অনেকদিন ধরে ভাবছিলাম এক জ্যোতিষীর কাছে হাত দেখাবো। বইমেলায় আমার লেখা বইগুলো কিরকম বিক্রি হবে জানার জন্যে। কিন্তু জ্যোতিষিদের দক্ষিনা শুনে ভয় পাচ্ছিলাম। কেননা বই বিক্রির রয়্যালটি অমাবস্যার চাঁদ।

হঠাৎ করে সেদিন সুযোগ হয়ে গেলো। শীতের দুপুরে পায়চারি করতে আমাদের চুঁচুড়া মাঠের ধারে গিয়েছিলাম। পাশেই কোর্ট। দেখি কোর্টের সামনে রাস্তার ধারে এক জটাধারী সাধু বসে আছে। তার সামনে সাজানো আছে অনেক জড়িবুটি আর বিভিন্ন রকমের আংটি। একটা বড়ো ফ্লেক্সে লেখা ۔۔۔۔ হাত দেখাইয়া ভবিষ্যৎ জানুন। এক নিমেষে সব বাধা দূর করুন। মাত্র একান্ন টাকায়।

সাধু বাবাকে দেখে মনে ভক্তির উদয় হলো। বেশ গোলগাল চেহারা। আমার মতো গাল তোবড়ানো বুড়ো নয় ..। সব থেকে দৃষ্টি টানলো দক্ষিণাটা। এই বাজারে মাত্র একান্ন টাকা মজুরি। জ্যোতিষীর সামনে কোনো খদ্দের নেই ..। একমনে মোবাইল ঘাঁটছে। তার মানে আধুনিক জোতিষী।এদিক ওদিক একটু তাকালাম। যদি কোন চেনা লোক আমায় দেখে ফেলে ,অন্য কিছু ভাবতে পারে। নিশ্চিন্ত হলাম।

এবার উবু হয়ে ওর সামনে বসলাম। বাবার মুখ একেবারে নির্লিপ্ত। তার মানে খদ্দের দেখেও যার মনে লালসা নেই , সে কিছুটা হলেও খাঁটি।

মেয়েলি স্বরে বলে ওঠে। " এই বয়সে হাত দেখাবি ? এখনও ভবিষ্যৎ জানার ইচ্ছে আছে ? " ۔۔ যাহ শালা , এ আবার কেমন জ্যোতিষী ? কোথায় খদ্দের -কে খাতির করবে ! তা নয় ۔۔۔ভাগাতে চাইছে ? একান্ন টাকার জ্যোতিষীর আবার বেশি ঢং ! বলবে তো উল্টো পাল্টা!

" বিশেষ একটা কথা জানতে চাই। " চাপা গলায় বললাম। মনে মনে জানি টাকাটা বেকার যাবে।

" অতীত ,বর্তমান ,না ভবিষ্যৎ ? আগে সে কথাটা বল ...। " -- এতো দেখছি তুই তোকারি করে চলেছে। আমার থেকে ও অনেক ছোট। বেশি ভড়ং ! " অতীত জানলে , দুশো টাকা। বর্তমান একশো। আর ভবিষ্যৎ একান্ন। "

যাক , একান্নর ওপর দিয়ে যাবে। দেখি আমার প্রশ্ন শুনে কি উত্তর দেয়। তবু জিজ্ঞেস করলাম।

" এরকম রেট কেন ? " গোঁফের ফাঁক দিয়ে অল্প হাসলো ।

" অতীতের রেট বেশি। কেননা তুই আমার উত্তরের মাঝেই সত্যি মিথ্যে মিলিয়ে নিতে পারছিস। বর্তমান একটু কম। কারণ তোর পোশাক আর মুখের চেহারা দেখে আন্দাজে কিছুটা বলে দেওয়া যায়। আর ভবিষ্যৎ ? সে তো ইজি । তোকে অপেক্ষায় থাকতে হবে। " -- এ দেখছি বেশ স্পষ্ট বক্তা। কিন্তু এরকম বললে আর্ধেক খদ্দের আগেই ভেগে যাবে। মনে হয় মাথায় কিছু ছিট্ আছে। দোটানায় পড়লাম। টাকাটা একেবারে জলে যাবে মনে হচ্ছে। এদিকে উবু হয়ে বসে থেকে কোমর টনটন করছে।

ও পাশ থেকে ছোট একটা কাঠের পিঁড়ি এগিয়ে দিলো। বুঝলাম ব্যাথার চিহ্ন বোধহয় মুখে ছাপ ফেলেছে। পিঁড়িতে বসলাম।

" একান্ন টাকা। " আমি বলে উঠলাম। ওর মুখটা এই প্রথম ব্যাজার হলো।

" ভবিষ্যৎ ۔۔। " জ্যোতিষী বিড়বিড় করলো। এই সময় ওর মোবাইল বেজে উঠলো। আধুনিক হস্ত রেখা বিশারদ। দু মিনিট কথা বলে রেখে দিলো।

আমার ডান হাতটা টেনে নিলো। " তোর লেখা গল্পের বই কেমন চলবে জানতে চাইছিস তো ? " ওর প্রশ্ন শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছি না ! এ কি কোন অন্তর্যামী ? এরকম ভেক ধরে এখানে বসে আছে ? নাহলে আমার মনের কথা জানলো কি ভাবে ? আমার দু চোখে বিস্ময় দেখে ۔۔۔জটাধারী মৃদু হাসলো।

" মনের মাঝে সন্দেহের ভূত এবার গেছে ? জানবি বেশি দক্ষিনা নিলেই সে আগ মার্কা জ্যোতিষী হয়ে যায় না।" এখন ওর কথাগুলো অত খেলো মনে হচ্ছে না। বরং একটা সমীহ জাগছে।

আমার থেকে বয়সে ছোট হলেও আপনি করে বললাম।

" আপনি সঠিক বলেছেন। প্রথমে এইরকম জায়গায় বসে থাকতে দেখে মনে একটা অবজ্ঞার সৃষ্টি হয়েছিল। ভুল করেছিলাম। " অনুতপ্ত গলা আমার। ও জবাব না দিয়ে আমার হাতটা খুঁটিয়ে দেখে চললো। তিন মিনিট বাদে আমার দিকে তাকিয়ে বললো।

" তোর চিন্তা নেই। এগিয়ে যা। সফলতা আসবে। " আমার হাত ছেড়ে দিলো। এই সময় আরেকজন খদ্দের এসে উপস্থিত হলো। উঠে দাঁড়ালাম। পকেট থেকে টাকা বার করে ওর হাতে দিলাম।

" আমি আবার কাল আসবো। আরও কিছু জানার আছে। "

" কাল নয়। আগামী শনিবার আবার এখানে এসে বসবো। তুই শনিবার আসিস। সঙ্গে তোর জন্ম কুন্ডলি নিয়ে আসবি। তাহলে আরও ভালো ভাবে সবকিছু বলে দেবো। " দু হাত জোড় করে প্রণাম করে বাড়ির রাস্তা ধরলাম। মনে একরাশ চিন্তা। এর আগে কোনদিন এদিকে আসিনি। একেও আমি চিনি না। তাহলে ও জানলো কি করে, আমি গল্প লিখি ? এ কি করে সম্ভব ? আমি পুরো অবিশ্বাস নিয়ে ওকে হাত দেখিয়েছিলাম। একটা কথায় জ্যোতিষী আমাকে বিশ্বাসের বন্ধনে বেঁধে ফেললো।

আজ বাড়ি গিয়ে আগে জন্ম কুণ্ডলী বার করতে হবে। অবশ্য বউ-কে লুকিয়ে। না হলেই শুরু হয়ে যাবে প্রশ্নের ঝড়। মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে, কুণ্ডলী দেখে না জানি আরও কত কি বলবে ওই জ্যোতীষী !

রাত্রিবেলা বউ শুয়ে পড়ার পর পা টিপে টিপে দালানে এলাম। এবার আলমারিটা আস্তে আস্তে খুললাম। এখানেই সেই অমূল্য সম্পদ রাখা থাকে। যার সাহায্যে আমার ভবিষ্যতের দরজা খুলে দেবে সেই রাজ জ্যোতিষী। কিন্তু একি কান্ড ? সবাইয়ের ঠিক্যুজি কুষ্ঠি রয়েছে। আর আমার-টাই হাপিস ! এই হলো আমার ভাগ্য ! দরকারে কিছু পাবো না। সব তাকগুলো হাঁটকাচ্চি ۔۔۔۔। শালা কপালে ঘাম দেখা দিলো। তবু মিললো না। হতচ্ছাড়া কুণ্ডলী, কোথায় কুণ্ডলী পাকিয়ে লুকিয়ে আছে কে জানে ? এ নিশ্চয়ই বউয়ের গোছানো।

এই সময় ঘাড়ের কাছে কারোর গরম নিঃস্বাশ পড়লো ! ভয়ে চমকে উঠে পিছু তাকালাম। যা ভয় করেছিলাম তাই ! গিন্নির চোখ দুটোতে রাজ্যের প্রশ্ন কিলবিল করছে। জানি এখুনি ফায়ারিং শুরু হয়ে যাবে।

" কি ব্যাপার তোমার ? এই রাত দুপুরে চোরের মতো আলমারি খুলে কি খুঁজছো ? " -- মিনমিন করে বললাম।

" আমার জন্ম কুণ্ডলী ۔۔۔۔। " উত্তর শুনে ওর চোখ দুটো আরও গোলগোল হয়ে উঠলো।

" ভূতের গল্প লিখে লিখে লোকটার মাথা খারাপ হয়ে গেলো নাকি ? " -নিজের মনে বিড়বিড় করে কথাগুলো ও বললো। ওর চোখে ঘুমের ভাবটা কেটে গেলো। বোধহয় ভেবে পাচ্ছে না, এতো রাতে আমি ওই কুণ্ডলী নিয়ে কি রাজকার্য করবো ?

" কি করবে ওটা নিয়ে ? " ۔۔ পড়ে গেলাম বিপদে। এখন আসল কথা না বলে উপায় নেই। কারণ কোন বানানো কথা মাথায় আসছে না। যতই আমি লেখক হই না কেন ?

" একজন খাঁটি জ্যোতিষীর সন্ধান পেয়েছি। আজকে ওনার একটা কথা শুনেই আমার চোখ খুলে গেছে। " - স্ত্রী শ্রাবণীর মুখটা একেবারে গোল পান্তুয়ার মতো হয়ে গেলো। আসলে ওর কল্পনার বাইরে কথাগুলো ওকে ক্রমশ অবাক করে দিচ্ছে।

" জ্যোতিষী ! তাকে আবার কোথা থেকে পেলে ? " এবার আমি সব কথা ওকে খুলে বললাম। ওর চোখেও উৎসাহ দেখলাম। আসলে বেশির ভাগ লোকেরই ভাগ্য জানার কৌতূহল থাকে।

" কি বলছো তুমি ? মুখ দেখে লেখক , বলে চিনে ফেললো ? এই শুনছো , এবারে আমাকে সঙ্গে করে নিয়ে যেতে হবে। আমার ভাগ্যটা জেনে আসবো। " ওর কণ্ঠে আবদারের সুর।

" সে হবে'খন। আগে কুণ্ডলী-টা বার করো দিকি। " অনেক খুঁজে রাত সাড়ে এগারোটা নাগাদ আমার শতছিন্ন কুন্ডলী আলমারির এক কোন থেকে ও বার করে দিলো। লেখাগুলো পর্যন্ত অস্পষ্ট হয়ে গেছে। রাগ হয়ে গেলো। এ যেন গুপ্তধন খোঁজার পাঁচশো বছরের পুরোনো কাগজ হয়ে গেছে। এ থেকে জ্যোতিষী কিছু উদ্ধার করতে পারবে ?

" আমার কোন জিনিসে তোমার যত্ন নেই দেখছি। " আমার মুখে রাগের চিহ্ন। তাই দেখে , ও নরম স্বরে বললো।

" আমার কি দোষ বলো ? তোমায় তো বলেছিলাম , নতুন একটা ঠিকুজি করিয়ে দিই। তুমি বললে -- ওসব ফালতু। মানুষের কর্মের ওপর ফল নির্ভর করে। " - মনে পড়ে গেলো। বেশ কয়েক বছর আগে ও বলেছিলো কথাটা ..।

" ঠিক আছে, ঠিক আছে। আমার ভাগ্যের ￰বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গে রাত বারোটা বাজতে চললো। শুয়ে পড়ি চলো। " ￰খাটে শুয়ে ও মৃদু কণ্ঠে বললো।

" তুমি দেখো, ভালো জোতিষী- রা ওই দেখেই সব বলে দিতে পারবে। " পাশ ফিরে বললাম।

" তাই যেন হয়। আগে আমি দেখিয়ে আসি। তারপর তোমায় নিয়ে যাবো। " চোখে ঘুম নেমে এলো।