রাতের নিস্তব্ধতা বাড়ার সাথে সাথে সারা বাড়ি যেন এক অশরীরী আত্মায় রূপান্তরিত হতে শুরু করলো। রাতের নিস্তব্ধতা যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, আজকাল তখনই বিপুল অনুভব করতে শুরু করে এক অশুভ, শীতল উপস্থিতি, যা প্রতিদিনের মতো আজও সে অনুভব করছে। সেই উপস্থিতি কেবল কল্পনা নয়, তা যেন তার প্রতিটি ইন্দ্রিয়কে আক্রমণ করছে কয়েকদিন ধরে। গত রাতে বকুলতলায় দেখা সেই আলতা রাঙানো পায়ের অধিকারিণী নারী যেন এবার সরাসরি কমলিনী ভিলার ভেতরেই তার অস্তিত্ব জানান দিতে শুরু করেছে। কে সে? কী তার পরিচয়? কিচ্ছু জানে না বিপুল। মনে মনে ভাবে, 'তবে রঘুকাকা? সে তো এই বাড়ির একমাত্র বাসিন্দা। সেও কী ওই প্রেতিনীর অস্তিত্বের টের পায় না?'

হঠাৎ করেই ঘরের ভিতরে দ্বিতীয় কারুর উপস্থিতি টের পেয়ে চমকে ওঠে বিপুল। তার চোখের কোণ দিয়ে বারবার দেখতে পাচ্ছে, ঘরের এক অন্ধকার কোণে, যেখানে আসবাবপত্রের ছায়া মিশে আছে, সেখানে যেন একটি ধূসর, আবছা অবয়ব দাঁড়িয়ে তার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। ঘাড় ঘুরিয়ে অবয়বটির দিকে সরাসরি তাকালে তা মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিবার চোখ সরালেই তা আবার ফিরে ফিরে আসছে যেন। এই নীরব উপস্থিতি যেন বিপুলের প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি শ্বাসকে অনুসরণ করছে। সাথে সাথেই বারে বারে তার কানে ভেসে আসছে কারুর দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। যেন তার অস্তিত্ব জাহিরে সে অক্ষম হয়েছে।

বিপুল এবার নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলো, 'না না! এ শুধু মনের ভুল, দীর্ঘসময় একা থাকার ভ্রম। এই বাড়ির আনাচে কানাচে সৃষ্টি হওয়া অন্ধকার এই সবের কারণ। নিশ্চয়ই তার দুর্বল মন কল্পনার জাল বুনছে।'

ঠিক তখনই, তাকে ভুল প্রমাণিত করে পিছন থেকে ভেসে এলো নূপুরের সেই রিনিঝিনি শব্দ—একদম তার কানের কাছে! বিপুল চমকে উঠলো! আতঙ্কে তার শরীর যেন মুহূর্তের জন্য অসাড় হয়ে গেল। সে দ্রুত ঘাড় ঘুরিয়ে পিছন দিকে তাকালো—কেউ নেই। কিন্তু ঘাড় ঘোরানোর ঠিক মুহূর্তেই সে অনুভব করল, তার গা ঘেঁষে, অতি দ্রুত বেগে এক হিমশীতল ছায়ামূর্তি এইমাত্র তাকে ছুঁয়ে দিয়ে গেল!

সেই স্পর্শ এতটাই প্রকট যে শীতের রাতেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমা হলো। সেই স্পর্শে যেন কুমকুমের মৃদু গন্ধ মিশে আছে—একই সঙ্গে মিষ্টি ও গা ছমছমে। তীব্র ভয় এবং অস্বস্তিতে বিপুল লাফ দিয়ে পিছিয়ে গেল তার জায়গা থেকে।

নূপুরের সেই রিনিঝিনি শব্দ এবার যেন বাড়ির ভেতরেই, বন্ধ ঘরের দরজা ভেদ করে, দেওয়ালের ভেতর থেকে ভেসে আসছে, সাথে মিষ্টি চুড়ির শব্দ। শব্দটা যেন বিপুলেরই প্রতিচ্ছবি হয়ে তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে, তার অজান্তেই তার চারপাশে এক অদৃশ্য বৃত্ত তৈরি করছে ওই অশরীরী। সেই মেয়েলি কণ্ঠের বিকৃত গুনগুন গান আবারও শোনা যাচ্ছে আজ। সুরটা এত করুণ যে তা হৃদয়ে গভীর বিষাদ তৈরি করে। বিপুলের মনের গভীরে একটা আলোড়ন তৈরি হতেই সে বুঝতে পারলো তার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

বিপুলের অনুভব বলছে, এই নারীমূর্তি কেবল একটা অশরীরী ছায়া নয়, বরং সে এক জীবন্ত অভিশাপ যা কমলিনী ভিলার প্রতিটি অস্তিত্বের সঙ্গে রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে আছে। সে বেশ বুঝতে পারছে, এই মুহূর্তে বিপুল আর একা নেই। সে এক ভয়ংকর, অদৃশ্য সত্তার সঙ্গে এক বাড়িতে আটকা পড়ে আছে, যার উদ্দেশ্য এখনো অজানা, কিন্তু উপস্থিতি এতটাই ভয়ঙ্কর যা এড়ানো অসম্ভব।

ঠিক যে সময় বিপুল তার যুক্তিবাদী মনকে বারবার বোঝাচ্ছিল, 'এসবই তার মনের নিছক ভ্রম', ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের হ্যারিকেনের আলোটা যেন আচমকা মৃদু থেকে মৃদুতর হয়ে এলো। যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি শিখাটিকে নিভিয়ে দিতে চাইছে। ঘটনার তাৎপর্য বোঝার আগেই বিপুল উঠে গেলো হ্যারিকেনের আলোটাকে উসকে দিতে। আর ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল ঘরের দেওয়ালে টাঙানো পুরোনো আয়নাটার দিকে।

ঘরের নিস্তব্ধতাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে এক বিকৃত, মর্মস্পর্শী কান্নার শব্দে সারা ঘরটা হঠাৎ ছেয়ে গেলো। বিপুল স্তম্ভিত হয়ে দেখল, আয়নাতে তার নিজের প্রতিচ্ছবিতে এক ঝলকের জন্য যেন ঘোমটা টানা একটি মুখ ভেসে উঠলো। সেই মুখ স্পষ্ট নয়, কুয়াশার মতো আবছা, কিন্তু তার ভেতরের দুটো চোখ যেন তীব্রভাবে তাকিয়ে আছে বিপুলের দিকে, আর তার ঠোঁটে লেগে আছে এক করুণ অভিব্যক্তি।

আহ! কী করুণ সেই কান্নার সুর! যেন দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা হিমশীতল অনুভূতিকে কেউ ছিঁড়ে বার করতে চাইছে তার পাষাণ প্রমাণ বুকের ভিতর থেকে।

সেই কান্নার সুরে এমন কিছু ছিল, যা বিপুলের যুক্তিবাদী মনকে নিমেষে ধ্বংস করে দিলো। তার মনে হতে লাগলো, যেন সে এই পৃথিবীতে ব্রাত্য, সকলের অনিচ্ছাতে বেঁচে আছে এই বিশ্বসংসারে। কেউ তাকে চায় না, পছন্দ করে না। সকলে তাকে ঘৃণা করে—শুধু ঘৃণা। এত শত মানুষের ঘৃণার পাত্র হয়ে সে যেন আর এক মুহূর্তও বেঁচে থাকতে চায় না; তার মরে যাওয়াই ভালো!

যেমন ভাবা তেমন কাজ। আত্মহত্যার সেই তীব্র তাড়নায়, বিপুল উদ্ভ্রান্তের মতো ঘরের দরজাটা খুলে বাড়ির পিছনে থাকা সেই পাতকুয়োর দিকে ছুটে গেল। সেখানে পৌঁছে সে কুয়োর শীতল জলের দিকে তাকালো—চাঁদের আলোয় জল চিকচিক করছে—মৃত্যু যেন হাতছানি দিচ্ছে। ঝাঁপ দেওয়ার জন্য সে প্রস্তুত হতেই...

পিছন থেকে একটি হাত লোহার মতো শক্ত করে তাকে চেপে ধরলো!

"ছোট দাদাবাবু! দাদাবাবু, এ আপনি কী করছেন দাদাবাবু! হা ঈশ্বর! আর বিন্দুমাত্র দেরি হলে যে এই বংশের শেষ প্রদীপকে আমি রক্ষা করতে পারতুম না। হা ঈশ্বর!"

রঘু, হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে তাকে নিচে নামিয়ে এনে একপাশে দাঁড় করালো। বিপুল তখনো যেন ঘোরগ্রস্ত, নিজের হাত-পা ছুঁড়ে নিজেরই ছায়ার সাথে লড়াই করে চলেছে। তাকে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে রঘু এবার যেন অদৃশ্য কোনো সত্তার উদ্দেশ্যে চিৎকার করে উঠলো:

"মুখপুড়ি! আর কতজনকে খাবি তুই? এত খেয়েও তোর খিদে মেটে না? এই বাড়ির সবাইকে তো খেয়েছিস তুই! এই বংশের শেষ বাতিটাকে তো নিস্তার দে? আরে ও তো কোনো দোষ করেনি?"

রঘুর শেষ কথাটা যেন ওষুধের মতো কাজ করলো বিপুলের উন্মত্ত মনে। সে এক-মুহূর্তের জন্য থেমে গিয়ে বিহ্বল দৃষ্টিতে তাকালো রঘুর দিকে। রঘু কাঁদছে, তার বলিরেখাযুক্ত শীর্ণ চোখে এখন কেবল তীব্র যন্ত্রণা। তার প্রতিটি কান্নার শব্দে বেরিয়ে আসছে প্রচন্ড ব্যাথা।

রুদ্ধশ্বাসে বিপুল এবার জিজ্ঞাসা করলো, "উনি-উনি কে রঘুকাকা? কী লুকাচ্ছ তুমি আমার কাছ থেকে? এই সারা গ্রাম কিসের ভয়ে এই ভিলায় পা রাখতে ভয় পায়? কেনই বা তারা একে কমলিনী ভিলা না বলে কলঙ্কিনী ভিলা বলে? উত্তর দাও আমাকে রঘুকাকা, উত্তর দাও! কেন বাড়ির কেউ আজ অবধি এই ভিলায় পা রাখে না? কী ইতিহাস লুকিয়ে আছে এখানে রঘুকাকা? আর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন...তুমি কে?"


সকালে পথচারীর সাথে দেখা হওয়ার পর থেকেই অজস্র প্রশ্ন যেন কঁটার মতো বিঁধতে শুরু করেছিল বিপুলের মনে। রঘুকে নিয়ে গ্রামবাসীর সেই আতঙ্কিত দৃষ্টি এবং চাপা ফিসফিসানি তাকে অস্থির করে তুলেছিল। কিছু তো একটা আছে ওই বাড়িতে—কিছু একটা আছে, যার ভয়ে সকলেই ওই পথে যেতে ভয় পায়। সেই সব প্রশ্নের ধকল এড়াতেই সে সোজা গিয়ে বসেছিল বটতলার চায়ের দোকানে।

অত সকালে চায়ের দোকানে বিশেষ লোকসমাগম ছিল না। দূরের আঁকাবাঁকা পথ ধরে এক বাউল আপন মনে তার গানের অভ্যাস করতে করতে চলে যাচ্ছিলেন। তাঁর একতারার শান্ত সুর আর সকালের শুভ্র বাতাস মন ছুঁয়ে গেল বিপুলের। সেই সুর যেন মনের সকল প্রশ্নের ভার এক নিমেষে হালকা করে দিলো।

ঠিক সেই সময়ে, হঠাৎ করেই তার পাশে এসে বসলেন এক সৌম্যকান্তি চেহারার মানুষ। পরিধানে সাদা পোশাক, চোখে পুরু চশমা, কাঁধ অবধি নেমে আসা সাদা চুল, আর কাঁধে একটি ঝোলা। তিনি এসেই যেন সরাসরি হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করলেন: "তুমি কি উপেন্দ্রর ছেলে? তোমার মুখের গড়ন তোমার পূর্বপুরুষদের কথা মনে করিয়ে দেয়।"

এই প্রথম, কমলিনী ভিলার সম্বন্ধে কেউ এত স্বাভাবিকভাবে, এত নির্ভয়ে কথা বললো। ব্যক্তিটির কণ্ঠস্বরে যেন এক জাদু ছিল, যা ওই মাত্র দু-এক কথাতেই বিপুলের মনে তাঁর সম্বন্ধে এক গভীর সম্মানের সৃষ্টি করেছিল। বিপুল দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে বললো: "আপনিই প্রথম, যিনি ওই ভিলা সম্বন্ধে এত সহজভাবে কথা বলছেন। হ্যাঁ, আমি ওনারই ছেলে। তবে উনি আর এই পৃথিবীতে নেই..."

তাঁকে মাঝপথেই থামিয়ে দিয়ে মানুষটি বললেন, "আমি জানি। ওঁর সাথে আমার একটা অন্যরকমের সম্পর্ক ছিল একসময়ে।"

বিপুল বেশ আশ্চর্য হয়ে বললো: "আপনার পরিচয় জানতে পারি?"

তার কথার উত্তর না দিয়েই ব্যক্তিটি শুধু হাসলেন, সেই হাসি রহস্যময়। তিনি বললেন, "আমি জানি তোমার মনে অনেক প্রশ্ন। আমার পরিচয় এখন থাক। আর প্রশ্নের ভার বাড়িও না, বিপুল। তোমার মনের ভার হালকা করবে ওই বাড়িই। ওই বাড়িতে রাতে তুমি অনেক কিছু দেখেছো—তা শুধু মনের ভুল বা স্বপ্নের মায়াজাল নয়। তার পিছনে লুকিয়ে আছে এক গভীর ইতিহাস। সেই ইতিহাসকে আজ অবধি ওই বাড়ি থেকে কেউ মুক্তি দেয়নি। দেখো, যদি তুমি পারো।"

তাঁর চোখে ছিল এক করুণ আর্তি। তিনি মার্জিতস্বরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে বললেন: "তোমার বাবা উপেন্দ্র কলকাতাতে মানুষ না হলে হয়তো তিনিও আজ জীবিত থাকতেন না। ওই ইতিহাস বহু মানুষের প্রাণ কেড়েছে, বিপুল। তাই যদি সত্য জানতে হয়, রঘুই তোমাকে সবটা বলবে। তুমি ওকে যা ভাবছো, তা ওর পরিচয় নয়। ও সবটা জানে। আজ রাতে তুমি সবটা ওর কাছ থেকে জেনে নিও।"

ব্যক্তিটির কথাগুলো কোনোভাবেই পরিষ্কার হয়নি বিপুলের কাছে, কিন্তু সে এটা বুঝেছিলো—কমলিনী ভিলাতেই সব রহস্যের সমাধান লুকিয়ে আছে, আর রঘুই তার একমাত্র চাবিকাঠি।

সেই মুহূর্তে বিপুল বুঝতে পারলো, কেন সকালের গ্রামের মানুষটি রঘুর নাম শুনে ভয়ে পালিয়েছিল। তার মনে কোনো সন্দেহ রইল না যে রঘুই এই অভিশাপের নীরব সাক্ষী। তাই, রঘুকে তার আসল পরিচয় এবং ইতিহাস প্রকাশ করতে বাধ্য করার জন্যই সে রাতের অন্ধকারে কুয়োর পাড়ে দাঁড়িয়ে আত্মহত্যার এক নাটক মঞ্চস্থ করেছিল। তার অভিনয় সফল হয়েছে। এখন শুধু রঘুর মুখ খোলার অপেক্ষা।


আলতা পরা রাঙা পায়ে, বাবার দেওয়া প্রিয় চওড়া নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ তুলে বছর পনেরোর একটি ফুটফুটে মেয়ে সেই মুখুজ্যে বাড়িতে পা রেখেছিল। সে ছিল এই বাড়ির একমাত্র ছোট ছেলে রাঘবেন্দ্রর নববধূ—কমলিনী।

সুন্দর চাঁদের মতো মুখের মধ্যে পদ্মফুলের মতো টানাটানা দুটি চোখ দিয়ে অঝোরে ঝরে পড়ছিল বিদায়ের অশ্রু। বাপ-মায়ের আদরে মানুষ হওয়া মেয়েকে বিদায় দিতে গিয়ে তার বাবা, আদরের জামাই রাঘবেন্দ্রকে বুকে জড়িয়ে বলেছিলেন, "মেয়েটারে বড্ড আদোরে কোলে-পিঠে মানুষ করেছি বাবা। ওকে একটু দেখে-শুনে রেখো। ও বড় ভালো মেয়ে আমার। ভুল-ত্রুটি হলে ওকে শিখিয়ে পরিয়ে নিও।"

কথাটা রাঘবেন্দ্রর কানে গেলেও, এই বিয়ে ছিল তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে। তাই তার শ্বশুরের কথায় সে তেমন কান না দিয়ে, নববধূ কমলিনীকে একরকম অগ্রাহ্য করেই গিয়ে বসেছিল গরুর গাড়িতে। সেই মুহূর্তেই কমলিনীর মনে প্রথম আশঙ্কার কালো মেঘ জমতে শুরু করে।

বর-কনের গরুরগাড়ি কনের বাড়ি ছেড়ে মাঠঘাট পেরিয়ে যখন বাড়ির সামনে এসে থামলো, তখন সবে সকালের কাজ শুরু হয়েছে গৃহস্থের ঘরে। মুখুজ্যে বাড়ির ছোট ছেলের বিয়ে—এই মুখুজ্যেবাড়ির প্রতিপত্তি গ্রামের অন্যান্য বাড়ির চেয়ে ছিল বেশ কয়েক গুণ বেশি।

শাশুড়ি সরমাদেবী হাত ধরে কমলিনীকে গরুরগাড়ি থেকে নামিয়ে তাকে বরণ করে নিলেন। এরপর সমস্ত আচার-বিচার একরকম বিনা ইচ্ছাতে সেরে রাঘবেন্দ্র যখন কারো দিকে না তাকিয়ে দ্রুত নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালো, সেই দৃশ্য দেখে ধক করে উঠলো কমলিনীর হৃদয়। তার আশঙ্কা কি তবে সত্যি? তাহলে কি এই বিবাহ ওনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে দেওয়া হয়েছে? কমলিনীকে কি এভাবেই কারো অপছন্দের পাত্রী হয়ে সারাটা জীবন কাটাতে হবে?

রাঘবেন্দ্রর ওভাবে ঘরের দিকে পা বাড়নোর দৃশ্য কমলিনীর সাথে সাথে বাড়ির আর সকলেরও চোখ এড়ায়নি। সেখানে উপস্থিত বাকিদের মধ্যে শুরু হলো চাপা গুঞ্জন, যা মুহূর্তেই গুঞ্জন থেকে ফিসফিসানিতে পরিণত হলো।

কেউ কেউ তো উচ্চস্বরে বলেই উঠলো, "না বাপু সরমা, এই বিয়ে দিয়ে তুমি মোটেও ভালো করোনি। ছেলের মত যদি এই বিয়েতে ছিলই না, তাহলে তার বিয়ে দিয়ে কালটা ডেকে আনলে কেন বাপু?"

কেউ আবার চুপিসারে বললো, "ও ছেলের সংসারে মন নেই গো, তাই তো ছেলেকে সাততাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে সংসারী করতে চেয়েছে সরমা।"

কথাগুলো কমলিনীর কানে আসার সাথে সাথেই সরমাদেবীর কানেও পৌঁছালো। সরমাদেবী তাতে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হয়ে সকলের উদ্দেশ্যে কঠোর কণ্ঠে বললেন, "শোনো বাপু, অত কথা আমার ভালো লাগেনে। আমি ছেলের বিয়ে কেন দেব, কিভাবে দেব, তাতে তোমাদের এত কথা কিসের? নেমন্তন্ন খেতে এসেছো খাও আর বাড়ি যাও। মেলা আমাদের পরিবারের ভেতরে ঢুকো না তো বাপু!"

কথাগুলো সেখানে উপস্থিত আর সকলের কানে গেলে সকলেই প্রায় অপমানিত হবার ভয়ে চুপ করে গেলো। তবে সরমাদেবীর এই রুক্ষ ব্যবহার দেখে কমলিনী প্রথম দিনেই শাশুড়িকে নিয়ে এক গভীর ভয় অনুভব করলো।

সরমাদেবী আবার তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, "কই দিকি, বৌকে আশীর্বাদ করো দিকি। মেলা বড্ড সময় যাচ্ছে। ওদিকে আবার একরাশ কাজ পড়ে আছে।"

তার কথার ঝাঁঝে সেখানে উপস্থিত সকলেই কমলিনীকে আশীর্বাদ করতে এগিয়ে এলো। সব শেষে এলেন কমলিনীর ভাসুর—নীরেন্দ্র। কমলিনী তখন লজ্জায় মাথা নিচু করে বসে আছে। এক নতুন আশঙ্কা তার মনে তখন ভার হয়ে চেপে বসেছে। ভারাক্রান্ত মনে কমলিনী নীরেন্দ্রর আশীর্বাদের পরে তার পা ছুঁয়ে নমস্কার করতে যেতেই হঠাৎ করেই নীরেন্দ্র তার দু কাঁধে হাত দিয়ে তাকে তুলে দাঁড় করালেন।

তার সেই স্পর্শ যেন কোনো সাধারণ মানুষের ছিল না—এ যেন কোনো হিংস্র পশু তার শিকারের দেহকে ভক্ষণের আগে ছুঁয়ে দেখছে। সঙ্গে সঙ্গে চমকে গিয়ে কমলিনী মাথা তুলে তাকালো ভাসুরের দিকে। আর তখনি তার চোখে নীরেন্দ্রর সেই প্রথম চাহুনি পড়লো—এক পাশবিক, তীব্র লালসা! সেই চাহুনিতে এমন এক আদিম খিদে ছিল, যা রাগে আর অপমানে যেন কমলিনীকে দগ্ধ করে তুলল।

কিন্তু তাকে পেরিয়ে এসে শাশুড়ি সরমাদেবী যেন নির্বিকার কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, "কই, কেমন হয়েছে বল ভাইয়ের বৌ?"

তার উত্তরে নীরেন্দ্র যা বললেন, তাতে কমলিনীর নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হচ্ছিল না। নীরেন্দ্র উত্তর দিলেন: "বেশ খাসা মুখখানা নতুন বৌয়ের। একেবারে সদ্য তুলে আনা পদ্মফুল যেন। এঁকে আমাদের যত্নে রাখতে হবে দেখছি।"

কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ উদ্ধার করতে কমলিনীর বেশি সময় লাগেনি। কিন্তু আরও আশ্চর্য হয়েছিল যখন তার শাশুড়ি সরমাদেবী তার বড় ছেলের উদ্দেশ্যে বললেন: "তা সেই দায়িত্ব আমি তোমাকেই দিলাম বাপু। তোমার ভাই তো এসেই মুখ ঘুরিয়েছে।"

তারপর কমলিনীর দিকে তাকিয়ে কঠিন কণ্ঠে বলেছিলেন: "তা দেখো বাপু, নিজের স্বামীরে কিভাবে নিজের আঁচলে বাঁধতে হয় তা নিশ্চই তোমার মা শিখিয়ে পরিয়ে পাঠিয়েছন। আমার ছেলেকে কিভাবে সংসারে ফেরাবে তা আমি তোমার ওপরে ছাড়লাম।"

কথাটা বলেই সেখান থেকে বিদায় নিলেন সরমাদেবী। তবে নীরেন্দ্র যাবার আগে কমলিনীর কানের কাছে ফিসফিস করে বলে গিয়েছিলেন: "তুমি কিচ্ছুটি ভেবো না নতুন বৌ, আমি আছি তো। আমার কাছে সব রকমের সাহায্যই তুমি পাবে।"

কথাটা যেন কমলিনীর অন্তরাত্মায় এক তীব্র ধাক্কা দিলো। তার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে তার দু'গাল ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। মনে মনে বলেছিল, "ও মা! ও বাবা! এ তুমি আমাকে কার বাড়ি পাঠালে? আমার ভাগ্যে কি এই লেখা ছিল?"

বাড়ির কর্তা মশাই অমরেন্দ্র মুখুজ্যে সেদিন সবটা শুধু চুপচাপ দেখেছিলেন। কারণ এই বাড়িতে সরমাদেবীর তার বড় পুত্রের ওপরে আবেগ আর ভালোবাসা আর সকলের চেয়ে একটু বেশিই ছিল, আর তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস বোধ হয় অমরেন্দ্ররও ছিল না। কমলিনী ভিলার অভিশাপের প্রথম বীজ সেদিন নীরবে রোপণ হয়েছিল, এক সরল বালিকার হৃদয়কে ক্ষতবিক্ষত করে।


কমলিনীর দিনগুলি একরকম কেটে যাচ্ছিল, তবে তা কেবল কর্তব্য পালনের ভারে। স্বামীর ভালোবাসা বা উষ্ণতা ছাড়া শাশুড়ি সরমাদেবী তার কাঁধে যে গুরুদায়িত্ব চাপিয়েছিলেন, সে দায়িত্ব ছাড়া বাকি সব কিছুই সে নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করত। শ্বশুরের সেবাযত্ন হোক বা শাশুড়ির ফাই-ফরমাশ খাটা—কোনোটাতেই তার ক্লান্তি ছিল না, অভিযোগও ছিল না। এই মুখুজ্যে বাড়িতে পুত্রবধূ বলতে তখন সে-ই একমাত্র।

কমলিনী অল্পদিনেই জানতে পারে এই বাড়ির অন্য এক করুণ ইতিহাস। অমরেন্দ্র মুখুজ্যে আর সরমাদেবীর বড় সন্তান নীরেন্দ্রর বিয়েও একসময়ে রাঘবেন্দ্রর মতোই ধুমধাম করে দিয়েছিলেন তাঁরা। কিন্তু নীরেন্দ্র মুখুজ্যে ছিলেন জুয়া আর মদের নেশায় চুর কপট মানুষ। তাঁর স্ত্রী, নাম ছিল সোহাগিনী, অন্যান্য গ্রাম্য বধূদের মতোই সমস্ত অত্যাচার নীরবে সহ্য করে সেই বাড়ি আঁকড়ে পড়েছিলেন সোহাগিনী।

কমলিনী প্রায়ই সোহাগিনীর কথা ভাবত।

"ওঁরা তো বলেছিলেন, এ বাড়ি লক্ষ্মীর আলয়। তবে লক্ষ্মীর আসনে বসে কেন এমন হাহাকার সইতে হলো তাঁকে? কেন ভালোবাসাহীন এক জীবন এমন করুণভাবে শেষ হলো?"

নীরেন্দ্রর অত্যাচার এবং শাশুড়ির গঞ্জনা দিন দিন বাড়ছিল, বিশেষত যখন নিশ্চিত হলো যে বাড়ির বড় বৌ কোনোদিনও মা হতে পারবেন না। এই নিঃসন্তান হওয়ার কলঙ্ক যেন সোহাগিনীকে তিলে তিলে গ্রাস করছিল। বড় বৌয়ের জীবন তখন মুখুজ্যে বাড়ির অন্ধকারে চাপা পড়ে যাওয়া এক দীর্ঘশ্বাসের মতো।

ঠিক সেই সময়ে একদিন হঠাৎ করেই দেবনন্দপুর গ্রামে হৈচৈ পড়ে গেলো।

অমরেন্দ্রবাবুর বাড়ির বড়বৌ নাকি গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছেন!

সকালে তার ঘরেই ঝুলন্ত অবস্থায় মৃতদেহ দেখা গিয়েছিল। সেই দৃশ্য দেখে সরমাদেবীও অমরেন্দ্রবাবু দুজনেই হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলেন।

সরমাদেবী বলেছিলেন, "এ কী কলঙ্ক দিলি মুখুজ্যে বংশে? এ কেমন পাপের বোঝা চাপালি আমাদের মাথায়! ছিঃ!"

কিন্তু কমলিনী এখন বুঝতে পারে, এই বাড়ির দেওয়ালে কেবল অতীতের রংই নেই, মিশে আছে এক অপমানিত নারীর যন্ত্রণা ও রক্তপাত।

কমলিনীর কাঁধের উপর তখন দুটি ভার: নিজের অপছন্দের জীবন, আর শিপ্রার করুণ পরিণতি।

কমলিনী শুধু বয়সেই ছোট ছিল না, সে ছিল শান্ত, স্নিগ্ধ এবং কোমল মনের প্রতিমূর্তি। সংসারের জটিল টানাপোড়েন বোঝার মতো মানসিক পরিপক্কতা তার তখনও আসেনি। শ্বশুরবাড়ি আসার আগে তাকে তার মা আশ্বস্ত করে বলেছিলেন:

"মা রে, তোর মা আর বাবা কোথাও যাচ্ছে না। এখন থেকে তোর আরও দুজন মা-বাবা। তোর শ্বশুরমশাই আর শাশুড়িমাও তো তোর মা আর বাবারই মতো।"

কমলিনী সরল কণ্ঠে তখন জিজ্ঞাসা করেছিল, "মা, ওরা আমাকে তোমাদের মতোই ভালোবাসবে তো? আমাকে শাস্তি দেবে না তো?"

তার মা হেসে বলেছিলেন, "ধুর পাগল মেয়ে! তোকে ওরা বকবে কেন? তোর মতো মিষ্টি মেয়েকে কি কেউ বকে? দেখবি, তাদের কথা শুনে চললে তোকে ওরা আদরে আর যত্নে ভরিয়ে দেবে।"

তার মায়ের বলা কথাগুলো সেদিন কমলিনীর মনে এক মিষ্টি আনন্দের সঞ্চার করেছিল। কিন্তু শ্বশুরবাড়িতে আসার অল্পদিনের মধ্যেই সংসারের আসল চিত্রটা তার চোখের সামনে ফুটে উঠলো, যখন সে বুঝতে পারলো এই সংসারে তার প্রকৃত স্থান কোথায়।

কমলিনীর স্বপ্নগুলো তখন ঘরের এক কোণে ধুলোয় পড়ে থাকতে থাকতে তার স্থান হয়েছিল আবর্জনার মাঝে। মেয়েটির ছেলেবেলা যেন কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো। এমনকি বাপের বাড়ি যাবারও অনুমতি সে পেতো না, পাছে যদি তার শ্বশুরবাড়ির গোপন কেচ্ছা তার বাপেরবাড়ির সামনে বেরিয়ে আসে।

তবে এই সবের মাঝেই, ধীরে ধীরে কমলিনীর একাকিত্বে ভরা জীবনে সাহচর্য গড়ে উঠছিলো একটি মিষ্টি বন্ধুত্বের হাত ধরে—তাদের বাড়ির দাড়োয়ানের ছেলের কানাইয়ের সাথে। সে ছিল দুপুরবেলার গল্পের সঙ্গী। বাইরের বা বাড়ির অন্যান্য মানুষের কাছে তাদের এই মেলামেশা হয়তো দৃষ্টিকটু হলেও, কমলিনীর কাছে কানাইয়ের সাহচর্য ছিল জীবনের একমাত্র প্রিয় আশ্রয়।

বিকেলে মাথার দুইপাশে বেণী বেঁধে, তাতে লাল ফিতে জড়িয়ে, নাকের নিচে নোলক পরা কমলিনী যখন আলতা পায়ে রূমঝুম শব্দে বকুলগাছে ঝুলে থাকা দোলনায় দোল খেত, তখন উঠোনের এক কোণে বসে গালে হাত দিয়ে একদৃষ্টে দেখতো সেই কানাই। কৌতুকে মাঝে মাঝেই হেসে উঠতো সে।

উঠোন জুড়ে তখন একফালি রোদে সোনারঙ। কানাই তার ছোটগিন্নিমাকে খুশি করতে প্রায়ই তার জন্য লুকিয়ে নিয়ে আসত বাগান থেকে পেড়ে আনা কাঁচা আম। নুন আর লঙ্কা গুঁড়ো দিয়ে সেই আম খাওয়ার সময় দু'জনের চোখে-মুখে যে নিষ্পাপ আনন্দের ঝিলিক ফুটে উঠত, তা যেন তাদের ক্ষণিকের স্বাধীনতা এনে দিত।

তাদের বন্ধুত্ব ছিল সবুজ আর তাজা পাতার মতো নির্ভেজাল।

কমলিনীর পায়ের কাছে বসে কানাই গ্রামের পুরোনো লোককথা বলত, বা দূরের নদীর গল্প শোনাত, তখন ক্ষণিকের জন্য সে ভুলে যেত তার শ্বশুরবাড়ির শীতল পরিবেশ। কানাইয়ের চোখে সে দেখত এক মুক্ত, বাঁধনহীন জীবন, যা সে নিজে ছুঁতে পারত না। তাদের এই নির্ভেজাল বন্ধুত্বই ছিল সেই কঠিন সময়ের মাঝে কমলিনীর একমাত্র শীতল আশ্রয়।

কিন্তু এই মধুর সম্পর্কেও ঘনাল ঘোর অমঙ্গল; ধীরে ধীরে নজরে আসতে লাগল তাদের এই নির্ভেজাল বন্ধুত্ব। সবার আগে তা চোখে পড়ল শাশুড়ি সরমাদেবীর, আর তারপর রাঘবেন্দ্রর। নিজের স্ত্রীকে সে দু'চোখেও সহ্য করতে পারত না, কিন্তু তা সত্ত্বেও কানাই আর কমলিনীর এই বন্ধুত্বে যেন তার মনের মাঝে এক অজানা আগুন জ্বলে উঠত। আর সেই আগুনে ঘি ঢালত তার দাদা নীরেন্দ্র।

কমলিনী নীরেন্দ্রর ধারের কাছেও যেত না এক গোপন ভয়ে। সহজ-সরল হলেও নারীচরিত্রের অনুভূতি দিয়ে বুঝতে পারত নীরেন্দ্রর মনের কালিমা।

সেদিনটা ছিল মেঘলা বিষণ্ণ দিন। আকাশের কোণে জমা হয়েছিল একগাদা কালো মেঘ—যেন প্রকৃতি নিজেই আসন্ন অমঙ্গলের পূর্বাভাস দিচ্ছিল। সেদিনও রান্নাঘরের কাজ সেরে কমলিনী স্নান সেরে সেজেগুজে তার বন্ধুকে খুঁজতে পুকুরপাড়ের রওনা হয়েছিল।

কিন্তু সেই দিনটা ছিল অন্যান্য দিনের চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। পুকুরপাড়ে যাওয়ার পথে গোয়ালঘরের এক কোণে মনের কুটিল অভিসন্ধি নিয়ে লুকিয়ে ছিল আরেকজন—এক মানুষবেশী পিশাচ।

সেই সময়ে ঐ দিকটা থাকত একেবারে নির্জন। সেই নির্জনতার সুযোগেই, সকলের চোখের আড়ালে, কমলিনীর অলক্ষ্যে একটি শক্ত, রূক্ষ হাত এসে তার মুখ চেপে ধরল। এরপর এক ঝটকায় তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো গোয়ালঘরের আধো-অন্ধকারে। কমলিনী নিজেকে ছাড়ানোর জন্য প্রাণপণে ব্যর্থ চেষ্টা করল—তার নরম শরীর সেই হিংস্র শক্তির সাথে কিছুতেই পেরে উঠল না।

নির্জন গোয়ালঘরে তখন কেবল গরু-বাছুরের মৃদু নড়াচড়ার শব্দ। সেই আধো-অন্ধকারে কমলিনী নিজেকে বাঁচাতে তখন প্রবলভাবে যুদ্ধ করে চলেছে। তার প্রাণপণ ছটফটানি আর শক্তি দিয়ে সে কোনোমতে অপহরণকারীটির মুখের ওপর থেকে ঢাকাটা সরিয়ে আনলো।

আর তাতেই বেরিয়ে এল সেই পরিচিত মুখ—যা দেখে চমকে উঠল কমলিনী। ‘নীরেন্দ্র!’

কমলিনীর আতঙ্ক মুহূর্তেই ঘৃণায় পরিণত হলো। এই সেই ভাসুর, যে আশীর্বাদের সময় তার শরীরে দিয়েছিল মাংসাশী স্পর্শ, আর প্রকাশ্যে দিয়েছিল যত্নের প্রতিশ্রুতি! নীরেন্দ্র সেই মুহূর্তে এক কুটিল, পাশবিক হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসি যেন গোয়ালঘরের স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল ভেদ করে প্রতিধ্বনিত হলো।

"এতদিনে সুযোগ পেলাম নতুনবৌ! এত লাজ কেন তোমার? তোমার শাশুড়ি তো বলেই দিয়েছেন—আমি তোমার সবরকমের সাহায্য করব! তোমার স্বামী যখন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন, তখন এই বাড়ির বড় ছেলে কি তোমার দিকে ফিরেও তাকাবে না?"

কমলিনীর চোখে তখন ভয় নেই, আছে কেবল তীব্র ঘৃণা। সে জানে এই মানুষটাই হলো এই বাড়ির আসল কলঙ্ক। নীরেন্দ্র যখন তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল, তখন কমলিনী শেষ বারের মতো তার সবটুকু শক্তি জড়ো করল।

তার শরীরের প্রতিটি অংশ দিয়ে সে নিরন্তর ধাক্কা দিতে লাগল নীরেন্দ্রকে। তার পা দু'টি তখন নূপুরের রিনিঝিনি না তুলে, প্রতিরোধের তীব্র আঘাতে বারবার আঘাত হানছিল নীরেন্দ্রর শরীরে। সুযোগ বুঝে, যখন মুহূর্তের জন্য নীরেন্দ্রর বন্ধন আলগা হলো, কমলিনী এক বিকট চিৎকার করে তার হাত থেকে নিজেকে ছিনিয়ে নিল!

শ্বাসরুদ্ধকর দ্রুততায়, সে গোয়ালঘরের দরজা ঠেলে বাইরে ছুটে এলো। তার আঁচল ছিঁড়ে গেছে, শাড়ির ভাঁজ এলোমেলো। ভয়, ঘৃণা আর অপমানে সে উদ্ভ্রান্তের মতো সেই পুকুরপাড়ের রাস্তা ধরে ছুটে চলল—যেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিল তার একমাত্র বন্ধু।

কমলিনী ছুটছিল এক বন্দি পাখির মতো, যে খাঁচার দরজা খুঁজে পেয়েছে। আর পেছনে, গোয়ালঘরের অন্ধকারে পড়ে রইল নীরব ব্যর্থ ক্রোধে ফুঁসতে থাকা এক পিশাচ, যার পাশবিক লালসা পূর্ণ হয়নি।

কিন্তু সেদিন সেখানে কানাই ছিল না। ক্লান্ত কমলিনী বহুবার তার নাম ধরে ডাকার পরেও যখন কানাইয়ের কোনো উত্তর পেল না, তখন নিরুপায় হয়ে সে মাটিতে বসে কাঁদতে লাগল। বারবার সে তার মায়ের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল, "মাগো তুমি যে বলেছিলে কেউ শাস্তি দেবে না। এই জীবন কি শাস্তির চেয়ে কোনো অংশে কম মা, বলো?" মাটিতে পড়ে বেশ কিছুক্ষণ অশ্রুবর্ষণের পর সে ধীরে পায়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয় তার বাড়ির পথে।

কিন্তু বাড়ির ভিতরের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ঘরে ঢুকেই সবার প্রথমে তার চোখ গেল কোমরে হাত রেখে জ্বলন্ত দৃষ্টি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার শাশুড়ির দিকে। শাশুড়ির পিছনেই ছিল নীরেন্দ্র, যার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে ক্রুর হাসি। উঠোনের একপাশে কাষ্ঠমুখে দাঁড়িয়ে আছে রাঘবেন্দ্র, আর দাওয়ার এক কোণে নিরুপায় হয়ে বসে আছেন অমরেন্দ্রবাবু। চোখ তার মাটির দিকে। কমলিনীর ঘেঁটে যাওয়া চুলের সারি আর তার আলুথালু পোশাক দেখে সকলে কিছু বুঝে ওঠার আগেই নীরেন্দ্র বলে ওঠে, "দেখেছো মা, দেখেছো ছোট বৌয়ের কাণ্ড। আমি না বলেছিলাম তোমাকে............"

কথাটা শেষ করবার আগেই রাগে গর্জে উঠলেন সরমাদেবী। তিনি এগিয়ে এলেন কমলিনীর দিকে আর তার চুলের মুঠি ধরে বললেন, "ছি ছি, বাপ-মা বুঝি এই শিক্ষে দিয়ে মানুষ করেছে তোকে! বাড়ির চাকরের ছেলের সাথে দিনে-দুপুরে ফস্টিনস্টি করা।" কথাটা বলেই তিনি মুখ ঘোরালেন রাঘবেন্দ্রর দিকে। সে মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল, তাকে সরমাদেবী বললেন, "ওই মেয়ে কিনা বাড়ির বৌ! দেখ-দেখ রাঘব তোর বৌয়ের কাণ্ডখানি দেক একটিবার। নির্লজ্জ বেহায়া কোথাকার। আজ যদি নীরেন্দ্র না বলত, তাহলে ও সেয়ানা মেয়ে আমাদের জানতেও দিতো নি।"

কথাগুলো শুনে যেন নিজের কানকেই বিশ্বাস করতে পারছিল না কমলিনী। এসব কী বলছে এরা? যে নীরেন্দ্র তাকে সকলের অলক্ষ্যে ধর্ষণ করার চেষ্টা করেছে, সকলে আজ তারই কথা মেনে চলছে! সেদিন নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে প্রায় সকলের কাছে একবার করে ছুটে গিয়েছিল কমলিনী। কিন্তু হায়, সেই ক্ষুদ্র মেয়ের কথা কেউ সেদিন শুনতে রাজি হয়নি। সবশেষে সে গিয়ে তার শ্বশুরের পায়ে লুটিয়ে পড়ে মিনতি করে, "দোহাই বাবামশাই, একটিবার আমার কথাগুলি বলবার সুযোগ দিন।" কিন্তু অমরেন্দ্রবাবু নিরুপায়। তিনি শুধু সজল চোখে তাকিয়ে রইলেন তার পুত্রবধূর দিকে।

ওদিকে কমলিনীর প্রতিটি পদক্ষেপ যেন রাঘবেন্দ্রর মনের রাগকে আরও বাড়িয়ে তুলছিল। সে আর থাকতে না পেরে দৌড়ে গিয়ে তার স্ত্রীকে তুলে দাঁড় করাল আর সপাটে তার গালে কষিয়ে দিল চড়। কিন্তু কমলিনীর শরীর সেই চড় সহ্য করতে পারল না। সঙ্গে সঙ্গে রাঘবেন্দ্রের পায়ের কাছেই লুটিয়ে পড়ল তার শরীরটা। নিজেকে নির্দোষ প্রমাণ করতে না পারার আক্ষেপ বুকে চেপে রেখেই মারা গেল মেয়েটি।

কমলিনীর নিথর দেহটি লুটিয়ে পড়ার পরমুহূর্তে, থমকে গেল যেন গোটা সংসার। বাতাস ভারী হয়ে গেল এক অনিবার্য পাপের নীরবতায়। ব্যাপারটা সকলের বুঝে উঠতে যেটুকু সময় লাগল, তার পরেই হতভম্ভ রাঘবেন্দ্র এই প্রথম কমলিনীর দিকে ঝুঁকে পড়ল। তারপর কম্পিত কণ্ঠে এতদিনে প্রথমবার তার নাম ধরে ডাকল, "ক-কমলিনী!"

কিন্তু সারা দিল না কমলিনী। তার জীবন তখন অন্য পারে পাড়ি দিয়েছে। ওদিকে সরমাদেবী সমেত বাকিদের চোখে ফুটে উঠেছে তীব্র ভয়, কারণ ধীর পায়ে বাড়িতে প্রবেশ করেছে কানাই। কমলিনীর সামনে মাটিতে ধপ করে বসে পড়ল কানাই। কমলিনীর ঠোঁটে তখনও প্রকাশ পাচ্ছে মোটা রক্তের দাগ, যা ছিল রাঘবেন্দ্রর এই প্রথম তাকে দেওয়া 'উপহার'। কমলিনীর খোলা চোখ তাকিয়ে আছে কানাইয়ের দিকে, যেন গভীর যন্ত্রণায় তাকে অভিযোগ জানাচ্ছে—এ কোন বিচার?

কিন্তু এই সবকিছুর মাঝে তার চোখ গেল কমলিনীর হাতের দিকে। তার মুঠোর মধ্যে ধরা আছে একটা কুঁচকে যাওয়া রুমাল। রুমালটা তুলে নিয়ে মুখের সামনে ধরতেই তার কোণে একটা সেলাই করা নাম তার চোখে পড়ল: "নীরেন্দ্র!"

রুমালটা নিঃশব্দে এগিয়ে দিলো কানাই রাঘবেন্দ্রর দিকে, নামটা দেখে বিদ্যুতের মতো চমকে উঠল রাঘবেন্দ্র। যেন মাথার ওপরের ছাদ ভেঙে পড়ল। "তাহলে এই প্রমাণটাই তখন থেকে সকলকে দেখাবার চেষ্টা করছিল সে!"

তাহলে সে রাগের বশে নিজের স্ত্রীকে খুন করেছে? ঠিক যেমন এক বছর আগে নীরেন্দ্র তার স্ত্রীকে খুন করেছিল? কথাটা ভাবতেই অনুশোচনায় নয়, ক্রোধে ফেটে পড়ল রাঘবেন্দ্র। সে রুমালটা নীরেন্দ্রর মুখের সামনে ধরতেই প্রচণ্ড ভয়ে কুঁকড়ে গেল নীরেন্দ্র। বাড়ির কারও বুঝতে বাকি রইল না—দোষটা ওই নির্দোষ মেয়েটার নয়, আসল দোষ তাদের নিজেদের, এই বাড়ির নষ্ট কলঙ্কের।

কিন্তু বিচারের চিত্রটা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। যদিও সেদিন কানাই অপরাধের ভাগি ছিল না, তবুও শাশুড়ি সরমাদেবীর জেদাজেদিতে তার দুই ছেলে বেঁচে গেল। বিচারের কাঠগড়ায় শাস্তি হলো নির্বোধ কানাইয়ের। সমস্ত দোষ তার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে, নির্বোধ ছেলেটাকে পাঠানো হলো জেলে। সে সেদিন একটাও কথা বলেনি। চাপিয়ে দেওয়া সমস্ত অপরাধের বোঝার চেয়েও তার কাছে অনেক গুণ কষ্টের ছিল তার খেলার সঙ্গী 'ছোটগিন্নিমা'-র মৃত্যু। চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়া সেই আলতা পায়ে রূমঝুম করে দোল খাওয়া মেয়েটির স্মৃতি নিয়ে, কানাই নীরবে বরণ করে নিল কঠিন শাস্তি। বাড়ির অন্দরে সেদিন বয়ে গিয়েছিলো এক রক্তক্ষয়ী ঝড়।

তবে এখানেই শেষ নয়, সেদিনটা ছিল ঝড়-বাদলের দিন। তাই কমলিনীর ছোট্ট নিথর দেহটা শ্মশানে যাত্রা করার আগেই অজস্র ধারায় নেমে এসেছিল বৃষ্টি। জন্মদাত্রী মায়ের কাছেও তার মেয়ের জীবন ছিল এক গভীর কলঙ্ক—তাই তার মা-বাবাও মেয়ের শেষ যাত্রায় সামিল হতে এলেন না। সবশেষে, একটু বৃষ্টি থামলে কমলিনীর শরীরটা নিয়ে যখন হাতে গোনা কয়েকজন শ্মশানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করেছিল, তখন রাত ঘনিয়েছে।

শ্মশানের চিতার পাশে দাঁড়িয়ে রাঘবেন্দ্র। নিজের হাতে চিতার কাঠে সে যখন আগুন ছোঁয়ালো, তখন সে জীবনে প্রথমবার এমন এক সম্পর্কের জন্য কান্নায় ভেঙে পড়েছিল, যার কোনো গুরুত্ব সে কখনও দেয়নি। এই কান্না কমলিনীর জন্য ছিল, নাকি এক নির্বোধের ওপর করা অত্যাচারের ফলশ্রুতি—তা কেউ জানতে পারল না। ওদিকে কমলিনীর শরীরটা ধিকিয়ে-ধিকিয়ে জ্বলছে আগুনে। এই সময়ে হঠাৎ করেই আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে নেমে এলো প্রবল বৃষ্টি। সঙ্গে সঙ্গে সেখানে উপস্থিত বাকিরা বৃষ্টির হাত থেকে বাঁচতে শ্মশানের চালাঘরে আশ্রয় নিল।

বেশ কিছুক্ষণ মুষলধারে বৃষ্টি চলার পর যখন তা থামল, তখন চিতা নিভে গেছে। আধপোড়া চিতাটার সামনে এসে সকলে দাঁড়াতেই দৃশ্যটা দেখে তাদের প্রাণ কেঁপে গেল। ভয়ে তারা যেন গুটিয়ে গেল। কেউ কেউ তো আবার জোরে জোরে তারকব্রহ্ম নাম জপ করতে শুরু করল। কারণ, দগ্ধ চিতাটা থেকে বেরিয়ে আছে আলতা পরা দুটি আধপোড়া পা, যা থেকে এখনও ধোঁয়া বেরোচ্ছে।

হঠাৎ করেই তাদের অবাক করে দিয়ে চিতাটা যেন সামান্য নড়ে উঠল। তাতেই উপস্থিত প্রায় সকলে ভয়ে পিছিয়ে গেল। ঠিক তখনি পুরোহিতের নির্দেশে আরো বেশ কিছু শুকনো কাঠ চাপিয়ে তাতে আগুন ধরানো হলো। এবার আগুন যেন দ্বিগুণ হিংস্রতায় জ্বলে উঠল। আগুনের লেলিহান শিখায় কমলিনীকে দাহ করা গেল, কিন্তু তার মৃত্যু যেন শুধু শরীরের বিনাশ নয়—ছিল এক অপমানের যন্ত্রণাদায়ক পরিসমাপ্তি।


কমলিনীর মৃত্যুর মাত্র কয়েকদিনের মাথায় আরও এক অশুভ খবর এলো—জেলে কানাই আত্মহত্যা করেছে। সেই খবর শোনার পর থেকে ধীরে ধীরে রাঘবেন্দ্র আরও ভেঙে পড়তে লাগল। দুজন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যুর জন্য সে নিজেকে ক্রমাগত দায়ী করতে শুরু করল। এক সময় সে বাইরে বেরোনো বন্ধ করে দিল, নিজেকে সম্পূর্ণরূপে ঘরের অন্ধকারে বন্দি করে রাখল।

ওদিকে, কমলিনীর স্মৃতি তখনো এই বাড়ির বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ঘরের মধ্যেই আজকাল মদের বোতল খুলে বসে নীরেন্দ্র আর মনে মনে কমলিনীর মুণ্ডপাত করে রোজ। সেদিনও সে ঘরের অন্ধকারের মাঝে গেলাস হাতে মদ্যপান করছিল, আর আপন মনে বিষ উগরে দিচ্ছিল: "শালা, মেয়েমানুষের প্রতি দরদ কত! তাহলে বেঁচে থাকতে মুখ ঘুরিয়ে থাকার কারণটাই বা কী ছিল? যত্তসব! আজকাল সারা বাড়ি যেন গুম হয়ে আছে ওই মেয়ের দুঃখে। যেন আর কারোর বৌ মরে না!"

তারপর ধূর্ত শিয়ালের মতো মুখে এক হিংস্র ভাব ফুটিয়ে হাত কচলাতে-কচলাতে সে বললো, "আমার আফসোস যদিও অন্য... সেদিন হাতে পেয়েও তাকে পাওয়া হলো না আমার! উফ, একটু যদি সচেতন হতাম, তাহলে মুখের ওই রুমালটা কিছুতেই ওর হাতে পড়তে দিতাম না।"

তার চোখ তখন লোলুপ লালসায় চকচক করছে। "কিন্তু সচেতন হতামই বা কিভাবে? চোখের সামনে ওরকম নরম মাংসের টুকরো দেখে নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না যে! সেই কতদিনের অভ্যাস, শালা মেয়েমানুষ দেখলে আমার মাথার ঠিক থাকে না। অমন সুন্দর দুটো ফুলের মতো হাত দিয়ে যখন আমাকে আঘাত করছিল, তখন মনে হচ্ছিলো..."

কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ করেই তার ঘরের মধ্যেকার বাতিগুলো ভয়ঙ্করভাবে কাঁপতে শুরু করলো। নীরেন্দ্র সেদিকে তাকিয়ে বেশ আশ্চর্য হলো, কিন্তু তার কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাতিগুলো দপদপ করেই হঠাৎ নিভে গেল—তাও একসাথে, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি এক ফুঁয়ে সব আলো নিভিয়ে দিলো। মদ্যপ নীরেন্দ্র এবার ক্রোধে উন্মত্ত হলো: "কোন শালা আমার ঘরের বাতি নেভালো? একবার সামনে আয় দেখি! আজ তোর একদিন কী আমার!"

কথাটা শেষ করার সাথে সাথেই হঠাৎ করেই সে এক প্রচণ্ড ধাক্কা খেলো, আর মদ্যপ অবস্থায় নিজেকে সামলাতে না পেরে ছিটকে গিয়ে পড়লো মেঝেতে।

ঘরের ভেতর থেকে এবার একটা হিসহিসে কণ্ঠস্বর ভেসে এলো: "এখনো তেজ যায়নি তোর, না? মেয়েমানুষের শরীরের প্রতি এত লোভ তোর? ভাসুরঠাকুর! তবে আজ এই মেয়েমানুষের হাতেই মরবি তুই!"

কথাটা বলার সাথে সাথেই চমকে গিয়ে নীরেন্দ্র ঘরের এদিক ওদিক তাকাতে লাগলো। ঘরের জমাট অন্ধকার ভেদ করে তার চোখ গিয়ে পড়লো তার থেকে বেশ কিছু হাত ওপরে শূন্যে ঝুলে থাকা দুটো আলতা পরা, আধপোড়া পায়ের দিকে!

প্রচণ্ড আতঙ্কে চিৎকার করতে গেলো নীরেন্দ্র। ঠিক তখনই এক শক্ত, অদৃশ্য হাত এসে চেপে ধরলো তার গলা। প্রচণ্ড কষ্টে প্রায় শ্বাস রোধ হয়ে আসতেই কানের কাছে আবারও সেই মেয়েলি গলা শুনতে পেলো: "সেদিন এই হাত দুটো দিয়েই আমি তোকে পরাস্ত করেছিলাম, ভুলে গেছিস তুই? তবে সেদিন ছেড়ে দিয়েছিলাম... আজ না।"

কথাটা বলার সাথে সাথেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো কমলিনীর প্রেতমূর্তি। প্রচণ্ড রাগে ফুঁসতে থাকা এক ভয়ঙ্করী প্রেত, যার শরীর যেন আগুনের হল্কায় দগ্ধ হয়েছে। চোখ থেকে ছিটকে পড়ছে আগুনের ফুলকি, নাকের নিচের সেই ছোট্ট নোলক এখন বিশাল বড় ও ভয়ঙ্কর। ঠোঁটের কোণে শুকিয়ে আছে একদলা রক্ত, আর মাথার চুল ঘরের বাতাস না থাকতেও যেন সাপের মতো উড়ছে।

কমলিনীর প্রেতমূর্তি নিজের হাত দিয়ে নীরেন্দ্রকে মাটি থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে তুলে ধরলো। তারপর আরেক হাত দিয়ে তার গলা খিমচে, ছিঁড়ে নিলো তার শ্বাসনালী। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় সেখানেই মৃত্যু হলো নীরেন্দ্রর।

কমলিনীর ক্রোধ তাতেও শান্ত হলো না। সে প্রচণ্ড আক্রোশে ছুঁড়ে দিলো তার নিথর দেহটা বারান্দার নিচে।

নীরেন্দ্রর দেহ বারান্দার নিচে ছুঁড়ে ফেলার পর, কমলিনীর দগ্ধ প্রেতমূর্তি শান্ত হলো না। প্রতিশোধের তীব্র আগুন তখনো ধিকিধিকি জ্বলছে তার চোখে। সেই ভয়ঙ্করী প্রেত তারপর ধীর পায়ে হেঁটে গেলো ঘরের ভেতরের একটি পুরোনো আলমারির কাছে।

দরজা খুলে ভেতরের দেরাজটি টেনে বের করে আনলো সে—সেখানে রাখা ছিল সেই একজোড়া মোটা নূপুর, যা বেঁচে থাকতে তার রাঙা পায়ে শোভা পেতো। এই নূপুর নীরেন্দ্র শ্মশানযাত্রার আগে সকলের অলক্ষে কমলিনীর পা থেকে খুলে নিয়েছিল, যাতে পরে তা বিক্রি করে নিজের নেশার খোরাক জোগাতে পারে।

কমলিনী সেই নূপুরদুখানি পরম মমতায় তুলে নিলো হাতে। সেদিনের মতো যত্নের সাথে নিজের প্রেত-পায়ে পরে নিলো সেই নূপুর। তারপর আলতো করে তাতে একবার হাত বুলিয়ে নিলো। মৃত্যুর পরেও সেদিন তার মনে এক গভীর কান্না দলা পাকিয়ে উঠতে থাকলো।

সেই কান্না ছিল এক সরল মেয়ের অঝোর আক্ষেপ—যে বাবা তাকে একসময়ে ভালোবেসে এই নূপুর দুখানি পরিয়ে দিয়েছিলেন, সেই বাবাও আজ তাকে ভুল বুঝলো! সবাই শুধু দেখলো তার অপমৃত্যু, কিন্তু কেউ জানলো না তার যন্ত্রণার কারণ। কেউ প্রশ্ন করলো না, কেন তার পায়ে বাঁধা নূপুর নীরবে থেমে গেলো।

কথাটা ভাবতেই, কমলিনী অঝোর ঝরে কেঁদে উঠলো।

তবে সেই বিলাপ ছিল ক্ষনিকের। পরক্ষণেই কমলিনীর প্রেতমূর্তি উঠে দাঁড়ালো। সেই নীরবতাকে সঙ্গে নিয়েই সে এগিয়ে গেলো লম্বা বারান্দা ধরে।

ধপ করে একটি ভারী শব্দ হতেই ঘুম ভেঙে উঠে বসলেন সরমাদেবী। একবার অন্ধকার ঘরের দিকে তাকালেন। ঘরের এক কোণে দেখা যাচ্ছে অমরেন্দ্র মুখুজ্যের দেহাবয়ব। তিনি একটি আরামকেদারার ওপরে গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছেন।

তাঁকে উদ্দেশ্য করে সরমাদেবী ত্রস্ত কণ্ঠে বলে উঠলেন, "ও-ও কিসের শব্দ ছিল গো? রাত-বিরাতে এ কেমন বিশ্রী কাণ্ড হচ্ছে!"

প্রশ্নের উত্তরে শুধুমাত্র একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো অমরেন্দ্রবাবুর দিক থেকে। "অপরাধের বিচার হচ্ছে, গিন্নি। যে অপরাধ আমরা সকলে মিলে করেছি, সেই অপরাধের। সেদিন আমিও তো চুপ করে দেখছিলাম সবটা—মেয়েটার কান্নাভরা আর্তির দিকে বিন্দুমাত্র নজর দিইনি আমি। তাই আমিও দোষী; অন্যায় হতে দেখাও তো সমান অন্যায়, গিন্নি!"

কথাগুলো সরমাদেবী কানে গেলেও তার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝলেন না তিনি। কেবল নিজের ক্রোধ আর অহঙ্কার ধরে রাখলেন। "আহা রে! ওই কুলটা মেয়ের দুঃখে যেন তোমরা দুই বাপ-ছেলে একেবারে পাগল হয়ে গেছো! ওর শোক সইতে পারছো না!"

কথাটা বলার সাথে সাথেই, আচমকা, সরমাদেবীর গলায় একটা চাপ অনুভব হলো। মনে হলো কেউ যেন অদৃশ্য হাতে তাঁর গলা চেপে ধরেছে। প্রচণ্ড কষ্টে কঁকিয়ে উঠে তিনি বললেন, "কেউ—কেউ আমার গলা চেপে ধরেছে! আ-আমাকে বাঁচাও!"

কিন্তু না। ধীরে ধীরে সেই অদৃশ্য হাতের আকার স্পষ্ট হতে লাগলো সরমাদেবীর চোখের সামনে—সাঁড়াশির মতো চেপে আসা দুটো হাত! তিনি বিছানায় যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলেন। একবার শেষ বারের মতো ক্ষীণ কণ্ঠে উচ্চারণ করলেন, "বাঁ-চা-ও..." তারপরই সব শেষ। সরমাদেবীর নিথর, প্রাণহীন দেহটা বিছানার ওপরে পড়ে থাকলো।

বিছানা থেকে একটা নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ ভেসে আসতেই তা থেমে গেল একটি কণ্ঠের করুণ ডাকে। আরামকেদারা থেকে উঠে এলেন অমরেন্দ্রবাবু। "মা রে! আমাকে মুক্তি দিবিনা! আমি যে সব দেখেও চুপ ছিলাম সারাজীবনের মতো সেদিন! আমাকেও মুক্তি দে!"

কিন্তু সেই নূপুরের শব্দটা আর ফিরলো না। তা কেবল ধীরে ধীরে বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে, যেন নিঃশব্দে বলে দিয়ে গেলো এক নির্মম সত্য:

"এটাই তোমার শাস্তি বাবা—জীবনের শেষদিন অবধি অপরাধবোধ আর অনুশোচনার আগুনে দগ্ধ হওয়া।"


রাঘবেন্দ্র যেখানে নিজেকে বন্দি করে রেখেছিল, সেই অন্ধকার ঘরের নিশ্ছিদ্র নৈঃশব্দ ভেদ করে এবার ভেসে এলো এক খ্যাসখ্যাসে পুরুষ কণ্ঠস্বর। সেই কণ্ঠস্বর যেন জমাট বাঁধা যন্ত্রণার ভারে আক্রান্ত: "ছোটকত্তা! কী দোষ ছিল আমার, ছোটকত্তা? কেন স্ত্রীহত্যার মতো পাপের শাস্তি সেদিন আমারে দিলেন আপনি? জেনে-শুনেও চুপ থাকলেন কত্তা?"

কণ্ঠস্বরটি ক্রমশ তীব্র হলো: "ওরা যে সেদিন আমার হাতে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে গেলো আমার বাপটার সামনে দিয়ে! একবার দেখে আসুন কত্তা, লোকটা আজকাল গ্রামের রাস্তায়-রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরে বেড়ায়!"

কথাটা শুনে রাঘবেন্দ্রর হৃৎপিণ্ড যেন থেমে গেলো। সে আতঙ্কে চিৎকার করতে পারলো না, শুধু মৃদু কণ্ঠে উচ্চারণ করলো: "কা—কা—কানাই!"

আবার সেই কণ্ঠস্বর, "আর কে কত্তা? মরার পরেও অনেক শোধ বাকি আছে যে! এই বাড়ির দারোয়ানের ছেলে আমি কত্তা। আমার কাজ আমার বাবার পরে এই বাড়ির মান-সম্মান রক্ষা করা। আর আমাকে কিনা আপনি বললেন ছোটগিন্নিমার সাথে... ছিঃ কত্তা, ছিঃ!"

কানাইয়ের কথাগুলো যেন রাঘবেন্দ্রর গালে সপাটে দুটো চড় কষালো। তার প্রতিটি শব্দে ফুটে উঠলো এক নিষ্পাপ হৃদয়ের চরম লাঞ্ছনা: "একটা নিষ্পাপ বন্ধুত্বকে আপনি কিনা অন্য নজরে দেখলেন, কত্তা! উনি ছিলেন সহজ-সরল। আমাকে বন্ধু মনে করতেন উনি। একবার সম্পর্ককে কলুষিত করার আগে ভেবে দেখতেন—ওঁনাকে আমি কী নামে ডাকতাম—'ছোটগিন্নীমা', কত্তা।"

রাঘবেন্দ্রর সমস্ত অহঙ্কার, সমস্ত ভুল এবং অনুশোচনা সেই মুহূর্তে চূর্ণ হয়ে গেলো। সে অনুতাপে চিৎকার করে উঠলো: "আমাকে কী শাস্তি দিতে চাও, তাড়াতাড়ি দিয়ে দাও কানাই! মেরে ফেলো! মেরে ফেলো আমাকে!"

কানাইয়ের কণ্ঠস্বর এবার শান্ত হলেও, তাতে ছিল এক ভয়াবহ শীতলতা। "না কত্তা। ও শাস্তি আপনার জন্য নয়। আপনার জন্য অন্য শাস্তি আছে, কত্তা। যতদিন না এই বাড়ির দাবি করতে আপনারই বংশের কেউ আসছে, কত্তা, আপনার আপন কেউ—ততদিন আপনি এই বাড়ি রক্ষা করবেন, আমার জায়গায়, কত্তা। ওটাই হবে আপনার শাস্তি। মরার পরেও আপনার আত্মা নেবে আমার জায়গা। আর এই বাড়িতে আপনি বন্দি থাকবেন ছোটগিন্নিমার সাথে, সারা জীবন।"


পরের দিনই রাঘবেন্দ্রর ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছিল তার ঘরের ভিতর থেকে। বড়কত্তা অমরেন্দ্র মুখুজ্যে সেদিনও চুপচাপ দেখেছিলেন সবটা।

বিপুল এতক্ষণ শান্ত হয়ে রঘুর মুখে সবকিছু শুনছিল। এবার সে তীব্র আবেগে বলে উঠলো, "তার মানে কমলিনীর আত্মাই... শেষ পর্যন্ত তাকেও..."

এবার রঘু, সামান্য হেসে বললো, "না ছোটদাদাবাবু, কমলিনী তাকে কিছুই করেনি, সে নিজেই আত্মহত্যা করেছিল।"

বিপুল আশ্চর্য হয়ে বললো, "তবে রাঘবেন্দ্র মুক্তি পেলো কিভাবে?"

রঘু আবারও হাসলো—তার ঘোলাটে চোখে জল জমতে শুরু করেছে। "সে মুক্তি পেলো কোথায় দাদাবাবু? তার আত্মা মৃত্যুর পরেও আজ অবধি এখানেই তার কমলিনীর সাথে বন্দি থাকলো। অমরেন্দ্রবাবু একাই এই বাড়িতে নিজের শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়েছিলেন। কিন্তু বহু আকুতি সত্ত্বেও একবারের জন্য কমলিনী আর তাঁর শ্বশুরমশাইকে দেখা দেয়নি। তারপর তিনি তাঁর সমস্ত সম্পত্তি তারই খুড়তুতো ভাই হরনাথের ছেলে উপেন্দ্রকে দিয়ে গিয়েছিলেন। তবে যাবার আগে এই বাড়িটাকে তিনি তাঁর পুত্রবধূর নামে উৎসর্গ করে গিয়েছিলেন, 'কমলিনী ভিলা'। কিন্তু কমলিনীর কলঙ্কের মিথ্যে অপবাদ সারা গ্রাম জানতো তাই তা ধীরে-ধীরে লোকমুখে হয়ে গিয়েছিলো 'কলঙ্কিনী ভিলা'।"

রঘুর কথায় বিপুলের কপালে ভাঁজ পড়তে শুরু করেছে। তার মনের ভেতরের সন্দেহ এবার চরম আকার ধারণ করলো। সে রঘুকে আমতা আমতা করে বললো: "তার মানে কি বলতে চাইছো তুমি? তুমি সেই... তুমি কি সেই রাঘবেন্দ্র?"

প্রশ্নের উত্তরে রঘুর মুখে আর কোনো হাসি ছিল না। তার শীর্ণ শরীরটা কেঁপে উঠলো।

রঘু ক্লান্ত ও ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললো, "হ্যাঁ, আমিই সেই হতভাগা—রাঘবেন্দ্র মুখুজ্যে। যাকে গ্রামের মানুষ রঘু বলে ডাকতো। যে আজ অবধি নিজের পাপের শাস্তি ভোগ করে চলেছে। আমি সেই, যে আজ অবধি নিজের স্ত্রীর সাথে বাঁধা পড়ে আছি এই বাড়িতে, আর থাকবো।"

তারপর সে ধীর পায়ে উঠে দাঁড়ালো। তার জরাজীর্ণ দেহটা যেন আরও বেশি নুয়ে পড়েছে অনুশোচনার ভারে।

রঘু বললো, "ওই পাতকুয়োর জলে এখনো প্রতি রাতে ভেসে ওঠে রাঘবেন্দ্রর আসল চিত্র, তবে এই বাড়ি তুমি বেচতে পারবে না। কমলিনী তা হতে দেবে না।"

কথাগুলো বলতে বলতে রঘুর আত্মা তার শীর্ণকায় দেহটাকে টেনে নিয়ে বহু কষ্টে এগিয়ে গেলো তার বরাদ্দ ঘরের দিকে।

এতক্ষণ বিপুল সব কথা পাথরের মতো স্থির হয়ে শুনছিল, 'কমলিনী' নামটা এই প্রথম তার মনে অন্য এক অনুভূতির সৃষ্টি করলো। সে দ্রুত এগিয়ে গেলো পাতকুয়োর দিকে। বিপুল সামান্য ঝুঁকে তাকালো কুয়োর জলের গভীরে।

সে যা দেখলো, তাতে তার শরীর কেঁপে উঠলো। তার সামনে জলের প্রতিচ্ছবিতে ফুটে উঠেছে একটি সৌম্য চেহারা, যার চোখে চশমা, কাঁধে ঝোলা আর মাথার চুল নেমে এসেছে কাঁধ অবধি। চায়ের দোকানে দেখা সেই রহস্যময় ব্যক্তি! সেই সৌম্য চেহারার ব্যক্তিটি কুয়োর জল থেকে তির্যক হাসি নিয়ে তাকিয়ে আছে তারই দিকে।

বিপুল চিৎকার করে বললো: "এ—এ কাকে দেখছি আমি?"

ঠিক সেই সময়ে, বাগানের ভিতরের সেই বকুল গাছের দিক থেকে ভেসে এলো নূপুরের রিনিঝিনি শব্দ। সাথে এক করুণ গুনগুন গান। কমলিনী, তার আলতা রাঙানো পায়ে নূপুর পরে, এখন তার অদৃশ্য দোলনায় চড়ে মনের সুখে দোল খাচ্ছে—রাতের আঁধারে আবার জেগে উঠেছে কলঙ্কিনীভিলা।