সময়টা যে ভীষণ রকমের প্রেক্ষাপটময় তা বলব না। তবে কলকাতার একেবারে কেন্দ্র। জ্ঞান যেখানে দোকানে দোকানে বিক্রি হয়। ফুটপাত দিয়ে হাঁটার উপায় নেই; "দিদি কি বই?" "দাদা কি বই বলুন না" মার্কা সবিনয় সুরে মুখর হয়ে দু চারটে বই এর পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে কখন বিল মিটিয়ে ফেলবেন তা আপনি নিজেও ধরতে পারবেন না। তা যা হোক, নামটা কলেজস্ট্রিট বলেই বোধয় স্ফুলিঙ্গটা এত বেশি। যেন সব সময় একটা STAY YOUNG - এর আগুন জলছে। কলকাতা এমনিতেই ঐতিয্যে মোড়া, তবে কেন্দ্রে বা উত্তরে গেলে নাড়ীটা দেখতে পাওয়া যায়। সে যাই হোক, যেটার জন্য এত কিছু বলা সেটা হল একটা ছোট্ট ঘটনা। অতি সাধারন একটা গল্পও বলা যায়। ইউনিভার্সিটির ক্লাস শেষ। টানা চার ঘণ্টা ক্লাস করে চোখে ধুতরা ফুল দেখার অবস্থা একেবারে। কিছু একটা না খেলেই নয়। 'কিছু' মানে মন ভর্তি করার মতো কিছু একটা খেলেই হল, পেটে তখনও খিদের আগুনটা সেভাবে লাগেনি। স্বভাবতই বিখ্যাত কলেজ স্কোয়ারের প্রখ্যাত ফুচকার আলু - টকজলে খানিকক্ষণের জন্য ডুব দিলাম। মনের অন্তঃস্থল থেকে জীভ যেন বলে উঠলো আহা পারফেক্ট! ফুচকা খাওয়ার পর টাকা মিটিয়ে মনে মনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে আক্ষেপ না করলে খাওয়াটা অসম্পূর্ণ থেকে যায়, এই আক্ষেপে অভিযোগের সাথে একটা স্বাদ মিশে থাকে। "ওরে এত আক্ষেপ করিসনা আমিতো আছি বাকি টুকুর জন্য" টের পেলাম ব্যাগের ভেতর থেকে কথাটা ভেসে এলো। বাইরে তখন রাস্তা অর্ধেক বন্ধ করে তুমুল আন্দোলন। তুমুল প্রতিবাদ। ট্রাম আর বাস একেবারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে আছে সেই তুমুল হই হট্টগোলের জ্যামে। টুক করে ব্যাগ থেকে বের করে আনলাম চারমিনারের প্যাকেটটা। ক্লাসিক ভাব করে যতই চারমিনার নিয়ে ঘুরি, আগুন না থাকলে সবটাই ফক্কার খাতায়। খানিকটা হতাশ হয়েই সিগারেট হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। প্রতিবাদের আগুনে কে কবেই বা সিগারেট জ্বালাতে পেরেছে?
যাইহোক, গোলযোগের পরিধি আরও কিছুটা বাড়ল ততক্ষণ। আরো খানিকক্ষন দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখলাম একজন মাঝ বয়সী কাকু গোছের লোক সবেমাত্র তার সোয়েটারের তলা থেকে হাত বের করল। বলাই বাহুল্য ঠোঁটে সদ্য জ্বলা বিড়ি দেখে বুঝলাম হয় দেশলাই নয় লাইটার এক্ষুনি সোয়েটার উঁচিয়ে বুক পকেটে রাখলো। তক্ষুনি গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম "কাকু আগুন হবে?" নির্বিকার কাকু ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে যথারীতি সোয়েটার উঁচু করে বের করে দিলেন লাইটার। মালিকের কাছে তার জিনিস বড়ই আদুরে অন্য আঙুলের খোঁচায় সহজে জ্বলবে কেন? দু' চারবার বিফল চেষ্টায় বললাম, "কিগো এ তো জ্বলেই না" বলে শেষ বারের মত চেষ্টা করে প্রায় ফেরত দিতে যাবো এমন সময় দপ করে জ্বলে উঠলেন বাবু। তারপর, দুই তিন দলা দলা ধোঁয়া...
ততক্ষণে পুলিশে মানুষে একেবারে একাকার চারিদিক। ইউনিভার্সিটির একেবারে উল্টো দিকের ফুটে একদল ছেলেমেয়ে, চোখেমুখে প্রতিবাদের দীপ্তি। নতুনকে গড়ে তোলার অদম্য ফুল্কি ঝরে পড়ছে। পথ চলতি মানুষের দৃষ্টি অস্বাভাবিক -কৌতূহলী, বিরক্তি মেশানো আবার কেউ কেউ কেমন একটা বাঁকা হাসি দিয়ে অদ্ভুত একটা চোখ ওল্টানোর ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে। আমার হাতের আধপোড়া সিগারেট প্রায় ফিল্টার ছুঁই ছুঁই। হাত ঘরিতেও প্রায় চারটে ছুঁই ছুঁই। যানজট ছেড়েছে তখন অনেকটাই।
আন্দোলন, মিছিল, বইয়ের দোকান, একদল নব উচ্ছাস, ফুটন্ত চায়ের ডেচকি সব ফেলে রেখে এগোলাম বাস ধরবো বলে। ফাঁকা বাস, সিট পেয়েও গেলাম একটা জানলার ধারে। শীতের বিকেল; তাড়াতাড়ি ঠান্ডা নেমে আসে।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।