পঁচাত্তর বছর বয়সী নিরুপমা দেবী আজ মৃত্যুশয্যায়। জীবনের অন্তিম প্রহরে এসে তাঁর চোখের কোণে দুই ফোঁটা জল স্পষ্ট ফুটে উঠেছে। ঘরের চারিদিকে আত্মীয়-স্বজনের ভিড়, সবার থমথমে মুখ। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে, সবার সামনে, একমাত্র পুত্রবধূ সুরঞ্জনার হাত দুটো আকুল হয়ে আঁকড়ে ধরলেন তিনি। কাঁদো কাঁদো গলায় গ্লানিময় কণ্ঠে বলে উঠলেন—

"আমাকে ক্ষমা করে দিও বৌমা! তোমার ওপর অনেক অন্যায়... অনেক অবিচার করেছি এতদিন। তুমি কেবল নীরবে সব অত্যাচার সহ্য করে গেছো। এক দিনের জন্যেও মুখে কোনো প্রতিবাদ করোনি। আমার অপরাধের কি কোনো মাফ নেই !"

​শাশুড়ির জীর্ণ হাত দুটো নিজের দুই হাতের মাঝে চেপে ধরে মৃদু কণ্ঠে উত্তর দিল সুরঞ্জনা।

"এই সময়ে এসব কথা বলে আমাকে পাপের মধ্যে ফেলবেন না মা। আপনি আমার থেকে সম্মানে, বয়সে অনেক বড়ো... মাতৃসমা। আমি বিশ্বাস করি, আমাদের ভালোর জন্যেই যা কিছু করার বা বলার আপনি করেছিলেন।"

​সুরঞ্জনার ঠোঁটে তখন এক অচেনা ও কৃত্রিম সৌজন্যের হাসি। কিন্তু তার চোখের গভীরে ফুটে উঠল এক করুণ, গাঢ় অন্ধকার। মনে মনে সে এক দীর্ঘশ্বাসের সাথে বলতে লাগল—

' ​এই অনুশোচনা আর উপলব্ধিটা যদি আজ থেকে কিছু বছর আগে হতো আপনার! তবে আমার জীবনের সোনালী বছরগুলো এভাবে একটা অন্ধকার খাঁচার ভেতরে বন্দি হয়ে কাটত না। অন্ধকারের সেই কারাগার থেকে আমার হারিয়ে যাওয়া সব স্বপ্ন, আমার যৌবনের সোনালী দিনগুলো কি আর কোনোদিন ফেরত পাবো? সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর এই কান্না আর অণুশোচনার মূল্য ঠিক কতটুকু"?

​নিরুপমা দেবী চোখ বুজলেন। চারপাশ কান্নায় ভেঙে পড়ল, কিন্তু সুরঞ্জনা কেবল শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

​আসলে, সময় চলে যাওয়ার পর অনুশোচনা, উপলব্ধি কিংবা প্রায়শ্চিত্তের আলো জ্বললেও তা কেবল বিজড়িত অতীতকেই স্পর্শ করে। নষ্ট হয়ে যাওয়া জীবনকে ফিরিয়ে দিতে পারে না। সুরঞ্জনার মনের এই প্রশ্ন আর ক্ষোভ সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত। শাশুড়ির প্রতি শেষ কর্তব্যে ও বাক্যে সে শালীনতা ও বিনয় বজায় রাখলেও, নিজের প্রতি হওয়া দীর্ঘ তিন দশকের অবিচারের যন্ত্রণা এবং হারিয়ে যাওয়া জীবনের আফসোস তাকে একবিন্দু ভুলিয়ে দিতে পারে নি—কারণ বিলম্বে আসা অনুশোচনা ক্ষত ঢাকতে পারে, কিন্তু ক্ষতচিহ্ন মুছে ফেলতে পারে না।