অধ্যায় ৩ : আর্থার ব্লেকের শেষ চিঠি


সারা রাত আর ঘুম হয়নি ঈশানের।

বারবার তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল আয়নার সেই নীল আলো।

আর সেই বাক্য—

"এবার তোমার পালা, ঈশান।"

ভোর পাঁচটার দিকে বৃষ্টি থেমে গিয়েছিল।

কলকাতার আকাশে ফ্যাকাশে আলো ফুটতে শুরু করেছে।

কিন্তু ঈশানের ঘরের বাতাস এখনও ভারী।

টেবিলের ওপর খোলা অবস্থায় পড়ে আছে সেই চামড়ার ডায়েরি।

গত রাতের লেখাগুলো এখনও সেখানে রয়েছে।

সেগুলো মুছে যায়নি।

তার মানে—

সবকিছুই বাস্তব।

অথবা অন্তত এমন কিছু, যার ব্যাখ্যা সে এখনও খুঁজে পায়নি।


সকাল দশটার মধ্যে সে পৌঁছে গেল জাতীয় গ্রন্থাগারের পুরনো সংবাদপত্র বিভাগের পাঠকক্ষে।

বাইরের পৃথিবী তখন স্বাভাবিক।

মানুষ অফিস যাচ্ছে।

বাস চলছে।

চা বিক্রি হচ্ছে।

কিন্তু ঈশানের মনে হচ্ছিল, সে যেন অন্য এক বাস্তবতার দিকে এগিয়ে চলেছে।

একটা এমন দরজার দিকে, যা একবার খুললে আর বন্ধ করা যায় না।


বিকেলের দিকে একটি পুরনো ক্যাটালগ ঘাঁটতে গিয়ে হঠাৎ সে একটি অদ্ভুত নথির সন্ধান পেল।

নথিটির উল্লেখ ছিল মাত্র এক লাইনে।

Private Correspondence of Arthur H. Blake

Filed: January, 1898

Restricted Access

ঈশানের বুকের ভেতর ধক করে উঠল।

১৮৯৮?

কিন্তু ব্লেক তো ১৮৯৭-এর শেষদিকে নিখোঁজ হয়েছিলেন।

তাহলে ১৮৯৮ সালের ফাইল এল কোথা থেকে?

দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর লাইব্রেরির এক প্রবীণ কর্মচারী তাকে একটি কাঠের বাক্স এনে দিলেন।

বাক্সটি ধুলোয় ঢাকা।

তালার জায়গায় পুরনো সিল।

মনে হচ্ছিল বহু দশক ধরে কেউ এটি খোলেনি।

ঈশান সাবধানে ঢাকনা তুলল।

ভেতরে একটি মাত্র খাম।

হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ।

মোমের সিল ভাঙা।

উপরের লেখা প্রায় মুছে গেছে।

শুধু একটি নাম স্পষ্ট—

Arthur Henry Blake


ঈশান কাগজটি খুলল।

প্রথম কয়েকটি লাইন ছিল সাধারণ।

খননকার্যের অগ্রগতি।

শ্রমিকদের সমস্যা।

আবহাওয়ার বর্ণনা।

তারপর হঠাৎ লেখার ভঙ্গি বদলে গেল।

অক্ষরগুলো কাঁপা।

কালির রঙ গাঢ়।

যেন লেখকের হাত কাঁপছিল।


"আমি যা দেখেছি, তা সরকারি রিপোর্টে লিখতে পারব না।"

"কারণ আমি নিজেই বিশ্বাস করতে পারছি না।"

"তবুও লিখে যাচ্ছি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ সত্যের সন্ধান পেলে এই চিঠি তার কাজে লাগে।"

ঈশান দ্রুত পরের অংশে চলে গেল।

"মূর্তিটির ডান চোখে যে নীল পাথর বসানো রয়েছে, প্রথমে আমরা তাকে লাজওয়ার্দ বা নীলকান্তমণির কোনো প্রকার ভেবেছিলাম।"

"কিন্তু পরীক্ষার ফল অন্য কথা বলছে।"

"পাথরটি আলো শোষণ করে রাখে।"

"এবং অন্ধকারে ধীরে ধীরে সেই আলো ফিরিয়ে দেয়।"

ঈশান থেমে গেল।

এটা অস্বাভাবিক হলেও অসম্ভব নয়।

কিছু খনিজের এমন বৈশিষ্ট্য আছে।

কিন্তু পরের লাইন পড়ে তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।


"সমস্যা হল, পাথরটি আলো ফিরিয়ে দেয় তখনও, যখন তাকে বহুদিন সম্পূর্ণ অন্ধকারে রাখা হয়।"


ঈশান আবার পড়ল।

ভুল পড়ছে না তো?

না।

একই লেখা।


চিঠির সঙ্গে কয়েকটি আলাদা নোটও ছিল।

সেখানে ব্লেক এক বিস্ময়কর তুলনা করেছেন।


"আমি অক্সফোর্ডের রয়্যাল সোসাইটির পুরনো নথি পড়েছি।"

"১৭৬৩ সালে এডওয়ার্ড স্টোন যে উইলো গাছের ছাল নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, মানুষ তখনও তার কার্যকারণ জানত না।"

"পরে স্যালিসিন আবিষ্কৃত হয়।"

"তারও বহু বছর পর বিজ্ঞান তার ব্যাখ্যা খুঁজে পায়।"

"সম্ভবত চিত্তোরগড়ের এই নীল পাথরও তেমনই একটি বিষয়।"

"আমরা যা দেখছি, তার ব্যাখ্যা হয়তো ভবিষ্যতের বিজ্ঞান দিতে পারবে।"


ঈশান অবাক হয়ে গেল।

এখানেই আপনার দেওয়া বাস্তব বৈজ্ঞানিক ইতিহাসটি গল্পের মধ্যে ঢুকে গেল।

ব্লেক আসলে বলতে চাইছেন—

একসময় স্যালিসিনও ছিল রহস্য।

পরে বিজ্ঞান তার উত্তর খুঁজে পেয়েছে।

তেমনি এই নীল পাথরেরও হয়তো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে।

কিন্তু...

এরপরের অংশ আবার সবকিছু পাল্টে দিল।


"তবুও এমন কিছু ঘটেছে, যার ব্যাখ্যা আমি বিজ্ঞানের সাহায্যে দিতে পারছি না।"

ঈশানের আঙুল শক্ত হয়ে উঠল।

"গত সাত রাতে তিনজন শ্রমিক নিখোঁজ হয়েছে।"

"তারা সকলেই মৃত্যুর আগে একই স্বপ্ন দেখেছিল।"

"একজন নারী।"

"পাথরের তৈরি।"

"ডান চোখে নীল আলো।"


ঈশানের নিঃশ্বাস আটকে গেল।

"স্থানীয়রা তাকে 'নীলচক্ষু দেবী' নামে চেনে।"

"তাদের বিশ্বাস, দুর্গের নিচে একটি নিষিদ্ধ কক্ষ রয়েছে।"

"সেই কক্ষের প্রবেশপথ পাহারা দেয় দেবীর মূর্তি।"


চিঠির শেষ অংশ ছিঁড়ে গিয়েছিল।

কিন্তু সবচেয়ে নিচে কেবল কয়েকটি লাইন বেঁচে ছিল।


"আজ রাতে আমি নিচে নামব।"

"যদি আমি আর ফিরে না আসি..."

"তবে জেনে রেখো, কিংবদন্তিটি মিথ্যে নয়।"

"দ্বিতীয় দরজাটি বিজয় স্তম্ভের—"


সেখানেই লেখা শেষ।

বাকি অংশ ছেঁড়া।

উধাও।


চিঠির শেষ লাইনটা পড়ার পর অনেকক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল ঈশান।

বাইরে তখন সন্ধ্যা নেমে এসেছে।

জাতীয় গ্রন্থাগারের উঁচু জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া আলো ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে আসছে। পাঠকক্ষের এক কোণে পুরনো ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে নিজের ছন্দে।

কিন্তু ঈশানের কাছে সময় যেন থেমে গেছে।

তার সামনে পড়ে আছে একশো ঊনত্রিশ বছর পুরনো একটি চিঠি।

একজন ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিকের শেষ স্বীকারোক্তি।

একজন মানুষের লেখা, যিনি সম্ভবত এমন কিছু দেখেছিলেন যা তাঁর সমসাময়িক বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করতে পারেনি।

আর্থার ব্লেক কি সত্যিই সেই নিষিদ্ধ কক্ষে নেমেছিলেন?

যদি নেমে থাকেন, তবে তিনি কী দেখেছিলেন?

কেন তাঁর সমস্ত সরকারি রিপোর্ট অদৃশ্য হয়ে গেল?

কেন তাঁর নাম ব্রিটিশ ভারতের নথিপত্র থেকে প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে?

আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—

ডায়েরির লেখাগুলো আজও কীভাবে নতুন করে প্রকাশ পাচ্ছে?


ঈশান আবার চিঠিটার শেষ অংশে চোখ বোলাল।

"দ্বিতীয় দরজাটি বিজয় স্তম্ভের—"

তারপর ফাঁকা।

ছেঁড়া।

নিখোঁজ।

ঠিক সেই জায়গাতেই যেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি ছিল।

যে তথ্য হয়তো আর্থার ব্লেকের ভাগ্য নির্ধারণ করেছিল।

হয়তো সেই তথ্যের জন্যই তাকে চিরতরে নীরব করে দেওয়া হয়েছিল।


একটা অদ্ভুত উপলব্ধি ধীরে ধীরে ঈশানের মনে স্পষ্ট হতে লাগল।

সে বুঝতে পারল, এতদিন সে ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করেছে একজন গবেষকের মতো।

দূর থেকে।

নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে।

পুরনো নথি পড়েছে।

হারিয়ে যাওয়া সভ্যতার গল্প খুঁজেছে।

কিন্তু এবার ইতিহাস তাকে ডাকছে।

এবার সে শুধু দর্শক নয়।

এই রহস্যের অংশ হয়ে গেছে সে নিজেই।

তার ব্যাগের ভেতরে রাখা ডায়েরিটা যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।

মনে হল, বই নয়—

কেউ যেন তার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়িয়ে আছে।

অদৃশ্য কেউ।

যে তাকে চিত্তোরগড়ের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে।


হঠাৎ তার মনে পড়ল গত রাতের আয়নায় দেখা সেই মুখ।

নীল আলো।

পাথরের মতো স্থির চোখ।

আর সেই কণ্ঠস্বর—

"তুমি দেরি করে ফেলেছ..."

বুকের ভেতর একটা শীতল স্রোত বয়ে গেল।

যদি সবই কাকতালীয় হয়, তাহলে এতগুলো ঘটনার মধ্যে এই অদ্ভুত যোগসূত্র কেন?

আর যদি কাকতালীয় না হয়...

তাহলে কি সত্যিই কেউ বা কিছু তাকে পথ দেখাচ্ছে?


পাঠকক্ষ প্রায় খালি হয়ে গেছে।

লাইব্রেরির কর্মচারীরা আলো নেভানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

ঈশান ধীরে ধীরে চিঠিটা ভাঁজ করল।

তারপর ডায়েরির মধ্যে রেখে দিল।

ঠিক সেই মুহূর্তে কাগজের ভেতর থেকে একটা ছোট্ট জিনিস মেঝেতে পড়ে গেল।

টুক।

শব্দটা খুব ক্ষীণ।

কিন্তু ঈশানের কানে বাজল বজ্রপাতের মতো।

সে নিচু হয়ে জিনিসটা তুলে নিল।

এক টুকরো পুরনো কাগজ।

সম্ভবত চিঠির সঙ্গেই আটকে ছিল।

কাগজের ওপর মাত্র কয়েকটি শব্দ—

"Kumbha Palace – Lower Passage"

তার নিচে কাঁপা হাতে আঁকা একটি প্রতীক।

একটি চোখ।

আর তার মাঝখানে—

একটি নীল পাথর।


ঈশানের আর কোনো সন্দেহ রইল না। এটা কেবল হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রত্নতাত্ত্বিকের গল্প নয়। এটা কোনো লোককথাও নয়। কেউ ইচ্ছে করে সূত্রগুলো লুকিয়ে রেখেছিল। কেউ ইচ্ছে করে ইতিহাসের পাতা থেকে কিছু অংশ মুছে দিয়েছিল।

আর এখন...

এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরে সেই সূত্রগুলো আবার সামনে আসছে। এক এক করে। তার হাতের মধ্যে।


সেদিন রাতেই বাড়ি ফিরে ঈশান ল্যাপটপ খুলল।

রাজস্থানের ট্রেনের সময়সূচি।

বিমান।

হোটেল।

চিত্তোরগড় দুর্গের মানচিত্র।

সবকিছু খুঁজতে শুরু করল।

বাইরে আবার বৃষ্টি নামছিল। কলকাতার আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছিল। জানালার ওপারে শহর তার নিজের ছন্দে বেঁচে ছিল।

কিন্তু ঈশান জানত—

তার জীবন আর আগের মতো থাকবে না।

কারণ কিছু যাত্রা গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য শুরু হয় না।

শুরু হয় এমন এক সত্যের খোঁজে, যা জানার পর আর ফিরে আসা যায় না।

আর সেই যাত্রা শুরু হতে চলেছে।

রাজস্থানের প্রাচীন পাথরের নগরী...

চিত্তোরগড়ে।