"কিছু লোকেশন মানচিত্রে থাকে,

আর কিছু লোকেশন মানুষের স্মৃতির ভেতরে।"

রাজ পাহাড় ভালোবাসত। পাহাড়ে গেলে তার মনে হতো, শহরের মানুষ আসলে যতটা ব্যস্ত, পাহাড় ততটাই নীরব। অথচ সেই নীরবতার মধ্যেই কত গল্প লুকিয়ে থাকে!

শহরের কোলাহল থেকে দূরে পাহাড়ের নীরবতা রাজকে সবসময় টানত। ভোরের কুয়াশা, পাইন গাছের গন্ধ, দূরের অচেনা পাখির ডাক—এসবের মধ্যে সে এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি খুঁজে পেত। তার মনে হতো, পাহাড় মানুষের মতো কথা বলে না ঠিকই, কিন্তু তার নীরবতারও একটা ভাষা আছে।

সেই কারণেই ছুটিতে রাজ চলে গেল উত্তরবঙ্গের এক প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলে—মেঘছায়া।

পর্যটকদের ভিড় এখনও সেখানে খুব একটা পৌঁছয়নি। পাহাড়ের গায়ে ছোট ছোট বাড়ি, পাইন আর দেবদারু গাছ, দূরে মেঘে ঢাকা পাহাড়ের সারি—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন ছবির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে।

সকালবেলায় পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়লে মনে হতো, কেউ যেন ধূসর ক্যানভাসের ওপর সোনালি রং ছড়িয়ে দিয়েছে। আবার বিকেল নামলেই সেই একই পাহাড় অচেনা হয়ে উঠত। কুয়াশা ধীরে ধীরে নেমে আসত, আর কয়েক হাত দূরের জিনিসও দেখা যেত না।

রাজের থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল পাহাড়ের একটি ছোট হোমস্টেতে। মালিক বৃদ্ধ পেমা শেরপা। বয়স ষাটের কাছাকাছি। শান্ত স্বভাবের মানুষ। খুব বেশি কথা বলতেন না, কিন্তু অতিথিদের প্রতি তাঁর যত্নে কোনো কমতি ছিল না।

প্রথম দিন সন্ধ্যায় চা খেতে খেতে রাজ জিজ্ঞেস করল,

"এখানে ঘোরার মতো ভালো জায়গা কোথায়?"

পেমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

"ঘুরতে চাইলে অনেক জায়গা আছে। কিন্তু একটা জায়গায় যেও না।"

রাজ কৌতূহলী হয়ে তাকাল।

"কোথায়?"

"লুমা-চূড়া।"

রাজ হেসে বলল,

"কেন? ভূত আছে?"

বৃদ্ধের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

"ভূত থাকলে ভয় কম।"

রাজ এবার আর হাসল না।

"মানে?"

পেমা জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন,

"বিশ বছর আগে সেখানে একটা পাহাড়ি পাড়া ছিল। ধসের পরে সবাই নেমে যায়। বাড়িঘর ভেঙে যায়, রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। এখন শুধু জঙ্গল।"

"তাহলে সেখানে এমন কী আছে?"

পেমা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর নিচু গলায় বললেন,

"মাঝে মাঝে রাতে ওখান থেকে ফোন আসে।"

রাজ অবাক হয়ে হেসে ফেলল।

"ফোন? কার?"

বৃদ্ধ আর উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন,

"যদি কখনও তোমার ফোনে লুমা-চূড়া থেকে লোকেশন শেয়ার আসে, সেটা খুলবে না।"

রাজ মনে মনে ভাবল, পাহাড়ের মানুষদের কুসংস্কার এখনও বেশ শক্তিশালী।

তবু বৃদ্ধের শেষ কথাটা তার মনে অদ্ভুত একটা দাগ কেটে গেল।

---

প্রথম সংকেত

পরদিন সকালেই সে পাহাড়ের ছবি তুলতে বেরিয়ে পড়ল। হাতে ফোন, কানে হেডফোন, পিঠে ছোট ব্যাগ।

পাহাড়ি রাস্তা ধরে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ফোনে নোটিফিকেশন এল—

Location shared with you.

রাজ স্ক্রিনের দিকে তাকাল।

লোকেশন—LUMA-CHURA

সময়—11:11 AM

তার থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার দূরে লোকেশনটি দেখাচ্ছে।

"কেউ হয়তো মজা করছে," রাজ নিজেকেই বলল।

কিন্তু অ্যাকাউন্টটির নাম দেখে তার হাসি মিলিয়ে গেল—

Rinchen_2006

নামটা তার পরিচিত নয়।

রাজ কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নোটিফিকেশনটি মুছে দিল।

কিন্তু মুছে ফেলার পরেও তার মনে হচ্ছিল, যেন কেউ তাকে দেখছে।

সে চারদিকে তাকাল।

রাস্তা ফাঁকা।

শুধু পাহাড়ের ঢালে বাতাসে পাইন গাছগুলো দুলছে।

সেদিন রাতে হোমস্টেতে ফিরে রাজ ঘটনাটা পেমাকে বলতেই বৃদ্ধের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল।

"কত সময়ে এসেছিল?"

"এগারোটা এগারো।"

পেমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

"কাল সকালে এখান থেকে চলে যেও।"

"কেন?"

"তুমি লোকেশনটা দেখেছ?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে আর দেরি কোরো না।"

তারপর বৃদ্ধ একটা পুরোনো কাঠের বাক্স খুললেন। বাক্সটির ভেতরে কিছু পুরোনো কাগজ, কয়েকটি ছবি এবং একটি মরচে ধরা চাবি ছিল।

সেখান থেকে তিনি একটি ছবি বের করলেন।

ছবিতে একটি পাহাড়ি স্কুল। সামনে দাঁড়িয়ে অনেকগুলো শিশু।

এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলেকে দেখিয়ে পেমা বললেন,

"ওর নাম রিনচেন।"

ছেলেটার বয়স বারো-তেরোর বেশি নয়। চোখে অদ্ভুত এক ধরনের শান্ত দৃষ্টি।

রাজ ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল,

"তারপর?"

"বিশ বছর আগে ধসের রাতে ও নিখোঁজ হয়েছিল।"

"লাশ পাওয়া যায়নি?"

"না।"

পেমা ছবিটা বুকে চেপে ধরে বললেন,

"কিছু মানুষ হারিয়ে গেলে তাদের খুঁজে পাওয়া যায় না। কিন্তু পাহাড় সবকিছু মনে রাখে।"

রাজ কথাটার কোনো উত্তর দিতে পারল না।

---

সেদিন রাতে রাজ অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারল না।

মোবাইলটা টেবিলের ওপর রাখা। ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে শুধু কালো পাহাড় আর কুয়াশা দেখা যাচ্ছে।

১০টা।

১০টা ৩০।

১১টা।

১১টা ১০।

রাজ নিজের অজান্তেই ঘড়ির দিকে তাকাল।

১১টা ১১।

টিং!

রাজ চমকে ফোনটা তুলে নিল।

আবার লোকেশন—

Rinchen_2006

এবার একটি মেসেজও এসেছে।

"তুমি গতকাল আমার লোকেশন দেখেছিলে।"

রাজের হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।

সে লিখল—

"তুমি কে?"

কয়েক সেকেন্ড পর উত্তর এল—

"যে এখনও বাড়ি ফিরতে পারেনি।"

রাজ লিখল,

"তুমি কোথায়?"

উত্তর—

"লুমা-চূড়ায়।"

"তুমি কি রিনচেন?"

কিছুক্ষণ কোনো উত্তর নেই।

তারপর—

"তুমি আমাকে চিনতে পারবে।"

সঙ্গে একটি ছবি এল।

ছবিটা দেখে রাজের বুকের মধ্যে যেন হঠাৎ বরফ জমে গেল।

ছবিতে একটি পুরোনো পাহাড়ি বাড়ি।

আর বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছে—রাজ নিজেই।

কিন্তু ছবিতে তার পোশাক আজকের মতো নয়।

রাজ ছবিটা বারবার দেখল।

অসম্ভব!

সে লিখল—

"এটা কীভাবে সম্ভব?"

উত্তর এল—

"জানতে চাইলে কাল লুমা-চূড়ায় এসো। একা।"

রাজের মাথায় পেমার কথা ঘুরছিল—

"লোকেশন খুলবে না।"

কিন্তু মানুষের কৌতূহল বড় অদ্ভুত জিনিস। যে দরজায় লেখা থাকে প্রবেশ নিষেধ, চোখ সবার আগে সেদিকেই যায়।

---

যেখানে GPS থেমে যায়

পরদিন ভোরে রাজ কাউকে কিছু না জানিয়ে বেরিয়ে পড়ল।

আকাশ তখনও পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি। পাহাড়ের মাথায় কুয়াশার আস্তরণ। সে GPS-এ লোকেশন সেট করল।

সরু পাহাড়ি রাস্তা পেরিয়ে ধীরে ধীরে উপরে উঠতে লাগল।

প্রথমে রাস্তার পাশে দু-একটা বাড়ি ছিল। তারপর বাড়িগুলোও হারিয়ে গেল। পাইন গাছ ঘন হতে লাগল। পাখির ডাক কমে গেল।

প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ফোনের নেটওয়ার্ক চলে গেল।

রাজ ফোনটা উঁচু করে ধরল।

কোনো সিগন্যাল নেই।

GPS-ও থেমে গেল।

স্ক্রিনে লেখা—

Location unavailable.

রাজ বিরক্ত হয়ে ফোনটা পকেটে রাখল।

ঠিক তখনই সামনে একটি পুরোনো পাথরের ফলক চোখে পড়ল।

ধুলো মুছে রাজ পড়ল—

"লুমা প্রাথমিক বিদ্যালয় — প্রতিষ্ঠিত ১৯৮৭"

রাজ থমকে দাঁড়াল।

স্কুলটি বহু বছর আগে ধসে যাওয়ার কথা।

কিন্তু সামনে যে ভবনটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি একেবারে অক্ষত।

জানালাগুলো বন্ধ। দরজায় মরচে। দেওয়ালের রং বিবর্ণ।

তবু ভেতর থেকে যেন শিশুদের পড়ার আওয়াজ ভেসে আসছে।

কেউ যেন একসঙ্গে পড়ছে—

"এক... দুই... তিন..."

রাজ দরজার কাছে যেতেই—

টং!

একটা ঘণ্টা বেজে উঠল।

তারপর সব চুপ।

রাজ ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে খুলল।

ভেতরে পুরোনো বেঞ্চ, দেওয়ালে বিবর্ণ মানচিত্র, এক কোণে কালো বোর্ড।

বোর্ডে চক দিয়ে লেখা—

"আজকের উপস্থিতি"

তার নিচে অনেকগুলো নাম।

রাজ একে একে পড়তে লাগল।

সবশেষে—

রিনচেন দর্জি — অনুপস্থিত।

তার নিচে আরও একটি নাম।

চকটা যেন একেবারে নতুন।

রাজ — উপস্থিত।

রাজের বুক কেঁপে উঠল।

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটি শিশুর গলা—

"তুমি এসেছ।"

রাজ ঘুরে দাঁড়াল।

কেউ নেই।

শুধু জানালার পাশে একটি পুরোনো কাঠের চেয়ার ধীরে ধীরে দুলছে।

তার ফোন নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।

নতুন মেসেজ—

"ভয় পেও না।"

রাজ লিখল—

"তুমি কোথায়?"

উত্তর এল—

"তোমার সামনে।"

রাজ তাকিয়ে রইল।

কিছুই নেই।

তারপর ফোনে আরেকটি ছবি এল।

ছবিতে বহু বছর আগের সেই স্কুল। সব বেঞ্চে শিশু বসে আছে। শেষ বেঞ্চে রিনচেন।

তার পাশে একটি খালি জায়গা।

ছবির নিচে লেখা—

"এই জায়গাটা তোমার।"

ঠিক তখনই বাইরে প্রচণ্ড শব্দ হল।

পাহাড়ের ওপর দিয়ে বাতাস ছুটে গেল। জানালার কাচ কেঁপে উঠল। দূরে কোথাও শিশুর হাসির শব্দ শোনা গেল।

রাজ আর দাঁড়াল না।

দৌড়ে পাহাড় থেকে নেমে এল।

---

একটি অসম্ভব সত্য

হোমস্টেতে ফিরে দেখে পেমা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে।

রাজকে দেখেই তিনি বললেন,

"তুমি গিয়েছিলে।"

এটা প্রশ্ন ছিল না।

রাজ চুপ করে রইল।

পেমা বললেন,

"স্কুলটা দেখেছ?"

রাজ মাথা নাড়ল।

"রিনচেন আসলে কে?"

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"আমার ছেলে।"

রাজ স্তব্ধ।

"বিশ বছর আগে ধসের রাতে ও স্কুলে আটকে পড়েছিল। আমরা ওকে খুঁজেছিলাম। পাইনি।"

রাজ ফিসফিস করে বলল,

"কিন্তু ওর ফোন?"

বৃদ্ধ মৃদু হেসে বললেন,

"ওর কোনো ফোন ছিল না।"

রাজের বুক কেঁপে উঠল।

"তাহলে যে মেসেজগুলো আসছে?"

পেমা জানালার বাইরে তাকিয়ে রইলেন।

"এই গ্রামের কেউ রিনচেনের নাম মুখে আনে না।"

"কেন?"

বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন—

"ধস নামার কয়েক মিনিট আগে ও আমাকে ফোন করেছিল।"

"তারপর?"

"বলেছিল—'বাবা, আজ আমাদের স্কুলে নতুন একজন এসেছে।'"

রাজের গলা শুকিয়ে গেল।

"কে?"

পেমা এবার সরাসরি রাজের দিকে তাকালেন।

"ও বলেছিল—ওর নাম রাজ।"

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

---

সেদিন রাতে রাজ ফোন বন্ধ করে রাখল।

ঠিক করল, ভোরেই পাহাড় ছেড়ে চলে যাবে।

কিন্তু রাত ২টা ১৭ মিনিটে ফোনটা নিজে থেকেই জ্বলে উঠল।

কোনো নোটিফিকেশন নেই।

শুধু Gallery খুলে গেছে।

একটি নতুন ছবি।

রাজ ছবিটা খুলল।

পুরোনো স্কুলের সামনে অনেক শিশু দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে রিনচেন।

আর তার পাশে—

রাজ।

কিন্তু এবার রাজের পোশাক বিশ বছর আগের স্কুলের পোশাক।

ছবির নিচে তারিখ—

১৭ জুলাই ২০০৬।

রাজের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।

কারণ তার জন্মতারিখ—

১৮ জুলাই ২০০৬।

অর্থাৎ ছবিতে সে ছিল তার জন্মের ঠিক একদিন আগে।

---

হারিয়ে যাওয়ারও কি শুরু থাকে?

পরদিন ভোরে রাজ পাহাড় ছেড়ে চলে গেল।

শহরে ফিরে সে নিজের জন্মের কাগজপত্র আবার দেখল।

সব ঠিক।

তারপর পুরোনো সংবাদপত্রের ডিজিটাল আর্কাইভ খুলে লুমা-চূড়া খুঁজতে লাগল।

একটি খবর পেল—

"লুমা-চূড়ায় পাহাড়ধস, নিখোঁজ ২৮ জন।"

খবরের নিচে ছোট্ট একটি লাইন—

"স্থানীয় এক পরিবার দাবি করেছে, নিখোঁজ শিশু রিনচেন দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা আগে এক অজ্ঞাত শিশুকে স্কুলে নিয়ে এসেছিল।"

শিশুটির পরিচয় কখনও জানা যায়নি।

তবে তার সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল একটি ছোট কাপড়ের ব্যাগ।

ভেতরে ছিল—

একটি হাসপাতালের ট্যাগ।

রাজের হাত কেঁপে উঠল।

হাসপাতালের নামটি ছিল সেই হাসপাতাল, যেখানে তার জন্ম হয়েছিল।

---

ফিরে আসা

কয়েকদিন পর রাজ আবার মেঘছায়ায় গেল।

পেমা তখন আর বেঁচে নেই।

হোমস্টেটাও বন্ধ।

দরজায় পুরোনো তালা ঝুলছে। উঠোনে শুকনো পাতা জমে আছে। যেখানে একসময় সন্ধ্যায় পেমা বসে চা খেতেন, সেখানে এখন শুধু নীরবতা।

রাজ একা লুমা-চূড়ার দিকে উঠতে লাগল।

কিন্তু এবার পথটা যেন আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত লাগছিল।

লুমা-চূড়ায় উঠে সে দেখল, পুরোনো স্কুলের কোনো চিহ্ন নেই।

শুধু ঘন জঙ্গল।

একটি পাথরের গায়ে খোদাই করা—

"যারা হারিয়ে যায়, তারা সবসময় হারিয়ে যায় না।"

রাজ ফোন বের করল।

নেটওয়ার্ক নেই।

GPS নেই।

হঠাৎ—

টিং!

স্ক্রিনে একটি নতুন লোকেশন।

Rinchen_2006

লোকেশনটি দেখাচ্ছে—

রাজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, ঠিক সেখানেই।

মেসেজ মাত্র এক লাইন—

"এবার তুমি জানো।"

রাজ লিখল—

"তুমি কে?"

কিছুক্ষণ পর উত্তর এল—

"তোমার গল্পের প্রথম পাঠক।"

তারপর—

"এবার লিখে রাখো। যেন কেউ ভুলে না যায়।"

স্ক্রিন নিভে গেল।

দূরে পাহাড়ের গায়ে মেঘ নামছিল। কোথাও কোনো মানুষ নেই।

তবু হঠাৎ খুব ক্ষীণ একটি শিশুকণ্ঠ ভেসে এল—

"রাজ... উপস্থিত?"

রাজ চোখ বন্ধ করল।

তারপর খুব আস্তে বলল—

"উপস্থিত।"

পাহাড়ের ওপার থেকে যেন একটি শিশুর হাসি ভেসে এল।

তারপর—

সবকিছু আবার নিস্তব্ধ।

---

শেষ কথা

শহরে ফিরে রাজ সেই ঘটনার ওপর একটি গল্প লিখল।

গল্পের নাম—

"শেষ লোকেশন"

শেষ পাতায় সে লিখল—

"প্রযুক্তি আমাদের বলে আমরা কোথায় আছি।

কিন্তু সবসময় বলতে পারে না—আমরা আসলে কোথা থেকে এসেছি।"

গল্পটি প্রকাশের কয়েকদিন পর রাজ তার ফোনের পুরোনো Gallery পরিষ্কার করছিল।

হঠাৎ একটি অচেনা ছবি চোখে পড়ল।

ছবিতে পাহাড়ি স্কুল।

সামনে ২৮ জন শিশু।

কিন্তু ছবির একেবারে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ২৯তম একজন।

ছেলেটার মুখ দেখা যাচ্ছে না।

শুধু তার হাতে একটি ফোন।

ফোনের স্ক্রিনে লেখা—

"Location sharing... Raj."

রাজ ছবিটির দিকে তাকিয়ে রইল।

ছবিটির তারিখ—

আগামীকাল।

ঘরের ঘড়ির কাঁটা তখন ধীরে ধীরে এগিয়ে চলেছে।

রাজ ফোনটা নামিয়ে রাখল।

কিছুক্ষণ পর আবার তুলে নিল।

ছবিটা এখনও সেখানে।

তারপর প্রথমবারের মতো তার মনে হল—

কিছু গল্প আমরা লিখি না।

কিছু গল্প আমাদের দিয়েই নিজেদের লিখিয়ে নেয়।

আর হয়তো পাহাড়ের কোনো এক অদৃশ্য স্কুলে এখনও প্রতিদিন উপস্থিতি নেওয়া হয়।

রিনচেনের নাম ডাকা হয়।

তারপর—

একটি নতুন নাম।

রাজ।

"উপস্থিত?"

পাহাড়ের নীরবতা যেন আজও তার উত্তর অপেক্ষা করে।