পশ্চিমবঙ্গের এক সুদূর গ্রাম, 'নিশিন্দাপুর'। চারিদিকে ঘন জঙ্গল, আর তার মাঝখানে জীর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে রায়বাড়ির পুরনো জমিদার বাড়ি। এই বাড়ির অন্দরমহল নিয়ে গ্রামের মানুষের মনে দীর্ঘদিনের ভয় আর কৌতূহল। কথিত আছে, অমাবস্যার রাতে যদি কেউ সেই বাড়ির ভাঙা জানালার দিকে তাকিয়ে থাকে, তবে সে নাকি অদ্ভুত এক ছায়া দেখতে পায়। সেই ছায়া কোনো মানুষের নয়, যেন কোনো অশরীরী আত্মার আর্তনাদ।
সৌমেন, পেশায় একজন ফ্রিল্যান্স লেখক, নতুন এক রহস্যের সন্ধানে এই গ্রামে এসে হাজির হয়। তার লক্ষ্য ছিল নিজের নতুন বইয়ের জন্য একটি বাস্তবসম্মত ভয়ের পটভূমি খুঁজে বের করা। গ্রামের বৃদ্ধ অঘোরবাবু তাকে সাবধান করে বলেছিলেন, "বাবু, যা দেখার নয়, তার দিকে নজর দিও না। রায়বাড়ির পুরনো দেওয়ালগুলো এখনো অনেক রক্তচক্ষু সহ্য করে আছে।"
সৌমেন পাত্তা দেয়নি। সে মনে করত, ভয়ের সবটাই মানুষের মস্তিষ্কের কারসাজি। কিন্তু তার সেই বিশ্বাস ভেঙে যেতে সময় লাগল না।
সেদিন ছিল অমানিশার রাত। ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে চারপাশ মুখরিত, কিন্তু রায়বাড়ির আশেপাশে যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সৌমেন তার টর্চ আর ক্যামেরা নিয়ে বাড়ির প্রধান ফটক খুলল। ভেতরে ঢুকতেই এক ভ্যাপসা গন্ধ তার নাকে এল—স্যাঁতসেঁতে দেওয়াল আর পুরনো কাঠের পচা গন্ধ।
হঠাৎ সে শুনল, ওপর তলা থেকে কোনো এক ঝিনঝিন শব্দ আসছে। যেন কেউ ভারী নুপুর পায়ে হাঁটছে। সৌমেন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল কয়েক গুণ। সে ওপরে ওঠার সিদ্ধান্ত নিল। সিঁড়িগুলো এতটাই নড়বড়ে ছিল যে প্রতিটা পদক্ষেপে যেন বাড়িটা কেঁপে উঠছিল।
ওপরের ঘরের দরজাটা আলতো করে ঠেলতেই সে দেখল, জানালার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। একটা দীর্ঘ ছায়া, যেন কারো সিলুয়েট। সৌমেন ক্যামেরা তাক করল, কিন্তু শাটার টিপতেই সে দেখল, জানালার কাঁচের ভেতরে কোনো মানুষের প্রতিচ্ছবি নেই। কেবল বাইরের ঘোর অন্ধকারের এক অস্পষ্ট কুণ্ডলী।
দ্বিতীয় রাতে সৌমেন আর বাড়িটার ভেতরে ঢুকল না, সে ক্যাম্প করল বাইরের উঠোনে। তার ডায়েরিতে সে লিখতে শুরু করল, কিন্তু মাঝরাতে এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হলো তার। সে শুনল তার নিজের নাম ধরে কেউ ডাকছে।
"সৌমেন... ও সৌমেন..."
কণ্ঠস্বরটা চেনা, কিন্তু ঠিক যেন তার মায়ের মতো। কিন্তু তার মা তো বছর পাঁচেক আগেই গত হয়েছেন। সৌমেন ঘামতে শুরু করল। সে দেখল, অন্ধকারের বুক চিরে একটা অস্পষ্ট অবয়ব এগিয়ে আসছে। তার পরনে সাদা কাপড়, আর মুখটা যেন এক ধূসর কুয়াশা। অবয়বটা তার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, "এখানে আর থেকো না, বাবু। এই বাড়িটা ক্ষুধার্ত।"
সৌমেন সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, "তুমি কে? কেন এই বাড়িটা ক্ষুধার্ত?"
সেই অশরীরী আত্মা কোনো উত্তর দিল না, শুধু মিলিয়ে গেল বাতাসে। যাওয়ার আগে সে একটা পুরনো চাবির তোড়া মাটিতে ফেলে রেখে গেল। সৌমেন সেটা হাতে তুলে নিল, আর অমনি তার মনে এক প্রবল শীতল স্রোত বয়ে গেল।
চাবিটা দিয়ে সে বাড়ির একটা লুকানো ঘর খুলল। সেখানে পাওয়া গেল একটি ডায়েরি। ডায়েরিটা ছিল শেষ রায়-গৃহিণীর। তাতে লেখা ছিল এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার কথা। সেই বাড়িতে একসময় কালো জাদুর সাধনা হতো, আর সেই সাধনায় বলি দেওয়া হয়েছিল নিরপরাধ মানুষদের। তাদের আত্মা এখনো সেই বাড়ির দেওয়ালে বন্দি।
সৌমেন বুঝতে পারল, এটা কোনো সাধারণ ভূতের গল্প নয়। এই বাড়িটা এক বিশাল অভিশাপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। সে ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে শুরু করল। প্রতিটি পাতায় যেন যন্ত্রণার চিহ্ন। হঠাৎ সে শুনল, বাড়ির চারিদিকের দেওয়াল থেকে অসংখ্য হাত বেরিয়ে আসছে। যেন সবাই তাকে ভেতরে টেনে নিতে চাইছে।
সৌমেন জানল, যদি সে সূর্যোদয়ের আগে এখান থেকে বেরোতে না পারে, তবে সে আর কোনোদিনও এই বাড়ির সীমা ছাড়াতে পারবে না। সে পাগলের মতো ছুটতে লাগল। পেছনে শুনতে পেল সেই নুপুরের শব্দ, আর অশরীরী হাসির প্রতিধ্বনি।
তার মনে হলো, বাড়ির প্রতিটি ইঁট যেন তার সাথে কথা বলছে। "থেকে যাও... আমাদের সাথী হও..."
সে কোনোমতে মেইন গেট দিয়ে বেরিয়ে এল। পেছনে তাকিয়ে দেখল, রায়বাড়িটা যেন এক মায়াবী কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছে। সূর্য যখন উদিত হলো, তখন সে দেখল তার ক্যামেরাটা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেছে, আর তার ডায়েরিটা রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিশিন্দাপুর গ্রাম থেকে সৌমেন যেদিন চলে গেল, সেদিন সে আর ফিরে তাকায়নি। কিন্তু আজও, কলকাতা ফিরে আসার পরও, মাঝরাতে তার কানে বাজে সেই নুপুরের শব্দ। সে বুঝেছে, অশরীরী বলে কিছু নেই, সবটাই এক চিরন্তন প্রতিধ্বনি। যে প্রতিধ্বনি একবার শুনে ফেলে, সে আর কোনোদিন নিজেকে মুক্তি দিতে পারে না।
রায়বাড়ি আজও দাঁড়িয়ে আছে, আর হয়তো নতুন কোনো শিকারের অপেক্ষায় আছে। কারণ ভয় কখনো মরে না, সে শুধু এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে তার বাসা পরিবর্তন করে।
রায়বাড়ির সেই ভয়ংকর রাতের অভিজ্ঞতার পর সৌমেনের জীবন আর আগের মতো রইল না। সে বুঝতে পারল, কিছু স্মৃতি মানুষের মনের কোণে পরজীবীর মতো বাসা বাঁধে, যা চাইলেও উপড়ে ফেলা যায় না। কিন্তু গল্পের নেশা কি এত সহজে ছাড়ে? সৌমেন তখন নতুন কোনো রহস্যের খোঁজে ব্যস্ত, কিন্তু নিয়তি যেন তার পেছনেই ছায়া হয়ে ঘুরছে।
সৌমেনের পরবর্তী অভিযানের বিবরণ নিচে দেওয়া হলো:
সৌমেন এখন কলকাতার পুরনো উত্তর পাড়ার এক অলিগলিতে বাস করে। তার নতুন ফ্ল্যাটটি বেশ পুরনো, ছাদ থেকে মাঝেমধ্যেই চুন-সুরকি খসে পড়ে। তার মনে হলো, রায়বাড়ির সেই চাবির তোড়াটা সে না জেনেই সাথে করে নিয়ে এসেছে। টেবিলের ওপর রাখা সেই চাবিগুলো এখন প্রায়ই নিজের জায়গা বদল করে।
একদিন রাতে, যখন বাইরে অঝোর ধারায় বৃষ্টি পড়ছে, সৌমেন লক্ষ্য করল তার ড্রয়ার থেকে একটা ক্ষীণ কান্নার শব্দ আসছে। সে ড্রয়ার খুলতেই দেখল, রায়বাড়ির সেই ডায়েরিটা আবার তার কাছে এসে পৌঁছেছে। আশ্চর্য! ডায়েরিটা তো সে নিশিন্দাপুরের জঙ্গলপথেই ফেলে এসেছিল।
ডায়েরির প্রথম পাতায় নতুন লেখা ফুটে উঠেছে, যা আগে ছিল না—"তুমি আমায় নিয়ে এসেছ, এবার আমাকে মুক্তি দাও।"
সৌমেন ডায়েরির পাতা ওল্টাতে লাগল। এবার ডায়েরিটা তাকে এক অন্য জগতের ঠিকানার দিকে নির্দেশ করছিল। কলকাতারই এক পরিত্যক্ত জমিদার বাড়ি, যার নাম 'ললিতা কুঞ্জ'। স্থানীয়দের মতে, এখানে এক সময় এক অপার্থিব প্রেমের কাহিনী ট্র্যাজেডিতে পরিণত হয়েছিল। সৌমেনের মনে হলো, রায়বাড়ির সেই অভিশাপ আর ললিতা কুঞ্জের এই ট্র্যাজেডি—দুটোর মধ্যে কোনো একটা যোগসূত্র আছে।
সে রাত দুটোর সময় ললিতা কুঞ্জের সামনে গিয়ে দাঁড়াল। বাড়িটা যেন এক জীবন্ত প্রাণীর মতো শ্বাস ফেলছে। সে দেখল, জানলার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে এক নারীমূর্তি নিচে তাকিয়ে আছে। তার পরনে লাল বেনারসি, কিন্তু সেই লাল রঙ যেন রক্তের মতো গাঢ়।
সৌমেন ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে চিৎকার করে উঠল, "তুমি কে?"
নারীটি কোনো উত্তর দিল না, শুধু এক আঙুল দিয়ে বাড়ির পেছনের অন্ধকার পুকুরটার দিকে ইশারা করল। সৌমেন টর্চ ফেলল সেই পুকুরের জলে। জলের নিচে যেন কেউ তাকে টেনে নিতে হাতছানি দিচ্ছে। সেই হাতগুলো রায়বাড়ির সেই হাতগুলোর মতোই পরিচিত
সৌমেন বুঝতে পারল, সে আসলে কেবল গল্প লিখছে না, সে অজান্তেই এক অভিশপ্ত চক্রের ধারক হয়ে উঠেছে। এই বাড়িগুলোর আত্মা কোনোভাবে তার লেখনীর মাধ্যমেই নিজেদের অস্তিত্ব জানান দিচ্ছে। সে ঠিক করল, সে আর কোনো ভয়ের গল্প লিখবে না।
কিন্তু যেই সে তার ল্যাপটপ বন্ধ করতে গেল, স্ক্রিনে ভেসে উঠল নিজের থেকে টাইপ হতে থাকা এক অদ্ভুত বাক্য—"গল্প শেষ হয়নি সৌমেন, তুমি তো কেবল শুরু মাত্র।"
ঘর অন্ধকার হয়ে এল। আলমারি থেকে জামাকাপড়গুলো নিজে থেকেই মাটিতে পড়ে গেল। সৌমেন বুঝতে পারল, অশরীরীরা এখন আর ঘরের বাইরে নেই, তারা এখন তার ঘরের ভেতরেই। সে চিৎকার করতে চেয়েও পারল না, যেন কারো হাত তার গলা চেপে ধরেছে।
পরদিন সকালে পুলিশ দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকল। সৌমেনকে আর পাওয়া গেল না। ঘরের মেঝেতে পড়ে ছিল কেবল সেই পুরনো চাবির তোড়া আর সেই রক্তবর্ণ ডায়েরিটা। টেবিলের ওপর ল্যাপটপটা তখনো খোলা, যেখানে শেষ লাইনে লেখা ছিল—
"আমি কোনো ভূতের গল্প লিখিনি, আমি আমার নিজের মৃত্যু লিখেছিলাম।"
বাইরের বাতাসে এখনো ভেসে আসে সেই নুপুরের শব্দ। কলকাতা শহরের বুক চিরে সেই শব্দ যেন আজও জানান দেয়, কিছু প্রতিধ্বনি কখনো নিঃশেষ হয় না। তারা শুধু তাদের নতুন ঠিকানার অপেক্ষায় থাকে।
সৌমেন নিখোঁজ হওয়ার পর বছর পেরিয়ে গেছে। পুলিশি তদন্তে কোনো সুরাহা মেলেনি, ল্যাপটপের ওই লেখাটিকে তারা স্রেফ কারো একার অদ্ভুত খেয়ালের ফসল বলে চালিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু যে ডায়েরিটি সৌমেনের ঘরে পড়েছিল, সেটি শেষ পর্যন্ত পৌঁছাল তার বন্ধু নীলাদ্রির হাতে। নীলাদ্রি একজন অকাল্ট গবেষক এবং ভূতাত্ত্বিক।
ডায়েরিটি হাতে পাওয়ার পর নীলাদ্রির জীবন এক অদ্ভুত মোড় নিল। সে বুঝতে পারল, সৌমেন সাধারণ কোনো গল্প লিখছিল না, সে আসলে একটি 'লিভিং স্ক্রিপ্ট' বা জীবন্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করছিল—যা যেখানে লেখা হয়, সেখানে সেই ঘটনার ছায়া তৈরি হয়।
নীলাদ্রি ঠিক করল, সে সেই নিশিন্দাপুরের রায়বাড়িতে যাবে। ডায়েরির শেষ পাতায় ছোট ছোট অক্ষরে লেখা ছিল, "যেখানে সুর শুরু হয়, সেখানেই সমাপ্তি। নূপুর যেখানে থেমেছিল, সেখানেই সে আছে।"
অমাবস্যার রাতে রায়বাড়ির সেই জীর্ণ আঙিনায় দাঁড়িয়ে নীলাদ্রি নিজের রেকর্ডিং ডিভাইস চালু করল। বাতাস ছিল অস্বাভাবিক স্থির। হঠাৎ, নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল সেই পরিচিত নূপুরের শব্দ। ঝিনঝিন... ঝিনঝিন...।
নীলাদ্রি টর্চ ফেলল সামনের পুকুর পাড়ে। সে দেখল, পুকুরের কাদা মাটি থেকে উঠে আসছে সৌমেনের নিথর দেহ। কিন্তু দেহটি পচেনি, বরং মনে হচ্ছে যেন সে দীর্ঘ এক গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নীলাদ্রি দ্রুত তার কাছে গিয়ে নাড়ি পরীক্ষা করতে যাবে, তখনই দেখল সৌমেনের চোখের পাতা কাঁপছে।
সৌমেন চোখ খুলল। কিন্তু সেই চোখ দুটো যেন তার নিজের নয়—সেখানে ফুটে উঠেছে এক প্রাচীন আতঙ্ক। সৌমেন অস্পষ্ট গলায় বলতে শুরু করল, "তুই কেন এলি, নীলাদ্রি? এরা তোকে মুক্তি দেবে না। এরা প্রতিধ্বনি খুঁজে বেড়াচ্ছে। আমি যে শব্দগুলো লিখেছিলাম, সেগুলো এখন জীবন্ত হয়ে উঠছে।"
নীলাদ্রি দেখল, বাড়ির প্রতিটি ইঁট থেকে রক্তবর্ণ তরল চুইয়ে পড়ছে। দেয়ালগুলো যেন সংকোচন-প্রসারণ করছে, ঠিক মানুষের ফুসফুসের মতো। বাড়িটা আর ইঁট-কাঠের নয়, বরং এক বিশাল অশরীরী সত্তা হয়ে উঠেছে।
সৌমেন উঠে দাঁড়াল, কিন্তু তার হাঁটার ভঙ্গি ছিল অদ্ভুত। সে বলল, "প্রতিটি গল্পের একটি শেষ থাকে, কিন্তু অভিশপ্ত গল্পের সমাপ্তি হয় অন্য কারো নতুন শুরুতে। তুই কি প্রস্তুত?"
নীলাদ্রি বুঝতে পারল, সৌমেন আর মানুষ নেই। সে এখন সেই রায়বাড়ির অতৃপ্ত আত্মাদের এক মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। নীলাদ্রি তার সাথে থাকা লেন্সের মাধ্যমে ছবি তুলতে লাগল। লেন্সের ভেতর দিয়ে সে দেখল, রায়বাড়িটা আসলে একটা বিশাল পোর্টাল বা প্রবেশপথ। শত শত আত্মা সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যারা আবার পৃথিবীতে ফিরে আসার জন্য হাহাকার করছে।
সৌমেন নীলাদ্রির দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, "তোর কলমটা দে। তোকে লিখতে হবে আমাদের ফিরে আসার পথ।"
নীলাদ্রি তার পকেট থেকে ডায়েরিটা বের করল। সে দেখল, ডায়েরির পাতাগুলো এখন সাদা। প্রতিটি অক্ষরের জায়গা এখন এক একটি চোখের মতো তাকিয়ে আছে। নীলাদ্রি বুঝে গেল, সে আটকা পড়েছে। সে কলম ধরল না, বরং ডায়েরিটা ছিঁড়ে ফেলতে চাইল। কিন্তু পারল না। যেন অদৃশ্য কোনো শক্তি তার হাতকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
সে লিখতে শুরু করল—নিজের অজান্তেই। আর প্রতিটি হরফ পড়ার সাথে সাথে চারদিকের কুয়াশা আরও ঘন হতে লাগল।
পরদিন সকালে গ্রামের মানুষ দেখল, রায়বাড়িটা গায়েব হয়ে গেছে। সেখানে শুধু পড়ে আছে এক বিশাল ফাঁকা জমি, আর মাঠের মাঝে দুটো খাতা পড়ে আছে—একটি সৌমেনের, অন্যটি নীলাদ্রির।
সেই থেকে গ্রামবাসীর মুখে এক নতুন উপকথা শোনা যায়। বলা হয়, যখনই কোনো নতুন লেখক ওই এলাকায় বসে কোনো ভয়ের গল্প লিখতে বসে, তখন বাতাস থেকে ভেসে আসে সেই নূপুরের শব্দ। তারা যেন আজও অপেক্ষা করছে তাদের নতুন গল্পের, তাদের নতুন ঠিকানার।
সৌমেন আর নীলাদ্রি কি মরেছে? নাকি তারা আজও সেই অশরীরী প্রতিধ্বনির অংশ হয়ে অন্য কোনো গ্রামে, অন্য কোনো বাড়িতে গল্প লিখছে? সেই রহস্য আজও অমীমাংসিত।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।