ই গোল্ডেন বারেই ওর সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল আমার। সেদিনও বিকেল থেকেই মেঘ করেছিল আকাশে। ঘড়ির কাঁটা চারটের ঘর ছুঁতে না ছুঁতেই ঈশান কোণে একটু একটু করে জমতে শুরু করেছিল সরীসৃপের চোখের মত শীতল ঘন অন্ধকার। দু-এক পশলা করে বৃষ্টিও পড়ছিল । বারের ভেতর গিটারের মৃদু ঝিমধরা টুংটাং শব্দ বেজে চলেছিল ক্রমাগত। গুঁড়ো গুঁড়ো জলের ফোঁটাগুলো আনমনে এসে মিশছিল বারের ঘষা নীল কাঁচের জানালাটার গায়ে। সেদিকে তাকিয়েই অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল লোকটা । ওর সামনের টেবিলের উপর রাখা গ্লাসের সোনালী তরলটা তলানীতে এসে ঠেকেছিল প্রায় । একনিঃশ্বাসে অবশিষ্ট পানীয়টুকু গলায় ঢেলে দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে পড়েছিল ও । তারপর টলমল পায়ে হাঁটতে হাঁটতে সোজা এসে বসেছিল আমার টেবিলের উল্টোদিকে রাখা চেয়ারটায় । ওর ঠোঁটের কোণে একটা হাল্কা মোলায়েম হাসি লেগেছিল । আমার দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে জড়ানো গলায় ও বলেছিল,‘হাই....!’

দূরে বসে থাকায় বারের ভেতরের মৃদু আলোছায়ার খেলায় এতক্ষণ ওর মুখটা ঠিক স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছিল না । এবারে মাথার উপর জ্বলতে থাকা লালচে রোলিং আলোটা ওর মুখের উপর তেরছাভাবে এসে পড়ায় প্রথমবারের জন্য ওকে ঠিকভাবে দেখেছিলাম আমি । আপাতবৈশিষ্ট্যবিহীন নিতান্ত সাধারণ চেহারা । শক্ত দৃঢ় চোয়াল,থেবড়ানো নাক,পাতলা ঠোঁট,গায়ের রঙ তামাটে । চোখের চাহনি তীক্ষ্ণতা মেশানো....স্থির শীতল । থুতনির কাছটায় একটা ছোট কাটা দাগ । একমাথা উষ্কখুষ্ক কোঁচকানো চুলগুলোর কয়েকটা কপালের উপর এসে পড়েছে । সেগুলো হাত দিয়ে সরাতে সরাতে একদৃষ্টে আমার দিকেই তাকিয়েছিল ও । আমি কী বলবো বুঝতে না পেরে অল্প হেসে মাথা নেড়েছিলাম । তা দেখে ওর ঠোঁটজোড়া আরও কিছুটা প্রশস্ত হয়েছিল । পকেট থেকে একটা সিগারেট বের করে সেটা ধরাতে ধরাতে ও জিজ্ঞেস করেছিল,‘আপনিই মিস্টার বেদ চতুর্বেদী তো ?’

আমি সত্যি বলতে একটু অবাক না হয়ে পারিনি । লোকটা আমার নাম জানল কী করে ? ও সম্ভবত আমার মনের ভাব বুঝতে পেরেছিল । শরীরটা একটু পেছন দিকে ঝুঁকিয়ে একটা ধোঁয়ার রিং ছেড়ে ও বলেছিল,

‘আরে,আপনি এই মুহূর্তের সবচেয়ে বেস্টসেলার রাইটার মিস্টার বেদ চতুর্বেদী....আপনাকে চিনবে না এমন বুরবক কজন আছে বলতে পারেন ?’

‘কিন্তু....আপনাকে তো ঠিক....?’

একটু ইতস্তত করে খানিক বোকা বোকা মার্কা হাসি নিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম আমি । লোকটা তাতে ওর খয়েরী ছোপ ধরা দাঁতগুলো বের করে একগাল হেসে বলেছিল,

‘আজ্ঞে আমাকে আপনার ফ্যান হিসেবেই ভাবতে পারেন । টপ মোস্ট ফ্যান ।’

ভ্রুগুলো উপরে তুলে বিচিত্র একটা মুখভঙ্গি করে শেষের কথাগুলো উচ্চারণ করেছিল ও । তারপরে আর বিন্দুমাত্র সময় নষ্ট না করে আসল প্রসঙ্গে চলে এসছিল । লোকটা ওর কাঁধে ঝোলানো ময়লা ব্যাগটা থেকে মাঝারি সাইজের একটা কালো রঙের ডায়েরী বের করে সামনের টেবিলটার উপর রেখে ভারী অদ্ভুত একটা প্রস্তাব দিয়েছিল আমায় ।

‘আপনি তো অনেক গল্প লেখেন । আমার জন্য একটা....একটা গল্প লিখবেন ? সত্যিকারের গল্প ?’

তারপর আমার দিকে তাকিয়ে আগেরমতই হাসিমুখে বলেছিল,

‘আমি জানি সামনের শারদীয়া সংখ্যায় লেখার জন্য আপনার প্লটের প্রয়োজন । অথচ আপনার মাথায় কিচ্ছু আসছে না । অ্যাম আই রাইট অর অ্যাম আই রাইট মিস্টার চতুর্বেদী ?’

বিস্ময়ে প্রায় হতবাক হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়েছিলাম আমি । লোকটা তখনও নিজের মনেই বলে চলেছিল ।

‘আপনি চাইলে এটা পড়ে দেখতে পারেন । তবে এখানে কোনো গল্প নেই । আছে শুধু কিছু সত্যিঘটনা । আপনি চাইলে এখান থেকে একটা সুন্দর নন-ফিকশন লিখতেই পারেন । কিন্তু ফিকশন লেখার কথা ভুলেও চিন্তা করবেন না । কজ উই নেভার নো হোয়েন আওয়ার ফ্যান্টাসিস বিকমস দ্য ডারকেস্ট ট্রুথ অফ আওয়ার লাইফ । তাহলে চলি মিস্টার চতুর্বেদী ? গুড বাই ! হোপফুলি উই মীট নেভার এগেইন ।’

কথাটা বলেই আর অপেক্ষা করেনি লোকটা । ঠিক যেভাবে এসেছিল সেভাবেই নিঃশব্দে চলে গিয়েছিল আবার । আমি হয়ত পুরো ব্যাপারটাকেই আমার নেশার ঘোরে দেখা কোনো অদ্ভুত হ্যালুসিনেশন ভেবে নিতাম । যদিনা লোকটার ফেলে যাওয়া সেই কালো রঙের ডায়েরীটা টেবিলের উপর অধীর আগ্রহে আমার জন্য অপেক্ষা করত । বিস্ময়ের ঘোরটা তখনও কাটেনি । তবুও কী মনে করে হাত বাড়িয়ে ডায়েরীটা তুলে নিয়েছিলাম আমি । চামড়ার কভার উল্টে পড়তে শুরু করেছিলাম রক্ত দিয়ে লেখা তার প্রতিটা অভিশপ্ত অক্ষর !

কিন্তু লোকটার সাবধান বাণী শোনার মত নির্বোধ আমি ছিলাম না । কেনই বা শুনতাম ? আমি বেদ চতুর্বেদী । এসবই আমার মস্তিষ্কপ্রসূত । হ্যাঁ আমার....আমার মস্তিষ্ক প্রসূত ! সেখানে অন্যকাউকে সূত্রধার করে নন-ফিকশন কেনই বা লিখতাম আমি ? লোকটার কথা মাথা থেকে মুছে গেল আমার । ডায়েরীটাকে পাথেয় করেই আমি লিখতে শুরু করলাম....গল্প । হ্যাঁ গল্প....রক্তের গল্প ! এমন গল্প যা এর আগে কেউ কখনও লেখেনি ! আর তারপরেই ঘটল সেই ঘটনাটা । তারিখটা এখনও স্পষ্ট মনে আছে আমার । তেরোই অগাস্ট । রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে রোজকার মতই বারান্দায় পায়চারি করছিলাম । উল্টোদিকের বাড়িটা মিসেস বাজাজদের । ভদ্রমহিলা উইডোড । ছেলেমেয়ে যে যার মত ওয়েলসেটেলড । অতবড় বাড়িটায় আপাতত একাই থাকেন মহিলা । আমার সাথে আলাপ আছে অল্পবিস্তর । সেইরাতে বেলকনিতে একটা ডেকচেয়ার নিয়ে বসে ছিলেন মহিলা । আমাকে দেখে মৃদু হাসলেন । আমিও মাথা নেড়ে প্রত্তুত্যর জানালাম । আর তখনই হঠাৎ চোখে পড়ল ওকে ! রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের টিমটিমে সাদা আলোটা ওর মুখের উপর এসে পড়েছিল । সেই ম্লান আলোতেই ওকে স্পষ্ট দেখেছিলাম আমি । না....না....কোনো....কোনো ভুল হয়নি আমার ! আলোআঁধারিতে মুখের প্রায় অর্ধেকটা ঢেকে আছে....থুতনির নীচে একটা কাটা দাগ....ঠোঁটের কোণে সেই এক মিহি হাসি । স্থির দৃষ্টিতে অপলকে তাকিয়েছিল ও । নিঃশব্দ শ্বাপদের মত মিসেস বাজাজের ঠিক পেছনে ওকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছিলাম । যেভাবে মৃত্যু এসে শিয়রে দাঁড়ায় ! ঠিক....ঠিক সেভাবেই....যেভাবে ওই ডায়েরীটায় লেখাছিল । যেভাবে.....যেভাবে আমি লিখেছিলাম....আমার গল্পে.... অবিকল....অবিকল সেইরকম ! আমি....আমি চিৎকার করে মিসেস বাজাজকে ডাকতে চেয়েছিলাম কিন্তু....কিন্তু পারিনি ! তার আগেই ওর চোখদুটোতে মুহূর্তের জন্য হঠাৎ বিদ্যুৎরেখা খেলে গেল যেন । তারপর আমার কিছু বুঝে ওঠার আগেই ওর হাতে ধরা ধারালো ছুরির ফলাটা নেমে এল মিসেস বাজাজের গলা লক্ষ্য করে । একবার....দুবার....তিনবার....কসাইয়ের দোকানের কাটা মোরগের মত ছটফট করছিল মিসেস বাজাজের দেহটা ! ওর দুহাতে তখন লালচে উষ্ণ চটচটে একটা ঘন তরলের প্রলেপ লেগেছিল । ও....ও হাসছিল....হাসছিল ও !

তারপর যে ঠিক কী হয়েছিল তা এখন আর ভালো করে মনে পড়েনা । পাগলের মত চিৎকার করছিলাম আমি ।

‘খুন....খুন....খুন !’

আমার চেঁচামেচি শুনেই আশেপাশের ফ্ল্যাটের কয়েকজন ছুটে এসেছিল । কিন্তু....সবটা শুনে তারা যেটা বলেছিল সেটা একফোঁটাও বিশ্বাস হয়নি আমার । ওরা বলেছিল বিগত একসপ্তাহ ধরে মিসেস বাজাজ নাকি বাড়িতেই নেই....দেরাদুন গিয়েছেন মেয়ের কাছে ! তবুও আমার কথায় মিসেস বাজাজের ফ্ল্যাটে গিয়ে তন্নতন্ন করে সবটা খুঁজেছিল ওরা....কিন্তু কোথাও কিচ্ছু ছিল না ! দেয়ার ওয়াজ অ্যাবসুলিউটলী নাথিং ইন দ্য হাউজ ! কেউ....কেউ ছিলনা সেখানে !

সেই শুরু । তারপর থেকেই আমার জীবনে নেমে এল অনন্ত বিভীষিকার রাত । ও একটাও মিথ্যে কথা বলেনি । ডায়েরীটাতে কোনো গল্প ছিলনা ! যা ছিল সব....সব সত্যি ! ওই অভিশপ্ত ডায়েরী নিয়ে লেখা আমার গল্পের পাতা থেকেই যেন একের পর এক রক্তাক্ত মৃত্যুর উপন্যাস উঠে আসছিল ক্রমাগত । জীবনটা ক্রমশই আমার কাছে অন্ধকার এক নরকে পরিণত হচ্ছিল । খুনের ধরণ,সময়, ভিক্টিমদের বয়স....প্রভৃতি ক্ষেত্রে পার্থক্য থাকলেও প্রতিটা খুনের মধ্যে একটা সাদৃশ্য ছিল অত্যন্ত সাধারণ । প্রতিটাক্ষেত্রেই ভিক্টিমদের খুনের কোনো ট্রেস পাওয়া যায়নি । আর প্রতিবারই সাক্ষী হিসেবে উপস্থিত ছিলাম এক এবং একমাত্র আমি ! লোকে আমাকে পাগল ভাবতে শুরু করেছিল । আড়ালে আমাকে নিয়ে ঠাট্টা-তামাশাও করত ওরা । আমি....আমি কিচ্ছু বলতে পারতাম না । আমার মাথার ভেতর শুধু ভেসে উঠত একটা মুখ । থুতনির নীচে একটা ছোট্ট কাটা দাগ....স্থির শীতল দুটো চোখ....ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা সেই মিহি হাসির রেশ । ও হাসত....আমার দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে হাসত ও । আমার মনে হত আমার মাথার ভেতর যেন ঝমঝম শব্দ করে একটা ট্রেন ছুটে চলেছে । ট্রেনের সেই তীক্ষ্ণ হুইসেলের সাথে তালে তাল মিলিয়ে কেউ যেন চিৎকার করে বলছে,

‘গুড বাই ! হোপফুলি উই মীট নেভার এগেইন ।’

ডায়েরীটাতে মোট তেরোটা খুনের বিবরণ লেখাছিল । গল্পেও ঠিক তাই লিখেছিলাম আমি । গত কয়েকমাসে বারোটা খুন ও সম্পূর্ণ করে ফেলেছে । এখন বাকি আর একটা মাত্র খুন । তেরো নম্বর খুন । গল্পে তেরো নম্বর খুনটা কার হবে সেটা নির্দিষ্ট করে বলা ছিল না । ওটুকু পাঠকের জন্যই উহ্য রাখা হয়েছে । কিন্তু আমি জানি তেরো নম্বর খুনটা ঠিক কার হতে চলেছে । আজ তেরোই ডিসেম্বর,নাইনটিন নাইনটি সেভেন । আজই শেষ খুনটা হওয়ার কথা আছে । শিকারের সন্ধানে এতক্ষণে নিশ্চয়ই বেরিয়ে পড়েছে সে । আমি জানি আজও ঠিক তাইই হতে চলেছে যেমনটা....যেমনটা গল্পে লেখা আছে । কিন্তু এতসহজে নিয়তিকে মেনে নেওয়ার মত মানুষ আমি নই । এ গল্পের লেখক আমি । আমার লেখা গল্পে আমার সৃষ্ট চরিত্রদের মৃত্যু হতে পারে কিন্তু লেখকের মৃত্যু কিছুতেই হবেনা....কিছুতেই না । তাই আজ আবার এই গোল্ডেন বারেই ফিরে এসেছি আমি । আমার সামনে এইমুহূর্তে বসে আছে শহরের নাম করা সুপারি কিলার যাদব । লোকটার গা থেকে দেশী মদের উগ্র গন্ধ ভেসে আসছে । মুখে রুমাল চাপা দিয়ে কোনোমতে নোটের তারাটা লোকটার দিকে এগিয়ে দিলাম আমি । ধূর্ত শিয়ালের মত ওর লোভী চোখদুটো চকচক করে উঠল একবার । জিভের থুথু দিয়ে নোটগুলো গোনা শেষ করে আমার দিকে তাকাল ও । তারপর সেগুলো পকেটে ভরতে ভরতে মাথাটা একদিকে কাত করে বলল,

‘কোনো চিন্তা করবেন না স্যার । যে শালাই আজ আপনার পেছনে লাগবে তাকেই একদম খাল্লাস করে দেবো । আপনি নিশ্চিন্তে বাড়ি যান স্যার । আমি আপনার পেছনেই আছি । আড়াল থেকে সব নজর রাখছি ।’

কথাগুলো বলে আরও একবার আমাকে সেলাম জানিয়ে উঠে পড়ল যাদব । বারের কাচের দরজা খুলে আমিও বেরিয়ে এলাম এবার । বৃষ্টির বেগ একটু একটু করে বাড়তে শুরু করেছে । মাঝে মাঝে মেঘের গুরুগুরু গর্জন শোনা যাচ্ছে । হাতঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালে সন্ধ্যে সাড়ে ছটা বাজছে প্রায় । একে ডিসেম্বর মাস । তারউপর এই অসময়ের বৃষ্টি । রাস্তায় লোকজন তেমন একটা নেই । দেখলাম উল্টোদিকের ফুটপাথের উপর একটা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে যাদব । গায়ে এখন একটা সস্তার বর্ষাতি চাপিয়েছে লোকটা । আমাকে গাড়িতে উঠতে দেখে দূর থেকে একবার হাত নাড়ল সে । আমি কোনো প্রত্তুত্যর না দিয়ে গাড়ির দরজা খুলে উঠে বসলাম । আমি চাই আজ সে আসুক । তার জন্যই অপেক্ষা করছি আমি । কথাটা ভাবতেই আমার ঠোঁটের কোণে অজান্তেই একটা মৃদু হাসির রেশ ফুটে উঠল । শিস দিতে দিতে গাড়ির ইঞ্জিনে স্টার্ট দিলাম আমি।


ক্রমশঃ পরবর্তী অংশ পরের সংখ্যায় দেখুন।