ড়ঘড়ানি শব্দ তুলে পুরোনো রেডিওটা দিয়ে আজও বেরিয়ে আসছে সেই হারানো দিনের সুর। চওড়া টেপ রেকর্ডারের দু-পাশে দুটো কালো স্পিকার, আর মাঝে ক্যাসেট ঢোকানোর পাল্লাটা কালের ঘায়ে কিছুটা ঝুলে পড়েছে। কিন্তু রেডিওটা আজও বেশ ভালো আছে। নবটা ঘুরিয়ে শীর্ষেন্দুবাবু রোজই একবার তৃপ্তির সাথে বলেন, "এই তো, দিব্যি শোনা যাচ্ছে!"

পল্টু চা দিতে এসে রোজই মুখ বাঁকায়, "কী যে এই পুরোনো ঘ্যাড়ঘ্যারানি শোনেন দাদু, মাথা-মুণ্ডু কিচ্ছু বুঝি না! বদ্দাকে একবার ঝেড়ে কাশলেই তো পারেন, একটা লতুন সেট আনিয়ে দেবে।"

দাঁতহীন মুখে ম্লান হাসি ফুটিয়ে শীর্ষেন্দুবাবু বলেন, "কেন রে, কী সুন্দর কিশোর-মান্নার গান বাজছে দেখ। কাহারবা নয় দাদরা বাজাও..." গুনগুন করে গেয়েও ওঠেন তিনি।

পল্টু মনে মনে ভাবে, "দাদুর রঙের তো শেষ নেই!" মুখে শুধু বলে, "হয়েছে হয়েছে, এখন গান থামিয়ে চা-টা মারুন তো দেখি।"

পাশে রাখা শীর্ষেন্দুবাবুর ছড়ি। রোজ সেটা নিয়ে বিকেলের পড়ন্ত রোদে গা ভাসিয়ে একবার হেঁটে আসেন তিনি। বড় ছেলে অভ্র থাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আর মেয়ে সুপমা ব্যাঙ্গালুরুতে। বছরে দুবার তারা আসে বটে, তবে বাবার খোঁজে না—বাড়িটা ক্লাবের হাতে বেদখল হলো কি না তা তদারকি করতে। শীর্ষেন্দুবাবুর তাতে আক্ষেপ নেই, ক্লাবের ছেলেদের দিয়েই তাঁর বেশ চলে যাচ্ছে। সেই ক্লাবেরই এক সদস্য এই পল্টু।

আজ শীর্ষেন্দুবাবু গানে ডুব দিতে পারছেন না। অস্থির হয়ে বারবার জানলার দিকে তাকাচ্ছেন। আজ কি তবে ডাকবাবু আসবেন না? ঠিক তখনই কানে এল সেই কাঙ্ক্ষিত শব্দ— 'ক্রিং ক্রিং'। সাইকেলের ঘণ্টা! ধড়ফড় করে উঠে বসেন শীর্ষেন্দুবাবু।

"আরে দাঁড়ান দাদু, আমি আনছি," বলেই পল্টুর ঢেঙা শরীরটা বেরিয়ে যায় বাইরে। অধীর আগ্রহে শীর্ষেন্দুবাবু তাকিয়ে থাকেন। সময় যেন থমকে গেছে, এই কয়েকটা সেকেন্ড যেন আর কাটতে চায় না।

কিছুক্ষণের মধ্যেই ফিরে আসে পল্টু। হাতে একটা নীলচে খাম। সেটা হাতে নিতেই শীর্ষেন্দুবাবুর চোখেমুখে এক অদ্ভুত দ্যুতি খেলে গেল। দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিলেন তিনি। অদ্ভুত এক জুঁই ফুলের মন মাতানো সুবাস! মনটা নিমেষেই ফিরে গেল সেই সুদূর অতীতে। নিরুপমা লিখেছিল চিঠিটা। বলেছিল, "আমি যখন থাকব না, তখন খুলে দেখ এই নীল খামে ভরা চিঠি।" তখন থেকেই শীর্ষেন্দুবাবুর স্মৃতি ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। চিকিৎসকরা যাকে বলেন বার্ধক্যজনিত স্মৃতিবিলোপ।

খামটা বুকের কাছে কিছুক্ষণ চেপে ধরে তারপর রেখে দিলেন টেবিলের ওপর। পল্টু কপালে ভাঁজ ফেলে রোজকার মতো বলে, "বলি ও দাদু, চিঠিটা কি কোনোকালে খুলবেন, নাকি এরাম রোজ শুধু শুঁকেই যাবেন?"

শীর্ষেন্দুবাবু উদাস গলায় বললেন, "খুললে তো খেলা শেষ রে পল্টু। ওটা বন্ধ আছে বলেই নিরুপমা আছে। এই চিঠিখানাই রোজ মনে করিয়ে দেয় যে সে ছিল আমার অর্ধাঙ্গিনী। নাহলে তো কাল সকালে আবার সব ভুলে যাবো। স্মৃতিভ্রংশ বুঝলিনা... এই চিঠি রোজ রোজ জানান দিয়ে যায় সে ছিল।"

এরপর ড্রয়ার থেকে একটা নতুন ডাকটিকিট বের করে পুরোনোটার ওপর সেঁটে দিয়ে খামটা পল্টুর হাতে দিলেন তিনি। "যা, এটা বক্সে ফেলে দিয়ে আয়। কাল যেন আবার ঠিক টাইমে আসে, ভুলিস না কিন্তু।"

পল্টু বেরিয়ে গেল। শীর্ষেন্দুবাবু আবার রেডিওর নব ঘোরালেন। হঠাৎ ঘর ভরে গেল চেনা সুরে— "তুমি যে আমার ওগো তুমি যে আমার..."। বৃদ্ধের মুখে একচিলতে মায়াবী হাসি। বাইরে এসে পল্টু খামটা নাকের কাছে ধরল। নাহ, কোনো গন্ধ নেই। শুধু পাশের বাগান থেকে ভেসে আসছে একঝাঁক বেল-জুঁইয়ের সুবাস। পল্টু জানে, খামের ভিতরের কাগজ কোনোদিনও পড়া হবে না। কিন্তু ওই চিঠিভরা খামটাই এক স্মৃতিহীন মানুষের বেঁচে থাকার শেষ অক্সিজেন।

পল্টু বিরক্তি মাখা মুখে বিড়বিড় করে ওঠে, "আমার হয়েছে যত জ্বালা। আবার সেই এক কেস!" কিন্তু তার নিজের চোখের কোণটাও কেন জানি একটু চিকচিক করে ওঠে। প্রসন্ন মনে সে ডাকদাদার দিকে এগিয়ে যায়। কাল ঠিক টাইমে চিঠিটা আবার ডেলিভারি দিতে হবে তো!