অনাদি ব্যানার্জী সরকারী দপ্তরের বড়বাবু হয়েই অবসর নিয়েছেন। সাংসারিক ব্যাপারে কোনদিনই পোক্ত ছিলেন না।
স্ত্রী অনিতা সাংসারিক দায়-দায়িত্ব নিপুণ ভাবে পালন করেছেন। মাসের প্রথমেই অনিতার হাতে মাইনের টাকা টা তুলে নিয়েই দায়িত্ব শেষ। দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার। অনাদি বাবু স্ত্রীর জন্য বেশ গর্ব বোধ করেন। তিন ছেলে মেয়ে কেই শিক্ষিত করে মানুষ করেছেন। বড় মেয়ে Electronics engineer। একটি manufacturing companyর বেশ বড় পদেই আছে। প্রায়ই হিল্লী- দিল্লী, এ দেশ-ও দেশ যেতে হয় companyর কাজে। একজন software engineer এর সাথে অনিমার বিয়ে দেন। সম্বন্ধ যখন এসেছিলো তখন অনিমা এক Restaurant এ বসে ওর কাজের ধরন, বাইরে যাওয়া- সব বলেছিলো যাতে পরবর্তী কালে দাম্পত্য জীবনে কোনো অশান্তি না হয়! বিয়ের আগে সব মেনে নিলেও বিয়ের পর এই নিয়ে অশান্তির শুরু হলো। বিশেষত বাইরে ট্যুরে যাওয়া নিয়ে। কিছুদিন মানিয়ে চললো কিন্তু যে কে সেই! খানিকটা অভিমান করেই অনিমা চলে আসে বাপের বাড়ী। চাকরী সূত্রে মাইনে টা ভালো হওয়ায় অচিরেই কলকাতায় একটি ফ্ল্যাট কেনে ও সেখানেই থাকা শুরু করে দেয়।
অনাদি বাবুর ছেলে আবীর পড়াশোনায় সাধারণ মানের, কথা কম বলে, একটু ঘরকুনো-অমিশুকে ধরনের। বন্ধু বান্ধব নেই বললেই চলে! তবুও অনিতা দেবী ওর পেছনে লেগে থাকায় Junior Engineering এ ভর্তির সুযোগ পায় এবং যথাযথ ভাবে পাশও করে। কিন্তু চাকরীর বাজার তো বেশ মন্দা! তাই Junior Engineering পাশ করেও বসেই থাকতে হয় আবীর কে। বিভিন্ন ভাবেই চেষ্টা করছিলো বাড়ীর সবাই। অনাদি বাবুই একদিন কাগজের বিজ্ঞাপন দেখে যোগাযোগ করেন এবং ওনার একটি পরিচিতি ও বেরিয়ে পড়ে। যদিও আবীর নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করেই চাকরী টা পায়। কিন্তু চাকরি পেতে এই দেরীটা আবীর কে একটু হতাশা গ্রস্ত করছিলো। চাকরী টা পাওয়ার পর ওর ছোট দিদি আবীরাষওকে বললো, দেখ, তুই অযথাই মন খারাপ করছিলি। চাকরী তো পেলি হয়তো একটু দেরী হলো। তাতে কি হয়! কতটুকু বয়সে চাকরী পেলি বল তো? তুই আরও ভালো জায়গা থেকে ডাক পাবি। তুই এখন মন দিয়ে কাজ করে যা। তোর অনেক উন্নতি হবে রে ভাই।
আবীরা hospital management পড়েছে। এখন একটা ভালো চাকরীর অপেক্ষায়। নতুন বিষয়, বেশীর ভাগ মানুষই এই course টার ব্যাপারে জ্ঞাত নয়। একটা ছোট নার্সিংহোমে চাকরী করে আবীরা। বিভিন্ন জায়গায় দরখাস্ত ও দিয়েছে। হঠাৎ ই খবরের কাগজে দেখে বিড়লাদের একটি হাসপাতালের managerial post এর বিজ্ঞাপন। application, written exam, interview সব পেরিয়ে আবীরা চাকরী টা পেলো। বাড়ীতেও বেশ খুশীর আবহাওয়া তৈরী হলো।
এরমধ্যে আবীর দু-টো তিনটে চাকরী পেয়েছে আর ছেড়ে দিয়েছে। প্রতি ক্ষেত্রেই ওর মনে হয় অফিস সহকারী রা সবাই অসৎ। সবাই তাই চেষ্টা করছে বা ষড়যন্ত্র করছে ওকে বিপদে ফেলার কারন ও সৎ। এই চাকরী ধরা আর ছাড়ার কারনে আবীরের চাকরীর বাজার টা বেশ খারাপ হয়ে যাচ্ছিলো। বাড়ীতেও অল্প সল্প সমস্যা হচ্ছিলো। বাবা-মা ও ওর এই স্বভাব টা কে খুব একটা সমর্থন করছিলেন না। কিন্তু দিদির খুব মনে হতে শুরু হয়েছিলো যে আবীরের এই আচরণ খুব স্বাভাবিক নয়। তাই একদিন আবীরার সাথে আলোচনা করে ঠিক করলো কোনো একজন মানসিক বিশেষজ্ঞ কে দেখাবে।
এরমধ্যে আবীর আবার একটা চাকরী পেয়েছিলো। ঠিক দু-মাসের মাথায় চাকরী টা দিলো ছেড়ে। বাড়ী ফিরে মাকে বলতেই মা বেশ বকলো। বকুনি টা যেন কিছুতেই মেনে নিতে না পেরে বাড়ী থেকে কিছু না বলে বেরিয়ে পড়লো। ওর খালি মনে হচ্ছিলো যে ওকে কেউ বুঝতে চাইছে না বা বুঝতে পারছে না। ভাবতে ভাবতেই এগিয়ে চললো ক্রমশ ষ্টেশনের দিকে। প্ল্যাটফর্মের শেষ প্রান্তে প্রায় অন্ধকার একটা ফাঁকা জায়গায় বসলো। বসে বসেই সিদ্ধান্ত নিলো পৃথিবী টা ওর জন্য নয়। তাই নিজেকে শেষ করে দেওয়া টাই সঠিক। হঠাৎ ওর রেলের ঘোষণা কানে এলো ৩ নং প্ল্যাটফর্ম দিয়ে একটা mail train যাবে। যাত্রী দের নিরাপদ দূরত্বে সরে যাওয়া আর লাইন পারাপার না করার নির্দেশ কানে এলো। এই আবছা আলোয় ওকে কেউ দেখতেও পাচ্ছে না আর ঠিক এই সময় লাইনের মাঝে দাঁড়িয়ে পড়লেই..
ঠিক ঐ সময়েই এলাকার সব থেকে নষ্ট মেয়েটি সেজে গুজে অভিসারে বেরোলো। মেয়েটি মানে অঞ্জনা কে মাইতি পাড়ার দিক থেকে আসল শহর টায় আসতে গেলে রেল লাইন পেরিয়েই আসতে হয়। এই সময় একটা mail train যায়। ওটা চলে গেলেই লাইন টা পেরোবে। দূর থেকে আলো টাও দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ দেখে মনে হয় ঐ লাইনেই একজন যেনো কেউ দাঁড়িয়ে আছে! মারা পড়বে তো! অঞ্জনা মুহুর্তে বুঝে যায় সব। প্রাণ পণ দৌড়ে এক হ্যাঁচকা টানে আবীর কে রেল লাইন থেকে পাশে ফেলে দেয়। নিজেও পড়ে যায়। প্রায় কানের ধার ঘেঁষে ট্রেন টা বেরিয়ে যায়।
আবীর প্রানে বাঁচে কিন্তু চোট পায়। অঞ্জনা আবীর কে ধরে ধরে বসায়। ব্যাগ থেকে নিজের জলের বোতল বের করে পরম মমতায় আবীরের মুখে চোখে জল দেয়, জল খাওয়ায়। বলে, বেশী লাগেনি তো বাবু? আমি অঞ্জনা, সবাই নষ্ট মেয়ে বলেই জানে। আবীর অঞ্জনার মুখে হাত দিয়ে থামায়, বলে ওভাবে বোলো না। তুমি আজ আমার প্রাণ বাঁচিয়েছো। নষ্ট মেয়ে টা তোমার পরিচয় হতে পারেনা।
কিন্তু অঞ্জনা থামেনা, তখন আবীর একটা জোড়ালো ধমক দেয়। অঞ্জনা চুপ করে যায়। খুব কম সময়ের মধ্যেই অঞ্জনা কে খুব আপন মনে হয়। ওর ঘাড়ে হাত দিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে বাড়ীর দিকে রওনা দেয়। সবাই খুব অবাক দৃষ্টি তেই ওদের দেখে। অঞ্জনা এগুলো তে খুব একটা গুরুত্ব দেয়না। ওর কাছে একটা প্রাণ বাঁচানো অনেক গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, ও সেটাই করেছে। এখন আবীর কে বাড়ী পৌঁছে তবে ওর দায়িত্ব শেষ হবে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আবীর কে বাড়ীতে ঢুকতে দেখে ওর মা জানতে চায় কি হয়েছে। অঞ্জনা পুরো ঘটনা টাই বলে। বলে ও বেরিয়ে যেতে উদ্যত হলে আবীর বাধা দেয়। তখন আবীর কে ওর মা, বাবা, আবীরা সবাই বোঝায় আর অঞ্জনা কথা দেয় যে রোজ একবার করে এসে দেখা করে যাবে। অঞ্জনা রোজই একবার করে আসে। ও একটা জিনিষ খেয়াল করে আবীর জীবন সম্পর্কে খুব হতাশ ও উদাসীন। একটা বৃষ্টিমুখর দিনে অঞ্জনা আবীর দের ব্যালকনি তে দাঁড়িয়ে বলে, দেখো আবীর আমি তখন অষ্টাদশী। এক সাজানো সুন্দর সংসারের নেশায় মশগুল। স্বামী, টলোমলো পায়ে ছুটে বেড়ানো সন্তান এই সবের স্বপ্নে বিয়ে করে ফেললাম একজন কে। বাড়ীর অমতে। বরের ঘরে গিয়ে জানতে পারলাম সত্যিই আমার ওগুলো স্বপ্ন ই ছিলো, আমার স্বামীর আগের বউ ও সন্তান বর্তমান। রাগে, দুঃখে বেরিয়ে চলে এলাম মা-বাবার কাছে। তারাও মুখ ফিরিয়ে নিল শুধু থাকার একটা জায়গা দিলো। দিনের পর দিন না খেতে পেয়ে মনে হচ্ছিলো জীবন টা শেষ করে দিই। মা খেতে দিতে চাইলেও বাবার ভয়ে আমার কাছে আসতেই পারতো না। লেখাপড়া ও করিনি বিশেষ যে কিছু কাজ জোটাতে পারবো। এই সময় একজন একটা নার্সিংহোমে আয়ার কাজের সন্ধান দিলো। দু-দিন কাজ করার পর মালিক বললো, কাজে টিকে থাকতে গেলে আমাকে খুশী করতে হবে। তাই করলাম!। পেটের টান বড় কঠিন! কিন্তু রোজ কি একই বায়না ভালো লাগে? দিলাম কাজ টা ছেড়ে। ভাবলাম নষ্ট যখন হয়েইছি তাহলে আর মুখোশের কি দরকার? নেমে পড়লাম এই লাইনে। হয়ে গেলাম "call girl"!! ভালোই আয় হয়। ফোনে ডাক পেলেই চলে যাই। তবে হ্যাঁ মৃত্যু কে আমি হারিয়ে দিয়ে জীবন যুদ্ধে জয়লাভ করেছি। হতে পারি সমাজের চোখে আমি নষ্ট মেয়ে। কিন্তু নষ্ট যদি হয়েই থাকি তো সেটাও করেছে এই সমাজ। আমাকে বাঁচতে হবে যে কোন মূল্যে। তুমিও এই ভাবে ভাবো আবীর। তুমি এতো শিক্ষিত। যা রোজগার করো সেটা তোমার পরিশ্রমের পুরস্কার। তাতে কেন তুমি খুশী হবেনা? তুমিও স্বপ্ন দেখো- বেঁচে থাকার স্বপ্ন, অন্যদের ভালো রাখার স্বপ্ন। তোমার মুখের দিকে চেয়ে বাঁচেন তোমার মা-বাবা। - এক নিঃশ্বাসে কথা গুলো বলে থামলো অঞ্জনা। আবীর হঠাৎ ওর হাত টা ধরে বললো, তুমি থাকবে তো আমার পাশে? অঞ্জনা বললো, আবীর আমি একটা নষ্ট মেয়ে। সবাই ভোগ করে কিন্তু সমাজের চোখে আমি ঘৃণ্য। তুমি একটু ভাবো আবীর তাহলেই বুঝবে।
আবীর উত্তেজিত হয়ে পড়ে, বলে, অঞ্জনা কি বলছো তুমি এটা? এই আজ আমি দাঁড়িয়ে আছি মা-বাবার সামনে, কথা বলছি, নড়াচড়া করছি, জীবনের প্রতি বিশ্বাস ফিরছে এতো তোমার ই দান। মানুষ ঈশ্বরের সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি, তা কখনও ই নষ্ট হতে পারেনা। আমি কখনও ই তোমাকে ঘৃণা করতে পারবো না। তুমি আমার প্রণম্য। যদি বাঁচি তোমার সাথেই বাঁচবো নাহলে-
অঞ্জনা আবীরের ঠোঁটে হাত দিয়ে থামিয়ে দেয়। হঠাৎ দুজনেই দেখে মা-বাবাও দাঁড়িয়ে আছেন। দুজনের চোখেই জল। আবীরের বাবা অনাদী বাবু বললেন, অঞ্জনা মা, মানুষের পরিচয় কাজে। তুমি না থাকলে আমাদের সন্তান কে তো আমরা হারিয়েই ফেলতাম। আর আবীরও তোমার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ওর জীবনের প্রতি আস্থা, ভরসা সবই ক্রমশ ফিরে আসছে। তাই আমরাই ভেবেছিলাম তোমাদের চারহাত এক করে দেবো। তোমার বাড়ীতে কথা বলো, প্রয়োজনে আমরা যাবো।
একদিকে স্বপ্ন পূরণের আনন্দ অন্যদিকে তার অতীত জীবনের মাশুল না গুনতে হয় এই ভাবতে ভাবতে অঞ্জনা বিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো। এবার অনিতা দেবী অঞ্জনার মাথায় হাত রেখে বললেন, মা রে, আজ থেকে তুই আমার আরেকটা মেয়ে। কোনো দ্বিধা রাখিস না।
অঞ্জনা ঝড়ঝড় করে কেঁদে ফেললো। ইতিমধ্যে আবীরাও চলে এসেছে। অঞ্জনার হাত ধরে বললো, ভাই আমাকে তো গুরুত্ব ই দেয়না। ভালোই হলো আমিও একটা বোন পেলাম- বলে অঞ্জনা কে জড়িয়ে ধরলো।
কয়েকদিনের মধ্যেই সানাই বাজলো। একটা অবসাদগ্রস্ত মানুষ বাঁচতে শিখলো অন্যদিকে একটি মেয়ে সুস্থ জীবনের মূল স্রোতে ফিরে এলো। সভ্যতা এই ভাবেই এগিয়ে চলে।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।