ভৌতিক গল্পের লেখকদের মধ্যে এই মুহূর্তে কে সেরা লেখক ? ...প্রশ্ন এলেই , একটা নামই চলে আসে শেখর ব্যানার্জি । সত্যি ভদ্রলোকের লেখার প্রশংসা করতে হয় । অতি বড়ো অবিশ্বাসী বা সাহসী লোকও ওঁর লেখা পড়ে তাজ্জব হয়ে যায় । মনে হয় সব সত্যি । চিরাচরিত ভূতের গল্পের প্লট ছেড়ে ...নতুন আঙ্গিকে লেখা । এখানেই তার জনপ্রিয়তা ।

মধ্য বয়সী শেখর , বিয়ে থা করেনি । তাই নিজের মর্জির নিজেই মালিক । বাবা মাকে হারিয়ে মামার বাড়িতেই মানুষ । ছোটোখাটো একটা কাজ করে । কিন্তু আসল উপার্জন লেখা থেকে । কিছু দিন ধরেই শেখর ভাবছে ...কোন পুরোনো দুর্গকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ গল্প লেখার । আগেকার ইংরেজি সাহিত্যের লেখক লেখিকারা দুর্গের ওপর অনেক রচনা লিখে গেছে । কিন্তু এখন আর সেই রকম হাড় কাঁপানো গল্প বড়ো একটা চোখে পড়ে না । কিছু বিশেষ বন্ধুকে সে বলেই রেখেছে । যদি ভারত বর্ষে সেই রকম অজানা , গা ছমছমে দুর্গের সন্ধান পাওয়া যায় ? অতি অবশ্যই জানাতে ।

ওই পরিবেশে গিয়ে লিখলে , আপনা হতেই মাথায় প্লট এসে যাবে । কিন্তু ভাবতে পারেনি ...এতো জলদি দুর্গের সন্ধান পেয়ে যাবে !

সিমলা থেকে ওর বন্ধু মৃগাঙ্ক ফোন করলো ।

" হ্যালো... শেখর , একটা দুর্গের সন্ধান পেয়েছি । একেবারে ব্রিটিশ আমলের । ছবিতে যেমন দেখিস ,সেরকম পুরোপুরি নয় । তবে ওই ধাঁচের বিরাট বাড়ি । চারিদিকের পরিবেশ একেবারে তোর ভৌতিক গল্পের সঙ্গে একদম মানান সই । জায়গাটা সিমলা ছাড়িয়ে একটু দুরে । ￰ফাগুর কাছাকাছি । অনেকদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে । রাস্তা থেকে খানিকটা উঁচুতে , পাহাড়ের মাথায় । এর মধ্যে আমি একবার গিয়ে দেখে এসেছি । কেননা আমাদের কোম্পানী ওটা কিনবে ঠিক করেছে । হোটেল বানাবে বলে । আমার ওপর সব দায়িত্ব দিয়েছে । আগামী সপ্তাহে স্ত্রীকে নিয়ে ওখানে যাচ্ছি । কেননা কিছুদিন ওখানে থেকে সব কিছু দেখে নিতে হবে । কতখানি রিপেয়ার আর রিমডেলিং করা যেতে পারে । আমার রিপোর্ট পাবার পরেই কোম্পানি কেনার ব্যাপারটা ফাইনাল করবে । তাই একটু জলদি আয় । কেননা কাজ শুরু হয়ে গেলে , ভুতুড়ে পরিবেশটা পাবি না । হলপ করে বলতে পারি তুই নিরাশ হবি না । "

একটাও কথা না বলে শেখর সব শুনে গেলো ..। তারপর বললো । " অল রাইট......দিন দশেকে মধ্যে আসছি । তুই সিমলা থেকে যাবার ডিটেলসটা মাঝখানে মেসেজ করে দিবি । কালকেই ফ্লাইটের টিকিট দেখছি । "

শেখর মনে মনে সন্তুষ্ট হলো । কেননা মৃগাঙ্কের দৃষ্টি ভঙ্গিকে ও অবজ্ঞা করে না । ও যখন বলেছে , ভৌতিক পরিবেশ ...। তখন কথাটার গুরুত্ব আছে । এলেবেলে কথা ও বলবে না । তবে কয়েকদিন বাদেই সে যাবে । আগে ওরা গিয়ে পৌঁছোক ।

সেই ভাবেই ও প্লেনের টিকিট কাটতে মনস্থ করলো । যাবার আগে মৃগাঙ্ককে সে জানিয়ে দেবে । মনের মধ্যে একটা চাপা উত্তেজনা খেলা করতে লাগলো । এখনও পর্যন্ত সে কোন দুর্গে রাত কাটায় নি । বই আর সিনেমাতে শুধু দেখেছে । যদি ভাগ্য ভালো থাকে , কোন অতীন্দ্রিয় শক্তির স্পর্শ বা অনুভব লাভ করে ? তাহলে ষোলো কলা পূর্ণ হয়ে যাবে । জম্পেশ একটা ভূতের গল্প লিখে ফেলা যাবে ।

কয়েক দিনের মধ্যে মৃগাঙ্কের ফোনে, যাবার পথ নির্দেশ পেয়ে গেলো । বন্ধু আবার ওই বাড়ির গুণগান করলো । শেখর তার যাবার তারিখ জানিয়ে দিলো ।

কিন্তু ভৌতিক গল্পের লেখক ....একটুও বুঝতে পারে নি । ...আগামী দিনে তার জন্যে কি ভয়াল অভিজ্ঞতা ওখানে অপেক্ষা করে আছে ??

ফ্লাইট দু ঘন্টা লেট্ হবার জন্যে দিল্লী পৌঁছতে দেরি হয়ে গেলো । এয়ার পোর্ট থেকেই সিমলা যাবার জন্যে গাড়ী নিয়ে নিলো । কম বেশি সাত আট ঘন্টা লাগবে । নভেম্বরের মাঝামাঝি । মৃগাঙ্ক বলেই দিয়েছিলো ....সিমলাতে ঠান্ডা পাবে । ￰ফাগুতে আরও একটু বেশি । সিমলা থেকে ফাগু আরও ঘন্টা দুয়েকের জার্নি । দেখা যাক , এই ড্রাইভারটা রাজি হয় কিনা ?

.....সন্ধ্যে থেকেই আত্রেয়ী ( মৃগাঙ্কের স্ত্রী ) আর মৃগাঙ্ক চিন্তায় আছে শেখরের জন্যে । ভোরের দিকে শুধু একবার শেখর ফোন করেছিল । এরপর থেকে আর করেনি । ওরাও চেষ্টা করে লাইন পায় নি । ...একটু আগে অবশ্য মৃগাঙ্ক , নেট ঘেঁটে জানতে পারলো ...প্লেন দিল্লিতে দেরিতে ল্যান্ড করেছে । তার মানে ...বন্ধুর আসতে রাত হবে ।

আত্রেয়ী বললো । " তোমার বন্ধু একটা খবর দিতে পারতো ? "

মৃগাঙ্ক হাসে । " লেখক মানুষরা একটু মুডি হয় । কখন কোন খেয়ালে থাকে । আশা করছি , রাত নটার মধ্যে এসে পড়বে । কেননা আগেই ও জানিয়ে ছিল ...এয়ারপোর্ট থেকে টানা কারে এখানে আসবে । "

￰ফাগুর এই জন বিহীন পাহাড়ি এলাকায় রাত নটা মানে , বেশ রাত্রি । এদিকে ঠান্ডা বেশ জাঁকিয়ে পড়েছে । রাস্তা ইতিমধ্যে নির্জন । বিশাল এলাকা জুড়ে এই দুর্গে , অন্ধকার ...কালো আঠার মতো চারিদিকে লেগে আছে ..। বিশাল ড্রইং রুমে দুটো প্রাণী নরম সোফায় বসে অপেক্ষা করে চলেছে শেখরের জন্যে । এ ছাড়া সারা বাড়ি অন্ধকার ঘুটঘুটে । ড্রইং রুমে যেটুকু আলোর রোশনাই ।

শেখরের গাড়ি , বিরাট লোহার গেটের বাইরে এসে থামলো যখন ...তখন ওর ঘড়িতে সাড়ে নটা বাজছে । ড্রাইভারকে ভাড়া মিটিয়ে দিলো । দিল্লির ড্রাইভার এই রকম একটা ভুতুড়ে দুর্গ দেখে অবাক হয়ে যায় । মনে হচ্ছে কেউ থাকেও না !

" স্যার , ইঁহা আপ রেহেঙ্গে ? লাগতা হ্যায় কোই নেহি হ্যায় .....বিলকুল সন্নাটা ! " ড্রাইভার সরু রাস্তাতে অনেক চেষ্টাতে গাড়ি ঘুরিয়ে ফিরতি পথ ধরলো । হেড লাইটের আলোয় তবু জায়গাটা কিছুটা আলোকিত হয়ে ছিল । এখন অন্ধকারের সঙ্গে ঠান্ডাটাও শেখরের দেহে ঝাঁপিয়ে পড়লো ।

মোবাইলের চার্জ না থাকার জন্যে ব্যাগ থেকে ছোট চাইনিজ টর্চটা বার করলো । গেট থেকে বাড়ির দূরত্ব বেশি থাকার জন্যেই বোধহয় ওরা তার গাড়ির শব্দ শুনতে পায়নি ! টর্চের আলো লোহার গেটে পড়তে জং ধরা লোহাগুলো চিকচিক করে উঠলো ।

শেখরের চোখে ...এক আকাশ উজ্জ্বল তারার মধ্যে দুর্গের ন্যায় বিশাল বাড়িটা , মনে হলো যেন একটা বিরাট বাদুড় দুই ডানা মেলে রয়েছে । ভয়ের থেকে রোমাঞ্চ বেশি লাগলো । মনে হচ্ছে এখুনি কাগজ পেন নিয়ে বসে যায় ! উঁচু গম্বুজের মতো বাড়িটার একেবারে ওপরের তলায় একটা ঘরে কমলালেবু রঙের আলো জানলার কাঁচে পড়ছে ..। তার বন্ধুরা ওই অত উঁচুতে থাকলে ....এখান থেকে চেঁচিয়ে মরে গেলেও শুনতে পাবে না । এদিকে গেটে একটা বড়ো তালা ঝুলছে ।

একটু চিন্তায় পড়লো সে । এদিকে শীতের কামড়ে দাঁত গুলো ঠকঠক করছে । ....এইসময় সদর দরজার আলোটা জ্বলে উঠলো । দশটা বাজছে দেখে মৃগাঙ্ক নিচের রাস্তার কাছে যাবার ঠিক করে.... আলোটা জ্বালিয়েছে ।

গেটের কাছে আসতেই বন্ধুর দেখা পেলো । অবাক হয়ে বললো । " কতক্ষণ হলো এসেছিস ? "

শেখর নিজেও অবাক হয়ে গেছে । ভাবছে ওই উঁচু ঘর থেকে তার আসার খবর মৃগাঙ্ক জানলো কি ভাবে ? ঠান্ডায় ঘরের জানলার কাঁচগুলো তো বন্ধ । ...সেই ভোরে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে । এতো পথ জার্নিতে এমনিতেই ক্লান্ত ! এখন আর ওই সব প্রশ্ন করে সময় নষ্ট করতে ইচ্ছে হলো না । পরে জেনে নেবে । আগে বাড়ির ভেতর গরমে ঢোকা যাক ।

বন্ধুকে নিয়ে মৃগাঙ্ক বাড়ির দিকে এগোলো । শেখরের মাথায় প্রশ্নটা মেসেজের মতো সেভ করা রইলো ।

( আমি শঙ্কর বলছি । প্রথম থেকে আপনি কিন্তু ঘটনার মধ্যে রয়েছেন । তাই নতুন করে আপনাকে কিছু বলার দরকার নেই । এখনও পর্যন্ত ভয় পাবার মতো কিছু ঘটেনি । শুধু ওই ছোট্ট ঘটনাটা ছাড়া ...যা শেখর মাথায় সেভ করে রাখলো । তাহলে আর কি ? আপনিও ওদের পিছু পিছু বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ুন । আবার পরে দেখা হবে । )

আগেকার দিনের ফায়ার প্লেস যুক্ত ড্রইং রুমে বসে ...শেখর কিছুটা আরাম বোধ করে । আত্রেয়ী হেসে বলে । " অবশেষে এসে পৌঁছলেন । খুব চিন্তা হচ্ছিলো । "

মৃগাঙ্ক বলে । " এমনিতেই রাত হয়ে গেছে । তাছাড়া ও টায়ার্ড । তুমি ডিনার রেডি করো । "

শেখর বলে । " ...এখনও দশটা বাজে নি । আমি ঠিক আছি । তোদের অসুবিধে না হলে , বরং এক কাপ চা বা কফি খাওয়া । "

" রাইট ....শেখরদা । আমি এখুনি করে আনছি । " আত্রেয়ী কিচেনের দিকে চলে যায় । পিছন থেকে মৃগাঙ্ক বলে ওঠে ।

" আমার জন্যেও এনো । "

শেখর তাকিয়ে তাকিয়ে চারিদিক দেখে । বসার জায়গা টাই বিরাট....... হল ঘরের সমান । ব্রিটিশ আমলের ধাঁচে তৈরী । সোফা সেট ঘিরে নিচু সেন্টার টেবিলটাই ছোটখাটো ডাইনিং টেবিল । ￰দেওয়াল জুড়ে বিভিন্ন ছবির ফ্রেম । সিলিং থেকে ঝুলছে ঝাড় লণ্ঠন । অবশ্য এই মুহূর্তে শুধু দুটো পেতলের স্ট্যান্ডিং আলো ঘরটা আলোকিত করে রেখেছে ।

" ভেরি নাইস । মনে হচ্ছে কোন ড্রাকুলার পুরোনো প্রাসাদে বসে আছি । " শেখরের প্রশংসার গলা ।

" ...সকাল হোক , পুরো বাড়িটা ঘুরিয়ে দেখাবো । আশ পাশের নৈসর্গিক দৃশ্যের সঙ্গে কেমন মানানসই এই ভিলা দেখবি । " মৃগাঙ্ক হাতে হাত ঘষে । এই সময় আত্রেয়ী কফির পেয়ালা নিয়ে হাজির । গরম ধোঁয়া ওঠা নেসক্যাফেতে চুমুক মেরে শেখর তৃপ্তির আহা শব্দ বার করে ..।

আত্রেয়ীর সঙ্গে আগেই আলাপ ছিল শেখরের । ওদের বিয়েতেও অ্যাটেন্ড করেছিল সে । মৃগাঙ্ক কফিতে চুমুক দিয়ে বলে ।

" তবে ...আসল জিনিসটাই মনে হয় নেই । এই কয়েক দিন এখানে থেকেও তার টিকিটি দেখতে বা উপলব্ধি করতে পারিনি । " আত্রেয়ী বুঝতে পারে না --- স্বামী কিসের কথা বলছে !

শেখর মুচকি হেসে বলে । " তেনাদের তো আমার কলম নিয়ে আসবে , নরকের দরজা খুলে । "

"...এই রাত্রে ওসব আলোচনা আমার ভালো লাগে না ..। " আত্রেয়ী এবার বুঝতে পারে ।

শেখর সোফায় ঠেসান দিয়ে সেই প্রশ্নটা করে । যা এতক্ষণ তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে । " তোরা দুজন ছাদের ওই চিলে কোঠার ঘর থেকে আমার আসার খবর পেলি কি করে ? " -- ওর প্রশ্নে স্বামী স্ত্রী দুজনেই অবাক চোখে শেখরের দিকে এক মিনিট তাকিয়ে থাকে ।

মৃগাঙ্ক কোল কুঁজো হয়ে বসে বলে । " ...চিলে কোঠা ? ...আমরা এখানেই বসে ছিলাম । তাছাড়া , আমরা শুধু দোতলার দুটো ঘর ব্যবহার করছি । বাকি ঘর সব বন্ধ পড়ে আছে । সারা বাড়ি তো অন্ধকার হয়ে আছে । "

শেখর চশমার ফাঁক দিয়ে দেবা দেবীর দিকে রহস্যময় চোখে তাকায় । " সমঝা...ভৌতিক লেখককেই ভয় দেখানো হচ্ছে ? অন্ধকার রাতে ...পরিষ্কার কমলা আলো জানলার কাঁচে দেখলাম ! তারপরেই তুই দরজা খুলে বেরিয়ে এলি । তাই ভাবছিলাম কি ভাবে এতো তাড়াতাড়ি নামলি ....দুজনে মিলে যতই চেষ্টা করো আমাকে ভূতের ভয় দেখিয়ে তাড়াতে ... ! আমি যাচ্ছি না । "

এবার আত্রেয়ী জোর দিয়ে বলে ওঠে । " উল্টে আপনি আমাদের ভয় দেখাচ্ছেন ! আপনার ফ্রেন্ড ঠিক কথা বলেছে । নীচে আর দোতলার দুটো ঘর ছাড়া ...। "

কথা শেষ করতে দেয় না শেখর । কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বলে ওঠে । " ....ঠিক আছে বাবা , আমারই দেখার ভুল ...। " ঘড়ির দিকে তাকিয়ে নেয় । " আমি এবার একটু ফ্রেশ হয়ে নিই । তারপর ডিনার করে নেবো । " ওই আলোচনা বন্ধ হয়ে গেলো । মৃগাঙ্ক উঠে দাঁড়ালো ।

" চল , ওপরে তোর ঘরটা দেখিয়ে আসি । ￰এটাচ বাথরুম আছে । ￰গিজারও পাবি । পাশেই আমাদের বেডরুম ..। "

ওরা কাঠের সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় এলো । মৃগাঙ্ক ঘরটা দেখিয়ে বলে । " নে...পনেরো মিনিটে রেডি হয়ে নিচে আয় । ও ডিনার রেডি করছে । "

শেখর দেখলো শোবার ঘরটা বেশ ভালোই । বাড়িটা পুরোনো হলেও ভেতরটা এখনও মজবুত আছে । আগেকার দিনের মাল মশলাই আলাদা ছিল । এতো ভেজাল ছিল না ।

মুখ হাত , গরম জলে ধুতে ধুতে পুরোনো কথাটা মস্তিষ্কে ধাক্কা দিলো । -- ওরা হঠাৎ আলো জ্বলা ঘরের ব্যাপারটা অস্বীকার করলো কেন ? সে স্পষ্ট আলো জ্বলা দেখেছে ! তবে কি ওরা ইচ্ছে করে তার সঙ্গে মজা করছে ? দেখতে চাইছে ভৌতিক গল্পের লেখকের নার্ভ কতটা শক্ত ? সে ঠিক করে নিলো ...কাল সকালে ওই ঘরে ঢুকলেই বোঝা যাবে ।

তোয়ালে নিয়ে বাথরুম থেকে ঘরে ঢুকতেই একটা অন্য রকম অনুভূতি ওর শরীরে হলো । মনে হলো ...একটা ছায়ার মতো মূর্তি বিছানা ছেড়ে উঠে , দৌড়ে দেওয়ালে আটকানো বিরাট আলমারির মধ্যে ঢুকে গেলো । বুকটা এক সেকেন্ডের জন্যে বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে গেলো । হাতে ধরা চশমাটা পরে নিয়ে আলমারির দিকে তাকালো । এগিয়ে গিয়ে পাল্লাটা খুললো ...কেউ নেই..। বুঝে পাচ্ছে না , আচমকা তার মনটা এতো ভীতু আচরণ করছে কেন ? সে তো বরাবরই সাহসী । গল্পের তাগিদে কতবার রাত্রে শ্মশানে গেছে ! কত তান্ত্রিকের সাথে মিশেছে । কিন্তু কখনও স্নায়ুর দুর্বলতা প্রকাশ পাইনি ।

তাহলে কি এই বাড়িতে সত্যি কিছু আছে ? তাই যদি হয় ? ওরা আগে দেখতে পেতো । বরং মৃগাঙ্ক বললো , ঐসব কিছু এখানে নেই । এই সময় মৃগাঙ্কের কণ্ঠস্বর ভেসে এলো ।

" কি রে হয়েছে ? খাবার ঠান্ডা হচ্ছে । " -- তাড়াতাড়ি শেখর সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে এলো । ওদের অনেক রাত করিয়ে দিচ্ছে সে । এসে দেখলো টেবিলে প্লেট সাজানো কমপ্লিট ।

" সরি , একটু দেরি করিয়ে ফেললাম তোদের । " শেখরের গলায় অপ্রস্তুতের চিহ্ন । আত্রেয়ী রান্নাঘর থেকে বললো ।

" আমরাও রাত করে খাই । কিন্তু হবার কিছু নেই । একটু বসুন ...চিকেনটা গরম করছি । ততক্ষন দুই বন্ধুতে মিলে গল্প করুন । "

,মৃগাঙ্কের দিকে তাকিয়ে সে বলে ওঠে । " তাহলে তুই হাঁক দিলি কেন ? "

" ....আমি ? কখন ? " মৃগাঙ্ক শেখরের দিকে গোল গোল চোখ করে তাকিয়ে থাকে ।

শেখর এবার একটু রেগে যায় । " ...কি আরম্ভ করেছিস তোরা ? আমাকে বাচ্চা ছেলে পেয়েছিস ? একটু আগেই ডাকলি ...তাই আমি তাড়াহুড়ো করে নেমে এলাম ...। ".

শেখরের সিরিয়াস গলা শুনে কিচেন থেকে আত্রেয়ীও বেরিয়ে এসেছে । মৃগাঙ্ক বললো ।

" ফ্রেন্ড....ইয়ার্কি তুই মারছিস । প্রথম এসেই বললি ছাদের ঘরে আলো জ্বলছে ! এখন আবার বলছিস ...নিচ থেকে আমি নাকি তোকে ডেকেছি ! একটু আগেই বউয়ের সঙ্গে তোর ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করছিলাম । আমাদের মনে ভয় ঢোকাবার জন্যেই তুই মজা করেছিস , এটাই বলছিলাম । " আত্রেয়ীও কথাটা সমর্থন করলো ।

ঢোঁক গিললো শেখর । কোনটা বিশ্বাস করবে সে ? নিজের চোখ কানকে ? না এদের কথাগুলো কে ? কিছু একটা রহস্য আছে এর মধ্যে । কিন্তু রহস্যটা কি ...সেটাই মাথায় আসছে না ।

মৃগাঙ্ক বলে বন্ধুকে । " মনে হয় , অনেক জার্নি করার ফল । ডিনার সেরে ভালো করে ঘুমো , দেখবি সকালে চাঙ্গা হয়ে গেছিস । "

আত্রেয়ী বলে । " এই ঠান্ডায় কাল ভোরে উঠতে হবে না । " আর কথা হয় না । ডিনার সারার পর মৃগাঙ্ক এক পেগ হুইস্কি শেখরকে দিলো ।

" রাত্রে শরীর গরম থাকবে । আর তোফা ঘুম হবে । "

চিয়ার্স করে দুই বন্ধুতে সুরাতে চুমুক দিলো । একটু বাদেই লাল পানীয় তার কাজ শুরু করে দিলো । শেখরের শরীরের শিরায় শিরায় সুরার প্রসন্ন শান্তি ছড়িয়ে যাচ্ছে । মনের মধ্যে লুকোনো ভয় কমে যাচ্ছে ! আরও এক পেগ নিলো । চোখ দুটোতে রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে । তারপর এক সময় উঠে দাঁড়ালো । " গুড নাইট....এবার শুয়ে পড়ি । "

মৃগাঙ্ক ওর সঙ্গে ওপরে এলো । " পাশের ঘরে আমরা থাকবো । যদি দরকার লাগে দরজায় নক করবি । শেখর হাত নেড়ে ঘরে ঢুকে এসে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়লো । একটু বাদেই তার নাক ডাকতে লাগলো ।

( আবার এলাম আপনার কাছে । মনে হচ্ছে একটু চিন্তিত ? ...ঠিক বলেছেন । সহজ সরল ভাবে ঘটনা এগোচ্ছে না । অবশ্য কাল সকালে শেখর চিলে কোঠার ঘরটা নিশ্চয়ই দেখবে । কিন্তু ওই ডাকটা ? তাছাড়া এখনও সারা রাত পড়ে আছে ! ...যদি সাহস থাকে , ঘরের এক কোণে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করুন । যদি কোন সমস্যার সমাধান করতে পারেন ? ...আমি এখন যাই । শুভ রাত্রি । )