের বধূরা শাঁখে ফুঁ দিতে শুরু করেছে । ভেসে আসছে আজানের আওয়াজ।

আনন্দ মাস্টার গুনগুন করে গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে সাইকেলের প্যাডেলে জোরে চাপ দিয়ে দ্রুত বাড়ি ফেরার চেষ্টা করছিল। মনে মনে খুব বিরক্ত হচ্ছিল সে। আর সেটাকে চাপা দেওয়ার জন্যই মাঝে মাঝে গানের সুর ভাঁজছিল ।

কোথায় সে আজ ভেবেছিল, স্কুল থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এক কাপ চা খেয়ে আখড়ার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়বে। চার চারটে দিন আখড়ায় যাওয়া হয়নি। শিলিগুড়িতে শিক্ষক সংগঠনের রাজ্য সম্মেলন ছিল। জেলা সভাপতির নির্দেশে , জেলা সম্পাদক শম্ভু দার সঙ্গী হয়ে তাকে যেতে হয়েছিল সম্মেলনে।

সন্ধ্যেবেলা হলেই তার মনটা ওখানে ছটফট করে উঠত। দাঁতে দাঁত চেপে সময় কাটাতো। 

রোজ সন্ধ্যায় শম্ভুদা তাকে শহরটা ঘুরে দেখার প্রস্তাব দিলে সে নানা রকম অজুহাতে পাশ কাটাতে চাইতো। শম্ভুদা বলতো, কিরে, তোর শরীর খারাপ নাকি? 

---না না, আমি ঠিক আছি।

----তাহলে মন খারাপ করে বসে আছিস কেন?

ঘুরে আসি চল। বাড়ির জন্য মন খারাপ করছে নাকি?

-----না না দাদা, তেমন কিছু না।

-----তাহলে চল আজকে এক জায়গায় যাব। 

-----কোথায় ?

----হংকং মার্কেটে।

বাধ্য হয়ে সে শম্ভুদার ‌সঙ্গী হয়েছে। শম্ভুদা মার্কেটে গিয়ে অনেক কিছু কিনেছেন বাড়ির সদস্যদের জন্য । সে কিছু কিনছে না দেখে শম্ভুদা বলেছেন ,কিরে, ছেলে, বউয়ের জন্য কিচ্ছু কিনবি না? 

----কী আর কিনব? ওদের যা লাগে তা তো লোকাল মার্কেট থেকেই কিনে দিই।

----তা বলে বাইরে এসেছিস, বাড়ির জন্য কিছু কিনবি না? 

-----না দাদা।

----বেশ , যা ভালো বুঝিস।

শেষে শম্ভুদা তার আট বছরের ছেলে পিন্টুর জন্য একটা খেলনা মোটরগাড়ি কিনে দিয়েছে। 

সে নিতে আপত্তি করেছিল বলে শম্ভুদা তাকে মৃদু তিরস্কার করেছিলেন। বাধ্য হয়ে সে ওটা নিয়েছিল।

আজ সকালে বাড়ি ফিরেছে আনন্দ মাস্টার ।ভেবেছিল, হেডমাস্টার মশাই কে বলে আজ একটু তাড়াতাড়ি স্কুল থেকে বেরিয়ে বাড়ি ফিরে এক কাপ চা খেয়েই চলে যাবে আখড়াতে। কিন্তু ওই যে বলেনা, মানুষ ভাবে একরকম আর হয় অন্যরকম। আনন্দ মাস্টারের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হলো।

 বিকেল চারটার সময় হেডমাস্টারমশাই হঠাৎ শিক্ষকদের নিয়ে জরুরি মিটিংয়ের আয়োজন করলেন ।সে মনে মনে ছটফট করলেও স্কুল থেকে বেরোতে পারছিল না।

মিটিংয়ে বসে জানতে পারল , স্কুলের চারিদিকে

বাউন্ডারি ওয়াল দেওয়ার জন্য সরকারি গ্র্যান্ট এসেছে। বিডিও সাহেব চেক দিয়ে দিয়েছেন

হেডমাস্টার মশাইয়ের হাতে। দ্রুত কাজ শেষ করার কথা বারবার করে বলেছেন তিনি। তাই গণিতের শিক্ষক আনন্দময় মন্ডল ও বাংলা শিক্ষক‌ মধ্য বয়সী ভুবনেশ্বর চৌধুরীকে পুরো কাজটা তত্ত্বাবধান করার দায়িত্ব দিলেন হেডমাস্টার মশাই।

বাংলার শিক্ষক ভুবনেশ্বর বাবু বাঙাল ভাষায় বললেন, আনন্দ যুবক মানুষ,অ একাই সামাল দিতে পারবে, আমারে আর এই বুড়া বয়সে 

এসব কাজে না জড়াইলেই ভালো হইতো। 

হেডমাস্টার মশাই বললেন, শত হলেও আনন্দ 

ছেলেমানুষ। আপনি ওর মাথার উপরে থাকলে ও সাহস পাবে। 

---ঠিক আসে, আপনার কথা তো আর ফ্যালতে

পারিনা। কী ভাই আনন্দ, ঠিক আসে তো।

আনন্দ তখন তাড়াতাড়ি মিটিং শেষ করে পালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত। তাই সে কোন রকমে ঘাড় কাত করে বলল, হ্যাঁ ,ঠিক আছে।

সাইকেল চালাতে চালাতে আনন্দ মাস্টার ভাবছিল, আখড়া থেকে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসে ঘুমোতে হবে। এ কয়দিন নতুন জায়গায় গিয়ে রাত্রে ভালো ঘুম হয়নি তার। এই একটা বদ অভ্যাস আনন্দ মাস্টারের। নিজের বিছানার স্পর্শ এবং সাদা কাপড়ে ফুল তোলা ওয়ারে মোড়া বিশেষ বালিশটিকে মাথার নিচে না পেলে ঘুম আসেনা তার। সে দুগ্ধ ফেননিভ নরম শয্যা হলেও না। সম্মেলনে শোয়ার আয়োজন মন্দ ছিল না। তবু যথারীতি ঘুম আসেনি মধু মাস্টারের। বৃথা বিছানায় ছটফট না করে মনে মনে নতুন গান রচনা করেছে। তার সুর ও দিয়েছে। ওই নতুন গানটা আখড়ায় গিয়ে নবীন বাবাজিকে না শোনানো অব্দি মনে মনে ছটফট করছে আনন্দ মাস্টার। শিলিগুড়ি যাওয়ার আগের দিন সন্ধ্যায় কৃষ্ণচরণ দাস বাবাজি সুললিত কণ্ঠে মধুর সুরে বিদ্যাপতির পদ ধরেছিলেন------

      -" জনম অবধি হম রূপ নেহারনু

নয়ন না তিরপিত ভেল।

সেই মধুর বোল শ্রবণহি শুননুি

শ্রুতি পথে পরশ না গেল।।

কত মধুর যামিনী রভসে‌ গোঁয়ায়নু

না বুঝনু কৈছা কেল।

লাখ লাখ যুগ হিয়ে হিয়ে রাখনু 

তবু হিয়া জুড়ান না গেল।।

যত যত রসিক জন রসে অনুগমন

অনুভব কাহু না পেখ।

বিদ্যাপতি কহে প্রাণ জুড়াইতে

লাখে না মিলল এক।।"

গানের সঙ্গে মৃদঙ্গে বোল তুলেছিল কুমোর পাড়ার বিকাশ আর সে নিজে।

মন্দিরা বাজিয়েছিল ধীবর পাড়ার নোটন ধীবর।

আসরে কৃষ্ণচরণ দাসের সাধন সঙ্গিনী ললিতা বৈষ্ণবী ছাড়াও ছিল গোকুল বৈরাগীর মেয়ে স্বামী পরিত্যাক্তা হরিপ্রিয়া, চাষাপাড়ার‌ মদন আর তার বন্ধু বিনয়। আর কিছু ভক্ত শ্রোতা ও উপস্থিত ছিলেন আসরে। সেদিনই আনন্দ মাস্টারের মাথায় দুটো লাইন খেলা করছিল---

         ( ওগো) দেখিয়া তোমার রূপ বধুয়া

মিটিলো না নয়ন তৃষা।

শুনিয়া তোমার মধুর ভাষণ

পুরিল না বঁধু আশা।।,.....

ওই গানটাই শিলিগুড়িতে সম্মেলনে গিয়ে শেষ করেছে। তারপর মাথার মধ্যে খেলা করেছে সুরের পাখি। দিনের বেলায় সম্মেলনের ওপেন সেশনে মঞ্চের উপর যখন রাজ্য স্তরের বাঘা বাঘা নেতারা বক্তৃতার ফুলঝুরিতে আসর গরম করছিলেন, আনন্দ মাস্টার তখন হলের ভিতর শ্রোতারা আসনে বসে মনে মনে সুর হাতড়ে বের করতে ডুব দিয়েছে মনের গভীরে।

স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায় আনন্দ মাস্টারের। বাড়িতে পৌঁছে সাইকেলটাকে উঠানের একপাশে স্ট্যান্ড নামিয়ে দাঁড় করাতে করাতে আনন্দ মাস্টার দেখল, সুমিত্রা তুলসী তলায় প্রদীপ দেখাচ্ছে। 

ও চট করে শোবার ঘরে ঢুকে আলনা থেকে একটা শাল টেনে নিল। ঠান্ডা টা ভালোই পড়েছে। আখড়া থেকে ফেরার সময় শাল গায়ে না দিলে ঠান্ডা লেগে যাবে।

ঘর থেকে বেরিয়ে উঠোনে পা দিতে না দিতেই সুমিত্রার তীক্ষ্ণ কন্ঠ ঝংকার তুলল --- ভরা সাঁঝে চললে কোথায়?

----- ওই কৃষ্ণচরণ দাস বাবাজির কাছে যাবো একটু, অনেকদিন দেখা-সাক্ষাত হয়নি তো।

---- দুটো দিনতো বাইরে ফুর্তি মেরে এলে আবার ঘরে আসতে না আসতেই চললে ফুর্তি করতে!

----- শিলিগুড়িতে আমি সম্মেলনে গেছিলাম, রাজ্য সম্মেলনে।

---- রাখো তোমার ঘোড়ার ডিমের সম্মেলন! আমি কিছু বুঝি না ভেবেছ? সম্মেলন মানে তো খানা-পিনা, ফুর্তি, গল্পগুজব!

----- যা বোঝনা ,তা নিয়ে কথা বলোনা সুমিত্রা। ওখানে কত রকম আলোচনা হল, নতুন নতুন কর্মসূচি নেওয়া হলো আগামী বছরের জন্য। কর্মপদ্ধতি রিভিউ করে নতুন পদ্ধতি ঠিক করা হলো।শেষে নতুন কমিটি তৈরি করা হোলো।

---- কমিটি তৈরির কথা আর বোলো না, হাসি পায়। আমি কিছু জানিনা ভেবেছ?

----কী জানো, কী জানো তুমি?

----তোমাদের পেট গুলো তখন ভালোমন্দ খাবারে ভর্তি থাকে, হাতে থাকে সুন্দর সুন্দর গিফট ।আবার বাড়ি ফেরার তাড়াও থাকে সবার। 

---তো?

------ তাই তখন কোনমতে থোড়-বড়ি-খাঁড়া নয়তো খাঁড়া-বড়ি-থোড় একটা পরবর্তী কমিটির নাম প্রস্তাব করে লিস্ট জমা দেয় বিদায়ী কমিটি। সবাই তাতে হুক্কাহুয়া করে সায় দেয়।

------ ও বাবা ,এতসব তুমি জানলে কী করে?

------ আমি কলেজে পড়ার সময় দু দুবার এ.জি.এস আর একবার জি.এস ছিলাম। এসব বিষয় আমার জানা।

---- এসব খবর আমি জানতাম না তো। বলোনি তো কোনদিন।

---- আগে বলার প্রয়োজন হয়নি তাই বলিনি, আজ বললাম। বাদ দাও ওসব কথা। এই ভর সন্ধ্যাবেলায় তুমি চললে ক্যানে বলতো?

------ একটা নতুন গান লিখেছি। ওইটা একটু বাবাজিকে শোনাব বলে....

------ বাবাজি না মা জী? তা আর সেখানে গিয়ে কোন লাভ হবে না।

---- মানে? কী হয়েছে সেখানে?

----- আশ্রমের কমিটি পঞ্চায়েতে নালিশ করেছে তোমার ওই কৃষ্ণ চরণ দাস বাবাজির নামে। ও ভ্রষ্ট। বাউল‌ আশ্রমের নিয়ম ভেঙেছে। ওকে আশ্রম থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে।

---- কেন কী করেছে সে?

--- করবে আবার কী? বুড়ো বয়সে বাবাজির বাবা হওয়ার সাধ হয়েছে।

------মানে?

---- দিন কয়েক থেকে অসুস্থ ছিল তোমার ওই ললিতা। পরশুদিন ওর চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে গেছিল বাবাজি। ডাক্তারবাবু পরীক্ষা করে বলেছেন যে, ও পোয়াতি। হাসপাতালে তো গাঁয়ের অনেক লোক ছিল। তারাই হয়তো সব শুনে কমিটির লোক কে লাগিয়েছো। ওরাই নালিশ করেছে পঞ্চায়েতে। ওরাই দাবি জানিয়েছে, কৃষ্ণচরণ গোঁসাই কে মহন্তের গদি থেকে নামিয়ে দিতে হবে। কিন্তু.....

--- কিন্তু কী?

------- আমার মন বলছে, ওই বুড়ো ভাম কেষ্ট গোঁসাই এ দুষ্কম্মের লেগে দায়ী নয় , দায়ী অন্য কেউ।

কথা শেষ করেই সুমতি আনন্দ ‌মাস্টারের দিকে তাকিয়ে চোখমুখের এমন ভঙ্গি এবং ইঙ্গিত করল যে ,রাগে গা পিত্তি জ্বলে উঠলো আনন্দ মাস্টারের। ধৈর্যচ্যুতি ঘটলো তার।

গলা চড়িয়ে আনন্দ মাস্টার বলল, মানে, কী বলতে চাও তুমি?

----- মানে টা কী আমাকে নিজের মুখে ভেঙ্গে বলতে হবে? বুদ্ধি থাকলে বুঝে নাও। দ্রৌপদীর ছিল পাঁচ স্বামী আর তোমাদের ললিতা তো বারো.......

----চুপ চুপ! আর একটা কথাও বলবে না তুমি ছিঃ! ছি ছি সুমতি, তোমার মুখে কী কিছুই আটকায় না? বাদ দাও ওসব ,আমি চললাম।

----- এদ্দিন বাইরে বাইরে ঘুরে তোমার সাধ মিটলোনা ,আবার চললে সেখানে! ছেলেটাকে নিয়ে খানিক পড়াতে বসলে ও তো পারতে।

,---- ওসব আমি এখন পারব না। ফিরে আসি তারপর দেখব।

------ তা পারবে কেন? সব দায় তো আমার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত তোমার সংসারে দাসীবৃত্তি করতে করতে আমার হাড়মাস কালি হয়ে গেল আর তুমি চললে ফুর্তি করতে। যাচ্ছ যাও, একটা স্পষ্ট কথা শুনে যাও। বেশি রাত হলে আমি দোর খুলবো না কিন্তু।

----- বেশ ,তাই হবে।

অজয় নদ এখানে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে দুটি বিশাল বাহুর মতো দুপাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছেএকটা বিশাল ভূখণ্ড । দুটি ধারা কিছুদূর পর্যন্ত আলাদা আলাদাভাবে প্রবাহিত হওয়ার পর  আবার এক জায়গায় এসে মিলিত হয়ে এগিয়ে গেছে সামনের দিকে। প্রকৃতির এ এক বিচিত্র খেয়াল।

আপন আনন্দে সৃষ্টি করে অনেক কিছু ,আবার ইচ্ছে হলে ধ্বংস করে নিষ্ঠুরের মত। বর্ষাকালে যখন ওই দুটি ধারা কানায় কানায় ভরে উঠে জলে তখন মাঝের ভূখণ্ডটি কে একটি দ্বীপের মতো মনে হয়। ওই ভূখণ্ডের ভিতরেই আছে ছোট-বড় দশটি গ্রাম।ওই গ্রাম গুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় গ্রামটির নাম বৃন্দাবনপুর। নদীর কোল ঘেঁষেই ওই গ্রাম। ওই গ্রামে পোস্ট অফিস আছে, প্রাইমারি স্কুল আছে, জুনিয়র হাই স্কুল আছে আর আছেবৃন্দাবনপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিস।

এই বৃন্দাবনপুর গ্রামেই কৃষ্ণচরণ দাসের আখড়া। কৃষ্ণচরণ দাস বর্তমানে আখড়ার প্রধান পুরুষ হলেও আখড়ার মালিক সে নয়। এই বৈষ্ণব আখড়া বা আশ্রম টি বহু প্রাচীন।

বৈষ্ণব সাহিত্যে একটি সুপরিচিত গ্রামের নাম কাঁদরা। এই গ্রামটি বর্তমানে পূর্ব বর্ধমান জেলার

কাটোয়া মহকুমার অন্তর্গত। এই গ্রাম পূর্বে বীরভূম জেলার অন্তর্গত ছিল।১২৭২ সনে বর্ধমান জেলার( বর্তমানে পূর্ব বর্ধমান )অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এই কাঁদরা গ্রাম বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি জ্ঞানদাসের জন্মভূমি। জ্ঞানদাসের আবির্ভাব ও তিরোভাব কাল নিশ্চিতভাবে জানা না গেলেও তৎকালীন বিভিন্ন রচনা এবং ঘটনা থেকে অনুমান করা হয় যে, তিনি 1531 খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। ,'বাংলার সে এক অতুলনীয় গৌরবের কাল।' তখন গৌরাঙ্গ নিত্যানন্দ অদ্বৈতের তিরোধানের পর 'ঠাকুর নরত্তম ,আচার্য শ্রীনিবাস ও প্রভু শ্যামানন্দ পূর্ণ উদ্যমে' কাজ আরম্ভ 'প্রত্যেক বাঙালি যেন গোরা প্রেমের উচ্ছ্বাসে' মেতে উঠেছে। সেই চৈতন্য পরবর্তী কালের বিখ্যাত বৈষ্ণব কবি ছিলেন জ্ঞানদাস ও গোবিন্দ দাস। জ্ঞানদাস বাংলা এবং ব্রজবুলি ভাষা থেকে বহু পদ রচনা করেছিলেন। এই "জ্ঞানদাসের বিশেষ বন্ধু ছিলেন মনোহর দাস। চৈতন্যচরিতামৃত ও নরোত্তম বিলাসে জ্ঞানদাস ও মনোহর দাস এর নাম একত্রে উল্লেখিত হয়েছে। জ্ঞানদাসের জীবিত কালে মনোহর কাঁদরাতেই থাকতেন, পড়ে আউলিয়া চৈতন্য দাস নাম গ্রহণ করে দেশে দেশে পর্যটন করেন। এদেশে বৈরাগীর আখড়া বেঁধে বাসের প্রথা তিনি প্রবর্তিত করেছিলেন। এইজন্য পশ্চিমবঙ্গের যত্রতত্র' মনোহর দাস এর আখড়া',' মনোহর তলা' প্রভৃতি স্থানে আজও তার পুজো হয়ে থাকে। অনেক আখড়ায় যে কোনো উৎসবে পর্বে দেববিগ্রহের পরেই মনোহর দাস এর ভোগ দেওয়ার রীতি এখন প্রচলিত আছে, সাধারণ লোক ও নানা উপলক্ষে মনোহর দাস এর নামে ভোগ মানসিক করে।" সেকালের অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তি মনোহর দাস এর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তারমধ্যে কবি বিপ্র পরশুরাম অন্যতম।" এই বিপ্র পরশুরামের শিষ্য জ্ঞানী উদ্ধব দাস প্রায় দুশো বছর আগে বৃন্দাবনপুর গ্রামে এই আখড়া বা আশ্রম প্রতিষ্ঠা করেন। এই উদ্ধব দাস প্রথম জীবনে একজন নামী জনপ্রিয় কবিরাজ ছিলেন। তাঁর বাড়ি ছিল নবরসিকদের অন্যতম" শ্রীকৃষ্ণকর্ণামৃত" গ্রন্থ প্রণেতা পরম বৈষ্ণব বিল্বমঙ্গল ঠাকুর এর পূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত বিল্বমঙ্গল- বেলুরিয়া গ্রামে।


ক্রমশঃ পরবর্তী অংশ পরের সংখ্যায় দেখুন।