শুনশান ফাঁকা বাইপাসের বুক চিরে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে আমার প্রিয় সুজুকি গাড়িটা । অজগরের পিঠের মত মসৃণ রাস্তাটা রাতের নীরব প্রতীক্ষা বুকে নিয়ে জেগে আছে একা । বাইরে একটানা ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়েই চলেছে । গাড়ির সাউন্ড প্লেয়ারে একটা গান বাজছিল ।

‘‘....গুমনাম হ্যায় কোয়ি,

 বদনাম হ্যায় কোয়ি, 

 কিসকো খবর কউন হ্যায় ও,আনজান হ্যায় কোয়ি....’’

ধীরে ধীরে অদ্ভুত একটা ঝিমঝিমে রেশ আমার মাথার ভেতর চেপে বসছিল ক্রমশ । ভীষণ ঘুম পাচ্ছিল আমার । ঠিক এমনসময়তেই একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা থেমে যায় হঠাৎ । এতক্ষণের মৌতাতের আমেজ ভেঙে চমকে উঠি আমি । বৃষ্টিতে গাড়ির কাঁচ প্রায় ঝাপসা হয়ে এসেছে । একনিমেষে এতক্ষণের নিশ্চিন্ত আমেজটা যেন হঠাৎই উধাও হয়ে গেল । পরিবর্তে মনের ভেতরের অন্ধকারে জমা হয়ে থাকা সেই অজানা ভয়টা আবারও যেন হামাগুড়ি দিয়ে একটু একটু করে বেরিয়ে এসে জাঁকিয়ে বসতে চাইল আমার সমস্ত সত্ত্বায় । মাথার ভেতর লুকিয়ে বসে থাকা সেই অশরীরী কন্ঠস্বরটা যেন আবার শুনতে পেলাম । কেউ যেন আমার ঠিক কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলে উঠল,

‘গুড বাই ! হোপফুলি উই মীট নেভার এগেইন ।’

চমকে উঠে তৎক্ষণাৎ পেছনে তাকালাম আমি । না....কেউ.... কেউ নেই । নিজের মনকে বোঝালাম । না না....সে এখানে আসতে পারেনা । সে আমার কাছে পৌঁছনোর আগেই যাদব নিশ্চয়ই তার কাছে পৌঁছে গেছে । একটু আগে হাইওয়ের মুখটাতে একটা ব্রিজের নীচে ওর গাড়িটাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি আমি । এরা প্রফেশনাল । কথার খেলাপ করে না । যাদব নিশ্চিতভাবেই আশেপাশেই কোথাও আছে । বড় করে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে আবারও গাড়িতে স্টার্ট দিলাম । কিন্তু না....এইবারে আর স্টার্ট নিলনা ইঞ্জিন । বুঝতে পারলাম গাড়ি থেকে নেমেই দেখতে হবে । বাইরে বৃষ্টির বেগ এখন আগের থেকেও বেশী জোরালো হয়ে উঠেছে । মাঝে মাঝে ইস্পাতের মত নিরেট কালো আকাশটার বুক ফালাফালা করে দিয়ে ঝলসে উঠছে আঁকাবাঁকা বিদ্যুতের রেখা । তবুও উপায়ান্তর না দেখে পেছনের সিট থেকে রেইনকোটটা নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে এলাম আমি । সাথে সাথেই অবাধ্য বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তীক্ষ্ণ কাঁচের ফলার মত গেঁথে বসতে লাগল আমার সারা গায়ে । কোনোমতে গাড়ির সামনের দিকে এগিয়ে এসে বনেটটা খুলে মেলে ধরতে বুঝলাম ইঞ্জিনের কিছু গোলমাল হয়েছে । এতরাতে এই ফাঁকা রাস্তায় মেকানিক পাবো কোথায় সেটাই চিন্তা করছিলাম....ঠিক তখনই কাঁধের কাছে একটা হাতের স্পর্শে চমকে পেছন ফিরলাম আমি । যাদব ! কিন্তু এ.....এ কী অবস্থা হয়েছে ওর ! যাদবের শক্তসামর্থ্য বলিষ্ঠ দেহটা এখন থরথর করে কাঁপছে । দুহাতে নিজের পেট চেপে ধরে দাঁড়িয়ে আছে ও । ওর হাতের নীচ থেকে বৃষ্টির জলের সাথে মিশে চুঁইয়ে চুঁইয়ে নামছে একটা কষাটে লবণাক্ত রক্তিম তরলের ধারা । আমি পেছন ফিরতে হাঁটু মুড়ে রাস্তার উপরেই বসে পড়ল ও । ওর মুখ থেকে অদ্ভুত একটা জান্তব গোঙানির শব্দ বেরিয়ে আসছে । আমি কী করবো বুঝতে না পেরে পাগলের মত ডাকতে লাগলাম ওকে ।

‘যাদব....এই....এই যাদব । এসব....এসব কী....কী করে হল ? কে....কে করেছে ?’

যাদব কিছু একটা বলার জন্য ঠোঁট দুটো ঈষৎ ফাঁক করল । কিন্তু....কিন্তু পারল না । ওর গলা চিরে বিশ্রী একটা ঘর্ঘরে শব্দ বেরিয়ে এল কেবল । কাঁপা কাঁপা হাতে আমার পেছনদিকে কিছু একটা নির্দেশ করল যাদব । পরমুহূর্তেই প্রবল একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ওর সমস্ত দেহটা হঠাৎ একদম স্থির হয়ে গেল ।

আমার কাঁধ ছুঁয়ে জলের ফোঁটা গড়িয়ে নামছিল । রক্তের ধারা এসে মিশছিল বৃষ্টির জলে । যাদবের দেহটা রাস্তার উপর চিৎ হয়ে শুয়েছিল । চোখদুটো বিস্ফারিত । ঠোঁটজোড়া ঈষৎ হাঁ হয়ে আছে । যেন শেষমুহূর্তেও কিছু একটা বলতে চেয়েছিল তারা । ঠিক কতক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়েছিলাম জানিনা । হঠাৎ যাদবের শেষ ইশারাটা মনে পড়তেই আমার সারা শরীর জুড়ে ঠাণ্ডা একটা হিলহিলে স্রোত খেলে গেল । কাঁপা কাঁপা পায়ে উঠে দাঁড়ালাম আমি । তারপর ধীরে ধীরে একটু আগে যাদবের দেখানো জায়গাটার দিকে চোখ ফেরালাম । দূরে রাস্তার ধারে চুপ করে সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে লম্বা লম্বা গাছগুলো । তাদের অপসৃয়মান শীতল ছায়াগুলোকে এখন অশরীরী প্রেতমূর্তির মত দেখাচ্ছে । কড় কড় শব্দ করে আকাশের বুক চিরে বিদ্যুৎরেখা ঝলসে উঠল আবার । আর তখনই আমার মনে হল একটা ছায়াশরীর যেন চকিতে অন্ধকারের আড়ালে সরে গেল । একটা কুৎসিত কালো কাঁকড়াবিছে যেন একটু একটু করে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে ক্রমশ উঠে আসতে লাগল । ও....ও এসেছে ! এসেছে ও !

আমি....আমি বুঝতে পেরেছি....এই....এই গল্পটা....এই গল্পটা আমার নয় । এখানে আমি ওর খেলার একটা....একটা সামান্য চরিত্রমাত্র । এখানে তাই হবে যা ও চায় ।

ফাঁকা শুনশান রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে বেশ বুঝতে পারছিলাম এভাবে চলতে থাকলে ওর হাত থেকে কেউ বাঁচাতে পারবেনা আমায় । মরিয়া হয়ে তাই পাগলের মত রাতটুকু মাথা গোঁজার জন্যে একটা....একটা আশ্রয় খুঁজছিলাম আমি । ঠিক কতক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজে ফাঁকা রাস্তা ধরে উন্মাদের মত দৌড়েছিলাম তা মনে নেই । যখন হুঁশ ফিরল.....দেখলাম একটা ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত চার্চের সামনে দাঁড়িয়ে আছি আমি । রাস্তার ধারে একা,একটা বিচ্ছিন্ন নির্বাসিত দ্বীপের মত দাঁড়িয়ে ছিল চার্চটা । জন-মানবহীন শুনশান রাস্তা,পেছনে অদৃশ্য আততায়ী,মুহুর্মুহু বাজের শব্দ আর দমকা মাতাল হাওয়ার দাপটে কেঁপে উঠছে সমস্ত চরাচর । সেই নির্বান্ধব শুন্য প্রেতপুরীর বুকে দাঁড়িয়ে ওইমুহূর্তে ওই নির্জন ভাঙাচোরা পরিত্যক্ত চার্চটার থেকে ভালো কোনো আশ্রয় খুঁজে বের করা আমার পক্ষে সম্ভবপর ছিলনা । ডিসেম্বরের ঠাণ্ডায় বৃষ্টিতে ভিজে আমার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপছিল । ক্লান্তি আর অবসাদে বুজে আসতে চাইছে দুচোখ । শরীরে আর একফোঁটাও শক্তি অবশিষ্ট নেই । মরুভূমির বুকে দিকভ্রষ্ট পথিকের মত উপায়ান্তর না পেয়ে চার্চটার ভেতরেই ঢুকে পড়লাম আমি ।

বাইরে তখন প্রিয়তমের বিচ্ছেদবেদনায় আকুল ব্যথাতুর রমণীর মত অবিশ্রান্ত বারিধারায় কেঁদে চলেছে এক নিঃসঙ্গ ডিসেম্বরের রাত । দূরে রাস্তার পাশে সারি দিয়ে দাঁড়ানো শীর্ণকায় দীর্ঘ গাছগুলো ঝোড়ো হাওয়ার উদ্যাম স্রোতে মুমূর্ষু রোগীর মত কেঁপে চলেছে ক্রমাগত । লুকোতে হবে । আমাকে....আমাকে যেভাবেই হোক ওর নজর এড়িয়ে লুকোতে হবে....লুকোতে হবেই আমাকে । আর একমুহূর্তও সময় নষ্ট না করে অন্ধকারের সাথে গায়ে প্রায় গা মিশিয়ে চার্চের লম্বা টানা বারান্দা ধরে হাঁটতে লাগলাম আমি । করিডর শেষ হতেই একটা ঘোরানো সিঁড়ি এঁকেবেঁকে উঠে গেছে উপরের দিকে । শতাব্দী প্রাচীন পুরু ঝুলের আস্তরণ আর মাকড়সার জালের স্তুপ সরিয়ে কোনোমতে সিঁড়ি বেয়ে ধীরে ধীরে উপরের দিকে উঠতে লাগলাম । বাতাসে হিমশীতল মৃত্যুর নির্জনতা মিশে আছে । কোথাও কোনো শব্দ নেই । শুধু চার্চের মোরাম বিছানো রাস্তা আর ভগ্নপ্রায় ছাদের উপর অবিরাম বর্ষণধারা অতৃপ্ত ধ্বনি তুলে একাকী জেগে আছে । অন্ধকার বড় অদ্ভুত জিনিস । অন্ধকারের থেকে পালাতেও সেই অন্ধকারেরই সাহায্য নিতে হয় আমাদের ! আসন্ন অন্ধকারের হাত থেকে বাঁচতে তাই আমার সমস্ত চেতনায়....আমার সমস্ত সত্ত্বায়....একটু একটু করে গাঢ় অন্ধকারের প্রলেপ মিশিয়ে নিচ্ছিলাম আমি ।

চারিদিক থেকে বিশ্রী একটা ভ্যাপসা গন্ধ আসছে । দীর্ঘদিনের বদ্ধ গুমোট বাতাস যেন সর্বগ্রাসী কোনো মারণ জিঘাংসায় আমার গলা টিপে ধরতে চাইছে । পায়ের চাপে মেঝেতে জমা হয়ে থাকা শুকনো পাতার দল খচমচ শব্দ তুলে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে চলেছে । যেন তাদের এই একান্ত নির্জনপুরীতে আমার অনধিকার প্রবেশে অত্যন্ত রুষ্ট হয়েছে তারা । আমার মনে হল এই নিস্তব্ধ গহীন অন্ধকার যেন ফিসফিস করে বলছে,

‘ফিরে যাও....চলে যাও....যাও....পালিয়ে যাও....যাও !’

হঠাৎ পায়ের পাশ দিয়ে সরসর করে কী একটা চলে গেল মনে হল ! তাড়াতাড়ি সরে গিয়ে দুপা পিছিয়ে এলাম আমি । পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ পুরোনো চার্চ । এর কোথায় কোন অলিন্দে কী রূপ ধরে মৃত্যু তার জাল বিছিয়ে রেখেছে কে জানে ? সাবধানে....খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে আমাকে । একটা পুরোনো থামের গায়ে পিঠটা সামান্য এলিয়ে হেলান দিয়ে বসে পড়লাম । প্রচণ্ড তেষ্টায় আমার বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে....মনে হচ্ছে নিঃশ্বাস বুঝি বন্ধ হয়ে আসবে এবার । পা দুটো বিশ্রাম চাইছে । সমস্ত শরীর জুড়ে নেমে আসছে ক্লান্তি ।

 হঠাৎ একটা মৃদু খট খট শব্দে চমক ভাঙল আমার । কখন যেন নিজের অজান্তেই চোখদুটো লেগে এসেছিল । বুঝতে পারিনি । ঘোরটা কাটতে বুঝলাম শব্দটা আসছে নীচের সিঁড়ি থেকে । যেন পুরোনো সিঁড়ির উপর ভারী বুটের ছাপ ফেলে খুব সন্তর্পণে এক পা এক পা করে উপরে উঠে আসছে কেউ । মুহূর্তে আমার শিরদাঁড়াটা টানটান হয়ে উঠল । অনুভব করলাম এতক্ষণ ধরে শরীরের ভেতর কুণ্ডলী পাকিয়ে বসে থাকা ভয়টা একটু একটু করে আড়মোড়া ভেঙে জেগে উঠতে চাইছে আবার । ক্লান্ত-অবসন্ন শরীরটাকে কোনোমতে মেঝে থেকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে নিঃশব্দে উঠে পড়লাম । কান পেতে শুনলাম । না....না....না.... কোনো....কোনো ভুল নেই ! ওই ....ওই তো মেঝের উপর কার....কার ভিজে জুতোর শব্দ শোনা যাচ্ছে । ও....ও এসে পড়েছে । এসে পড়েছে ও । ঠিক তখনই গল্পের শেষ অংশটা মনে পড়ে গেল আমার ।

‘নিঃসঙ্গ বিনিদ্র প্রহর যখন গুমড়ে গুমড়ে কাঁদবে,

 অন্ধকারের ফোঁটায় শোনা যাবে ঘোড়ার খুরের শব্দ,

 ঈশ্বরও তখন ছেড়ে যাবেন আপন বাসভূমি ।

 বুকে হেঁটে নামবে গাঢ় নৈঃশব্দ ।

কুয়াশার চাদর মুড়ি দিয়ে রক্তিম উপসংহার লিখে দিতে,সে আসবে ।

সে....আসবে !’

নিঃসঙ্গ প্রহর....? ঘোড়ার খুরের শব্দ ! কান পেতে বৃষ্টির শব্দ শোনার চেষ্টা করলাম । আগে খেয়াল হয়নি । ওই তো....ওই তো শোনা যাচ্ছে । পাথরের গায়ে ঝরে পড়া প্রবল বর্ষণের শব্দ....! হঠাৎ কান পেতে শুনলে মনে হবে ঠিক যেন কোনো অশরীরী অশ্বারোহী যোদ্ধা নক্ষত্রবেগে তার অনুগত বাহনটিকে ছুটিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ! লেখার বাকি অংশগুলোর অর্থও একটু একটু করে ক্রমশ আমার মাথার ভেতর স্পষ্ট হতে লাগল । চার্চ মানে ঈশ্বরের বাসভূমি । পরিত্যক্ত চার্চ অর্থাৎ......! মুহূর্তে আমার সমস্ত শরীর জুড়ে ঠান্ডা হিলহিলে একটা বিদ্যুৎস্রোত খেলে গেল । মনে হল আমার পায়ের পাতা ছুঁয়ে স্যাতস্যাতে পিচ্ছিল হিমেল কিছু একটা যেন মাটি থেকে একটু একটু করে উঠে আসছে উপরের দিকে ।

আমার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় জানান দিচ্ছে এই পরিত্যক্ত প্রেতপুরীতে এখন আমিই শুধু আর একমাত্র অনাহূত অতিথি নই । আমি বুঝতে পারছি....সে এসেছে । সে নিশ্চিত এসেছে ! বাতাসে মিশে থাকা তার শীতল নিঃশ্বাসের স্পর্শ অনুভব করতে পারছি আমি । হঠাৎ একটা দমকা ঝোড়ো হাওয়ার স্রোত এসে মেঝেতে জড়ো হয়ে থাকা শুকনো পাতাগুলোকে মুহূর্তে এলোমেলো করে দিয়ে গেল । মনে হল দীর্ঘ কয়েক শতক ধরে জমা হয়ে থাকা প্রাচীন ধুলোরাশির বুকে আচমকা একটা ঝড় উঠল । আর ঠিক তখনই গলিত পিচের মত তরল অন্ধকারের শরীর চিরে নিদারুণ আস্ফালনে বিদ্যুৎরেখা ঝলসে উঠল আকাশের বুকে । কয়েকটা সেকেন্ডের ভগ্নাংশ মাত্র । মাত্র কয়েকটা সেকেন্ড ! কিন্তু ওই কয়েকটা মুহূর্তই আমার কাছে ওকে চিনে নেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল । না....কোনো ভুল হয়নি আমার । দীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীর । পরনের ভিজে বর্ষাতিটা প্রায় অর্ধেকটা মুখ আড়াল করে রেখেছে । কিন্তু তাও ওকে চিনতে একটুও ভুল হয়নি আমার । থুতনির নীচে সেই কাটা দাগ । ঠোঁটের কোণে জেগে থাকা সেই এক অপার্থিব হাসি ! ও হাসছিল ! আমার....আমার দিকে তাকিয়েই হাসছিল ও !

দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ছুটতে লাগলাম আমি । পালাতে হবে । ওর....ওর হাত থেকে পালাতেই হবে আমাকে ! ওই তো....ওই তো একটা....একটা ঘর দেখা যাচ্ছে । দরজাটা এখনও অক্ষত আছে । কোনোক্রমে ঘরটায় ঢুকে ভেতর থেকে ভালো করে ছিটকিনিটা লাগিয়ে দিলাম । হাহাহা....হা....আহাহা....! নিশ্চিন্ত....নিশ্চিন্ত ! এখন আর চাইলেও আমাকে....আমাকে বিরক্ত করতে পারবে না ও । আমি....আমি পেরেছি ! অবশেষে ওর চোখে ধুলো দিতে পেরেছি আমি ! কিন্তু এই....এই খসখস শব্দটা আসছে কোথা থেকে ? এঘরে....এঘরে তো আমি ছাড়া আর কেউ নেই । তবে ?

‘মিস্টার চতুর্বেদী....!’

খ্যানখ্যানে ধরা গলায় কে যেন ফিসফিস করে ডেকে উঠল আমার নামটা ।

‘কে....কে আছো এখানে ? কে....?

কিন্তু আমার কথা শেষ হতে পারল না । পেছন ফিরে নির্বাক নিস্পন্দের মত দাঁড়িয়ে রইলাম আমি । সারা শরীরে অন্ধকার মেখে ও....ও কে দাঁড়িয়ে আছে ?

‘মিস্টার চতুর্বেদী....!’

এবারে....এবারে আমি চিনতে পারলাম গলাটা । এই কণ্ঠস্বর আমার চেনা....ভীষণ...ভীষণ চেনা ! মিসেস বাজাজ ! আর ঠিক তখনই শব্দটা কানে এল আমার । বন্ধ দরজাটার উপর ধারালো কিছু দিয়ে আঘাত করছে কেউ ! মুহূর্তে কাঠের পুরোনো দরজাটার দিকে চোখ চলে গেল আমার । দরজাটা এখন মৃত্যুযন্ত্রণায় মুহুর্মুহু আর্তনাদ করে চলেছে । একটা ধারালো কুঠারের ফলা ঝলসে উঠছে বারবার । সমস্ত ঘরজুড়ে তারই বিজাতীয় আর্তনাদের শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে চলেছে । আর মাত্র কয়েকটা মুহূর্ত হয়ত । তারপরেই দরজার পাল্লাদুটো হুরমুড়িয়ে ভেঙে পড়বে হঠাৎ । আর তারপর....তারপর ?

‘না....নাআআআআআ !!!’

এইটুকু বলে অবশেষে থামলেন বৃদ্ধ । তার ফর্সা মুখটা এখন লাল হয়ে উঠেছে । উত্তেজনায় কাঁপছে তার সারা শরীর । ঘন ঘন নিঃশ্বাস পড়ছে । ইতিমধ্যেই মেট্রন এসে জানান দিয়ে গেল,

‘ভিজিটিং আওয়ার্স অনেকক্ষণ ওভার হয়ে গেছে মিস্টার চৌধুরী । এবার আপনাকে যেতে হবে ।’

রোগীর পাশের ছোট চেয়ারটা ছেড়ে উঠে পড়ে প্রশান্ত । ও বেরিয়েই আসতে যাচ্ছিল হঠাৎ পেছন থেকে মিস্টার চতুর্বেদীর বৃদ্ধ ক্লান্ত কণ্ঠস্বর ভেসে আসে ।

‘ওর তেরো নম্বর খুনটা কিন্তু এখনও বাকি । আর ক্যালেন্ডার বলছে আজকেও তেরো তারিখ । সাবধানে থাকবেন মিস্টার চৌধুরী । আমি যা যা বললাম ধরে নেবেন সবটাই একজন প্রায় স্মৃতিভ্রষ্ট বিকৃতমস্তিষ্ক বৃদ্ধের অর্থহীন প্রলাপ । এসব গল্প নিয়ে নিজের মনের ভেতর বেশী ফ্যান্টাসাইজ করবেন না । কজ উই নেভার নো হোয়েন আওয়ার ফ্যান্টাসিস বিকমস দ্য ডারকেস্ট ট্রুথ অফ আওয়ার লাইফ । গুড বাই ! হোপফুলি উই মীট নেভার এগেইন ! হাহাহা.... হাহাহা....!’

অপ্রকৃতস্থের মত হেসে ওঠেন বৃদ্ধ । সেদিকে তাকিয়ে কেমন যেন অস্বস্তি লাগে প্রশান্তর । দ্রুত ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসে ও ।

‘কী পান এসব করে ?’

ছেলেটা বেরিয়ে যেতেই ঘরে এসে ঢোকেন ডক্টর শাসমল । তার প্রশ্নে সামান্য মুখ তুলে তাকায় বৃদ্ধ । তার ঠোঁটে অস্ফুট একটা চাপা হাসি খেলে যায় ।

‘আমার কী দোষ ডক্টর ? ওরা আমার কাছে আসে গল্প শুনতে । একসময়ের প্রখ্যাত লেখক বেদ চতুর্বেদীর হঠাৎ করে বিকৃতমস্তিষ্ক উন্মাদে পরিণত হওয়ার গল্প । জানেন ডক্টর,ভালো গল্পকারের গুণ কী ? শ্রোতা কিংবা পাঠকদের মস্তিষ্ক নিয়ে যিনি নিজের ইচ্ছে মতো খেলতে পারেন....তাকেই একজন ভালো গল্পকার বলা উচিত । আমি গল্পকার ডক্টর । আমার কাজ শুধুই.....গল্প বলা !’

ওষুধের গন্ধ মেশানো হসপিটালের আলোআঁধারি ঘেরা ঘরটাতে চুপচাপ মাথা নীচু করে বসে থাকেন বৃদ্ধ । তার চোখ দুটোতে অদ্ভুত এক অব্যক্ত অভিব্যক্তি খেলে যায় ।

‘একজন অতো জনপ্রিয় লেখক কিনা শেষপর্যন্ত এমন বদ্ধ পাগল হয়ে গেলেন ? কিন্তু কথা বলে মনেই হলনা লোকটার উপর খুনের চার্জেস আছে ! তবে আর যাই হোক এই ইন্টারভিউটা কাল ভালো টি.আর.পি আনবে । গল্পটা বেশ ইন্টারেস্টিং । নাম্বার থার্টিন ! তেরো নম্বর....তেরো নম্বর খুন !’ 

মনে মনে এসব ভাবতে ভাবতেই ড্রাইভ করছিল প্রশান্ত । হঠাৎ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গাড়িটা দাঁড়িয়ে যেতে ওর চমক ভাঙে ।

‘আবে ইয়ার....গাড়িটার আবার কী হল ?’

মুখ দিয়ে অস্ফুট একটা স্বগতক্তি বেড়িয়ে আসে ওর । আর ঠিক তখনই গাড়ির হলদে হেড লাইটের আলোয় রাস্তার ঠিক মাঝবরাবর দাঁড়িয়ে থাকা ছায়ামূর্তিটাকে চোখে পড়ে ওর । দীর্ঘ বলিষ্ঠ শরীর । মুখের প্রায় অর্ধেকটা জুড়ে আড়াল করে আছে অন্ধকার । থুতনির নীচে ছোট্ট কাটা দাগ । ঠোঁটের কোণে লেগে আছে একটা মিহি হাসি । সে হাসছে....প্রশান্তর দিকে তাকিয়েই হাসছে সে !’