আমার বয়স তখন পনেরো। শহরের মাঝে এক শান্ত অথচ রহস্যে মোড়া নির্জন গলিতে ছিল আমাদের আদি বাড়ি। শীতের সন্ধ্যাগুলো সেখানে বড্ড দ্রুত নেমে আসত। যেদিনের কথা বলছি, সেদিনও রোজকার মতো পড়া শেষে আমরা দল বেঁধে বাড়ি ফিরছিলাম।

রোজকার মতো গল্প করতে করতে আমার বন্ধুরা যে যার বাড়িতে ঢুকে যাচ্ছিল। কিন্তু সেদিন আমার সাথে শেষ অবধি ফেরা বান্ধবীটি, নাম নন্দিনী, ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল। তাই পথের শেষটুকু আমাকে একাই পেরোতে হচ্ছিল। আমাদের বাড়ি আর নন্দিনীর বাড়ির মাঝে দূরত্বটা বেশি না হলেও, মাঝখানে পড়ত সেই পুরোনো শ্যাওলা-পড়া পুকুরটা। আর তার ঠিক ধার ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিল একটা বিশাল ছাতিম ফুলের গাছ। গাছটা যেন সেই পুকুরের সমস্ত রহস্য একাই আগলে রাখত।

ছাতিম তলায় পৌঁছতেই শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল। কারণ, হঠাৎ পিছন থেকে আমি আমার নাম ধরে স্পষ্ট ডাক শুনতে পেলাম।

গলার স্বরটা নন্দিনীরই, তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না। আমি তৎক্ষণাৎ আনন্দে পিছনে ফিরে তাকালাম। কিন্তু কই? চারিদিকে ঘন হয়ে আসা আঁধার, আবছা জঙ্গল আর পথের নীরবতা ছাড়া তো কেউ নেই! ভুল শুনেছি ভেবে নিজেকে বকা দিলাম, মনটাকে শক্ত করে আবার বাড়ির দিকে এগোতে লাগলাম।

আমি যখন ছাতিম গাছ থেকে কয়েক পা এগিয়েছি, তখনই আবার একই ডাক, আরও স্পষ্ট, যেন ঠিক আমার কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে ডাকল – "নবনীতা... দেখবি না একবার?"

এবার আর ভুল বোঝার উপায় ছিল না। আমার সমস্ত শরীরের লোম খাড়া হয়ে উঠলো। আমি ভয়ে ভয়ে পিছন ফিরে তাকালাম, শ্বাস বন্ধ করে। আবারও কেউ নেই। দ্বিতীয়বারের এই নীরবতা আমাকে গভীরভাবে বিচলিত করল। নন্দিনী যদি এসে থাকে, তবে সে কেন লুকিয়ে থাকবে? আমার মন দ্রুত একটা খারাপ কিছু অনুমান করতে শুরু করল। পুকুরের জমাট বাঁধা অন্ধকার যেন জীবন্ত হয়ে উঠলো।

আমি কাঁপতে কাঁপতে তৃতীয়বার যখন পথ হাঁটতে শুরু করেছি, তখনই ঘটল শেষ এবং সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ঘটনা। তৃতীয়বারের ডাকটা শুধু স্পষ্ট ছিল না, এবার যেন তাতে গভীর এক আকুতি মেশানো ছিল। একটা অদ্ভুত, চাপা আর্তনাদের মতো শোনাল। আমি তৎক্ষণাৎ পিছন ফিরে, অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে প্রায় চিৎকার করে ডাকলাম – "নন্দিনী! তুই কি মজা করছিস? সামনে আয়!"

উত্তর এলো না। কিন্তু এবার আর আমি সেখানে থমকে রইলাম না। এক অদৃশ্য, তীব্র আকর্ষণ যেন আমার পা দুটোকে ছাতিম গাছ পেরিয়ে সোজা পুকুরের ভেজা ধাপগুলোর দিকে টানতে লাগল। আমার মনে হচ্ছিল, নন্দিনী হয়তো জলে পড়ে গেছে বা কোনো বিপদে পড়েছে, আর সে জন্যই আমাকে ডাকছে। আমার মন তখন ভয়ে নয়, এক অজানা কর্তব্যবোধের তাড়নায় অস্থির। আমি পা বাড়াচ্ছি, চোখ বন্ধ হয়ে আসছে, আর মাথার মধ্যে সেই চাপা আর্তনাদ প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। পুকুরের সেই জমাট কালো জল আমাকে হাতছানি দিচ্ছে...

ঠিক সেই মুহূর্তে আমার জ্ঞান ফিরে এলো—পেছন থেকে আমার ছোটকাকার তীক্ষ্ণ গলা শুনে। "এই আঁধারে তুই পুকুরের দিকে যাচ্ছিস কেন? কী হয়েছে তোর?"

ছোটকাকা এসে আমার হাত শক্ত করে ধরল। আমি ধড়মড় করে পুকুরটার দিকে তাকালাম। তখন যেন মনে হলো, পুকুরটার কালো জলের নিচে কিছু একটা চুপিসারে ডুবে গেল, আর ছাতিম গাছের ডালপালাগুলো মৃদু কেঁপে উঠলো। ভয়ে আমার কথা সরল না। কোনোমতে ছোটকাকার সাথে বাড়ি ফিরে এলাম।

সেদিনই রাত থেকেই আমার কাঁপুনি দিয়ে জ্বর এলো। তাপমাত্রা কিছুতেই নামছিল না। টানা এক সপ্তাহ আমি জ্বরের ঘোরে অসংলগ্ন কথা বলতে থাকলাম, যেন সব সময় কেউ আমার নাম ধরে ডাকছে। সুস্থ হওয়ার পর যখন বাড়ির লোককে পুরো ঘটনা বললাম, তখন তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়লেন।

রহস্যের উন্মোচন হলো যখন আমার মা নন্দিনীর বাড়িতে খোঁজ নিলেন। নন্দিনী সেদিন তার মামারবাড়ি গিয়েছিল এবং সেদিন সন্ধ্যায় সে পাড়ায় ছিল না!

তবে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্যটি পরে জানতে পারি। সেই পুকুরপাড়ে, ছাতিম গাছটার ঠিক নিচে, বছর কয়েক আগে জল আনতে গিয়ে একটি কিশোরী ডুবে মারা গিয়েছিল। সেও নাকি রোজ তার বান্ধবীর সাথে ফিরত। সেই কিশোরীর আত্মাই হয়তো গভীর রাতে একা মেয়েদের তার নাম ধরে ডেকে পুকুরের দিকে টেনে নিয়ে যায়।

আমি আজও এই ঘটনার কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা খুঁজে পাইনি। তবে একটি কথা স্পষ্ট জানি—সেদিন ছোটকাকা যদি সময়মতো না আসত, তবে ছাতিম তলার সেই ডাক আমার কৈশোরের শেষ ডাক হয়ে যেত। সেই এক সপ্তাহের মরণ-জ্বর, আর সেই অদৃশ্য টানের সত্যতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। সেই থেকে আজও শীতের সন্ধ্যায় একা ছাতিম তলা দিয়ে হাঁটলে আমার মনে শিহরণ জাগে।