"তুমি কে গা?"
নোংরা ব্রিজের তলায় জবুথবু হয়ে বসে থাকা শিশুটি হঠাৎ মুখ তুলে প্রশ্নটা করল। বৃদ্ধ স্বপন খুড়ো একটু মুচকি হেসে বিষণ্ণ গলায় বললেন, "আমি একজন গানওয়ালা রে... স্বপ্নওয়ালাও বলতে পারিস মোরে।"
বিন্দির শুকনো মুখটায় একরাশি বিস্ময় ফুটে উঠল। চোখ দুটো গোল গোল করে সে বলল, "স্বপ্নওয়ালা? তুমি স্বপন বেচো? দাও না গো আমারে একখান স্বপন কিনে! আমি যে আজ কতদিন ঘুমাই নাই...”
“ক্যান বল তো বেটি? ঘুমাই নাস ক্যান?”
“ওই যে ওরা বলতেছে আমাদের নাকি এই দ্যাশ থেকে তাড়িয়ে দেবে! আমাদের নাকি এটা দ্যাশ না! আচ্ছা কাকা... দ্যাশ কারে কয়? জানো তুমি?"
স্বপন খুড়ো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দূর আকাশের দিকে তাকালেন। "না রে বিন্দি... দ্যাশ মানে কী আমিও জানি না। সেই ছেলেবেলায় মায়ের কোলে এই দ্যাশে এসেছিলুম, তা সেই মা-ও রইল নি! সেই তখন থেইকা যা পাই খাই, আর বাঁশি বাজাই।"
বিন্দি আকুল হয়ে বৃদ্ধের ছেঁড়া জামার হাতা ধরে একটু ঝাঁকিয়ে বলল, "আর স্বপন বেচো?”
“হ্যাঁ রে মা?”
“তা স্বপনের দাম কত গো খুড়ো?"
"স্বপনের আবার কী দাম রে? ওটা ফিরি! চোখ বুজলেই দেখা যায়। তবে... কি জানিস, চোখ বুজতেও পয়সা লাগে!"
বিন্দি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, "কেমনে?"
"ক্যান, এই যে দেখ—খালি পেটে শুলে কি তুই স্বপন দেখবি রে ছুড়ি? পেটে তো ভাত চাই! আর মাথার ওপরে একটা ছাদ না হলে তো আবার শিয়াল-কুকুরে তোরে ছিঁড়ে খাবে... শান্তিতে স্বপন দেখার জো আছে নাকি?"
বিন্দি নিজের খালি পেটে হাত দিয়ে একটু কুঁকড়ে গেল। করুণ গলায় বলল, "তবে আমি ঘুমাইব কেমনে? না ঘুমাইলে যে স্বপন দেখব না? আমার যে পেটে ভাত নাই... সেই কবে শেষ খেয়েছি মনে নাই। ওই যে সেদিন রাস্তার ধারে একজন দরদী মানুষ খাবার বিলি করতেছিল, সেই তো দু-খান সেবারে খাইতে দিল। সেরকম মানুষ আবার আইলে আবার দু-মুঠো পেটে দেবো।"
স্বপন খুড়ো থমকে গেলেন। বিন্দির মাথায় হাত রেখে আদর করে একটু নেড়ে দিলেন। তারপর বিন্দির শরীরটার দিকে নজর যেতেই বৃদ্ধের বুকের ভেতরটা যেন মুচড়ে উঠল। পাজরের হাড়গুলো পিঠের ওপর এমনভাবে উঁচু হয়ে আছে, যেন দুটো ডানা মেলে ধরেছে। তামাটে চুলে কতদিন যে তেল পড়েনি তার ইয়ত্তা নেই। তবু এই ব্রিজের তলায় মেয়েটা কী অকৃত্রিম হাসিতে বেঁচে আছে! ছোট্ট বিন্দিকে কেউ কাজে নেয় না সে শিশু বলে, আর বৃদ্ধ স্বপন খুড়োকেও বুড়ো বলে কেউ কাজ দেয় না। দুনিয়াতে তাদের কোনো দাম নেই।
গলাটা ধরে এলেও নিজেকে সামলে স্বপন খুড়ো বললেন, "তবে তো হয়েই গেল রে বিন্দি... ওরকম মানুষ রোজ রোজ কই আসবে? তার চেয়ে বরং এক কাজ কর... আমি বাঁশি বাজাই, আর তুই ঘুমা... ঘুমা! বাঁশির সুর বড় পবিত্র, কেমন খালি পেটেও ঘুম এসে যায়। দেখবি কত রকমের স্বপন তোর চোখে আইসা জড়ো হবে।"
“সুখের স্বপন না দুঃখের?”
“সুখ? সুখ যে কারে কয় তা সকল অভাগাই বোধহয় গালে হাত দিয়া ভাবে। যার পকেট ভর্তি টাকা সেও ভাবে, আবার যার খালি প্যাট সেও ভাবে। সুখি হওয়া যে বড়ই কঠিন, ও তুই বুঝবি নে। এখন ঘুমা দিকি।”
বিন্দি আর কথা বাড়াল না। রাস্তার ধারে যেটুকু ছায়া পাওয়া যায়, সেটুকুর মধ্যেই নিজের ছোট্ট জীর্ণ শরীরটা গুটিয়ে নিয়ে শুয়ে পড়ল।
স্বপন খুড়ো নিজের শুকনো ঠোঁটে পুরোনো বাঁশিটা চেপে ধরলেন।
বাতাসে ভেসে এলো এক অদ্ভুত করুণ সুর। সে সুর যেন কেবল ঘুম পাড়ায় না, সব ক্লান্তি আর পেটের জ্বালাকে ভুলিয়ে দেয়। বাজাতে বাজাতেই বৃদ্ধের চোখের কোণ বেয়ে দু-ফোঁটা নোনা জল গড়িয়ে পড়ল শুকনো গাল দুটো দিয়ে। বিন্দি হয়তো জানে না, এটাই স্বপন খুড়োর শেষ বাঁশি বাজানো।
অনেক দিন আগে এক মহাপুরুষ যে তাকে বলেছিলেন—যেদিন তার বাঁশির সুর সত্যি সত্যি ঘুমপাড়ানি গান হয়ে উঠবে, সেদিন নাকি তার মুক্তি। জীবনের এত বড় ভার, এই অনাহার আর দেশহীনতার যন্ত্রণা সে আর সইতে পারছিল না। কত লোককে সে প্রতিদিন ধরে ধরে বলেছে, "একটা স্বপ্ন কিনবে? মধুর স্বপ্ন?" সবাই হেসে উড়িয়ে দিয়েছে, গালি দিয়েছে, বিশ্বাস করেনি। কিন্তু এ যে শিশু তাই বড়ই সরল। খালি পেটেও সে স্বপ্ন কিনতে চেয়েছিল। আজ এই বাঁশিটাই তাকে উপহার দিয়ে যাবে নয়।
রাস্তার ধারে বিন্দি তখন একটু একটু করে তলিয়ে যাচ্ছে মিষ্টি এক ঘুমের দেশে। আর তার পাশে বসে স্বপন খুড়ো বাজিয়ে চলেছেন তাঁর মুক্তির শেষ সুর... আজ তাঁর একবারে চিরকালের মুক্তি।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।