ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফোটেনি। রাধাপুর গ্রামের বাঁশঝাড়ের মাথা চিরে একটা হালকা কুয়াশার চাদর নেমে এসেছে মাটির উঠোনে। চরাচর জুড়ে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, যা কেবল মাঝেমধ্যে কোনো অচেনা পাখির ডানার ঝাপটানি বা দূরে বিলের জলে মাছের খিলানিতে বিঘ্নিত হচ্ছে। সত্তর বছর বয়সী অবিনাশ সূত্রধর বারান্দার এক কোণে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছেন। তাঁর গায়ের চাদরটা বড্ড পুরনো, তাতে অনেক জায়গায় সুতো আলগা হয়ে গেছে, যেন তাঁরই জীবনের মতো সময় তাকে ক্ষয়ে দিয়েছে। তাঁর সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অজস্র অদ্ভুত জিনিস—শুকনো শিউলি পাতা, পুরনো সুতির শাড়ির পাড়, নারকেলের মালা, তামার কুচি আর কিছু কাঁচের ভাঙা টুকরো। এই বস্তুগুলো আপাতদৃষ্টিতে জঞ্জাল মনে হলেও, অবিনাশের কাছে এগুলো এক একটি বিস্মৃত ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
অবিনাশের হাত দুটো বার্ধক্যজনিত কারণে কাঁপছে, কিন্তু তাঁর আঙুলের ডগায় এক অদ্ভুত জাদু রয়েছে। তাঁর চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত স্থিরতা, যা দেখে মনে হয় তিনি পৃথিবীর কোলাহল থেকে বহুদূরের কোনো জগতে বাস করছেন। তিনি একটা পুরনো, মলিন কাঠের পুতুলের বুকে তামার একটা সরু তার পরম মমতায় পেঁচিয়ে দিচ্ছেন। পুতুলটার মুখটা চেনা চেনা। অবিনাশ ফিসফিস করে বললেন, "কী রে সুধা? আজ কি তোর গলাটা বড্ড ভারী? মেঘ করেছে বুঝি আকাশে?"
আশ্চর্যের বিষয়, পুতুলটি কোনো সাধারণ যান্ত্রিক পুতুল নয়। কিন্তু অবিনাশ যখনই তার সুতোয় আলতো করে টান দিলেন, পুতুলের ভেতর থেকে একটা মৃদু, খসখসে খাটখাট শব্দ হলো। ঠিক যেন কোনো পুরনো গ্রামোফোন রেকর্ড ঘুরতে শুরু করেছে। অবিনাশ চোখ বন্ধ করলেন। তাঁর জীর্ণ মুখের চামড়ায় এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তিনি যেন বর্তমানে নেই, চলে গেছেন তিরিশ বছর আগের কোনো এক পড়ন্ত বিকেলে, যেখানে সুধাময়ী চুড়ি ঠিক করতে করতে এক গাল হেসেছিল। সেই দিনের রোদেলা বিকেলের স্মৃতিগুলো যেন পুতুলের গলার আওয়াজে নতুন করে জীবন্ত হয়ে উঠছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে গ্রামের মেঠো পথ ধরে হেঁটে আসছিল নীল। তার কাঁধে একটা ভারী ব্যাগ, পিঠে ট্রাইপড আর হাতে একটা লম্বা বুম মাইক্রোফোন (Boom Mic), মাথায় বড় হেডফোন। নীল এসেছে এই অঞ্চলের বিলুপ্তপ্রায় শব্দগুলোকে ধরে রাখতে—ঝাঁঝিঁ পোকার ডাক, ভোরের পাখির ডানা ঝাপটানো, আর খালের জলে ডিঙি নৌকার বৈঠার ছলাৎ ছলাৎ শব্দ। অবিনাশের বাড়ির সামনে এসে নীল থমকে দাঁড়াল। তার হেডফোনে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এসেছে। সেটা কোনো সাধারণ পাখির ডাক নয়, আবার কোনো চেনা বাদ্যযন্ত্রের সুরও নয়। এটা যেন একটা মানুষের দীর্ঘশ্বাস, যা কোনো কাঠের বুক চিরে বেরিয়ে আসছে। এই অদ্ভুত সুরটি নীলের পেশাদার কানের ভেতর এক প্রচণ্ড কৌতুহলের শিহরণ জাগাল।
নীল ধীর পায়ে উঠোনে এসে দাঁড়াল। "দাদু, আসতে পারি?"
অবিনাশ চোখ খুললেন না। শুধু হাতের সুতোটা আলতো করে ছেড়ে দিয়ে বললেন, "শহরের মানুষ বড্ড বেশি শব্দ নিয়ে ঘোরে বাবা। একটু শান্ত হয়ে বসো। শব্দরা ভয় পেয়ে পালিয়ে যাবে।"
নীল গত দুদিন ধরে অবিনাশের বাড়িতেই আস্তানা গেড়েছে। গ্রামের মানুষ তাকে বারণ করেছিল। চায়ের দোকানের খগেন বলেছিল, "ওরে বাবা, ওই বুড়ো পাগলের ওখানে আছো? ও তো মানুষ নয়, ভূতের সাথে কথা বলে! মাঝরাতে ওর ঘর থেকে মরা মানুষের গলা শোনা যায়।" কিন্তু নীল একজন আধুনিক যুক্তিবাদী ছেলে। সে এসব কুসংস্কারে বিশ্বাস করে না। তবে অবিনাশের প্রতি তার এক তীব্র কৌতুহল তৈরি হয়েছে।
দুপুরের কড়া রোদে চারিদিক নিঝুম। অবিনাশ নীলকে এক বাটি মুড়ি আর নারকেল নাড়ু দিলেন। নীল তার রেকর্ডারটা অন করে জিজ্ঞেস করল, "দাদু, আপনার এই পুতুলনাচের দলটা কবে বন্ধ হলো?"
অবিনাশ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘরের কোণের দিকে তাকালেন। সেখানে একটা বড় কাঠের বাক্স ধুলো জমে পড়ে আছে। "পুতুলনাচ তো শুধু নাচ নয় রে পাগল, ওটা ছিল মানুষের সুখ-দুঃখের কথা। আজ থেকে তিরিশ বছর আগেও যখন এই গাঁয়ে বিদ্যুৎ আসেনি, মানুষ লণ্ঠনের আলোয় রাত জেগে আমার পুতুলনাচ দেখত। সীতার বনবাস দেখে চোখের জল ফেলত, আর হরিশ্চন্দ্রের গল্প শুনে দান ধ্যান করত। তারপর একদিন ঘরে ঘরে ওই চৌকো বাক্সটা (টেলিভিশন) এলো। মানুষ আমার কাঠের পুতুলদের ভুলে গেল। ভাবল, ওগুলোর কোনো প্রাণ নেই।"
নীল পুতুলগুলোর দিকে এগিয়ে গেল। সে লক্ষ্য করল, অবিনাশের তৈরি পুতুলগুলো বাজারের সাধারণ পুতুলের মতো নয়। একেকটা পুতুলের গায়ে জড়িয়ে আছে কোনো পুরনো চাদরের টুকরো, কোনোটার গলায় একটা ভাঙা পিতলের মাদুলি। প্রতিটি পুতুলের গঠনভঙ্গিতে যেন এক অদ্ভুত যন্ত্রণা ও মমতা মিশে আছে।
"আপনি এগুলো কী দিয়ে বানান দাদু?" নীল জিজ্ঞেস করল।
অবিনাশ হাসলেন। তাঁর চোখে একটা রহস্যময় চকমকি আলো। "এগুলো কাঠ-মাটি দিয়ে তৈরি নয় নীল। এগুলো তৈরি হয়েছে 'মানুষের ফেলে যাওয়া নিশ্বাস' দিয়ে। এই যে পুতুলটা দেখছিস, এটার গায়ে যে কাপড়ের টুকরোটা আছে, ওটা আমার সুধাময়ীর বিয়ের শাড়ির আঁচল। আর ওই যে ছোট পুতুলটা, ওটার বুকে যে তামার কয়েনটা আছে, ওটা আমার ছেলে আকাশের প্রথম উপার্জনের পয়সা। ও যখন পাঁচ বছর বয়সে মেলা থেকে হারিয়ে গিয়েছিল, তখন এই কয়েনটা ওর পকেটে ছিল।"
নীল অবাক হয়ে শুনছিল। সে লক্ষ্য করল, অবিনাশ যখনই 'সুধাময়ী' পুতুলটার সুতো নাড়ছেন, তখন বাতাসে একটা চেনা চেনা গন্ধ ভেসে আসছে—পুরনো আলমারিতে রাখা কাপড়ের গন্ধ, আর রোদে শুকানো শিউলি ফুলের গন্ধ। নীল তার হেডফোনটা কানে লাগাল। সে অবিনাশের অজান্তেই বুম মাইক্রোফোনটা পুতুলটার মুখের কাছে ধরল।
হঠাৎ নীলের গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। হেডফোনের ভেতরে সে একটা অতি সূক্ষ্ম, ফিসফিসে নারীকণ্ঠ শুনতে পেল—*"ওগো, শুনছ? আকাশকে আজ একটু তাড়াতাড়ি খাইয়ে দিও, ওর বড্ড জ্বর।"*
নীল চমকে উঠে হাত থেকে মাইক্রোফোনটা প্রায় ফেলেই দিচ্ছিল। সে অবিনাশের দিকে তাকাল। অবিনাশ শান্ত মুখে পুতুলটার চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। নীল বিড়বিড় করে বলল, "এ... এটা কীভাবে সম্ভব? এটা তো অলৌকিক!"
নীল ঘুমাতে পারছিল না। তার ল্যাপটপে সে অডিও ফাইলটা নিয়ে বসেছে। সে ফ্রিকোয়েন্সি অ্যানালাইজার (Frequency Analyzer) সফটওয়্যার দিয়ে অবিনাশের ঘর থেকে রেকর্ড করা শব্দটা বিশ্লেষণ করছে। স্ক্রিনের ওপর লাল-নীল শব্দের তরঙ্গগুলো (Sound Waves) অদ্ভুত এক জ্যামিতিক নকশা তৈরি করছে।
সাধারণত কোনো পুরনো অডিও রেকর্ড বা টেপ থাকলে তার একটা নির্দিষ্ট ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ (Hiss) থাকে। কিন্তু এই শব্দটার কোনো ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ নেই। এটা যেন সরাসরি বাতাস থেকে তৈরি হচ্ছে! নীল তার ব্যাকপ্যাক থেকে একটা থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা আর ডিজিটাল মাইক্রোস্কোপ বের করল। সে মাঝরাতে চুপিচুপি অবিনাশের কাজের ঘরে ঢুকল।
ঘরটা অন্ধকার। শুধু চাঁদের আলো জানলা দিয়ে এসে পড়েছে পুতুলগুলোর ওপর। নীল সুধাময়ী পুতুলটার কাছে গেল। সে তার ডিজিটাল মাইক্রোস্কোপ দিয়ে পুতুলটার বুক এবং গলার অংশটা পরীক্ষা করতে লাগল। যা দেখল, তাতে নীলের চোখ কপালে উঠল।
পুতুলের গলার ভেতরে কোনো সাধারণ সুতো বা কাঠের জয়েন্ট নেই। সেখানে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সাজানো রয়েছে এক ধরনের বিশেষ অনুনাদক বা রেজোনেটর (Resonator)। অবিনাশ গ্রামীণ কিছু উপাদান—যেমন শুকনো বাঁশের ভেতরের পাতলা পর্দা, মৌচাকের মোম, আর তামার সরু তার এমন এক জ্যামিতিক কোণে স্থাপন করেছেন, যা একটি প্রাকৃতিক স্পিকার এবং সাউন্ড রিসিভারের মতো কাজ করছে!
আরও আশ্চর্যের বিষয়, পুতুলের গায়ে জড়ানো কাপড়ের ফাইবারগুলোর মধ্যে মানুষের শরীরের ঘাম, তেল এবং ত্বকের মৃত কোষের অবশিষ্টাংশ আটকে আছে। আধুনিক বিজ্ঞানে একে বলা হয় 'বায়ো-অ্যাকোস্টিক মেমোরি' (Bio-acoustic Memory)। কোনো মানুষ যখন কোনো কাপড় দীর্ঘদিন ব্যবহার করে, তখন তার কণ্ঠস্বরের নির্দিষ্ট কম্পনাঙ্ক বা ফ্রিকোয়েন্সি সেই কাপড়ের তন্তুর মধ্যে এক ধরণের সূক্ষ্ম চৌম্বকীয় বিন্যাস তৈরি করে। অবিনাশ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই, সম্পূর্ণ সহজাত লোকজ্ঞানের মাধ্যমে এমন এক প্রযুক্তি আবিষ্কার করেছেন, যা সেই কাপড়ের তন্তু থেকে শব্দতরঙ্গকে পুনরুত্পাদন (Regenerate) করতে পারে!
"তুমি একে জাদু ভাবছ তো নীল?"
হঠাৎ দরজার গোড়ায় অবিনাশের কণ্ঠস্বর শুনে নীল লাফিয়ে উঠল। অবিনাশের হাতে একটা লণ্ঠন। তাঁর মুখে কোনো রাগ নেই, শুধু এক বিষণ্ণ হাসি।
নীল থতমত খেয়ে বলল, "দাদু... আপনি... আমি দুঃখিত। কিন্তু এটা তো অবিশ্বাস্য! আপনি যা তৈরি করেছেন, তা পৃথিবীর বড় বড় সাউন্ড ইঞ্জিনিয়াররা ল্যাবরেটরিতে বসেও তৈরি করতে পারেনি। এটা এক অনন্য লোকবিজ্ঞান (Indigenous Science)! আপনি কীভাবে জানলেন যে এই উপাদানগুলো এভাবে জুড়লে পুরনো শব্দ ফিরে আসে?"
অবিনাশ লণ্ঠনটা টেবিলে রাখলেন। "আমি বিজ্ঞান বুঝি না রে বাবা। আমি শুধু জানি, এই মহাবিশ্বে কোনো শব্দ কখনো হারিয়ে যায় না। আমরা যা বলি, যা গাই, তা এই বাতাসে, এই মাটিতে, আমাদের পোশাকে ধাক্কা খেয়ে ঘুরে বেড়ায়। মানুষ যখন চলে যায়, তখন তার স্মৃতিগুলো এই জড় বস্তুগুলোর মধ্যে আটকে থাকে। আমি শুধু তাদের একটু মুক্তির পথ করে দিই। সুধাময়ী যখন মারা গেল, এই ঘরটা বড্ড নিঝুম হয়ে গিয়েছিল। আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। একদিন ওর ব্যবহৃত ওই পুরনো শাড়িটা জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম। হঠাৎ মনে হলো, শাড়ির খাঁজ থেকে সুধার গলার আওয়াজ আসছে। তারপর থেকেই আমি এই শব্দের সন্ধান শুরু করি।"
নীল উত্তেজনায় কাঁপছিল। "দাদু, আপনি বুঝতে পারছেন না আপনি কী করেছেন! আজ সারা পৃথিবী এআই (AI) দিয়ে মানুষের কণ্ঠস্বর নকল করছে। কিন্তু সেটা তো কৃত্রিম, প্রাণহীন। আর আপনার এই পুতুলগুলো আসল মানুষের স্মৃতির তরঙ্গ ধরে রাখছে। আমি আপনার ওপর একটা আন্তর্জাতিক ডকুমেন্টারি বানাব। পুরো পৃথিবী জানবে 'শব্দের কারিগর' অবিনাশ সূত্রধরের কথা!"
অবিনাশ শান্তভাবে বললেন, "পৃথিবীকে জানিয়ে কী হবে নীল? যে শোনার, সে তো শোনে না।"
দুপুর নাগাদ গ্রামের রাস্তায় একটা বড় কালো রঙের বিলাসবহুল গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নামল এক ভদ্রলোক—দামী সানগ্লাস, স্যুট-বুট পরা। সে আর কেউ নয়, অবিনাশের ছেলে আকাশ। আকাশের সাথে এসেছে কিছু রিয়েল এস্টেট ডেভেলপার।
আকাশের এই গ্রামে আসার উদ্দেশ্য কোনো আবেগ বা বাবার প্রতি ভালোবাসা নয়। সে এসেছে গ্রামের এই পৈত্রিক জমি এবং পুরনো চণ্ডীমণ্ডপটা বিক্রি করে দিতে। শহরের এক প্রোমোটার এখানে একটি আধুনিক রিসোর্ট বানাতে চায়।
উঠোনে এসে আকাশ তার বাবাকে দেখে শুকনো মুখে বলল, "বাবা, তোমাকে কতবার বলেছি কলকাতায় আমার ফ্ল্যাটে চলে চলো। ওখানে এসি আছে, কাজের লোক আছে। এই ভাঙা বাড়িতে একা একা পুতুল নিয়ে পাগলামি করার কী মানে? এই দেখো, আমি সব পেপারস রেডি করে এনেছি। তুমি সাইন করে দাও। এই জমির অনেক ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।"
অবিনাশ চুপ করে বসে রইলেন। তাঁর চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। তিনি আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুই এই চণ্ডীমণ্ডপটা বিক্রি করে দিবি আকাশ? যেখানে তোর মা তোর হাত ধরে হাঁটতে শিখিয়েছিল? যেখানে বসে তুই প্রথম বর্ণপরিচয় পড়েছিলি?"
আকাশ বিরক্ত হয়ে বলল, "ওসব পুরনো আবেগ দিয়ে বর্তমান চলে না বাবা! প্র্যাক্টিক্যাল হও। এই জঙ্গলটার এখন কোনো মূল্য নেই।"
নীল আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, "আকাশবাবু, আপনি আপনার বাবাকে পাগল ভাবছেন? আপনি জানেন উনি কী আবিষ্কার করেছেন? ওনার এই কাজটার মূল্য কোটি কোটি টাকা! উনি চাইলে আজ পৃথিবীর যেকোনো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রধান হতে পারতেন।"
আকাশ নীলকে দেখে উপহাসের হাসি হাসল। "আপনি কে মশাই? কলকাতা থেকে আসা কোনো ফিল্মমেকার? ওনার এই কাঠে-পোকা-লাগা পুতুলগুলোর মূল্য কোটি টাকা? দয়া করে আমার পারিবারিক বিষয়ে নাক গলাবেন না।"
অবিনাশ উঠে দাঁড়ালেন। তিনি নীলকে হাত দিয়ে থামিয়ে দিলেন। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন, "তুই সাইন চাস তো? দেব। কিন্তু তার আগে আজ রাতে তোকে আমার একটা শেষ পুতুলনাচ দেখতে হবে। তুই যদি তারপরেও এই বাড়ি বিক্রি করতে চাস, আমি নিজেই দলিলে সই করে দেব।"
আকাশ ঘড়ির দিকে তাকাল। "ঠিক আছে, আজ রাতটা আমি এই গ্রামের সার্কিট হাউজে আছি। সন্ধ্যায় আসব। আশা করি কাল সকালে সাইনটা পেয়ে যাব।"
সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে চণ্ডীমণ্ডপে আলো জ্বলে উঠল। তবে কোনো আধুনিক বিজলি বাতি নয়, অবিনাশ চারদিকে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ আর লণ্ঠন জ্বালিয়েছেন। নীল তার সমস্ত ক্যামেরা আর সাউন্ড রেকর্ডার অন করে এক কোণে বসে আছে। সে এই ঐতিহাসিক মুহূর্তটি ফ্রেমবন্দী করতে চায়।
আকাশ এসে একটা কাঠের চেয়ারে বসল। তার মুখে চরম বিরক্তি ও তাচ্ছিল্যের ভাব।
মঞ্চের পর্দা উঠল। অবিনাশ পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে সুতো ধরেছেন। মঞ্চে প্রথম প্রবেশ করল একটি ছোট পুতুল—একটা ছোট্ট ছেলে, যার হাতে একটা লাটিম। পুতুলটি মঞ্চের ওপর নাচতে শুরু করল।
হঠাৎ করেই চণ্ডীমণ্ডপের বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠল। নীল তার হেডফোনে শুনতে পেল, আর স্পিকারের মাধ্যমে পুরো উঠোনে ছড়িয়ে পড়ল এক অবিকল শিশুর হাসির আওয়াজ। আকাশ চমকে উঠল। এই হাসির আওয়াজটা তার বড্ড চেনা। এটা যেন তার নিজেরই ছোটবেলার কণ্ঠস্বর!
পুতুলের ভেতর থেকে আওয়াজ এলো—*"মা! ও মা! দেখো আমার লাটিমটা কেমন ঘুরছে! বাবা এনে দিয়েছে মেলা থেকে। আমি আর কখনো বাবার হাত ছাড়ব না মা..."*
আকাশের হাত দুটো চেয়ারের হাতলকে শক্ত করে চেপে ধরল। তার কপালে ঘাম জমতে শুরু করেছে। এই কথাগুলো সে তার মাকে বলেছিল, যখন তার বয়স ছিল মাত্র পাঁচ বছর। রাধাপুরের মেলায় সে হারিয়ে গিয়েছিল, আর অবিনাশ তাকে সারারাত খুঁজে সকালবেলা কোলে করে বাড়ি ফিরিয়ে এনেছিলেন।
এরপর মঞ্চে প্রবেশ করল দ্বিতীয় পুতুল—এক জননী, যার মাথায় সুতির শাড়ির আঁচল। পুতুলটি পরম স্নেহে ছোট পুতুলটিকে কোলে তুলে নিল। আর তখনই বাতাসে ভেসে এল সেই কণ্ঠস্বর, যা শোনার জন্য আকাশ গত বিশ বছর ধরে আকুল হয়ে আছে, কিন্তু যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ততায় যা সে ভুলে যাওয়ার ভান করেছিল।
সেটা সুধাময়ীর কণ্ঠস্বর। কোনো এআই বা রেকর্ডিং নয়, সুধাময়ীর সেই চেনা খসখসে, মায়াবী গলা—*"আকাশরে... তুই বড় চাকরি পেয়ে শহরে চলে গেলি। আমায় বলেছিলি বড় গাড়ি করে এসে নিয়ে যাবি। আমি তো চলে গেলাম রে বাপ, কিন্তু তোর বাবা আজও তোর ওই প্রথম উপার্জনের পাঁচ টাকার কয়েনটা বুকে ধরে বসে থাকে। তুই কি একবারও ওনার একাকীত্বটা দেখতে পেলি না?"*
আকাশের চোখ দিয়ে জল বাঁধ ভাঙল। সে আর চেয়ারে বসে থাকতে পারল না। সে উঠে দাঁড়াল। তার ভেতরের আধুনিক, কর্পোরেট মানুষটার অহংকার তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল। সে মঞ্চের দিকে এগিয়ে গেল।
পর্দার আড়াল থেকে অবিনাশ বেরিয়ে এলেন। তাঁর হাত দুটো কাঁপছে, চোখ দুটো লাল। আকাশ অবিনাশের পায়ের কাছে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। সে অবিনাশের জীর্ণ হাত দুটো জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে উঠল।
"বাবা... আমায় ক্ষমা করে দাও। আমি ভুল করেছিলাম। আমি এই বাড়ি, এই চণ্ডীমণ্ডপ কিচ্ছু বিক্রি করব না। এই স্মৃতিগুলোই তো আমার আসল পরিচয়।"
অবিনাশ আকাশের মাথায় হাত রাখলেন। তাঁর মুখে এক পরম তৃপ্তির হাসি। তিনি আকাশের চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে বললেন, "স্মৃতি তো ধরে রাখার জিনিস রে বাবা, বিক্রি করার নয়।"
পরের দিন সকালে চারদিকের পরিবেশটা খুব শান্ত। আকাশ তার গাড়ি আর প্রোমোটারদের বিদায় করে দিয়েছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে প্রতি মাসে গ্রামে আসবে এবং এই চণ্ডীমণ্ডপটাকে একটা লোকশিল্প কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলবে।
নীল তার সমস্ত ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েছে। সে অবিনাশের কাছে বিদায় নিতে এলো। নীল বলল, "দাদু, আমি এই ভিডিও আর অডিও রেকর্ডিংগুলো নিয়ে কলকাতায় যাচ্ছি। আমি চাই এটা নিয়ে একটা বড় স্তরে কাজ হোক। আপনি রাজি হলে বড় বড় বৈজ্ঞানিকরা আপনার এই 'সাউন্ড আর্ট' নিয়ে গবেষণা করতে পারেন।"
অবিনাশ নীলকে জড়িয়ে ধরলেন। তারপর ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে বললেন, "নীল, তুমি তো ভালো ছেলে। একটা কথা বলো তো, বিজ্ঞান কি মানুষের মনের ভেতরের শূন্যতাটা পূরণ করতে পারে? এই যে শব্দগুলো তুমি ক্যামেরায় বন্দি করলে, এগুলো যদি ইন্টারনেটে কোটি কোটি মানুষ শোনে, তবে কি এর মায়াটা থাকবে? স্মৃতি যখন যান্ত্রিক আর বাণিজ্যিক হয়ে যায়, তখন হৃদয়ের ব্যথা তার পবিত্রতা হারিয়ে ফেলে।"
নীল স্তব্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারল, অবিনাশের এই আবিষ্কার কোনো ব্যবসার জন্য নয়, কোনো খ্যাতির জন্য নয়। এটা একজন মানুষের নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার এক নীরব সাধনা। নীল অবিনাশের দিকে তাকাল, তারপর ধীর পায়ে তার ল্যাপটপের কাছে গেল।
নীল মাউসে ক্লিক করল—'Delete All Files'। সে তার রেকর্ড করা সমস্ত এক্সক্লুসিভ বায়ো-অ্যাকোস্টিক ডাটা চিরতরে মুছে দিল।
অবিনাশের মুখে এক স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। তিনি নীলকে আর্শীবাদ করলেন।
বিগত কয়েক মাস পরে নীল কলকাতার এক ব্যস্ত ট্রাফিক জ্যামে তার গাড়িতে বসে আছে। চারদিকে গাড়ির হর্ন, মানুষের চিৎকার আর আধুনিক শহরের কর্কশ কোলাহল। নীল তার পকেট থেকে নিজের ফোনটা বের করল। ফোনে কোনো ফাইল নেই, কিন্তু নীল তার হেডফোনটা কানে লাগাল এবং চোখ বন্ধ করল।
শহরের সমস্ত কোলাহল ছাপিয়ে নীলের মনের ভেতরে, তার নিজের স্মৃতি থেকে ভেসে আসতে লাগল রাধাপুর গ্রামের সেই ভোরের শিউলি ফুলের গন্ধ, মাটির সুবাস, আর একজন বৃদ্ধ শব্দের কারিগরের কাঠের পুতুলের সেই খাটখাট শব্দ—যা কোনো যান্ত্রিক রেকর্ডারে ধরা পড়ে না, যা শুধু হৃদয়ের গভীরে অনুরণিত হয়।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।