জ সারাদিন কামাই না হলেও জহিরের মন খারাপ নেই। মাঝে মধ্যে ওর এমনটা হয়ে থাকে। নো ওয়র্ক, নো আর্নিং! ঐ দিনে সারাদিন কাটায় ও মোবাইল ফোনে গান শোনে এবং ফেসবুক ঘাটাঘাটি করে। কামাই না হওয়ায় ইণ্টারনেট খর্চাটা বাজে খর্চা হিসেবে থাকে। ও সকাল সাড়ে দশটায় এসে কাজে বসে; ডেড়ায় ফিরে যায় সন্ধ্যার পরপরই।

জহির ডুপ্লিকেট চাবি বানায়। কারো চাবি হারিয়ে গেলে তালাও খুলে দেয়-যে কোনো তালা। ও মিরপুর-১ এর মুক্তবাংলা শপিংসেণ্টারের আন্ডারগ্রাউন্ডে বসে। ও একা না, দুই সারিতে ত্রিশ জন; ও যখন প্রথম বসেছিলো, তখন ছিলো দশ জন। এই সংখ্যা আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে; কারণ, দুই দিকে এখনো অনেক জায়গা খালি পড়ে আছে। এটা মূলতঃ বেসমেন্টে পার্কিং। কিন্তু গাড়ি না ঢুকিয়ে বিভিন্ন সেকশনে ভাগ করে অস্থায়ী হকারদের কাছে ভাড়া দেয়া হচ্ছে। দৈনিক ভাড়া তিন শত টাকা; ভাড়া বাকি রাখার কোনো সুযোগ নেই!

জহির হাঁটছে। কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে। আজ কামাই না হওয়ায় ওর মন খারাপ নেই। জহির প্রত্যেকদিন হেঁটেই ছাপড়া থেকে কামে আসে এবং কর্মস্থল থেকে ছাপড়ায় যায়। ওর ছাপড়টা মিরপুর মাজারের দুটো গলির পরে ওয়াশার একটি ময়লা নিষ্কাশন খালে বাঁশের খুঁটির উপরে সারি ধরে অনেক ছাপড়ার একটা।এই ছাপড়ার গুদামে অনেক ঘটনা-দুর্ঘটনা ঘটে থাকে। পুলিশের তাড়া খেয়ে অনেক দাগী আসামী ও বড় মাপের রাজনেতারাও এখানে লুকিয়ে স্বস্তির দম ফেলে। মাদকদ্রব্য কেনা-বেচার আখড়া অনায়াসে বলা যায়, সেবনেরও। কপালে হাসির পাত্র ও লজ্জা পাওয়া নিশ্চিত থাকলে সহবাসের সময় মাচা ভেঙে খালের নোংরা জলে পড়ে নাকানিচুাবানী!

জহির মাজার পেরিয়ে একটা গলিতে ঢুকলো। হালকা-পাতলা হলেও লোকজনের যাতায়াত চলছে। একটা লোক দ্রুত হেঁটে জহিরের পাশাপাশি এলো। জহির আঁড়চোখে লোকটাকে একবার দেখে হাঁটতে থাকলো নিজের মতো।

লোকটা ফিসফিস করে বললো, একটা চাবি বানায়া দিবেন জহির ভাই?

জহির দুই কান থেকে হেডফোন খুলে বললো, আমি চাবি বানাই আপনে জানলেন ক্যামনে? আমার নাম জানলেন ক্যামনে?

লোকটি বললো, আমি মুক্তবাংলা শপিং সেণ্টারের আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়েছিলাম। আমার তালাটা স্পেশাল। সবাই বানাতে পারবো না। সবার কাজ দেখে মনে হইলো আপনি এক্সপার্ট কী মেকার। আপনে অহনই চলেন আমার সাথে। অনেক টাকা দিবো।

কই যাইতে অইবো?

নিকুঞ্জ।

রাইতে আমি এতো দূরে যাইতাম না ভাইসাব।

দুই হাজার টাকা দিমু জহির ভাই।আমার নাম রুবেল।

পাঁচ হাজার দিলেও রাইতে অতো দূর যাইতাম না। দিনে আহেন, সকাল দশটায়।

দশটায় না, নয়টায়। এইখানে আমি আপনের জন্য অপেক্ষা করবো।

কিছু না বলে জহির দুই কানে হেডফোন ঢুকিয়ে রওয়ানা দিলো খালপাড় বস্তির দিকে। ওর হাঁটার ছন্দ দেখে যে কেউ বলবে, ও নির্ভার, দুশ্চিন্তার কোনো ব্যাপার নেই অন্তরে। বস্তির কাছাকাছি এসে একটি মুদি দোকানে দাঁড়ালো। একটা সিগারেট কিনে ধরিয়ে ওখানে দাঁড়িয়ে টানতে থাকলো। সিগারেট টানা শেষ হলে দুই সন্তানের জন্য দুটো ললিপপ কিনে ফের রওয়ানা দিলো ডেড়ার দিকে।

সন্তান দুটো ছাপড়ার বাইরে অপেক্ষা করছিলো,হয়তোবা বাবার জন্য। বড়টা পাঁচ বছরের মেয়ে, নাম আছিয়া; ছোটটার বয়স তিন বছর, নাম জুয়েল। ওরা ছুটে গিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরলো। বাম হাতে দুই সন্তানকে জড়িয়ে রেখে পকেট থেকে ললিপপ বের দুই সন্তানের হাতে দিলো। বাবাকে ছেড়ে দিয়ে দুই সন্তান ললিপপ চাটতে চাটতে ঢুকে গেলো ছাপড়ার ভেতরে

জহির ছাপড়ার ভেতরে ঢোকার সাথে সাথে আবেদা ওকে এক ঝলক দেখে বললো, আইজও তোমার কামাই হয় নাই। ঠিক কিনা?

কাঁধের ব্যাগটা বেড়ায় ঠেস দিয়ে রাখতে রাখতে ম্লান কণ্ঠে বললো জহির, হ।

তোমারে কতবার কইছি চাবি বানানোর কাম বাদ দিয়া ঠেলায় শাকসব্জি বেচলেও দৈনিক কয়ডা টাকা আসতো হাতে। কিন্তু তুমি আমার কথা হুনবা না; কারণ, তোমারে বইসা থাকার ব্যারামে ধরসে! আমার কুনু বিশ্রাম নাই! সারাদিন মাইনসের বাড়িতে কাম করতে করতে শেষ হয়া যাইতাছি।

জহির জবাব দেয় না কখনো। ওর কমতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল; সেকারণে ও স্ত্রীর সাথে কখনো লাগে না। ছাপড়ার বাইরে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে ঢুকলো ভেতরে। রান্না এখনো শেষ হয় নি। ও বিছানায় উঠে বসতেই সন্তান দুটো ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়লো। তিনজন বিছানায় হাসতে হাসতে হুটোপুটি খেতে লাগলো।

ভাতের ফ্যান গেলে আবেদা বিছানার কাছে এসে বললো, আমি কী দোষ করলাম!

বলে আবেদা ঝাঁপিয়ে পড়লো তিনজনের উপরে। এবার চারজনের হুটোপুটি চলতে থাকলো বিছানার এমাথা থেকে ও মাথায়। এই পরিবারের প্রাণখোলা আনন্দ পুরনো চৌকিটা সইতে পারলো না- হঠাৎ হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়লে ওরা প্রথমে হতভম্ব হলেও ব্যাপার বুঝতে পেরে জহির ও আবেদা গলা ফাটিয়ে হাসতে থাকলেও দুই শিশু ভয় পেয়ে শুরু করলো কান্না।

চৌকি ভেঙে পড়ার শব্দ, অট্টহাসি ও শিশুদের কান্না শুনে আশেপাশের ছাপড়া থেকে বয়স নির্বিশেষে নারী-পুরুষ ছুটে এলো এই ছাপড়ার সামনে। একেকজন নিজ নিজ ভাবনা অনুযায়ী প্রশ্ন করতে লাগলো:

-কী হইলো আবেদা?

-কিসের শব্দ হুনলাম?

-খাট ভাংলো নাকি?

-নাকি ছাপড়া ভাংলো?

-রাইত না হইতেই শুরু কইরা দিছস জহির‍্যা?

-লাজ-শরমের মাথা খাইছস?

তখন জহির ও আবেদা দুই সন্তানকে কোলে নিয়ে বাইরে এলে চুপসে গেলো সবাই। জহির ঘটনা বললে হতোদ্যম হয়ে একে একে চলে গেলো সবাই।


পরদিন সকাল নটায় জহির ঐ গলির মুখে এসে ফুকতে থাকলো সিগারেট। দুই কানে আগের মতোই আছে হেডফোন।

পেছন থেকে রুবেল বললো, কী গান শুনতাছেন জহির ভাই?

হঠাৎ পেছনে কথা শোনে ভয় পেয়ে এক লাফ দিয়ে ঘুরে রুবেলকে দেখে নিজ বুকে একবার থুথু দিয়ে বললো, কেডা আফনে? ভূতের মতো পিছনে আইসা কথা কইলেন ক্যান?

জহিরের প্রতিক্রিয়ায় রুবেল প্রথমে ভ্যাবাচ্যাকা খেলেও সামলে নিয়ে এক চিলতে নিস্প্রাণ হেসে বললো, আমাকে চিনতে পারলেন না? আমি রুবেল, গতকাইল রাইতে একটা চাবি বানানো নিয়া কথা বলছিলাম।

সিগারেটে একটা টান দিয়ে জহির বললো, ও!

রুবেল জহিরের হাত থেকে সিগারেটটা নিয়ে এক টান দিয়ে বললো, চলেন জহির ভাই।

সিএনজিতে ওঠে ওরা এলো নিকুঞ্জে। এখানে অধিকাংশ বাড়ি দোতলা; কিছু বাড়ি তেতলা ও চৌতলা; একক প্রাচির ঘেরা।

তখন একটা বিমান উড্ডয়ন হলে বিস্ময়ে বিমানটা দেখতে দেখতে জহির বললো, কত্ত বড়ো বিমান! এতো কাছ থাইকা দেখা যায়!

রুবেল বললো, চলো জহির ভাই। একটু পরে পরে তুমি প্লেন দেখতে পারবা।

কয়েকটা গলি পেরিয়ে একটি বাড়ির গেটের সামনে এসে দাঁড়ালো রুবেল। বাড়িটা দোতলা বাংলোবাড়ির মতো; দোচালা স্টাইলে ছাদটা টালির; দোচালা টালির ছাদ করা হয় শীতপ্রধান দেশে, যাতে ছাদে তুষার না জমে। নামফলকে মালিকের নাম লেখা আছে: সাফিনা লজ; মালিকের নাম-রুবাইয়াৎ আলম; অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজি অব পুলিশ।


"
বানান করে নামটা পড়ে জহির বললো, বাড়িটা তো রুবাইয়াত আলম নামের একজন পুলিশের ডিআইজির। স্যার বাসায় আছে না?


ভিত্রে গেলে সব বুঝতে পারবা জহির ভাই! আসো।

ভেতরে ঢুকে রবেল জহিরকে নিয়ে গেলো সরাসরি দোতলায়। মাস্টার বেডরুমে ঢুকলে অবাক হয়ে চারিদিকে তাকিয়ে দেখতে থাকলো। এত্তো সুন্দর করে সাজানো ঘর এর জীবনে কখনো দেখে নাই! বাঘের মাথা, হরিণের শিংওয়ালা মাথা, ছোটো কার্পেট! আরো কতকিছু! কক্ষের মাঝখানে একটা ডাবল খাট; পরিপাটি নরোম তুলতুলে বিছানা। খাটের পায়ের দিকে একটি রকিং চেয়ার এবং মাথার দুইপাশে দুটো টানা টানা ড্রেসিং টেবিল। আর কোনো আসবাবপত্র নেই কক্ষটায়; খাটের পায়ের দিকের দেয়ালে একটা ঢাউস পোট্রেট-অবসরপ্রাপ্ত ডিআইজির।

জহির ভাই!

রুবেলের ডাকে জহির চমকে পেছনে তাকালে রুবেল জিজ্ঞেস করলো, কী দেখছো দুই চোখ বড় করে?

জহির বললো, এই ঘরে আনছেন ক্যান আমারে? এখানে তো তালা নাই!

রুবেল পোট্রেটটা নামিয়ে দেয়ালে সাঁটানো একটা সিন্দুক দেখিয়ে বললো, এই সিন্দুকের চাবি বানায়া দিতে হবে।

জহির কাছে গিয়ে সিন্দুকটা দেখে বললো, এই সিন্দুকের তো কম্বিনেশন লক আছে। চাবি বানায়া কী হইবো। আমি কম্বিনেশন লক খুলতে পারি না।

আমি এই কম্বিনেশন লকের পাসওয়ার্ড জানি!

কিভাবে জানলেন?

কায়দা করে জেনে নিছি।

জহির দুই কদম সরে বললো, আপনার মতলব টের পাইছি! আমি চুরি করার জন্য চাবি বানাই না! আমারে ক্ষমা করবেন!

রুবেল দেয়ালটায় টোকা দিয়ে বললো, এণ্টিকরাপশনের ডরে ডিআইজি সাব ব্যাংকে বেতনের টাকা ছাড়া অন্য টাকা রাখতো না। ঘুষের সব টাকা এই ঘরের চার দেয়ালে লুকায়া রাখছে। মানুষের রক্ত চুইষা টাকা কামাই করছে এই ঘুষখোর পুলিশ অফিসার। এএসপি থাইকা আমি এর সাথে আছি। আমি হের আগামাথা সব জানি!

এতো বছর উনার সাথে থাইকা উনার নুন খাইয়া অহন নেমহারামি করতাছেন ক্যান?

অর্ধেক জীবন কাটায়া ফালাইছি এই লোকটার সাথে। ঐ লোভী লোকটা কয়েটা মাসিক বেতন ছাড়া আর কিছু দেয় নাই। এখন সুযোগ পাইছি ওর ধনভাণ্ডার লুটের।

এই সম্পদ লুট করে কী আফনে লুকায়া থাকতে পারবেন? দেশের পুরা পুলিশরে আফনের পিছনে লাগায়া দিবো না?

ঘুষের টাকা লুট হয়ে গেলে কাউরে কিছু কইবো না!

আমার দ্বারা এই কাম হইতো না। আমি গেলাম!

রুবেল জহিরের পথরোধ করে বললো, কী বলছেন আপনি? সবকিছু জেনে আপনি চলে যেতে পারেন না! আপনাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা, না না এক লাখ টাকা দেবো!

জহির রুবেলের চোখে চেয়ে বললো, আমি গরীব মানুষ। চাবি বানায়া টাকা কামাই। কোনোদিন কামাইও হয় না। তাই বলে অসৎ পথে কোনো টাকা কামাই করি না।

রুবেল রুঢ় কণ্ঠে বললো, বুঝছি! সোজা আঙুলে ঘি উঠবো না! আঙুল বেঁকা করার ব্যবস্থাও কইরা রাখছি।

তখন জহিরের বড় মেয়ে আছিয়াকে কোলে নিয়ে রুবেলের বয়সী এক যুবক কক্ষে ঢুকলে জহির হয়ে গেলো অবাক। সে ওদের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আমার মা, তুমি এইখানে আইলা ক্যামনে? এই, তুমি কেডা? আমার মাইয়াডারে এইখানে আনছো ক্যান? মা, তুমি এই লোকটার সাথে আইলা ক্যান?

আছিয়া বললো, এই চাচ্চু আমারে ললিপপ দিলো যে। এত্তোগুলা!

রুবেল ওদের কাছে এসে বললো, নাসিম আমার লোক। তোমার মেয়েকে কিডন্যাপ করছি! এই তালার চাবি বানায়া না দিলে তোমার মেয়েকে বিক্রি কইরা দিবো! ঝামেলা না করে চাবিটা বানায়া দেও; পাঁচ লাখ টাকা দিবো।

তখন জহির আছিয়াকে কোলে নিয়ে দুই কদম পিছিয়ে বললো, আমি এই অসৎ কাম করুম না। পারলে আমার কোল থাইকা আমার মাইয়ারে লয়া যাও!

রুবেল দরজার দিকে তাকিয়ে কণ্ঠ উঁচিয়ে বললো, ভাবি, এবার ভিত্রে আসুন!

ছোটো ছেলে জুয়েলকে কোলে নিয়ে আবেদাকে ঢুকতে দেখে ছানাবড়া হয়ে গেলো জহিরের চোখ।

খুশিতে আছিয়া ' মা আইছে!' চিৎকার দিয়ে বাবার কোল থেকে নেমে ছুটে গেলো মায়ের দিকে।

জহির মনে করলো শয়তান রুবেল আছিয়াকেও কিডন্যাপ করেছে। সে ভয় পেলো এবার। ভয়ার্ত কণ্ঠে তোতলিয়ে বললো, তু-তুমি আ-আইলা ক্যান? তো-তোমাকেও কি কি-কিডন্যাপ করছে?

আবেদা উচ্ছল কণ্ঠে বললো, আমাকে কিডন্যাপ করবো ক্যান? আমি সব জাইন্যাই আইছি!

জহির আরো বিস্মিত হয়ে বললো, মানে?

এবার রুবেল হাসিমুখে বললো, আমি ভাবিকে সব বলছি।

সাথে সাথে আবেদা বললো, হ। সারা জীবন চাবি বানায়া তুমি পাঁচ লাখ টাকা কামাই করতে পারবা না। চাবিটা বানায়া দাও।