লেজ স্ট্রিটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঈশান কয়েক সেকেন্ড নড়তেই পারল না।

বৃষ্টি তখনও পড়ছে। রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের আলো ঝাপসা হয়ে গেছে জলের পর্দায়। চারপাশে মানুষের ভিড়, গাড়ির হর্ন, দোকান বন্ধ করার শব্দ—সবই যেন দূর থেকে ভেসে আসছে।

কিন্তু ঈশানের চোখ আটকে আছে সেই জায়গাটায়।

মাত্র কয়েক মিনিট আগেও যেখানে একটা বইয়ের দোকান ছিল...

এখন সেখানে শুধু ভেজা লাল ইটের দেওয়াল।

কোনো দরজা নেই।

কোনো সাইনবোর্ড নেই।

কোনো আলো নেই।

যেন দোকানটা কোনোদিন অস্তিত্বই রাখেনি।

ঈশান আবার ডায়েরিটার দিকে তাকাল।

চামড়ার মলাটে বৃষ্টির ফোঁটা পড়ছে।

আর সেই নীল পাথর...

এক মুহূর্তের জন্য যেন জ্বলে উঠল।

তারপর নিভে গেল।

ঈশানের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

নিজেকেই প্রশ্ন করল সে। "আমি কি হ্যালুসিনেশন দেখছি?"

কিন্তু প্রশ্নটা শেষ হওয়ার আগেই একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেল।

"দাদা, দাঁড়িয়ে আছেন কেন?"

পাশের চায়ের দোকানের মালিক।

ঈশান দ্রুত এগিয়ে গেল।

"এই যে... এখানে একটা বইয়ের দোকান ছিল না?"

লোকটা অবাক হয়ে তাকাল।

"কোথায়?"

"এইখানে।"

"না তো।"

"একজন বৃদ্ধ ছিলেন।"

লোকটা এবার হেসে ফেলল।

"আপনি ভুল দেখেছেন। আমি পনেরো বছর ধরে এখানে চা বিক্রি করছি। এই দেওয়াল কোনোদিন সরেনি।"

ঈশানের মুখ শুকিয়ে গেল।

"নিশ্চিত?"

"একশো ভাগ।"

লোকটা আবার বলল—

"আপনার শরীর খারাপ নাকি?"

ঈশান আর কথা বাড়াল না।


কলেজ স্ট্রিট থেকে বাড়ি ফেরার সময় বারবার পিছন ফিরে তাকিয়েছিল ঈশান। তার মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাকে অনুসরণ করছে।

কিন্তু রাস্তার ভিড়ের মধ্যে কাউকে আলাদা করে বোঝার উপায় ছিল না।

শ্যামবাজারের পুরনো বাড়িটায় পৌঁছতে পৌঁছতে রাত সাড়ে দশটা বেজে গেল।

দোতলার ঘরটা খুলতেই পরিচিত গন্ধটা নাকে এল।

পুরনো বই।

কাগজ।

কাঠ।

আর সময়।

ঈশানের ঘরটা অনেকটা ব্যক্তিগত আর্কাইভের মতো। চারদিকের দেওয়ালে ঝোলানো ভারতের পুরনো মানচিত্র, রাজপুত দুর্গের ছবি, মুঘল যুগের যুদ্ধক্ষেত্রের স্কেচ।

একটা বড় টেবিলের ওপর ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পাণ্ডুলিপি।

সাধারণ মানুষের চোখে এগুলো হয়তো এলোমেলো কাগজ।

কিন্তু ঈশানের কাছে এগুলো ইতিহাসের নিঃশ্বাস।

ভেজা জামা বদলে সে চা বানাল।

তারপর টেবিলের ওপর ডায়েরিটা রাখল।

ঘড়িতে তখন রাত ১১টা ১৭।

বাইরে আবার বিদ্যুৎ চমকে উঠলো, সাথে ঝোড়ো হাওয়া। ত্রিফলার আলোগুলো যেন আজ বড়বেশি নীল আলো ছড়াচ্ছে ...

এক ঝলক আলো এসে পড়ল ডায়েরির মলাটে বসানো নীল পাথরের ওপর।

এক মুহূর্তের জন্য মনে হল পাথরটা যেন আলো প্রতিফলিত করেনি...

বরং নিজেই জ্বলে উঠেছিল।

ঈশান দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।

নিজেকে বোঝাল—

"অতিরিক্ত কল্পনা করছি।"

কিন্তু মনের ভেতরে কোথাও একটা অস্বস্তি থেকেই গেল।


ল্যাপটপ খুলে সে কাজ শুরু করল।

প্রথম লক্ষ্য—

১৮৯৭ সালের চিত্তোরগড়।

ডিজিটাল আর্কাইভ।

পুরনো সংবাদপত্র।

ব্রিটিশ ভারতের প্রশাসনিক রিপোর্ট।

প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগের নথি।

একটার পর একটা ফাইল খুলতে লাগল সে।

প্রায় এক ঘণ্টা কেটে গেল।

কিছুই নেই।

কোনো রহস্য নেই।

কোনো ডায়েরির উল্লেখ নেই।

কোনো নীল পাথরের মূর্তিও নেই।

তারপর...

হঠাৎ।

একটা স্ক্যান করা নথি চোখে পড়ল।

ফাইলের নাম—

Rajputana Archaeological Correspondence – November 1897

ঈশানের শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে এল।

সে দ্রুত ফাইল খুলল।

পাতাগুলো হলদে।

কালি অনেক জায়গায় ফিকে হয়ে গেছে।

কিন্তু একটি রিপোর্ট পরিষ্কার।

প্রেরক—

Arthur Henry Blake

সহকারী প্রত্নতাত্ত্বিক কর্মকর্তা।

রাজপুতানা সার্কেল।

তারিখ—

১৭ নভেম্বর ১৮৯৭।

ঈশান ধীরে ধীরে পড়তে শুরু করল।

"বিজয় স্তম্ভের উত্তর-পূর্ব অংশে খননকার্যের সময় শ্রমিকেরা একটি অদ্ভুত পাথরের মূর্তির অংশ আবিষ্কার করেছে। মূর্তিটির ডান চোখে নীল বর্ণের এক অজানা খনিজ পদার্থ বসানো রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। আবিষ্কারের পর থেকে স্থানীয় শ্রমিকদের মধ্যে অস্বাভাবিক ভীতি দেখা দিয়েছে। তাদের দাবি, রাতের বেলায় মূর্তির চোখে আলো জ্বলতে দেখা যায়।"


ঈশানের বুকের ভেতর কাঁপন শুরু হল।

সে আবার পড়ল।

আরও একবার।

শব্দগুলো যেন ঠিক সেই ডায়েরির স্কেচের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে।

নীল পাথর।

মূর্তি।

চিত্তোরগড়।

১৮৯৭।

সবকিছু।

তারপর সে পরের পাতা খুলল।

ফাইল শেষ।

আর কোনো তথ্য নেই।

কোনো উপসংহার নেই।

কোনো ব্যাখ্যা নেই।

মনে হচ্ছে মাঝের পাতাগুলো কেউ ইচ্ছে করে সরিয়ে দিয়েছে।


ঈশান ভুরু কুঁচকাল।

এটা অস্বাভাবিক।

সরকারি নথিতে এমন অসম্পূর্ণতা সচরাচর দেখা যায় না।

সে সঙ্গে সঙ্গে আর্থার ব্লেকের নাম সার্চ করল।

একবার।

দু'বার।

পাঁচবার।

ফলাফল—

প্রায় শূন্য।

একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও তার অস্তিত্ব যেন ইতিহাস থেকে মুছে গেছে।

কোনো ছবি নেই।

কোনো জীবনী নেই।

কোনো মৃত্যুর রেকর্ড নেই।

কিছুই না।

শুধু একটি পুরনো সংবাদপত্রে ছোট্ট একটি লাইন।

The Pioneer

লখনউ

ডিসেম্বর, ১৮৯৭

"Assistant Archaeological Officer A.H. Blake has been reported missing while conducting field studies in Rajputana."


ব্যস।

এর পর আর কিছু নেই।

মানুষটা যেন পৃথিবী থেকে হাওয়া হয়ে গেছে।


ঈশানের বুকের ভেতর হঠাৎ অদ্ভুত উত্তেজনা তৈরি হল।

এই সেই অনুভূতি—

যেটা একজন গবেষক অনুভব করে যখন সে জানে যে সে এমন কিছুর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যা অন্য কেউ খেয়াল করেনি।

সে ডায়েরিটা আবার খুলল।

এবার স্কেচগুলো আরও মন দিয়ে দেখতে লাগল।

একটা স্তম্ভ।

একটা সরু সিঁড়ি।

একটা মুখ।

তারপর...

একটা চিহ্ন।

আগে খেয়াল করেনি।

স্কেচের এক কোণে ছোট্ট একটা প্রতীক আঁকা।

একটি বৃত্ত।

তার ভেতরে তিনটি ত্রিভুজ।

আর মাঝখানে একটি চোখ।

ঈশানের ভুরু কুঁচকে গেল।

প্রতীকটা কোথায় যেন দেখেছে।

খুব পরিচিত।

কিন্তু মনে করতে পারছে না।


রাত তখন ১টা ১২।

বাইরে ঝড় আরও বেড়েছে।

হঠাৎ।

ঘরের আলো দু'বার টিমটিম করল।

ঈশান মাথা তুলে তাকাল।

তারপর আবার নথির দিকে মন দিল।

ঠিক সেই সময়—

টক।

টক।

টক।

দরজায় শব্দ হল।

ঈশান থমকে গেল।

এই সময়?

কে?

বাড়িতে সে একাই থাকে।

মা-বাবা দুজনেই কয়েক বছর আগে মারা গেছেন।

কাজের লোক সন্ধ্যাতেই চলে যায়।

তাহলে?

আবার শব্দ।

টক।

টক।

টক।

ধীরে ধীরে সে দরজার দিকে এগোল।

হাত বাড়িয়ে লক খুলল।

দরজা খুলে দিল।

বাইরে কেউ নেই।

ফাঁকা করিডর।

অন্ধকার।

দূরে শুধু দাদুর আমলের পেন্ডুলাম ঘড়ির শব্দ।

টিক।

টিক।

টিক।

ঈশান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।

তারপর নিচের দিকে তাকাতেই বুকের রক্ত যেন জমে গেল।

করিডরের ভেজা মেঝেতে স্পষ্ট পদচিহ্ন।

একটা।

দুটো।

তিনটে।

চারটে।

কেউ যেন বৃষ্টির মধ্যে থেকে এসে তার ঘরের সামনে দাঁড়িয়েছিল।

কিন্তু...

ফিরে যাওয়ার কোনো চিহ্ন নেই।

পদচিহ্নগুলো তার দরজার সামনে এসে শেষ হয়ে গেছে।

যেন মানুষটা সেখানেই অদৃশ্য হয়ে গেছে।


ঈশান দ্রুত ঘরে ফিরে এল।

দরজা বন্ধ করল।

হৃদস্পন্দন দ্রুত হচ্ছে।

কিন্তু গবেষকের স্বভাবটা এখনও হারায়নি।

সে টেবিলে ফিরে এসে আবার ডায়েরির দিকে তাকাল।

তারপরই শরীরের সব রক্ত যেন মাথায় উঠে গেল।

কারণ...

ডায়েরিটা খোলা।

সে স্পষ্ট মনে করতে পারছে, বেরোনোর আগে বইটা বন্ধ ছিল।

এখন খোলা।

আর খোলা পাতায় নতুন কিছু লেখা।

যা আগে ছিল না।

একদম ছিল না।

কালি এখনও ভেজা।

যেন কেউ এইমাত্র লিখে গেছে।


"আর্থার ব্লেক সত্য খুঁজেছিল।"

তার নিচে—

"সে পথ পেয়েছিল।"

আরও নিচে—

"কিন্তু ফিরে আসেনি।"

ঈশানের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।

শেষ লাইনটা পড়তেই তার হাত কেঁপে উঠল।

"এবার তোমার পালা, ঈশান।"


সে জমে গেল।

ডায়েরির নাম কোথাও লেখা নেই।

কেউ তাকে চেনে না।

তাহলে...

তার নাম এখানে এল কীভাবে?

বাইরে হঠাৎ প্রবল বজ্রপাত হল।

ঘর সাদা আলোয় ভরে উঠল।

আর সেই ক্ষণিক আলোর ঝলকে ঈশান দেখল—

ঘরের কোণের পুরনো আয়নায় এক মুহূর্তের জন্য আরেকটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে।

লম্বা।

স্থির।

মাথায় প্রাচীন অলংকার।

আর ডান চোখে...

একটি নীল আলো।

আলোটা নিভে গেল।

আয়না আবার ফাঁকা।

কিন্তু ঈশান বুঝল—

চিত্তোরগড়ের রহস্য আর শুধু ইতিহাসের বিষয় নয়।

এখন সেটা তাকে খুঁজে নিতে শুরু করেছে।

চলবে...


ক্রমশঃ পরবর্তী অংশ পরের সংখ্যায় দেখুন।