শ্রাবণের রাতে বৃষ্টি শুরু হলে মিঠুর ঘুম ভাঙে। তার বয়স সাত, থাকে পোড়ো বাড়ির তৃতীয় তলায়। মা বাবা কাজে যায়,, সে একা থাকে দাদুর সঙ্গে। দাদু অন্ধ, বয়স সত্তর। মিঠুর কাঁধে তাঁর দায়িত্ব। বৃষ্টির ফোঁটা এসে জানালার কাঁচে আঘাত করে। মিঠু শোনে কে যেন কাঁদছে। দাদু বলে, "এসব শুধু বর্ষার ডাক। কেউ নয়।" কিন্তু মিঠু বিশ্বাস করে না।
দ্বিতীয় রাতে সে দেখে, বৃষ্টি থেমে গেলেও এক ঝলক নীল আলো ঘুরছে তার ঘরের চারপাশে। আলো এসে থামে ছাদে। মিঠু ধীরে ওঠে, ছাদে যায়। দেখে একটি ছোট্ট মেয়ে বসে আছে, পরনে ভেজা সবুজ শাড়ি, মাথায় উপর চাঁদ নেই, তবে আলো আছে। তার চোখ বড় বড়, কান্নায় ভেজা। মিঠু জিজ্ঞেস করে, "তোমার নাম কী?" মেয়ে বলে, "পাপেট। আমি বর্ষার ভূত। কেউ আমায় দেখে না, তুমি কেন দেখলে?"
মিঠু ভয় পায় না। বলে, "দাদু বলে, ভয় পাওয়া মানে পরাজয়।" পাপেট তাকে গল্প বলে। সে একসময় ছিল এই বাড়িরই মেয়ে, বৃষ্টিতে খেলতে গিয়ে নর্দমায় পড়ে মারা যায়। তারপর থেকে আত্মা ঘুরে বেড়ায়, বৃষ্টির ফোঁটা তার কান্না। মিঠু বলল, "তুমি বাঁচতে চাও?" পাপেট মাথা নাড়ে।
মিঠু সিদ্ধান্ত নেয়। সে পাপেটের আত্মাকে মুক্তি দেবে। কিন্তু কী করে? দাদু বলে, "প্রতিটি অলৌকিকের পিছনে থাকে জাদু, জাদুর পিছনে থাকে সত্যিকারের ভালোবাসা।" মিঠু পাপেটের হাত ধরে। সে আলোতে পরিণত হয়, কিন্তু মিলিয়ে যায় না। মিঠু জানত না, বর্ষার শেষ রাতে তারা মিলে জ্বালায় প্রদীপ, যে প্রদীপের আলোয় পাপেট বাঁচতে পারে। সেই প্রদীপ জ্বালানোর রীতি মিঠু জানে না।
এমন সময় দাদু উপস্থিত। যদিও তিনি অন্ধ, প্রদীপের গন্ধ পেয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওঠেন। তিনি মন্ত্র পড়েন, "অন্ধকারে যারা হারায়, আলো তাদের ফিরিয়ে আনে।" প্রদীপ জ্বলে ওঠে। পাপেটের শরীর স্বচ্ছ হতে থাকে। শেষবারের মতো মিঠুর দিকে তাকায়, বলে, "তুমি আমার বন্ধু।"
সকালে বৃষ্টি থামে। পাপেট আর নেই। কিন্তু মিঠু দেখে তার বিছানায় একটি শুকনো বেল ফুল পড়ে আছে। সে বেল ফুলটি বুকে রাখে। বর্ষার মৌসুমে যখন বৃষ্টি হয়, মিঠু জানালায় বসে, কেউ যেন কাঁদছে – কিনা? না, বৃষ্টি তখন শুধু বৃষ্টি, হাজার হাজার ফোঁটা, যেখানে হারিয়ে যায় পাপেটের আলো। তবু মিঠু জানে, ঐ আলো তার হৃদয়ে বেঁচে আছে। ক্ষুদ্র প্রাণের এ বড় আশা— মৃত্যু পার হয়ে ফিরে আসা।
দাদু মিঠুর হাত ধরে বলে, "তুই ভূত দেখিসনি, দেখেছিস নিজের সীমাহীন বিশ্বাস। যার ভেতর জাদু আছে, সে অলৌকিককে বাস্তব বানায়।" মিঠু বুঝতে পারে, বর্ষার ভূত আসলে তার কল্পনা নয়, বরং সেই স্পর্শ, যে স্পর্শ তাকে ভালোবাসার অর্থ শিখিয়েছে। চিরকাল সে অপেক্ষা করবে বর্ষার ফেরার, পাপেটের ফেরার নয়, তার নিজের বড় হয়ে ওঠার।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।