হ্যারিকেন হাতে একটি শীর্ণকায় শরীর হেঁটে চলেছে ফাঁকা বাড়ির উন্মুক্ত দালান ধরে। সে রঘু—এই শতাব্দী প্রাচীন কমলিনী ভিলার ভৃত্য এবং অভিশাপের অলিখিত রক্ষক। তার কাজ কেবল তালা খোলা-বন্ধ করা নয়; তার কাজ হলো এই বাড়ির ক্ষয়িষ্ণু অস্তিত্বকে আগলে রাখা।

রঘু জানে, কালের গতিতে ছিন্ন হয়ে যাওয়া এই ভিটের ইটের পরতে পরতে লেগে আছে এক প্রাচীন অভিশাপ, যা ঘুণপোকার মতো কুরে কুরে খাচ্ছে সবটা। সেও যেন এক গভীর ষড়যন্ত্রে এই মৃতপ্রায় বাড়ির সঙ্গে বাঁধা পড়ে থাকা এক জীর্ণ রক্ষী মাত্র।

হঠাৎ করেই তার আশপাশে ভেসে এলো সেই চেনা শব্দ—নূপুরের রূমঝুম রিনিঝিনি!

কেউ যেন দ্রুত পায়ে বাড়ির এক দরজা থেকে অন্য দরজায় ছুটে গেল। রঘু বুঝলো, আজ চাবি দিতে তার দেরি হয়েছে। নূপুরের সেই করুণ অথচ তীব্র শব্দ বাড়ির প্রতিটি বন্ধ দরজায় আঘাত হানছে, যেন ফিসফিস করে বলছে, "খোলো দরজা, খুলে দাও বলছি!"

কিন্তু রঘু নিরুপায়। বহু বছর ধরে কত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী তার এই ঘোলাটে চোখ। সে বোঝে সেই নারীকণ্ঠের আর্তনাদ, কিন্তু তাকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা তার নেই। সেই অভাগী আত্মা এই বাড়ির চারদেয়ালের মধ্যেই ঘুরে বেড়াতে বাধ্য।

"এক যদি না—" কথাটা শেষ করার আগেই সেই আর্তনাদ পরিণত হলো এক জীবনগ্রাসী গানে। যে গান একসময়ে মধুর শোনাতো, আজ তা যেন ভয়ঙ্কর রূপে দেওয়ালে দেওয়ালে আছড়ে পড়ছে। কয়েক মুহূর্ত গানটা শোনার পরই রঘু দু'হাতে নিজের কান ঢাকলো, তার শীর্ণ শরীরটা কাঁপতে শুরু করলো।

"নাহ! আর পারছি না! ওরে অভাগী, আমাকে মুক্তি দে!"

কথাটা বলতে বলতে রঘু দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেল কুয়োর ধারের ঘরের দিকে। আর ঠিক তক্ষুনি তার পিছন থেকে ভেসে এলো সেই নারীকণ্ঠের বিকট হাসি—যেন আজকের মতো তার প্রতিশোধের পাঠ চুকেছে।

রঘু কুয়োতলায় গিয়ে দু'হাতে পাতকুয়োর ধারটা চেপে ধরলো। এত বছরের এই অত্যাচার তার বুড়ো শরীর আর মেনে নিতে পারছে না। চাঁদের জ্যোৎস্না এসে পড়ল কুয়োর জলে। সেই জলে রঘুর কুঁচকে যাওয়া, বলিরেখাযুক্ত মুখের যে প্রতিকৃতি ফুটে উঠলো, তা দেখে সে চমকে গেলো। এ কাকে দেখছে সে? এক মৃত মানুষের অবয়ব!

একবার তার মনে হলো, ঝাঁপ দেয় এই জলে। কিন্তু তাতে কি সে মুক্তি পাবে? এই দোটানায় রঘু শীতল জলের দিকে তাকিয়ে থাকলো। চোখ কুঁচকে একটু মন দিতেই সে স্পষ্ট দেখতে পেল—ওই কুয়োর শীতল জলের গভীর থেকে একটি পৈশাচিক হাসি ভেসে আসছে, আর তাতে স্পষ্ট ভেসে উঠেছে আসল রঘুর মুখাবয়ব।

সে বুঝলো, তার মুক্তি নেই।

দীর্ঘকাল পর বিপুল এসেছে তার এই গ্রামের বাড়িতে, বীরভূমের দেবনন্দপুর গ্রামে। শহরজীবনের কোলাহল থেকে দূরে, সবুজে ঘেরা এই শান্ত গ্রাম। তবে গ্রামের শান্ত প্রকৃতি তাকে যতটা শান্তি দিয়েছিল, তার চেয়েও বেশি চেপে বসেছিল এক গা ছমছমে নীরবতা।

তার গ্রামের বাড়ির নাম—কমলিনী ভিলা—শুনতে যতটাই স্নিগ্ধ, গ্রামের মানুষের কাছে তা ততটাই ভীতিকর। নামফলকে কমলিনী থাকলেও, লোকমুখে তা 'কলঙ্কিনী ভিলা' বলেই পরিচিত। দিনের আলোতেও নাকি কেউ এই বাড়ির ত্রিসীমানা মাড়ায় না।

বিপুল এই বাড়িটি বিক্রি করার উদ্দেশ্যেই এসেছে। কিন্তু বাড়িটি দেখামাত্র তার সমস্ত সিদ্ধান্ত যেন নড়ে গেল, যখন রাতের নিস্তব্ধতাকে খানখান করে দিলো লোহার গেট খোলার শব্দটা।

গেট খুলে ভিতরে এসে দাঁড়াতেই বিশাল বাড়িটা চোখে পড়ল বিপুলের। অন্ধকারে ঢেকে বাড়িটা এখন এক রহস্যময় কেল্লার রূপ নিয়েছে। প্রবেশমুখে একটা গাছবিহীন তুলসীমঞ্চ—যেন এই পরিত্যক্ত ভিটের শূন্যতার প্রতীক। পূর্বপুরুষের তৈরি এই বাড়ি যেন কালের গতিতে এখনো টিকে আছে, কিন্তু বিপুলের মনে হলো, হয়তো আর বেশিদিন সে এর অস্তিত্ব রক্ষা করতে পারবে না। তার বর্তমান আর্থিক অবস্থা তাকে এই বাড়ি বিক্রি করতে বাধ্য করছে। কিন্তু এই বাড়ির স্মৃতি তার জীবনে ক্ষীণ হওয়া সত্ত্বেও কেন যে তার মনের মধ্যে এক গভীর টানের অনুভূতি হচ্ছে, বিপুল তা বুঝতে পারেনি। কী আছে এই মাটির আর ইটের ভাঁজে?

এইসব ভাবনাচিন্তার মধ্যে বাড়ির পশ্চিম কোণে একটা মৃদু আলো স্পষ্ট হতে দেখল সে। আলোর উৎসধারী একটা হ্যারিকেন এগিয়ে আসছে তার দিকে। কাছে আসতেই স্পষ্ট হলো মানুষটার অবয়ব: শীর্ণকায় চেহারায় ঘোলাটে চোখের অধিকারী এক বৃদ্ধ। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া তার শরীর। হাতের হ্যারিকেনটা বিপুলের দিকে উঁচিয়ে খসখসে কণ্ঠে জিজ্ঞাসা করল, "তুমি কে বাবা? এত রাতে এদিকেই বা কী করছো?"

বিপুল সেদিন সামান্য হেসে বলেছিলো, "আমি বিপুল মুখার্জি। শ্রী অমরেন্দ্র মুখার্জির খুড়তুতো ভাই হরনাথ মুখার্জির নাতি।"

অমরেন্দ্র মুখার্জি নামটা শুনেই বৃদ্ধ তার মুখের দিকে এমন চমকে তাকালেন যে দৃশ্যটা আজও মনে আছে বিপুলের। বিস্মিত দৃষ্টিতে যেন তিনি কালের পাতা উল্টে কিছু খুঁজছিলেন। কিন্তু সে সবকে পাত্তা না দিয়ে বিপুল জানতে চাইল, "আপনি কে? আপনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।"

বৃদ্ধ সামান্য হেসে বলেছিলেন, "আমি এই বাড়ির দীর্ঘদিনের বাসিন্দা, বা রক্ষক বলতে পারো। আমার নাম রঘু। আমি এই বাড়ি দেখাশোনা করি। আজ দীর্ঘদিন হয়ে গেছে কেউ আসে না। তাই তোমাকে দেখে একটু চমকে গিয়েছিলাম।"

এই রঘু নামের ভৃত্যের কথা বিপুল আজ অবধি শোনেনি। খুব আশ্চর্যজনকভাবে এই বাড়ির সম্বন্ধে আলোচনা তাদের পরিবারে নিষিদ্ধ ছিল, বিশেষ করে অমরেন্দ্র মুখার্জির পরিবারের কথা। তাই এই বাড়িটার সম্বন্ধে তার কিছুই প্রায় জানা নেই।

প্রথম দিন রঘুকাকাই একটা ঘরের দরজা খুলে দিয়েছিলেন বিপুলের জন্য। ঘরটার দিকে দেখে প্রথমে চমকে গিয়েছিল বিপুল—জীর্ণ, কিন্তু পরিচ্ছন্ন। রঘুকাকা যেন তার মনের ভাবনা বুঝতে পেরে বলেছিলেন, "আমি এখনো সব ঘরকেই পরিষ্কার করে রাখি বাবা। যদি কেউ আসে সেই আশায়। কিন্তু কেউ আসে না। তাই বাড়ি সামলে আমি একলাই পড়ে আছি এখানে। আজও কালের পরিহাসে যেতে পারি নাই।"

কথাগুলো কেমন যেন অস্বস্তিকর ঠেকেছিল সেদিন বিপুলের কানে। কিন্তু একজন বৃদ্ধের একাকীত্বের প্রলাপ ভেবে তা উড়িয়ে দিয়েছিলো।

রাতের খাবার সেরে ঘরে ঢোকার মুখে আরও আশ্চর্য হয়েছিল সে, যখন রঘুকাকা তাকে ফিসফিস করে বলেছিলেন, "এই গ্রামে এই বাড়ির তেমন সুনাম নেই দাদাবাবু। তাই রাতে কোনো কিছু দেখলে ভয় পাবে না। যদি ভয় পাও, তবে আমাকে ডেকো—আমি চলে আসবো।"

এই কথাটা শুনে বিপুল আশ্চর্য হলেও চিন্তাটাকে পাত্তা না দিয়েই ঢুকে গিয়েছিল ঘরে। কিন্তু রঘুর সেই সতর্কবাণী যেন এক অশুভ ইঙ্গিত হয়ে তার মনের গভীরে রয়ে গেল।

মধ্যরাতের স্তব্ধতা চুরমার করে একনাগাড়ে কানে আসছে একটি শব্দ—নূপুরের রিনিঝিনি। রিনরিনঝিনঝিন... শব্দটা প্রথমে ছিল আবছা, যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে। কিন্তু ধীরে ধীরে তা স্পষ্ট হতে শুরু করল, যেন বাড়ির ভেতরেই কোনো অদৃশ্য পথে হেঁটে চলেছে কেউ। বিপুলের ঘরের দরজার দিকেই কি এগিয়ে আসছে সেই শব্দ?

বিপুলের যুক্তিবাদী মন প্রথমে বিদ্রোহ করল। সামান্য একটা শব্দের কাছে কি আধুনিক যুগের মানুষ হার মানবে? সে এই গ্রামের কুসংস্কার বিশ্বাস করতে রাজি নয়। কিন্তু এই যুক্তির বাঁধন হঠাৎ করেই টলে গেল যখন নূপুরের রূমঝুম শব্দের সাথে যোগ হলো এক মেয়েলি কণ্ঠের গুনগুন গান। রাতের এই নিঝুম, নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে এমন বিকৃত সুর আর অলৌকিক নৈঃশব্দ যেন এক ধাক্কায় তার সমস্ত যুক্তিকে অস্বীকার করল। গানের সুরটা করুণ, যেন দীর্ঘদিনের পুরোনো কোনো বিয়োগব্যথা, যা মাটির নীচ থেকে উঠে আসছে।

অসাড় কৌতূহল তাকে টেনে নিয়ে গেল ঘরের একমাত্র খোলা জানালাটির সামনে। কম্পিত হাতে জানালার পুরু পর্দাটা সামান্য সরিয়ে দিয়ে বিপুল মুখ বাড়ালো বাইরে।

জ্যোৎস্নামাখা রাত। চারপাশের কুয়াশায় এক মায়াবী আবহাওয়া। সামান্য মাথা ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাতেই সেই দৃশ্যটা দেখতে পেল সে।

শ্বাস আটকে গেল তার। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।

দেখা গেল—তার বাড়ি থেকে কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল বকুলগাছটার ডাল থেকে ঝুলছে এক অদৃশ্য দোলনা! সেই দোলনায় ভর দিয়ে প্রায় শূন্যে বসে আছে দুটি আলতা রাঙানো পা। নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ সেই পায়েরই। প্রতিটি দুলুনির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সেই মোটা নূপুরজোড়া বাজছে, আর অদৃশ্য দেহের অধিকারিণী গাইছে সেই বিকৃত সুর, যা এখন কান্নার রূপ নিয়েছে।

হঠাৎই সেই গান এবং দুলুনি থেমে গেল। পা দুটি স্থির।

প্রচণ্ড উদ্বেগের সাথে বিপুল সেই স্থির পায়ের দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই তার দৃষ্টি গেল বকুলগাছের উপরের দিকে। গাছের গাঢ় ছায়া ভেদ করে এক ঘোমটা টানা মুখ যেন তার দিকেই উঁকি দিচ্ছে। আধো-অন্ধকারে মুখটি স্পষ্ট নয়, কিন্তু বিপুলের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় চিৎকার করে বলে উঠলো, ঘোমটার আড়ালে থাকা দুটো চোখ যেন তীব্রভাবে তাকেই নিরীক্ষণ করছে!

ঠিক সেই মুহূর্তে, তার কানের কাছে কেউ যেন ফিসফিসিয়ে গেল:

"চলে যা, এখান থেকে চলে যা। এই বাড়ি কলঙ্কিত... চলে যা।"

কথাটা কানে যেতেই প্রবল এক শিউরে উঠে বিপুল পিছনে তাকালো। সারা ঘর খালি—কেউ নেই। আবার যখন সামনে তাকালো—বকুল গাছটা এখন সম্পূর্ণ ফাঁকা! সেই আলতা পরা পা, অদৃশ্য দোলনা, ঘোমটা টানা মুখ—সব যেন এক জাদুবলে উধাও হয়ে গেছে।

বিপুলের যুক্তিবাদী মন এই অলৌকিক ঘটনা কিছুতেই স্বীকার করতে পারছিলো না। এক ক্লান্ত, বিক্ষিপ্ত মন নিয়ে সে ধীর পায়ে খাটে ফিরে এলো। খোলা জানালার দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। যা দেখল বা শুনল, তা কি সত্যিই কলঙ্কিনী ভিলার অভিশাপ, নাকি তার আধুনিকতা-আশ্রয়ী মনের এক চরম বিভ্রম? রাজ্যের ঘুম নেমে এলো তার দু'চোখের পাতায়। তার ক্লান্ত চেতনা পাড়ি দিল এক গভীর, রহস্যময় রাজ্যে।

গত রাতের ভৌতিক বিভ্রমের পর, ভোরের এই আলো বিপুলের কাছে যেন এক আশীর্বাদ হয়ে এলো। কুয়াশার চাদর ভেদ করে দেবনন্দপুর গ্রামের বুক চিরে যখন প্রথম রোদ এসে পড়ল, তখন এক লহমায় মুছে গেল রাতের আঁধার আর অশরীরী স্পর্শের সমস্ত আতঙ্ক। সূর্যালোকে কলঙ্কিনী ভিলা যেন তার কুৎসিত আবরণ ঝেড়ে ফেলে আবার কমলিনী ভিলাতে পরিণত হয়েছে।

বীরভূমের এই গ্রামটি সত্যিই মনোমুগ্ধকর। এখানে প্রকৃতি আর শিল্প হাত ধরাধরি করে চলে—ঠিক যেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের একচিলতে শান্ত ছায়া এই গ্রামের উপর দিয়ে বয়ে গেছে।

বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসতেই মনটা জুড়িয়ে গেল। গ্রামের চারপাশ ঘন সবুজে ঘেরা। গত রাতে যে বকুল গাছটিকে ভীতিকর লাগছিল, এখন ভোরের নরম আলোয় সেই গাছটি ফুলে ভরে শান্ত ও স্নিগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

বিপুলের এখন মনে হচ্ছে, গত রাতে সে যা দেখেছিল, তা হয়তো এই নিছকই তার ক্লান্ত ও ঘুমন্ত মনের কল্পনা। দেবনন্দপুরের সকাল এতই নির্ভেজাল এবং শান্ত যে, এখানে অশরীরী উপস্থিতি কল্পনা করাও যেন অসম্ভব!

সকালে রঘুকাকা যদিও এক কাপ চা বিছানার পাশে রেখে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেই ঠাণ্ডা ও বিস্বাদ চা খেয়ে তার তৃষ্ণা মেটেনি। তাই সতেজ হওয়ার আশায় সে গ্রামের পথ ধরে এগিয়ে গেলো কোনো চায়ের দোকানের খোঁজে।

সে এক মুহূর্তের জন্য বকুলগাছটার নিচে এসে দাঁড়ালো। আর সঙ্গে-সঙ্গে কালকের সমস্ত দৃশ্য যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো চোখের সামনে ভেসে উঠলো—শূন্যে স্থির হয়ে থাকা আলতা রাঙানো পা, ঘোমটার আড়ালে থাকা সেই তীক্ষ্ণ চোখ! মনের মাঝে এক তীব্র অস্বস্তি যেন কাল রাতের শীতলতা ফিরিয়ে আনল।

সঙ্গে-সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে সে দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলো। তার উদ্দেশ্য এক এবং অমোঘ—এই বাড়ি বিক্রি করা। একবার বাড়িটা বিক্রি হয়ে গেলে এই দেবনন্দপুর বা তার কলঙ্কিনী ভিলার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করে দেবে সে। এই বাড়ি ও এর ইতিহাস থেকে মুক্তি পাওয়াটাই যেন এখন তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য।

চণ্ডীমণ্ডপের কাছে পৌঁছাতেই একটি কণ্ঠস্বর কানে এলো বিপুলের। মাথায় হনুমানটুপি, গলায় মাফলার পরা এক ব্যক্তি সবে প্রাতঃভ্রমণ সেরে ফিরছিলেন। তিনি কাছে এসে যেন কিছুটা ইতস্তত করে সরাসরি জিজ্ঞাসা করলেন: "তুমি ওই কলং... মানে কমলিনী ভিলার ছেলে না?"

বিপুল বিরক্ত হলো, কিন্তু মুখের ভাব কঠোর রেখে বললো, "কলঙ্কিনী ভিলা—সেই নামেই তো ডাকেন আপনারা। হ্যাঁ, আমি একরকম অমরেন্দ্র মুখার্জির নাতি।"

লোকটি ফিসফিস করে, যেন শব্দটি জোরে উচ্চারণ করতে ভয় পাচ্ছেন, বিপুলের মুখের ওপরই বলে উঠলেন, "তার মানে তুমি উপেন্দ্রর ছেলে? আর তুমি ওই বাড়িতেই উঠেছ নাকি?"

বিরক্তি চরমে উঠলেও বিপুল কড়া কণ্ঠে বললো, "কেন বলুন তো? ওটা তো আমাদেরই বাড়ি, ওখানে না উঠে কোথায় উঠতাম আমি?"

বিপুলের উত্তরে লোকটি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলেন। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর, তিনি ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার দেখাশোনা, রান্নাবান্না...কে করছে?"

কথাটা শেষ করতে না দিয়েই বিপুল বললো, "কেন, আমাদের ভৃত্য রঘুকাকা তো আছেন, উনিই তো..."

রঘুকাকার নাম শুনে লোকটি যেন কেবল অবাক হলেন না, তার চোখে-মুখে ফুটে উঠলো এক ভয়াবহ আতঙ্কের ছাপ। বিস্ময় এবং ভয় মেশানো সেই হতবাক দৃষ্টি দেখে বিপুলের বেশ আশ্চর্য লাগলো।

ব্যক্তিটি আর একটিও কথা না বলে, সেই লাল মাটির পথ ধরে প্রায় পালিয়েই গেলেন। যাবার সময় তিনি বার কয়েক পিছন ফিরে তাকালেন—সেই দৃষ্টিতে ছিল এক অজানা ভীতি।

বিপুল ঠায় দাঁড়িয়ে থাকল। লোকটির চোখে-মুখে ফুটে ওঠা সেই অতর্কিত আতঙ্ক যেন তার কানে প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো।

রাত্রি বাড়ার সাথে সাথেই কমলিনী ভিলাতে যেন নেমে আসে এক অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। এই নিস্তব্ধতা এমন নয় যে কেবল শব্দের অনুপস্থিতি; বরং এ যেন এক জমাট বাঁধা নৈঃশব্দ, যা প্রতিটি ইটের ফাটল থেকে বেরিয়ে এসে বিপুলকে ঘিরে ধরছে।

বাইরের জগৎ থেকে আসা ঝিঁঝিঁপোকার ডাকও এখানে এসে কেমন যেন বিকৃত, দূরবর্তী আর ক্ষীণ শোনাচ্ছে—যেন তারা এই বাড়ির অশরীরী নৈঃশব্দের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। ঘরের ভেতরে থাকা বিপুল হঠাৎ অনুভব করলো, প্রতিটি মুহূর্ত যেন আরও ভারী হয়ে আসছে। বাতাস যেন জমে গেছে, তার শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দও এই মৃত্যুপুরীর নীরবতায় অস্বাভাবিক জোরে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

এই আলো আঁধারির খেলায় দেওয়ালগুলি যেন ধীরে ধীরে সজীব হয়ে উঠছে। তাদের প্রাচীন ফাটলগুলো থেকে ভেসে আসছে শতাব্দীর পুরোনো গোপন আর্তনাদ, যা কেবল শোনার জন্য নয়, অনুভব করার জন্য। প্রতি মুহূর্তে তার মনে হতে লাগলো, ছাদের ঠিক উপরে, অথবা বন্ধ দরজার ওপাশে কেউ যেন সন্তর্পণে হেঁটে বেড়াচ্ছে, তার উপস্থিতি টের পাওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে।

নিস্তব্ধতার সুযোগ নিয়ে, হঠাৎ করেই বাড়ির পুরোনো, কাঠের মেঝেতে একটা মৃদু মচমচ শব্দ ভেসে আসতেই কেঁপে উঠলো সে। শব্দটা এক জায়গায় স্থির নয়, মনে হয় কেউ যেন একটি ভারী পা টেনে টেনে হলঘর পার হচ্ছে। শব্দটা থেমে গেলেও, তার রেশ বিপুলের কানের পর্দায় বহুক্ষণ ধরে ঝুলে থাকে। ঘরের ভেতরের হ্যারিকেন আলোটি বাইরে থেকে আসা জ্যোৎস্নার সাথে মিশে দেওয়ালের উপর এক অদ্ভুত আলো-ছায়ার খেলা তৈরি করছে। সেই ছায়াগুলিই ক্ষণে ক্ষণে মানুষের বা বিকৃত অবয়বের রূপ নিচ্ছে, যেন তারা দেওয়ালের ভেতরে আটকে থাকা অতৃপ্ত আত্মা, যা মুক্তি চাইছে।


ক্রমশঃ পরবর্তী অংশ পরের সংখ্যায় দেখুন।