"রানিমা আপনার আহারের ব্যবস্থা সম্পন্ন হয়েছে। আমি পাশের কক্ষে আছি আপনি দ্রুত চলে আসুন…।"
কথাগুলো বলে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন এক বয়স্কা মহিলা। যাকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বললেন তিনি নিরুত্তর। খিড়কির সামনে দাঁড়িয়ে এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছেন। বাইরে প্রখর রৌদ্র। জনমানবহীন এলাকা। তপ্ত হয়ে উঠেছে প্রকৃতি। মানুষ চাতক পাখির মতো বৃষ্টির আহ্বান করছে। তবুও শান্ত হয়েই দাঁড়িয়ে আছেন সেই মহিলা। দেখে মনে হবে তিনি নিরুত্তাপ।
কিন্তু ভিতরে ভিতরে মন-টা কতটা তপ্ত হয়ে পুড়ছে সেটা বাইরে থেকে দেখে বোঝাই যাচ্ছে না।
এটা এখন প্রতিদিনের-ই রুটিন কাজ। বয়স্ক মহিলাটি তাই কোথাও না গিয়েই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ভালো করেই জানেন এখান থেকে চলে গেলে আর রানিমাকে আহার করান যাবে না। এই প্রাণটাকে বাঁচিয়ে রাখতে তার আর কোন ইচ্ছাই নেই। তিনি বেঁচে মরে আছেন। ঠিকমত আহার নিদ্রা করেন না। এই সব দিকে তাঁর ভ্রুক্ষেপ ও নেই। এই জগৎ সংসারের কোন মায়া আজ তাকে আর বিচলিত করে না। কোন কিছুতেই ইদানিং তাঁর কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।
সেই বয়স্ক মহিলা আবারও বললেন, "রানিমা আপনার আহারের ব্যবস্থা হয়েছে। দ্রুত আহার সম্পন্ন করুন বেলা যে বহে যায়।"
"তোমাকে কতবার আমি বলেছি আমাকে রানি মা বলবে না। আমি কারও রানি মা নই…।" ক্ষীণ স্বরে বললেন ভদ্র মহিলা।
মৃদু হেসে বৃদ্ধা মহিলা বললেন, " আপনি যতই বলুন আমি আপনাকে রানি মা বলেই ডাকব। যতদিন প্রাণ আছে এই মুখ দিয়ে এই শব্দই উচ্চারিত হবে। আর কিচ্ছু বের হবে না। আপনি যে আমাদের রানি মা।"
"আমি যে আর তোমাদের রানি মা নেই। এখন আমি বন্দিনী এক নারী। কোম্পানির হাতে আমি বন্দি। দীর্ঘদিন আমি এই বন্দী জীবন কাটাচ্ছি। একমাত্র মৃত্যুই আমাকে এই স্থান থেকে মুক্তি দিতে পারে। তাই আমি প্রতিদিন মৃত্যুকে আহ্বান করছি।" আবারও মৃদু স্বরে বললেন ভদ্রমহিলা।
"এই অঞ্চলের প্রতিটা মানুষ,গাছপালা,পশু-পক্ষী, নদী আজও আপনাকে রানি মা বলেই জানে। আমাদের জন্য আপনার লড়াই কোনদিন ভুলবে না আমাদের জাতি।" মৃদু হেসে বয়স্ক মহিলাটি বলল।
এবার ব্যঙ্গাত্বক একটা হাসি হেসে সেই ভদ্র মহিলা মৃদু স্বরে বলা শুরু করলেন, " আমার সময় তো প্রায় শেষ! আর কিছুদিনের মধ্যেই আমি এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যাব। নক্ষত্রদের দেশে। আমি বুঝতে পারছি প্রতিদিন আস্তে আস্তে করে আমি মৃত্যুর দিকেই এগিয়ে চলেছি। তাতেও আমি কখনও বিচলিত হয়নি। দুঃখ আমার একটাই আমার জন্মভূমিকে রক্ষা করতে পারলাম না। আমার সন্তানদের আমি রক্ষা করতে পারিনি। তাই মৃত্যুর পরেও আমার এই আক্ষেপ রয়েই যাবে।
হে দেবী তুমি আমাকে ক্ষমা কর। তেরটা বছর আমি আবাস গড়ে বন্দি। তোমার কাছে আমি যাইনি। আর হয়ত কখনও যাওয়াও হবে না। সাদা চামড়ার ঐ ইংরেজরা আমাকে মাঝে মাঝে যেতে বলেছিল। আমার প্রাণের প্রিয় কর্ণগড়ে। আমি স্বেচ্ছায় তা প্রত্যাক্ষান করেছি। ১২০ বিঘা সীমানা ছিল আমার গড়ের। আজ তা অন্যের হাতে। ওরা আমাদের জাতিকে বর্বর জংলী বলেছে।
আমাদের জন্মভূমিতেই ওরা রাজত্ব করছে। সব সম্পদ লুঠ করে নিয়ে যাচ্ছে। দেশে আর আমাদের বিদ্রোহকে বলছে চুয়ার! এই অপমান আমি মরে যাওয়ার পরেও ভুলতে পারব না। আমাদের দেশে কোম্পানি ব্যবসা করতে এসে আমাদেরকেই আজ পরাধীন করে দিয়েছে।
হে দেবী তুমি আমাকে ক্ষমা কর। আমি তো আমার জন্মভূমিকে রক্ষার জন্য সব রকম চেষ্টাই করেছিলাম। আমার নিজের কোন সন্তান নেই, আমি তো সবসময় প্রজাদেরই সন্তান ভেবেছি। আমার সম্প্রদায়ের লোধা, চুয়াড়, কুড়মি, মাঝি, ভঞ্জ এদের নিয়ে সাদা চামরাদের সাথে চোখে চোখ রেখে আমি দীর্ঘদিন লড়াই করেছি।
আমার চার'শ জনের একটা বাহিনী ওদের সরকারি অফিস লুঠ করল। ওদের রাতের ঘুম আমি কেড়ে নিয়েছিলাম। ওরা আমাকে রোজ স্বপ্নে দেখে আঁতকে উঠত। ঐ সাদা চামড়াদের আমি কখনও বিশ্বাস করিনি। ওরা শয়তান জাতি।
ওরা চতুর।
আমি তখন ঘোষনা করলাম, কেউ যদি ইংরেজদের কোনভাবে সাহায্য করে তার মৃত্যুদণ্ড হবে। আমি বুঝতে পেরেছিলাম লোভে কেউ কেউ ওদের হাতে হাত মেলাতে পারে। তীর-ধনুক, লাঠি, বল্লম, বাঁটুল,বর্শা নিয়ে গেরিলা কায়দায় ওদের সাথে যুদ্ধ শুরু করলাম। আমার লোকেরা অনেক বেশি পারদর্শী। ওরা তো কিছুই চেনে না এই জঙ্গলমহল। কিন্তু হায়! আমি শেষ রক্ষা করতে পারলাম না। ভয়ংকর আগ্রাসী রূপ নিয়েও শেষ পর্যন্ত আমি পরাজিত এক রানি। ইতিহাস আমাকে এক পরাজিত রানি হিসেবেই চিনবে!
সাদা চামরার সাহেবরা প্রজাদের ভয় পাওয়ানোর জন্য শুরু করল ভয়ংকর এক খেলা। রাতের ঘুম কেড়ে নেওয়ার জন্য বিদ্রোহীদের মৃতদেহ গাছে গাছে ঝুলিয়ে রেখে দিল। বিভৎস সেই দৃশ্য যা আজও আমি চোখ বন্ধ করলে দেখতে পাই আর শিউরে উঠি। ধুলিসাৎ করেদিল আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় কর্ণগড়। আমার প্রিয় বিশ্বস্ত সেনাপতি ওদের হাতে গ্রেপ্তার হল। যে প্রজাদের আমি সন্তানের মতো ভালোবাসতাম তারাই একদিন আমাকে ধরিয়ে দিল! আজও যে আমার বিশ্বাস করতে খুবই কষ্ট হয় গো।"
কাশতে কাশতে থামলেন ভদ্রমহিলা। চোখ অশ্রুসিক্ত হয়ে উঠল।
জলে খেয়ে একটু থেমে আবারও শুরু করলেন ভদ্রমহিলা, "তুমি তো জানো দাসী আমার স্বামী অজিত সিংহ মারা যাওয়ার পর আমি ছোট রানি হয়েও রাজ্য পরিচালনার দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলাম। বড় রানি ভবানী কখনও চাইনি রাজ্য শাসন করার দায়িত্ব নিতে। আমাদের কোন সন্তান ছিল না তাই আমি দায়িত্ব নিয়েছিলাম। চল্লিশ বছর ধরে আমি এই রাজ্য আর প্রজাদের সেবা করে গেলাম। শেষে সেই প্রজারাই আমাকে ধরিয়ে দিল! এই দুঃখ আমাকে আজও কুরে কুরে খায়। মরে গেলেও যে এই দুঃখ আমি ভুলতে পারব না। পারাং নদীর পাশে শাল,শিশু,কেন্দ,আমলকীর ঘন অরণ্যের মাঝে আমার ভালোবাসার কর্ণগড় রাজপ্রাসাদ। যারা আজ যে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাঁদছে।
কিসের জন্য যাব সেখানে? কে আছে আজ আমার? সবটাই তো আজ ইংরেজদের হাতে। আমাকে তো কলকাতার জেলেই পচে মরতে হত। নাড়াজোলের রাজা আনন্দমোহন যদি মধ্যস্থতা না করত। লজ্জা শুধুই লজ্জা। আমার জন্মভূমিতেই অন্য দেশের মানুষের হাতে আজ আমি গৃহবন্দি।
যেখানে পদে পদে বিশ্বাসঘাতকরা লুকিয়ে আছে সেখানে কাদের জন্য লড়াই করব! রাজা অজিত সিংহের ভালোবাসার রাজ্য আমার হাত দিয়েই ইংরেজদের কাছে চলে গেল। এটাই আমার কাছে চরম লজ্জার অপমানের। যাঁরা আমাকে সাহায্য করেছিল তাদের আমি কখনও ভুলতে পারব না। তাদের কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমি পাড়িনি রক্ষা করতে।
ধলভূমের জগন্নাথ সিং, কুইলাপালের সুবল সিং, ধড়কার শ্যাম গঞ্জাম সিং, রায়পুরের দুর্জন সিং, ধলভূমের বৈদ্যনাথ সিং, মঙ্গল সিং, পাঁচে, বীরভূমের গঙ্গা নারায়ণ সিং, বীরভূমের লক্ষ্মণ সিং, ধলভূমের রঘুনাথ সিং, মানভূমের রাজা মধু সিং, জুরিয়ার রাজা মোহন সিং, দুলমার লক্ষ্মণ সিং, সুন্দর নারায়ণ সিং এবং ফতেহ সিং এরা সবাই আমার পাশে ছিল। এই গৃহে বন্দি থেকেও আমি নতুন করে আর কিচ্ছু করতে পারিনি। তাই আজ মৃত্যুই আমার একমাত্র সমাধান। " বলে থামলেন ভদ্রমহিলা।
"রানি মা আমি ছোটবেলা থেকেই আপনাদের প্রাসাদে আছি। আমার মায়ের সাথে আমি প্রবেশ করেছিলাম প্রাসাদে। মায়ের মৃত্যুর পর আমি থেকে গেছি। আপনি যখন প্রাসাদে নূতন বধূ সেজে প্রবেশ করেছিলেন আজও আমার পরিস্কার স্মৃতিতে আছে। আপনাদের নুন খেয়েই আমি বড় হয়েছি। অনেক কষ্টে আপনার সেবায় আমি আবারও নিয়োজিত হয়েছি। আপনি তো জানেন মাত্র সাতদিন হল আমি এই প্রাসাদে কর্মে নিযুক্ত হয়েছি। ইংরেজরা ওদের পছন্দের লোক দিয়েই এত বছর আপনার দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিল। আপনি আমার উপর ভরসা রাখুন। সব ঠিক হয়ে যাবে।"
"তুমি অনেক দেরি করে ফেলছ দাসী আর কিছুই করার নেই। আমার ডাক যে চলে এসেছে। কিন্তু আমি বিশ্বাস করি একদিন ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আমার দেশ ছেড়ে চলে যাবে। ওরা চলে যেতে বাধ্য হবে। আমাদের দেশের তরুণ যুবক যুবতীরা ওদেরকে দেশ ছাড়া করেই ছাড়বে। সেদিনই আমার আত্মা প্রকৃত শান্তি পাবে। আমার মত হাজার হাজার বিদ্রোহী জন্ম নেবে এই দেশের ঘরে ঘরে। ওরা ইংরেজদের রাতের ঘুম কেড়ে নেবে। সর্বস্তরের মানুষ এগিয়ে আসবে হাসি মুখে মৃত্যু বরণ করবে। আমার দেশ পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত হবেই।" বলে থামলেন রানি মা তারপর আস্তে আস্তে পা বাড়ালেন পাশের কক্ষে। পিছন পিছন এগিয়ে গেল সেই বৃদ্ধা দাসী।
রানি মা আহার করছেন। দূর থেকে দেখছেন সেই বৃদ্ধা দাসী। এত বছর ধরে রানি মা-য়ের খাবারে
অল্প অল্প করে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে। আস্তে আস্তে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন প্রিয় রানি মা। হয়ত রানি মা নিজও সেটা বুঝতে পারছেন। একজন মহিলা হয়ে ইংরেজদের হাতে আটক রানিমাকে এই অপমান আরও লজ্জিত করেছে। আর যে কিছুই করার নেই দাসীর। শুধুমাত্র শেষের কটা দিন রানি মায়ের পাশে থাকতে পারলেই শান্তি। যে মানুষটা একদিন ইংরেজদের নাস্তানুবাদ করেছিল,সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে সবার বুকে সাহস সঞ্চার করেছিল,আজ সেই মানুষটাই দীর্ঘ বছর গৃহবন্দি। চতুর ইংরেজরা কোনদিন মানুষকে জানতেই দেবে না রনিমার মৃত্যুর আসল কারণ।
চোখ ঝাপসা হয়ে গেল বৃদ্ধা দাসীর। চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছা হচ্ছে। কিন্তু সেটা সে পারছে না। বিদেশি শক্তি রাজত্ব করছে। ওদের থেকে কবে মুক্তি পাবে এই মাতৃভূমি? নিঃশব্দে চোখের জল মুছল দাসী। আর দূর থেকে রানিমাকে মনে মনে প্রণাম করল। প্রতিটা ঘরে যেন জন্ম নেয় এমন একজন নারী। যারা কখনও অন্যায়য়ের সাথে আপোষ করবে না।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।