সেদিনের সন্ধ্যাটা ছিল মফস্বলের এক নির্জন গলিতে, শীতের গভীর অন্ধকারে মোড়া। এখনকার মতো তখনো শহরতলিতে বিশাল বিশাল গগনচুম্বী ইমারত গড়ে ওঠেনি। আমাদের চারপাশে ছিল বিস্তীর্ণ ফাঁকা জমি, পুরোনো আমলের বাগানবাড়ি আর শান্ত নিস্তব্ধতা। এই পরিবেশেই ছিল আমাদের নাচের স্কুল। হঠাৎ লোডশেডিং হওয়ায় সেই নিস্তব্ধতা যেন আরও গাঢ় হয়েছিল। সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে, আমরা সকলে মিলে আশ্রয় নিয়েছিলাম ছাদে।
নাচের স্কুলে আমাদের গল্প বলিয়ে কাকিমা ছিলেন অপর্ণা কাকিমা। আমরা অপর্ণা কাকিমাকে ঘিরে বসেছিলাম। আমি আর তাঁর মেয়ে মঞ্জুশ্রী একই নাচের স্কুলে নাচ শিখতাম। কাকিমা চাকরি সুবাদে দেশের বহু প্রান্ত ঘুরেছেন—আমরা জানতাম তাঁর ঝুলিতে জমা আছে বহু না-বলা গল্প। আমাদের কৌতূহল মেটাতে তিনি তাঁর এক অভিজ্ঞতা বলতে শুরু করলেন। আমাদের নাচের শিক্ষক সমেত বাকি মায়েরাও এসে ততক্ষণে যোগ দিয়েছেন, যেন এক গোল বৈঠক বসেছে সেই শীতের আকাশের নিচে। তিনি বলতে শুরু করলেন:
"তোরা তো জানিস, ব্যাঙ্কে চাকরির সুবাদে আমাকে মাঝে মাঝেই বদলি হতে হতো বিভিন্ন এলাকায়। একবার যখন তোদের বন্ধু মঞ্জুশ্রী বেশ ছোট, তখন আমাকে বদলি হতে হয়েছিল জলপাইগুড়িতে। জায়গাটা একেবারে জনমানবহীন না হলেও সেখানে এখানকার চেয়ে অনেক কম লোকসংখ্যা ছিল বলা যায়।
আমি উঠেছিলাম আমার অফিস থেকে ঠিক করে দেওয়া একটি বাড়িতে। বাড়িটা একটি আবাসনের মধ্যে হলেও বাকি বাড়িগুলোর থেকে একটু দূরে ছিল, একেবারে শেষের দিকে। তাতে অবশ্য আমার বিশেষ ভয় ছিল না, কারণ আমি ভূতে বিশ্বাস করতাম না। ছোট্ট মেয়ে নিয়ে আমি একা। তবে একা বললেও ভুল হবে, আমার মা আর আমাদের কাজের লোক পুষ্প সবসময়ে সঙ্গে থাকত মেয়ের দেখাশোনার জন্য।
এরকম করে বেশ কেটে যাচ্ছিল। এর আগে আমি কোনোদিনও কোনো ভুতুড়ে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হইনি বলে অলৌকিক কিছুর ভয় যে কাকে বলে, তা আমি ঠিক জানতাম না।
এবার আসি আসল ঘটনায়...
সময়টা ছিল বর্ষাকাল। থেকে থেকে বৃষ্টি নেমে আসছিল অতর্কিতে। সেদিন আমি অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু আগেই গিয়েছিলাম ব্যাঙ্কে, ম্যানেজারের সাথে মিটিং থাকায়। আমার নির্ধারিত টেবিলের পাশে মনোময় গাঙ্গুলির বসার জায়গাটা তখন ফাঁকা।
ব্যাঙ্কের পিওন রঘুকে চা আনতে পাঠিয়েছিলাম। তারমধ্যেই হঠাৎই চোখ গেল মনোময়বাবুর টেবিলের ওপর রাখা একটা কাগজের ঠোঙার দিকে।
কেন জানি না, আমার হাত যেন সেদিকে আপনা-আপনি এগিয়ে যেতে চাইল। এক অদৃশ্য আকর্ষণ, যা উপেক্ষা করার সাধ্য আমার ছিল না। আমি নিজেকে সংযত করার বহু চেষ্টা করলাম, 'অন্যের জিনিসে হাত দিতে নেই।'
কিন্তু সেই কৌতূহল এক তীব্র নেশার মতো আমাকে টেনে নিয়ে গেল। ধীরে ধীরে আমি ঠোঙাটা হাতে তুলে নিলাম, আর ব্যস্তভাবে মুখটা খুলতেই যেন এক শীতল স্রোত আমার শিরদাঁড়া দিয়ে নেমে গেল।
ঠোঙার ভেতরে ছিল কিছু সাধারণ অথচ ভয়ংকর জিনিস—লাল-কালো-হলুদ সুতো, সিঁদুর মাখানো একটি ছোট নারকেল (পুজো দেওয়া মনে হল), বেশ কিছু সুপারি, আর সবশেষে, একটা ছোট কাগজে মোড়া এক চিমটে ছাই, সাথে আরও বেশ কিছু উপকরণ যার নাম আমার জানা নেই।
ঠিক তখনই পিছন থেকে চিৎকার করে উঠল চায়ের কাপ হাতে দাঁড়িয়ে থাকা রঘু, ব্যাঙ্কের পিওন। তার চোখ বিস্ফারিত, মুখমণ্ডলে আতঙ্ক।
"এ-এগুলোকে আপনি কোথা থেকে পেলেন ম্যাডাম? সাংঘাতিক জিনিস! এক্ষুনি দূর করুন!"
আমি হতভম্ব। রঘুর দিকে তাকিয়ে বললাম, "এতে কী হয়েছে? পাশের টেবিলে ছিল, তুলে নিয়েছি কৌতূহলবশত।"
রঘুর কণ্ঠস্বর তখন কাঁপছে, "এ আপনি কী করলেন ম্যাডাম? অন্যের বিপদ না জেনেই নিজের ঘাড়ে নিলেন? তুক করেছে কেউ। হয়তো মনোময়বাবুর জন্য ছিল... কিন্তু আপনি ওটাতে হাত দিয়ে একেবারেই ভালো করেননি। এখন থেকে খুব সাবধানে থাকবেন। সামনেই অমাবস্যা... আর সেই সময়েই কিছু ঘটতে চলেছে।"
আর কথা বাড়ালাম না। দ্রুত সেগুলোকে তুলে নিয়ে বাইরে ফেলে দিয়ে এলাম। কিন্তু সেই দিনটা আমার কাটল এক গভীর চিন্তার ভারে। মন জুড়ে শুধু ওই ঠোঙার ভেতরের অশুভ বস্তুগুলোর ছবি ভেসে উঠছে।
কিছুদিন কাটল নিশ্চিন্তে। আমি প্রায় ভুলেই গেলাম রঘুর সতর্কবাণী। হয়তো সবটাই মনের ভুল ছিল।
কিন্তু সেই শান্তিতে বাধ সাধল একদিনের বৃষ্টিভেজা রাত। ঘরের জানালা বন্ধ। কাঁচের ওপাশ দিয়ে বাইরে শুধু ঝড়-বৃষ্টি আর অন্ধকারের বীভৎসতা প্রকাশ পাচ্ছিল। আমি টিভি দেখছিলাম। হঠাৎ আমার তীব্রভাবে মনে হল—যেন কেউ জানালা দিয়ে আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।
প্রথমে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম—নিশ্চয় বিভ্রম, ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম, কেউ নেই সেখানে। কিন্তু সেই অনুভূতি এত বাস্তব ছিল যে, আমি আর স্থির থাকতে পারলাম না। চোখের কোণ দিয়ে জানালার দিকে তাকালাম।
যা দেখলাম, তাতে আমার রক্ত যেন জমে গেল।
একটা কালো মাথা যেন উঁকি দিচ্ছে জানালার কাঁচের ওপার থেকে। তার দৃষ্টি জ্বলজ্বলে, স্থিরভাবে তাকিয়ে আছে ঠিক আমার দিকে। আমি চকিতে মাথা ঘোরাতেই এক ঝলকের জন্য দেখলাম—একটি বীভৎস, পুড়ে যাওয়া মুখ!
চিৎকার করতে গেলাম, কিন্তু গলার স্বর ফুটল না। সেই মুখটি হঠাৎ করেই অদৃশ্য হয়ে গেল। মনে হল—ওটা কি সেই শক্তি, যাকে কেউ জাগিয়েছিল অন্যের ক্ষতির জন্য, আর যাকে না জেনে আমি আমার ঘরে বয়ে এনেছি? এক পৈশাচিক শক্তি যার উপস্থিতি আজ আমার দোরগোড়ায়।
মেয়েকে খাওয়ানো শেষ করে মা ঘরে প্রবেশ করেই আমার ওরকম ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়ে কারণ জানতে চাইলেন। আমি বলতে পারলাম না, কারণ আমিও সঠিক কিছুই বুঝিনি।
তারপর থেকে কেটে গেল বেশ কিছুদিন। আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—সেদিনের দেখাটা ছিল মনের ভয়, হয়তো বা চোখের ভুল। রোজনামচা চলছিল স্বাভাবিক ছন্দে।
কিন্তু সেই স্বস্তিকে ভেঙে দিল এক রাতের ঘটনা, যা আমি কোনোদিন ভুলতে পারব না।
সেদিনও ঝড়-বৃষ্টির পর ঘুমটা ছিল খুব গভীর। আমরা তিনজন একই বিছানায়—একপাশে আমি, মাঝে মঞ্জুশ্রী আর অন্যপাশে মা। হঠাৎ আমার গালে সপাটে একটা চড় পড়ল। প্রচণ্ড যন্ত্রণায় আমার ঘুম ভাঙল।
চোখ খুলে যে দৃশ্য দেখলাম, তাতে আমার মেরুদণ্ড বেয়ে যেন বরফ গলা জল নেমে গেল।
মা প্রবলভাবে কাঁদছেন। ঘরের কোণে পুষ্প আতঙ্কে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে। মা আমাকে বারবার কিছু বলতে চাইছেন, আমার হাত ধরে টানছেন। কিন্তু আমি প্রথমে কিছুই বুঝতে পারলাম না।
তারপর আমার চোখ পড়ল সেই ভয়ংকর সত্যের দিকে—আমি আমার মেয়ের গলা টিপে ধরে আছি!
মঞ্জুশ্রী ককিয়ে উঠছে, নিশ্বাস বন্ধ হওয়ার যন্ত্রণায় তার শরীর ছটফট করছে। মা পাগলের মতো চেষ্টা করছেন আমার হাত ছাড়াতে, কিন্তু পারছেন না। সেই জন্যই তিনি আমার গালে চড় মেরেছিলেন, আমার জ্ঞান ফেরানোর জন্য।
তড়িঘড়ি হাত ছেড়ে দিলাম। ভয়ে, অনুশোচনায় আমি জবুথবু হয়ে বিছানার একপাশে সরে গেলাম। মনে কেবল একটিই প্রশ্ন—"এ... এ আমি কী করছিলাম? নিজের হাতেই নিজের মেয়েকে...!"
মঞ্জুশ্রী সে যাত্রায় রক্ষা পেল, কিন্তু সেই আঘাত তার মনে গভীর ক্ষত তৈরি করল। সে আমাকেই ভয় পেতে শুরু করল। আমার ভয়ংকর রূপ দেখে আমি নিজে থেকেই তাকে আলাদা করে দিলাম। সে রাতে মায়ের সঙ্গে অন্য ঘরে ঘুমাত।
"তোরা জানিস," অপর্ণা কাকিমা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর চোখ দুটোতে তখনো সেই রাতের আতঙ্ক স্পষ্ট প্রতিফলিত হচ্ছে।
"আজ অবধি অনেক মন্দির-মসজিদ করেছি। নিজেকে স্বাভাবিক করতে পারিনি। আজও মাঝে মাঝে আমি রাতের অন্ধকারে সেই পোড়া মুখের অধিকারীকে এক ঝলকের জন্য দেখতে পাই। কখনো নির্জন কোনো গলিতে, কখনো অন্ধকার রাস্তা দিয়ে যাবার সময় গাড়ির আলোতে এক সেকেন্ডের জন্য..."
তিনি একটু থামলেন। তাঁর কণ্ঠস্বরে তখন ভয়ের আভাস পাচ্ছিলাম আমরা।
"সে কিন্তু আজও পিছু ছাড়েনি। আমি জানি সে আমার সাথে সাথেই আছে। হয়তো এই ছাদে, এই অন্ধকারের মধ্যেই সে কোথাও লুকিয়ে আছে। অন্ধকারের বাসিন্দা সে, তাই তাকে আমার জীবন থেকে আলাদা করা সোজা না। কোনো মন্দির বা মসজিদ আমাকে এর থেকে রেহাই দিতে পারেনি আজও। সে সুযোগ পেলেই পিছু পিছু আসে।"
তিনি আমাদের দিকে তাকালেন। তাঁর শেষ কথাগুলো যেন সেই শীতের রাতের নীরবতাকে ভেদ করে গেল।
তিনি আবার বললেন, "শুধু আমার এইটুকুই জানা নেই—রাতে ঘুমের মধ্যে আমি এখনও কারুর গলা টিপতে যাই কিনা। কারণ, তারপর থেকে আমি রাতে একাই শুই।"
গল্পটি শুনে আমাদের মধ্যে পিনপতন নীরবতা নেমে এল যেন। প্রত্যেকেই যেন সেই পোড়া মুখ আর গভীর রাতের আতঙ্কের দৃশ্য মনে মনে কল্পনা করে ভয়ে শিউরে উঠছিলাম।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।