মেলপুকুরের পশ্চিমদিক আগাছায় ভরে গিয়ে ঘন জঙ্গলের আকার ধারণ করেছে। সচরাচর কেউ ঢোকে না ওই জঙ্গলে। মেলপুকুরের দক্ষিণে মানুষের ঘন বসত গড়ে উঠেছে ফুট দশেক দূরত্ব বজায় রেখে। অনেকটা ফাঁকা জায়গা পেয়ে যাওয়ায় এলাকারই পায়ে চলার রাস্তাটার বরাতে গুচ্ছের মোরাম জুটে যাওয়ায় রাস্তাটা এরপরই পূর্বদিক থেকে বাঁক নিয়ে দক্ষিণের ওই ফাঁকা জায়গাটুকুর দখল নিয়েছে। মোরাম বিছিয়ে দিয়ে দেওয়ার দরুন পায়ে চলা রাস্তার বদলে মোরাম বিছানো দশ ফুটিয়া চওড়া রাস্তা পেয়ে যাওয়ায় এলাকাবাসীও রকমারি যানবাহনে সওয়ারি হয়ে খুব সহজে এবং দ্রুত মেলপুকুরের পাশ কাটিয়ে যাতায়াত করতে পারছে। বর্ষাকালে পায়ের পাতা ডোবা জমাজল কিছুটা ব্যাঘাত ঘটাতে চাইলেও সেই সমস্যাকে তেমন আমল দিতে নারাজ তারা। আজকাল মোরাম বিছানো রাস্তাকে যখন তখন দু’পায়ে মাড়িয়ে কিংবা রাস্তার বুকের ওপর দিয়ে বাইসাইকেল, ভ্যানরিক্সা, মোটোরবাইক ইত্যাদি নিয়ে ছোটাছুটির যেন অন্ত নেই। মোরাম বিছানো রাস্তাযাবতীয় যাতনা মুখ বুজে সয়ে চলেছে।
এছাড়া আরও কিছু উপদ্রব হামেশাই ঘটছে মোরাম বিছানো রাস্তাটায়। টেলিফোনের লাইন, জলের পাইপ লাইন, পাকা নর্দমা ইত্যাদির জন্য মোরাম বিছানো রাস্তার দুই ধার কিংবা বুকের মাঝখানটায় রকমারি যন্ত্র দিয়ে প্রটোজনমত খোঁড়াখুঁড়ি করলে মোরাম বিছানো রাস্তা তার প্রতিবাদ করতে না পেরে সব অত্যাচার নীরবে সহ্য করে চলেছে। গোঁদের ওপর বিষফোঁড়ার মত বেওয়ারিশ এবং পোষ্য কুকুর-বিড়াল যখন তখন এসে মোরাম বিছানো রাস্তার সর্বত্র হেগেমুতে দিয়ে যাচ্ছে, পথচারী কিংবা যাববাহন আরোহী পানের পিক - গুটোখার ছেঁড়া মোড়ক, এলাকাবাসী বাড়ির আবর্জনা ভর্তি মোড়ক ইত্যাদি বস্তু ফেলে নোংরা করে দিয়ে গেলেও মোরাম বিছানো রাস্তা ‘যে সয়, সে রয়’ কথাটা মনেমনে মন্ত্রের মতো জপ করতে করতে এসব নির্যাতনও নির্বিবাদে সয়ে চলেছে।
এই এলাকায় সন্ধ্যের পর জমে ওঠে আরও এক খেলা। মেলপুকুর থেকে উঠে আসা শীতল ঝিরঝিরে বাতাস মাঝেমাঝেই হামলে পড়ে চুমু খেয়ে যায় মোরাম বিছানো রাস্তাকে। যেন প্রেমিক এসে প্রেমিকার অধরে আলতো করে চুমু দিয়ে গেল। মোরাম বিছানো রাস্তা লজ্জায় কুঁকড়ে যেতে চাইলেও তেমন কিছু করতে না পেরে মেলপুকুরের এক ধার কামড়ে ধরে টান টান হয়ে পড়ে থাকে নিজের জায়গায়। বেহায়া ঝিরঝিরে বাতাস আরও একটা কাজ করে থাকে। ভরদুপুরে মাঝেমাঝেই এসে মোরাম বিছানো রাস্তার বুকের ওপর হামলে পড়ে ধুলোবালি উড়িয়ে দিয়ে ইচ্ছেমতো হুল্লোড় করে যায়।
এক একদিন গভীর রাতে মোরাম বিছানো রাস্তার বুকেরওপর ঘটে যায় গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠার মত ঘটনা। মোরাম বিছানো রাস্তা সবকিছু দেখেও না-দেখার ভান করে মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকে নিজের জায়গায়। তাতেও কি সে নিস্তার পায়? মেলপুকুরের পশ্চিমে ঝোপঝাড়ে ঢাকা জায়গায় একঝাঁক ঝুড়ি নিয়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন অশ্বত্থগাটা মোরাম বিছানো রাস্তাকে ভয় দেখানোরবাসনাতে দুরন্ত বাতাসকে দূত করে পাঠায়। দুরন্ত বাতাস এসে ফিসফিস করে কোন না কোন দুঃসংবাদ তুলে দিয়ে যায় মোরাম বিছানো রাস্তার কানে। সেই দুঃসংবাদ পেয়ে মোরাম বিছানো রাস্তা ভয়ে জড়োসড়োহয়ে গিয়ে মনেমনে বলে, ‘ইস, আজ আবার একজন... সাতসকালে ছুটোছুটি, হাঁকডাক, গম্ভীর গলায় হুকুম, সেই হুকুম তামিল করা ইত্যাদি ইত্যাদির বিশাল ঝড় বয়ে যাবে আমার বুকের ওপর দিয়ে। মানুষের পায়ের চাপে সযত্নে বিছিয়ে রাখা মোরামগুলো রাস্তার বুকে এলোমেলো ভাবে ছড়িয়ে পড়বে মড়মড় শব্দ তুলে।’
আজ একটু আগে তেমনই একটা ঘটনা ঘটে গেল মেলপুকুরের ধারে। মেলপুকুরের আশেপাশে আশ্রয় নেওয়া মানুষগুলো যে যার বিছানায় ঘুমিয়ে কাদা হয়ে আছে। রাত গভীর হওয়ায় মোরাম বিছানো রাস্তা নির্জনতা উপভোগ করার সুযোগ পেয়ে যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে শুরু করেছে ঠিক তখনই আচমকা মানুষের পায়ের চাপের মৃদু শব্দ বেজে ওঠে রাস্তার বুকে। ওই মৃদু শব্দেই মোরাম বিছানো রাস্তা চমকে উঠে মনেমনে বলে ওঠে,
মোরাম বিছানো রাস্তা ভাবনায় ডুবে থেকেই টের পায়, মানুষের পায়ে চলার মৃদু শব্দটা আচমকা থেমে গেল মেলপুকুরের পশ্চিমে ঝোপঝাড়ে ঢাকা জায়গাটায়।
এরও বেশ কিছুটা সময় পরই মোরাম বিছানো রাস্তা শোনে, অদূরেই কাঁঠালগাছটার মগডালে খড়কুটোর বাসা থেকে একটা কাক আচমকা এমন করে ‘কা-কা’ করে ডেকে উঠলো যেন নবাগত দিনকে আগাম অভ্যর্থনা জানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। কাকটার ওই ‘কা-কা’ ডাক শুনে মোরাম বিছানো রাস্তার মাথায় চলে এলো অন্য একটা ভাবনা। ভোর হয়ে এলো! তারমানে তন্ময়বাবুর পায়ের আওয়াজ যখন তখন বেজে উঠবে তার বুকে। মানুষটা নিত্যদিনই কাকভোরে প্রাতঃভ্রমণে বেরোন। বিগত কুড়ি বছরে তাতে তেমন ভাটা পড়েনি। তন্ময়বাবুর পদশব্দ শোনার জন্য আরও কিছুক্ষণ কান খাড়া করে রেখেও মোরাম বিছানো রাস্তা একসময় হতাশ হলো। তন্ময়বাবুর পায়ের শব্দ এখনো কেন বুজকের ওপর বেজে উঠলো না!
ভাবতে ভাবতেই শোনে অন্য একটা চেনাজানা পায়ের আওয়াজ বেজে উঠলো রাস্তার বুকে। শুনেই মোরাম বিছানো রাস্তা মনেমনে বলে ওঠে, ‘ওই এলেন ছিঁচকে চোর সাধু। মা-বাবা আদর করে চোরটার একটা বাহারি নামও রেখেছে বটে। করে চুরিচামারি অথচ ‘সাধু’ নামটা বেশ সেঁটে রেখেছে নিজের শরীরে। ছিঃ-ছিঃ।’
সাধু এসবের কিছুই টের পাচ্ছে না বলে যে-কাজটা সেরে নিতে এসেছে তাতেই মন দিলো। রাতভর শহরতলির এখানে সেখানে ঘুরে ঘুরে হাতসাফাই করে প্রায় কাকভোরের দিকে এখানে চলে আসে সাধু। মোরাম বিছানো রাস্তা জানে, চোরটা এখানে এসে প্রথমে ঝোপঝাড়ের আড়ালে বসে রাতভর বাড়ি বাড়ি ঘুরে সেসব স্থান থেকে সংগ্রহ করে আনা চুরিচামারির বস্তুভরা পোঁটলা লুকিয়ে রাখবে পুকুরের ধারে গজিয়ে
ওঠা ঘন ঝোপের আড়ালে। তারপর মেলপুকুর থেকে আঁজলা ভরা জল তুলে চোখেমুখে জলের ছিটে দিয়ে মুখে জল ভরে নিয়ে ভালো করে কুলকুচো করে জলটুকু পুচুত করে ছুঁড়ে দেবে আকন্দগাছের ঝোপে। এসব করেটরে নিয়ে চোরাই মালের পোঁটলা কাঁধে ফেলে গলা ছেড়ে হরিধুন গাইতে গাইতে হাঁটতে শুরু করবে মোরাম বিছানো রাস্তায়। তখন মুখে এমন একটা ভাব ফুটিয়ে রাখবে যেন এইমাত্র ঘর থেকে বেরোলো রাস্তায় নেমে হরিনাম করার বাসনায়।
সহসা মোরাম বিছোনো রাস্তার ভাবনায় আবার চলে এলেন তন্ময়বাবু। কাক ‘কা-কা’ করে ডাকলো অথচ তন্ময়বাবু এখনো কেন প্রাতঃভ্রমণে বেরোলেন না! নাকি আজ এদিকে না এসে অন্যদিকের রাস্তায় টহল দিতে বেরিয়েছেন? শরীর খারাপ হওয়ায় এখনো শুয়ে আছেন বিছানায়? নাকি কোথাও বেড়াতে গিয়েছেন দিন কয়েকের জন্য? বছর তিনেক আগে দিনকতক এদিকে আসেননি তিনি। এরপর নিয়মমত কাকভোরে মোরম বিছোনো রাস্তার ওপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কাকে যেন সেলফোনে বলছিলেন, ‘হ্যাঁ-হ্যাঁ, চিন্তা কোরো না। আমি ভালোভাবেই বাড়িতে... না-না, অটোরিক্সায় ওঠার সময় ওই ছোট্ট ঘটনার পর আসার পথে আর কোন ঝামেলায়... হাহাহা, নিশ্চয়ই আসবে। এসে দিন কতক থেকে গেলে খুব খুশি হবো ভায়া।’
আজ কেন যেন তন্ময়বাবুর কথা মোরাম বিছানো রাস্তার খুব মনে পড়ছে। মিউনিসিপ্যালিটির ঠিকাদারের পোষ্য যে-মানুষটা রোজ ‘ফু-র-র-র, ফু-র-র-র’ করে বাঁশী বাজিয়ে এগলি সেগলি ঘুরে নিজের হাতগাড়িতে আবর্জনাসংগ্রহ করতে করতে মোরাম বিছানো রাস্তার ওপর দিয়ে একটু একটু করে এগোতে থাকে ভাগাড়ের দিকে, সেই মানুষটার আসা যাওয়ার সময়ের কোন ঠিক থাকে না। কোনদিন সকাল আটটায় আসে তো কোনদিন দশটা কিংবা দুপুর বারোটায় হাতগাড়ির লোহার চাকায় খটরমটর শব্দ তুলতে তুলতে মোরাম বিছানো রাস্তাকে বিরক্ত করতে আসে। এক একদিন অসুস্থতার বাহানায় আবর্জনা সংগ্রহ করতেও আসে না। অথচ সেই ঠিকাদারের কিন্তু টনটনে সময়ের জ্ঞান। মাস পয়লায় সঠিক সময়ে ঠিকাদারের ভারী গলার হাঁকডাক ভেসে ওঠে এলাকার প্রতিটি গলির দোরে দোরে, ‘ময়লার টাকা দে-বে-ন-ন-ন’। ওই ঠিকাদারের মতো তন্ময়বাবুরও সময় জ্ঞান ভীষণ টনটনে। মানুষটার ওই গুণটাই মোরাম বিছানো রাস্তার মন কেড়ে নিয়েছে। অমন সময়নিষ্ঠ মানুষ যে আর দুটি দেখে নি।
মেলপুকুরের অদূরেই এখানকার সদাব্যস্ত বাজার বসে। বাজারটার নাম ‘সরকার বাজার’। কেন ‘সরকার বাজার’ নাম হলো সেকথা মোরাম বিছানো রাস্তার জানা নেই। হয়তো কোনো এক নামীদামী সরকারবাবু ওই বাজারের পত্তন করেছিলেন। সকাল থেকে সন্ধ্যে ইস্তক ক্রেতা-বিক্রেতার ভিড় লেগেই আছে ওই বাজারে। আনাজপাতি, মাছ-মাংস, মালমশলা কেনা বেচার ফাঁকেই বহুকালের চেনাজানা খদ্দেরের সঙ্গে ব্যাপারীদের টুকটাক কথাবার্তা, রঙ্গতামাশা দিনভর লেগেই আছে সরকার বাজারে।
এই যেমন, সরকার বাজারের মাছের ব্যাপারী বছর পঞ্চান্নর মরণ। মানুষটা নিত্যদিন মাছ বেচে সরকার বাজারে। সেই কোন কাকভোরে সঙ্গীদের সঙ্গে বাইসাইকেলে চেপে দূরের এক মাছের হাট থেকে টাটকা মাছ নিয়ে আসে জলভরা হাঁড়িতে। সরকার বাজারে বসে খদেরদের সঙ্গে বার্তালাপ এবং দরাদরির ফাঁকে ডান হাত দিয়ে হাঁড়ির জলে ছপাত ছপাত শব্দ তুলে মাছগুলোকে যেন সতর্ক করে দিয়ে বলছে, ‘কেটেকুটে খদ্দেরের হাতে তুলে না দেওয়া ইস্তক তোরা বেঁচে থাক বাপ। ‘তার নাম ‘মরণ’ কে রেখেছে জানতে চাইলে মাছের ব্যাপারী মরণ হাসতে হাসতে জবাব দেয়, ‘জন্মের পরপরই মা আমাকে ওই নাম দিয়েছেন বলেই না আজও সরকার বাজারে বসে আপনাকে মাছ খাওয়াতে পারছি বাবু। নইলে আর ভাইবোনদের মত আমাকেও জন্মানোর পর পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হতো।’ মাছের ব্যাপারী মরণেরও সময়জ্ঞানের বড্ড অভাব। অনেক পুরোনো খদ্দেরই সরকার বাজারে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকেন মরণের আসার অপেক্ষায়। মাছ নিয়ে এলে মরণকে লোকদেখানো বকাঝকা করে মাছ কিনে নিয়ে বাড়ির পথ ধরেন।
মোরাম বিছানো রাস্তার ধারণা, তন্ময়বাবু যেন একেবারে বিপরীত ধরণের একটা মানুষ। সময়ের জ্ঞান বড্ড বেশী টনটনে। নিত্যদিন কাকের প্রথম ‘কা-কা’ ডাক বাতাসে ভেসে ওঠার পরপরই পায়ের চাপে মৃদু ‘খসখস’ শব্দ তুলতে তুলতে মোরম বিছানো রাস্তা দিয়ে হেঁটে যান তিনি। তন্ময়বাবুর ভাবনা ছেড়ে মোরাম বিছানো রাস্তা সাধু চোরের দিকে তাকালো। সাধু চোর এখন নিজের কাজেই মগ্ন রয়েছে। সাধুকে এক ঝলক দেখে নিয়ে মোরাম বিছানো রাস্তা দৃষ্টি ঘোরালো আকাশের দিকে। রাতের অন্ধকার অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। চরাচর ধীরে ধীরে ঢাকা হয়ে চলেছে হালকা আলোর চাদরে। তাতেই মোরামা বিছানো রাস্তা বুঝলো চোরাই মালের পোঁটলা কাঁধে ফেলে হরিধুন গাইতে গাইতে বাড়ির দিকে হেঁটে যাবার সময় হয়ে এলো সাধু চোরের।
আলো ফুটে উঠতে শুরু করেছে দেখে মেলপুকুর থেকে আঁজলা ভরা জল তুলে চোখেমুখে বেশ করে জলের ঝাপটা দিয়ে, মুখের জল পুচুত করে আকন্দগাছের ওপর ছুঁড়ে দিয়ে সবে চোরাই মালের পোঁটলা কাঁধে তুলতে যাচ্ছে সাধু, তখনই সহসা তার চোখে পড়লো ভয়ানক একটা দৃশ্য। নবারুণের নরম আলোয় আকাশের অন্ধকার প্রায় নেই বললেই চলে। ওই নরম আলোয় সাধু দেখে, কিছু একটা বস্তু অশ্বত্থগাছের ডাল থেকে ঝুলছে! কৌতূহলী সাধু পোঁটলা তুলে নেবার কথা ভুলে গিয়ে পা টিপে টিপে অশ্বত্থগাছটার কাছে গিয়ে যা দেখলো তাতে সে সেখনেই জমে পাথর হয়ে গেল। সাধু দেখে, সাদা পোশাক পরিহিত লম্বা মতো একটা মানুষ ঝুলছে অশ্বত্থগছের মোটা একটা ডাল থেকে! মানুষটা নিশ্চয়ই রাতের অন্ধকারে এই গাছে উঠে গলায় দড়ি দিয়েছে।
সাধু কতক্ষণ ওখানে জমে পাথর হয়ে ছিলো নিজেও জানে না। জবাফুলের মতো লাল রঙের সুর্যটা যখন পূর্বাচলের দিগন্তরেখা থেকে ছোট্ট একটা লাফ দিয়ে আকাশে উঠে এলো তখনই সাধু চোরের টনক নড়লো। নবারুণের প্রথম আলো অশ্বত্থগাছের ওপর আছড়ে পড়তেই সাধু দেখে, অশ্বত্থগাছের ডালে গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে মৃদু মৃদু দুলতে থাকা লম্বামতো মানুষটার ডান হাতের আঙ্গুলে কিছু একটা বস্তু থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছে! আলো ছিটকে বেরোতে দেখেই সাধু চমকে গেল। হীরের আংটি! এই এলাকারই এক ভদ্রলোকের ডান হাতে একটা হীরের আংটি জ্বলজ্বল করতে দেখেছে সে। বারকতক তাঁর ঘরে মাঝরাতে ঢুকে ওই হীরের আংটি হাতানোর কম চেষ্টা করেছে সাধু? কিন্তু কখনো
সফল হতে পারেনি মানুষটার ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায়। হয়তো সেই মানুষটাই হবে ভেবে বিস্ময়ে পাথর হয়ে জমে থাকা সাধু বাড়ি বাড়ি ঘুরে হাতসাফাই করে আনা বস্তুভরা পোঁটলার কথা বেমালুম ভুলে গেল। এমনকি গলা তুলে হরিনাম করতে করতে বাড়ি ফেরার কথাও আর মনে রইলো না ওর। সব ভুলে গিয়ে ঝুলন্ত মানুষটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করতে পারলো না সে।
মেলপুকুরের এক ধার কামড়ে পড়ে থাকা মোরাম বিছানো রাস্তাও দেখেছে ওই দৃশ্য। অশ্বত্থগছে ঝুলে থাকা মানুষটার হাতের আঙ্গুলের আংটি থেকে আলোর দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কেন জানে না আচমকা একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো মোরামে বিছানো রাস্তার বুকের ফাঁকফোঁকর দিয়ে। ‘তন্ময়বাবু কী আজ প্রাতঃভ্রমনে বেরোবেন না? নাকি আজ প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে হাঁটার কথা ভুলে অনেক উচুতে উঠে ডানা মেলে দিয়ে আকাশে উড়ার চেষ্টা করছিলেন? তাই যদি হবে তাহলে আমি কী ধরে নেবো, আগামীকাল কাকভোর থেকে ওই চেনাজানা পায়ের শব্দ আর কোনদিন বেজে উঠবে না আমার বুকে?’
তন্ময়বাবুর পায়ের শব্দ শোনার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে এই অদ্ভুত ভাবনাগুলো মোরাম বিছানো রাস্তাকে কুরেকুরে খেয়ে চলেছে।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।