অধ্যায় ১ : আহ্বান
কলকাতার বর্ষা মানেই এক অদ্ভুত গন্ধ—ভেজা মাটি, পুরনো বাড়ির স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল, রাস্তার ধারের চায়ের দোকান থেকে ভেসে আসা আদা-চায়ের ধোঁয়া, আর শত বছরের ইতিহাস জমে থাকা শহরের বুক থেকে উঠে আসা এক অচেনা স্মৃতি।
সেই সন্ধ্যাতেও ঠিক তেমনই বৃষ্টি পড়ছিল।
কলেজ স্ট্রিটের আকাশটা যেন সারা দিনের জমে থাকা মেঘের ভার আর ধরে রাখতে পারছিল না। ট্রামের লাইন বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, ফুটপাতের গর্তে জমে থাকা জলেতে নীয়ন আলো কাঁপছে। পুরনো বইয়ের দোকানগুলোর মাথায় ঝোলানো টিনের চালের ওপর বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ যেন একঘেয়ে অথচ অস্বস্তিকর সুর তুলেছিল।
ঈশান মুখার্জী ছাতাটা কাঁধে হেলিয়ে হাঁটছিল। বয়স মাত্র বত্রিশ। পাতলা গড়ন, চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, কাঁধে পুরনো ক্যানভাস ব্যাগ। বাইরে থেকে দেখলে তাকে স্রেফ কলেজের অধ্যাপক বলে ভুল হতে পারে। কিন্তু যারা তাকে চিনত, তারা জানত—ঈশান শুধু ইতিহাস পড়ে না, পড়ায় না... ইতিহাসের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হিসেবে গত ছয় বছর ধরে, মানে কলকাতায় করোনা জাকিয়ে বসার আগে থেকেই সে মধ্যযুগীয় ভারতীয় দুর্গ, রাজপুত যুদ্ধনীতি আর লোককথা নিয়ে কাজ করছে। তার ঘরে আধুনিক আসবাবের চেয়ে বেশি ছিল মানচিত্র, পাণ্ডুলিপি আর ভাঙা মূর্তির প্রতিরূপ।
বন্ধুরা মজা করে বলত—
“তুই মানুষ না, তুই টাইম মেশিন।”
ঈশান হেসে উড়িয়ে দিত।
কিন্তু আজকের দিনটা অন্যরকম ছিল।
সকালে থেকেই তার মধ্যে অদ্ভুত এক অস্থিরতা কাজ করছিল। কেন, সে নিজেও জানত না। এমনকি দুপুরে ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিতে বসে কাজ করার সময়ও মন বসছিল না। যেন কেউ তাকে কোথাও ডাকছে...
একটা অচেনা, নিঃশব্দ ডাক।
সন্ধে নামার আগেই সে বেরিয়ে পড়েছিল কলেজ স্ট্রিটে।
কলেজ স্ট্রিটের ভিড় তখন ধীরে ধীরে কমছে। দোকানিরা প্লাস্টিক চাপাচ্ছে বইয়ের ওপর, ছাত্ররা শেষ মুহূর্তে নোটস কিনছে, রাস্তার ধারে চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছে। দোকানিরা জানে গত বর্ষায় প্রচুর বই জলে ভেসে গেছে , নষ্ট হয়েছে অনেক ইতিহাসের সাক্ষী, তাই এবার বাঁচাতেই হবে তাদের স্বপ্নের মূলধনকে, এটা বইপাড়ার ছোট ছোট দোকানিদের এক প্রাকৃতিক লড়াই ।
ঈশান হঠাৎ থেমে গেল।
পুঁটিরামের দোকানের ঢোকার সরু গলির মুখে। মানে ওই সূর্য সেন স্ট্রিটের মুখটাতে তার হঠাৎ চোখে পড়লো ... এক অদৃশ্য হাতছানি
গলিটা সে আগে বহুবার দেখেছে। অথচ আজ ...।
বড়ো বেশি অন্ধকার, বড়ো বেশি স্যাঁতসেঁতে।
দু’পাশে বন্ধ কাঠের দরজা।
শেষ মাথায় একটা ছোট্ট হলুদ আলো জ্বলছে।
কেন যেন সে গলির ভেতর ঢুকে পড়ল।
পা ফেলার সঙ্গে সঙ্গে জল ছপছপ করে উঠছিল। কোথাও কেউ নেই। শুধু মাথার ওপর পুরনো বাড়ির বারান্দা থেকে জল পড়ছে।
টুপ…
টুপ…
টুপ…
হঠাৎ—
“কিছু খুঁজছেন?”
গলা শুনে ঈশান চমকে উঠল।
ডানদিকে একটা অন্ধকার দোকানের ভেতর থেকে এক বৃদ্ধ তাকিয়ে আছে।
দোকান? না, বরং বইয়ে ভর্তি একটা গুহা।
বয়স আশির কাছাকাছি। শুকনো মুখ। সাদা দাড়ি। চোখ দুটো অস্বাভাবিক উজ্জ্বল।
ঈশান একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল—
“না... মানে... এমনি...”
বৃদ্ধ হেসে বলল—
“যারা এমনি আসে... তারা সাধারণত এমনি ফিরে যায় না।”
ঈশানের বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে উঠল।
সে দোকানের ভেতরে ঢুকল।
ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত গন্ধ।
পুরনো কাগজ।
চামড়া।
ধূপ।
আর যেন কোথাও খুব পুরনো কাঠ পুড়ে যাওয়ার গন্ধ।
দেয়ালজুড়ে বই। মেঝেতে বই। কাঠের তাক ভেঙে পড়ার জোগাড়।
ঘরের এক কোণে রাখা পিতলের বাতিটা কাঁপতে কাঁপতে জ্বলছে।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বলল—
“রাজপুত ইতিহাস নিয়ে কাজ করেন... তাই না?”
ঈশান থমকে গেল।
“আপনি... জানলেন কী করে?”
বৃদ্ধ উত্তর দিল না।
শুধু তাকের ওপর হাত বুলিয়ে একটা মোটা চামড়ার ডায়েরি নামাল।
ডায়েরিটা টেবিলের ওপর রাখতেই ধুলো উড়ে গেলো।
ঈশান ডায়েরিটার দিকে তাকিয়ে রইল।
গাঢ় বাদামি চামড়া।
কোণাগুলো ক্ষয়ে গেছে।
মাঝখানে অদ্ভুত একটা প্রতীক খোদাই করা।
একটা চোখ।
আর সেই চোখের ভেতরে...
একটা ছোট নীল পাথর।
ঈশানের গলা শুকিয়ে গেল।
“এটা কী?”
বৃদ্ধ ধীরে বলল—
“এটা আপনাকে খুঁজছিল।”
“মানে?”
“খুলে দেখুন।”
ঈশান হাত বাড়াল।
চামড়াটা ঠান্ডা।
অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
যেন বরফ।
সে প্রথম পাতা খুলল।
আর সঙ্গে সঙ্গে বাতিটা দপ করে নিভে গেল।
ঘর অন্ধকার।
বাইরে বজ্রপাত।
এক মুহূর্তের সাদা আলোয় বৃদ্ধের মুখ দেখা গেল।
তিনি হাসছেন।
কিন্তু চোখে কোনো হাসি নেই।
পাতার ওপরে মাত্র এক লাইন লেখা—
“যে মূর্তির চোখ জেগে ওঠে, সে-ই পথ দেখায়।”
নিচে—
১৮৯৭, চিত্তোরগড়।
ঈশানের হাত কাঁপছিল।
সে দ্রুত পরের পাতা খুলল।
সেখানে আঁকা—
একটা বিশাল স্তম্ভ।
সরু সিঁড়ি।
পাথরের মুখ।
আর একটা নারীমূর্তি।
তার ডান চোখে বসানো—
নীল পাথর।
ঈশানের বুকের ভেতর যেন কেউ বরফ ঢেলে দিল।
ঠিক একই প্রতীক...
ঠিক একই নীল পাথর...
যেটা ডায়েরির মলাটে আছে।
হঠাৎ—
পাতার কোণ থেকে একটা কাগজ মাটিতে পড়ল।
ঈশান সেটা তুলে নিল।
তাতে ইংরেজিতে লেখা—
DON'T LET HER SEE YOU FIRST.
“ও যেন তোমাকে আগে না দেখে।”
ঈশান ফিসফিস করে পড়ল।
তারপর মাথা তুলল।
বৃদ্ধকে কিছু জিজ্ঞেস করবে—
কিন্তু...
দোকানে কেউ নেই।
কেউ না।
ঘর ফাঁকা।
দরজা আধখোলা।
বাইরে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
ঈশানের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“হ্যালো?...”
কোনো উত্তর নেই।
সে দ্রুত দোকান থেকে বেরিয়ে এল।
পেছনে তাকাল।
গলির শেষে যেখানে দোকানটা ছিল...
সেখানে এখন শুধু বন্ধ ইটের দেওয়াল।
কোনো দরজা নেই।
কোনো আলো নেই।
কোনো দোকান নেই।
ঈশান স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
বৃষ্টি তার চশমা ভিজিয়ে দিচ্ছে।
তার হাতের ডায়েরি ভারী হয়ে উঠছে।
যেন ভেতরে শুধু কাগজ নয়...
আরও কিছু আছে।
জীবন্ত কিছু।
ঠিক তখনই—
তার মোবাইল বেজে উঠল।
স্ক্রিনে লেখা—
UNKNOWN NUMBER
ঈশান রিসিভ করল।
ওপাশে প্রথমে নিঃশ্বাসের শব্দ।
তারপর—
একটা নারীকণ্ঠ।
ফিসফিস করে।
খুব ধীরে।
“ঈশান...
তুমি দেরি করে ফেলেছ...”
কল কেটে গেল।
ঈশানের হাত থেকে মোবাইল প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
সে স্ক্রিনের দিকে তাকাল।
Call Duration:
00:00
কোনো কলই আসেনি।
তবু...
সে শুনেছে।
স্পষ্ট শুনেছে।
আর ঠিক তখনই—
ডায়েরির ভেতর থেকে নীল আলো বেরোতে শুরু করল।
বৃষ্টিভেজা কলেজ স্ট্রিটের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঈশান বুঝল—
সে আর কোনো বই কেনেনি।
সে খুলে ফেলেছে...
একটা দরজা।
যেটা একশো উনত্রিশ বছর ধরে বন্ধ ছিল।
আর সেই দরজার ওপারে...
কেউ অপেক্ষা করছে।
চলবে…

মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।