বর্ষা এবার ফেরার মুখে। যাওয়ার আগে তারও বোধহয় সংসারী মানুষের মতো কিছু হিসেব মেলাতে হয়। কোথাও শেষবারের মতো ছাদের কার্নিশ বেয়ে দু-ফোঁটা জল নামিয়ে দেওয়া, কোথাও বাঁশবনের মাথায় ভেজা বাতাসের হাত বুলিয়ে দেওয়া, কোথাও বা আচমকা এক পশলা বৃষ্টিতে ধুলো-মলিন পৃথিবীটাকে ধুয়ে দিয়ে বলা, আমি যাচ্ছি বটে, কিন্তু আমাকে একেবারে ভুলে যেয়ো না।
এইমাত্র তেমনই এক পশলা বৃষ্টি হয়ে গেছে। আকাশ এখন আশ্চর্য নীল। সেই নীলের গায়ে দু-এক টুকরো ধূসর মেঘ ভাসছে, যেন বৃষ্টির সংসার গুটিয়ে নেওয়ার পর আকাশে ভুল করে ফেলে যাওয়া তুলোর বালিশ। সুপুরির পাতার ডগা থেকে টুপটাপ জল পড়ছে। ভেজা মাটির গন্ধে উঠোন ভারী। দূরের ধানখেতগুলো বৃষ্টির জল মেখে এমন চকচক করছে, যেন কোনও অদৃশ্য কারিগর সবুজের গায়ে নতুন পালিশ দিয়ে গেছে।
আর বাড়ির পাশের তালাওটি? সে তো আজ একেবারে ভরা যৌবনা। কানায় কানায় জল। একটু দুষ্টু ছেলে যদি পাড়ে দাঁড়িয়ে একটা ঢিল ছুড়ে দেয়, মনে হবে তালাও অভিমান করে বলবে, "আর জল ধরতে পারছি না বাপু, এবার তোমাদের আলপথেই কিছুটা রেখে দাও।"
গাঁয়ের লোক অবশ্য তাকে পুকুর বলে না। সেই কোন আমলে কে যেন 'তালাও' বলেছিল, তারপর নামটি আর বদলায়নি। গ্রামবাংলারও মানুষের মতো ডাকনাম থাকে; সরকারি খতিয়ানে এক, মানুষের মুখে আরেক। তালাওটির বয়স কত, কেউ জানে না। চিত্তর ঠাকুমা বলেন, তাঁর শাশুড়ি নাকি বলতেন, তিনি বাপের বাড়ি থেকে বউ হয়ে এসে এই তালাও দেখেছেন। অর্থাৎ তালাওটির বয়স জানতে গেলে বংশলতিকা ধরে এমন পিছোতে হবে যে শেষে হয়তো দেখা যাবে কোনও জমিদারের নায়েব, তারও আগে কোনও ফকির, কিংবা তারও আগে কেবল একটি নিচু জমি আর বর্ষার জল।
গ্রীষ্মকালে অবশ্য তার এমন রূপ থাকে না। জল নেমে হাঁটুর কাছাকাছি এলে পাড়ার ছেলেরা তাকে নিজেদের সম্পত্তি বলে ধরে নেয়। ঝপাং করে একজন নামে, আরেকজনকে ঠেলা মারে, তৃতীয়জন চেঁচায়, "এই, কে আমার গামছা নিলি?"
বয়স্কেরা অনেক বেশি সভ্য। লুঙ্গি হাঁটুর ওপর তুলে এমন গাম্ভীর্যে পার হন, যেন গঙ্গাসাগর অতিক্রম করছেন। যাঁদের প্যান্ট, তাঁরা দুদিকে সমান করে গুটিয়ে নেন। কারণ তালাওয়ের তলার কাদা গণতান্ত্রিক, ধনী-গরিব, লুঙ্গি-প্যান্ট কাউকেই ছাড়ে না।
গরু-মোষদের অবশ্য এসব ভদ্রতার বালাই নেই। রাখালের "হ্যাট হ্যাট্" শুনে তারা জল ভেঙে চলে যায়। মাঝপথে কোনও মোষের ইচ্ছে হলে বসেও পড়ে। তাকে ওঠানো তখন স্থানীয় প্রশাসনের চেয়েও কঠিন।
তালাওয়ের ওপর একটি ছোট সাঁকো হওয়ার কথা বহুদিন। চিত্তর বাবা বলেন, তাঁর ছোটবেলাতেও হওয়ার কথা ছিল। ঠাকুমা বলেন, তাঁর বিয়ের বছরেও শুনেছিলেন, "এইবার হবেই।"
তারপর কত ভোট এল, কত নেতা এলেন, কত পোস্টার উঠল, কত পোস্টারের ওপর আরেক পোস্টার সাঁটা হলো। সাঁকোর বরাদ্দও নাকি হয়েছে বেশ কয়েকবার। শুধু সাঁকোটি বোধহয় অত্যন্ত লাজুক; কিছুতেই জনসমক্ষে দেখা দিতে চায় না।
চিত্ত একদিন বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল, "টাকা যদি আসে, সাঁকো আসে না কেন?"
বাবা বলেছিলেন, "বড় হলে বুঝবি।"
চিত্তর এই 'বড় হলে বুঝবি' কথাটির ওপর প্রবল বিরক্তি। বড়রা যখন নিজেরাই কোনও উত্তর জানে না, তখন ছোটদের বয়সের ওপর দায় চাপিয়ে দেয়।
তবে আজ সাঁকো নিয়ে তার মাথাব্যথা নেই। আজ তার সমস্ত মন পড়ে আছে জলে।
চিত্তর বয়স দশ। নামটি দিয়েছিলেন তার দাদু। দাদুর ধারণা ছিল, ছেলেটি একদিন খুব চিন্তাশীল হবে। আপাতত অবশ্য চিত্তর চিন্তার চেয়ে দৌড় বেশি, দর্শনের চেয়ে দুষ্টুমি বেশি। তার মন শরীরের অন্তত দশ হাত আগে দৌড়োয়। বৃষ্টি দেখলেই তার ছাদে উঠতে ইচ্ছে করে। জল দেখলেই নামতে।
কিন্তু মা আছেন। মায়ের কাছে বর্ষা কোনও কবিতা নয়, সর্দি, কাশি, জ্বর এবং রাত তিনটেয় জলপট্টির সম্মিলিত ষড়যন্ত্র। চিত্ত একবার টিপটিপ বৃষ্টিতে ভিজে এমন জ্বর বাধিয়েছিল যে তিন রাত মা প্রায় ঘুমোননি। চিত্ত তখন জ্বরের ঘোরে দিব্যি ঘুমিয়েছে; মাঝেমধ্যে চোখ খুলে দেখেছে কপালে ঠান্ডা কাপড় আর মায়ের লাল চোখ।
সেই থেকে বৃষ্টি নামলেই মা বলেন, "বাইরে যাবি না।"
আজও বলেছেন। চিত্ত খুব বাধ্য ছেলের মতো জানলার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। তারপর তালাওটি তাকে ডাকল। সত্যি ডাকল কি? কে জানে!
জলেরও তো ভাষা আছে। সে শব্দ দিয়ে ডাকে না। রোদ্দুরের ঝিলিক দিয়ে ডাকে, পাড়ের কচুরিপানা নড়িয়ে ডাকে, ব্যাঙের গলা ধার করে ডাকে।
চিত্ত পাঁচ মিনিট যুদ্ধ করল। একদিকে মায়ের নিষেধ। অন্যদিকে কানায় কানায় জল। দশ বছরের মানুষের নৈতিকতা শেষ পর্যন্ত প্রকৃতির কাছে পরাজিত হলো। সে নিঃশব্দে পিছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। পাড়ে এসে একবার বাড়ির দিকে তাকাল। কেউ নেই। তারপর, ঝপাং! জল তাকে বুকের মধ্যে নিয়ে নিল। আহা! কী ঠান্ডা! পায়ের আঙুল থেকে মাথার চুল পর্যন্ত একটা শিরশিরে আনন্দ ছুটে গেল। প্রথমে সে দুহাত দিয়ে জল কাটল, তারপর ডুব, তারপর ভেসে ওঠা। মুখে জল নিয়ে ফোয়ারার মতো ছুড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চিত্ত আর তালাও আলাদা রইল না। জল তার শরীর জড়িয়ে ধরেছে, আর সে জলকে দুহাতে আদর করছে। কখনও চিৎ হয়ে আকাশ দেখছে। কখনও ডুব দিয়ে তলার কাদায় পা ছোঁয়াচ্ছে। কখনও শালুকপাতা সরিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
একসময় তালাওয়ের মাঝামাঝি পৌঁছে তার মনে হলো, কেউ তার পা ধরেছে। চিত্ত প্রথমে হাসল। নিশ্চয়ই শেকড়। পা ঝাঁকাল।
ছাড়ল না। বরং টানটা আরও প্রবল হলো। চিত্ত এবার জোরে সাঁতার কাটতে চাইল। পারল না। তার ডান পা যেন নিচের দিকে নামছে। তারপর বাঁ পা। জল হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
চিত্তর বুকের মধ্যে প্রথম ভয় ঢুকল, "মা!" ডাকতে গেল। কিন্তু আশ্চর্য, মুখ থেকে শব্দ বেরোল না। সে হাত-পা ছুড়ল। যত ছোড়ে, তত নিচে। পায়ের আঙুল কাদায় ঢুকে গেল। তারপর গোড়ালি। হাঁটু। কোমর। চিত্ত বুঝতে পারছে না, এত গভীর কাদা এল কোথা থেকে! একসময় বুক পর্যন্ত নেমে গেল। তার থুতনি প্রায় তলায় ছুঁল।
এবং ঠিক তখন, পৃথিবী বদলে গেল। চিত্ত চোখ খুলে দেখল, তালাওয়ে জল নেই। এক ফোঁটাও না। সে দাঁড়িয়ে আছে, না, দাঁড়িয়ে নয়, কাদার মধ্যে আটকে আছে, এক বিশাল শুকনো গর্তের তলায়। উপরে নীল আকাশ। চারপাশে পাড় অনেক উঁচু। এইমাত্র যে জল তাকে জড়িয়ে ছিল, তা কোথায় গেল? এক মুহূর্তে? এ কি সম্ভব? চিত্তর বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
তার চারপাশে ভয়াবহ দৃশ্য। পদ্মপাতা মাটিতে লুটিয়ে আছে। শালুকের ডাঁটা নিস্তেজ। কচুরিপানা কাদায় মুখ গুঁজে পড়ে আছে। আর মাছ! শত শত মাছ ছটফট করছে। ছোট পোনা মুখ খুলে বন্ধ করছে। বড় রুই কাদায় শরীর আছড়ে যাচ্ছে। শিঙি, মাগুর কিলবিল করছে। একটি জলঢোঁড়া সাপ শুকনো কাদার ওপর দিয়ে এগোতে গিয়ে বারবার শরীর মোচড়াচ্ছে। ব্যাঙগুলো অস্থির হয়ে লাফাচ্ছে, কিন্তু কোথায় যাবে?
চিত্ত নিজের ভয় ভুলে গেল, "জল কোথায় গেল?"
কেউ উত্তর দিল না।
একটি বড় মাছ তার সামনে ছটফট করতে করতে ধীরে নিস্তেজ হয়ে এল। চিত্তর মনে হলো মাছটি তাকে দেখছে। অভিযোগ করছে না। শুধু যেন বলছে, "তোমরা তো ডাঙায়ও বাঁচতে পারো। আমরা কোথায় যাব?"
চিত্ত পাগলের মতো হাত দিয়ে কাদা খুঁড়তে শুরু করল, "জল! জল!"
তার নখের ভিতর কাদা ঢুকল। হাত ব্যথা হয়ে গেল। সে খুঁড়েই চলল। মনে পড়ল স্কুলের ভূগোল বই, বিশ্ব উষ্ণায়ন, ভূগর্ভস্থ জল, জলসংকট।
কিন্তু বইয়ের পাতায় জলসংকটের পাশে সুন্দর রঙিন ছবি থাকে। এখানে একটি মাছ তার চোখের সামনে মরছে। পৃথিবীর বিপর্যয় যখন বইয়ে থাকে, তখন সে তথ্য। নিজের উঠোনে এলে তার নাম আতঙ্ক।
চিত্ত কাঁদতে কাঁদতে বলল, "আমি জল আনব। একটু দাঁড়া।"
কার উদ্দেশে বলছে সে নিজেই জানে না। মাছ? তালাও? পৃথিবী?
তার হাত কাদার ভিতর আরও গভীরে গেল, হঠাৎ, আঙুলে ঠান্ডা কিছু লাগল। জল! চিত্ত উন্মাদের মতো সেই জায়গা খুঁড়তে লাগল।
এক ফোঁটা। তারপর আরেক ফোঁটা। কাদার নিচ থেকে ক্ষীণ জল উঠছে। চিত্তর চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল, "পেয়েছি!"
সে আরও জোরে খুঁড়ল। একটি ছোট গর্তে জল জমল। দুই আঁজলা হবে বড়জোর। চিত্ত দুহাত জোড় করে জল তুলে কাছের পোনামাছগুলোর ওপর ঢেলে দিল। মাছগুলো একটু নড়ল।
সে আবার খুঁড়ল। আরও জল। তার ছোট্ট দুই হাত তখন কোদাল। নখ ভেঙে রক্ত বেরিয়েছে, খেয়াল নেই।
হঠাৎ উপরে কারও গলা, "চিত্ত!"
মা।
চিত্ত মুখ তুলে তাকাল। পাড়ের ওপর মা দাঁড়িয়ে। মুখ ফ্যাকাশে।
"মা! জল নেই!"
মা কিছু বুঝতে পারছেন না, "কী বলছিস? উঠে আয়!"
"পারছি না! মাছগুলো মরে যাবে!"
চিত্ত আবার কাদা খুঁড়ল, "মা, জল দাও! ওরা শ্বাস নিতে পারছে না!"
মায়ের চোখে জল। তিনি পাড় বেয়ে নামতে যাচ্ছেন।
ঠিক তখন, প্রচণ্ড শব্দ। যেন মাটির অনেক নিচে কেউ বিশাল দরজা খুলে দিল। গড়গড়গড়, চিত্তর হাতের ছোট গর্তটি কেঁপে উঠল। তারপর সেখান থেকে জল উঠে এল। প্রথমে সরু ধারা। তারপর ফোয়ারা। তারপর, প্রচণ্ড বেগে।
চিত্ত পিছনে পড়ে গেল। জল ছড়িয়ে যাচ্ছে শুকনো তলায়। মাছগুলো নড়ছে। শালুকের ডাঁটা ভাসছে। ব্যাঙ লাফিয়ে জলে পড়ছে। জল বাড়ছে। চিত্তর হাঁটু ছুঁল। তারপর কোমর, বুক। সে এবার ভয় পেল না। হেসে উঠল।
"মা! জল এসেছে!"
মা উপরে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন আর হাসছেন একসঙ্গে। কিছুক্ষণের মধ্যে তালাও আবার ভরে উঠল। ঠিক আগের মতো। যেন কিছুই ঘটেনি।
চিত্তর জ্ঞান ফিরল নিজের বিছানায়। কপালে জলপট্টি। পাশে মা। বাইরে রাত ঘন।
"আমি... তালাওয়ে..."
মা বললেন, "চুপ। কথা বলিস না। তোকে পাড়ের কাদায় অজ্ঞান হয়ে পড়ে থাকতে দেখেছি।"
"জল শুকিয়ে গিয়েছিল।"
মা মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন, "জ্বর এসেছে। স্বপ্ন দেখেছিস।"
"মাছগুলো?"
"সব ঠিক আছে।"
"সত্যি?"
"সত্যি।"
চিত্ত চোখ বন্ধ করল। তাহলে স্বপ্ন? হয়তো।
পরদিন জ্বর একটু কমতেই জানলা দিয়ে তালাওয়ের দিকে তাকাল। কানায় কানায় জল। একটি বক পাড়ে দাঁড়িয়ে মাছ ধরছে।
সব স্বাভাবিক। শুধু একটি জিনিস ছাড়া। তালাওয়ের মাঝখানে, যেখানে চিত্ত কাদা খুঁড়েছিল, সেখানে জল গোল হয়ে কাঁপছে। যেন নিচ থেকে এখনও কোনও প্রস্রবণ উঠে আসছে।
আর তার বিছানার পাশে রাখা দুই হাতের নখের মধ্যে শুকনো কাদা। তর্জনীতে ক্ষুদ্র ক্ষত। চিত্ত অনেকক্ষণ নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর মাকে বলল, "মা, তালাওয়ের সাঁকোটা হবে না?"
মা হেসে বললেন, "আমি কী করে জানব?"
"বাবা বলে টাকা আসে।"
"বড়দের ব্যাপার।"
চিত্ত মাথা নেড়ে বলল, "না। জলও তো বড়দের ব্যাপার ছিল।"
মা থমকে গেলেন। চিত্ত জানলার বাইরে তাকাল। তার মনে হলো, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সর্বনাশগুলো শুরু হয় তখনই, যখন সবাই বলে, ওটা অন্য কারও ব্যাপার।
কয়েকদিন পরে সে স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে তালাও পরিষ্কার করতে নামল। প্লাস্টিক তুলল, পাড়ে গাছ লাগাল। মাস্টারমশাইকে ধরে পঞ্চায়েতে চিঠি লিখল সাঁকোর জন্য।
চিঠির শেষে নিজের হাতে লিখল, "সাঁকোর টাকা কোথায় গেছে জানি না। কিন্তু তালাওয়ের জল কোথায় যাবে, সেটা আমরা দেখতে চাই।"
চিঠিটি গ্রামে বেশ হাসির সৃষ্টি করেছিল। তারপর অস্বস্তিরও। কারণ শিশুর প্রশ্নের অসুবিধা একটাই, তার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের সুবিধাজনক ভদ্রতা থাকে না।
তিন মাস পরে সাঁকোর কাজ শুরু হলো। কেউ বলল বিধায়কের উদ্যোগ। কেউ বলল পঞ্চায়েতের সাফল্য। কেউ বলল বহুদিনের পরিকল্পনা।
চিত্ত কিছু বলল না। সাঁকোর প্রথম বাঁশ বসানোর দিন সে পাড়ে বসে ছিল। শীত এসে গেছে। তালাওয়ের জল শান্ত। হঠাৎ তার পায়ের কাছে ছোট্ট একটি পোনা মাছ লাফিয়ে উঠল। ছপাৎ। এক ফোঁটা জল এসে পড়ল তার হাতে। চিত্ত সেই ফোঁটাটি দেখল। একটি মাত্র জলবিন্দু। তার মধ্যে উল্টো হয়ে আছে আকাশ, তালগাছ, মেঘ, চিত্তর মুখ, একটা গোটা পৃথিবী। সে হাত মুছল না। মনে হলো, সেদিন সে মা ধরিত্রীর কাছ থেকে এক আঁজলা জল ছিনিয়ে আনেনি। বরং পৃথিবীই তার ছোট্ট হাতে এক আঁজলা জল রেখে বলেছিল, "সবটা তোমার নয়। তবু যতটুকু তোমার হাতে পড়ে, ততটুকুর দায় তোমার।"
চিত্ত হাতটি বুকের কাছে তুলে নিল। দূরে নতুন সাঁকোর ওপর হাতুড়ির শব্দ উঠছে। ঠক। ঠক। ঠক। একটি গ্রাম বুঝতে শুরু করেছে, সাঁকো শুধু এপার থেকে ওপারে যাওয়ার জন্য তৈরি হয় না। কখনও কখনও একটি শিশুর প্রশ্ন থেকে বড়দের বিবেক পর্যন্ত পৌঁছতেও একটি সাঁকো লাগে।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।