একটা ছোট বাজারের মতো জায়গায় অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে এদিক ওদিক। মোটর ভ্যানই বেশি, তা ছাড়াও কয়েকটা ক্যাব আর প্রাইভেট কারও পার্ক করা রয়েছে। সেখানেই এসে ওদের গাড়িটা দাঁড় করালো ড্রাইভার। গাড়ি থেকে নেমে দুহাত মাথার ওপর তুলে আড়মোড়া ভাঙল শুভেন্দু। এতক্ষণ একটানা গাড়ির ভেতর বসে থেকে শরীরটা টাটিয়ে গেছে। শর্বরীও তার সঙ্গেই নেমে এসেছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে চুলটুল ঠিক করে নিতে নিতে এপাশ ওপাশ দেখছে। মাথার ওপর থেকে গগলস্টা নামিয়ে চোখে পরে নিয়ে সামনে তাকাল শুভেন্দু।
এটাই তার মানে গাড়ির স্ট্যান্ড। এর পর গাড়ি আর যাবে না। বাকি পথটুকু হেঁটেই যেতে হবে। সামনের পথটা ক্রমশ ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে বাঁদিকে বেঁকে গেছে। যা দেখতে আসা, তার কিছুই এখান থেকে দৃষ্টিগোচর নয়। হেঁটে খানিকটা এগোলে তবেই হয়তো দেখতে পাওয়া যাবে।
শর্বরী হ্যান্ডব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়েছে। শুভেন্দুর কিছু নেবার নেই। তবু একবার অকারণেই গাড়ির ভেতর উঁকি মেরে দেখে নিল, তারপর শর্বরীকে সঙ্গে আসার জন্য ইশারা করে এগিয়ে গেল ঢালু পথটা ধরে। একটাই রাস্তা, আর আশপাশের লোকজনরাও ওইদিকেই হাঁটছে, অতএব ওদের গন্তব্য ওখানেই হবে নিশ্চয়ই।
এর আগে অনেকবার দীঘায় এসেছে শুভেন্দু। তালসারি বলে জায়গাটার নামও শুনেছে বহুবার, কিন্তু কোনদিনই যাওয়া হয়নি সেখানে। শুধু শুনেছে সেটাও নাকি একটা বীচ। তবে অন্য সব বীচের থেকে আলাদারকম, আর সেই আলাদা হওয়ার পেছনে নাকি একটা মজা আছে। কিন্তু কী সেই মজা, সেটা অনেক চেষ্টা করেও জানতে পারেনি সে।তাই এবার ঠিক করেই নিয়েছিল যে এবারের ট্রিপে তালসারি যাবেই। গিয়ে নিজের চোখেই মজাটা দেখবে।তারপর হোটেলের রিসেপশানে কথা বলে একটা গাড়িও যখন ঠিক হয়ে গেল, তখন আর দেরি করতে চায়নি ওরা। গতকাল নিউ দীঘায় এসে পৌঁছেছে, আর আজ সকালেই তালসারি। দেখা যাক কী এমন আছে এখানে।
বাঁদিকে ঘুরতেই দেখা গেল, দুপাশের দোকানগুলো কমতে কমতে কিছুটা গিয়েই শেষ হয়ে গেছে। তার পরে অল্প একটু দূরেই লম্বা একটা আড়াআড়ি চত্বর। তার ছাদ আর মেঝেটা সিমেন্ট বাঁধানো, তবে দেয়াল নেই। প্রচুর পশরা বসেছে সেখানে, আর লোকেরাও ভিড় করে আছে, তাই ওপাশে কী আছে সেটা এখান থেকে কিছু বোঝাই যাচ্ছে না। চটপট শর্বরীর হাতটা আলতো করে ধরে ওদিকে এগোলো শুভেন্দু। তারপর ভিড় ঠেলে ওপাশে পৌঁছতেইমুহূর্তে হতবাক হয়ে গেল। আরে সাবাশ ! এ তো অসামান্য একটা ল্যান্ডস্কেপ ! এরকম অদ্ভুত বীচ তো এর আগে কোথাও দেখেনি শুভেন্দু !
ওরা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেই জায়গাটা একটা উঁচু চত্বর। সেখান থেকে কয়েকটা ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নামলে বালিয়াড়ি। সেখানে কোথাও জল নেই, শুধুই বালির সাম্রাজ্য। সেই বালির স্তর পেরিয়ে অনেকটা দূরে চোখে পড়ছে উঁচু জমি, যেখানে লাইন করে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি ঝাউগাছ, আর তার ওপাশেই সমুদ্রটা। বাঁদিকেও বালির চড়াটা বিস্তীর্ণ হয়ে আছে যতদূর দৃষ্টি যায়, ততদূর। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর দৃশ্য হল, ডানদিকে তাকালে অনেকটা দূরে সেই সমুদ্রটাই দেখা যাচ্ছে। সেখানে নৌকো ভাসছে, জেলেরা মাছ ধরছে, অথচ সেই জল এখানে নেই ! কী আশ্চর্য ব্যাপার ! এটা হয় কী করে ?
ভাবতে ভাবতেই আসল ধাঁধাটা ধরতে পারল শুভেন্দু। লক্ষ্য করল, দূরের সমুদ্র থেকে একটু একটু করে জলের ধারা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে, আর এঁকেবেঁকে নানারকম আলপনা আঁকতে আঁকতে সেই জলের ধারা ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে সামনের বেলাভূমিতে। তার মানে এদিকের এই জমিটা আসলে অনেকটা উঁচু, তাই ভাটার সময় সমস্ত জল সরে গিয়ে বালি বেরিয়ে পড়ে, আবার জোয়ারের সময় একটু একটু করে জল এসে গ্রাস করে নেয় গোটা বেলাভূমিটা।
ওদের পাশেই এক মাঝবয়েসী ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে দূরের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। শুভেন্দু আর শর্বরীর চোখেমুখে বিস্ময়ের ভাব লক্ষ্য করে মৃদু হেসে বললেন, “কী দেখছেন ? আর আধঘন্টার মধ্যেই এই গোটা বালিয়াড়িটা জলে জলময় হয়ে যাবে। পারলে এইবেলা ওই ঝাউয়ের বনে ঘুরে আসুন। পরে আর যেতে পারবেন না।”
শুভেন্দু চমৎকৃত হয়ে বলল, “তাই নাকি ? বাঃ ! তা আপনি যাবেন না ?”
ভদ্রলোক মাথা নেড়ে বললেন, “আমার এই নিয়ে এখানে তিনবার আসা হয়ে গেল। আগের দুবার ঘুরে এসেছি। যান না, গেলে ভালোই লাগবে।”
কথা না বাড়িয়ে শর্বরীর দিকে তাকিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল শুভেন্দু। তার পেছন পেছন শর্বরী। ওদের আগে অনেকেই নেমে গিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে বালিয়াড়ির এদিকে ওদিকে। হাসিঠাট্টা, ছবি তোলা, সবই চলছে। কেউ কেউ বালি পেরিয়ে ঝাউবনের দিকেও চলে গেছে। এদিকে জলও একটু একটু করে বাড়ছে। তাই শুভেন্দুরা বালিতে নেমে সময় নষ্ট না করে সোজা চলে গেল ঝাউবনের দিকে। ঢালু জমিটা বেয়ে উঁচুটায় উঠতেই চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। ওদেরচারপাশে ঝাউয়ের সবুজ প্রগাঢ়তা। সামনে অসীম, অনন্ত নীল সমুদ্র। ঘন ঝাউবনের ভেতর শান্ত সকালের মিষ্টি হাওয়ার মাতামাতি। অনেক, অনেকদিন পরে যেন প্রকৃতির স্পর্শ পেল শুভেন্দু।
বেশ কিছুক্ষণ ওরা দাঁড়িয়েছিল একটা ফাঁকা জায়গায়। শর্বরীর মুখের ওপর টুকরো চুলগুলো এলোমেলো হাওয়ায় এপাশ-ওপাশ করছিল। শর্বরী মুখ তুলে বলল, “কী হল ? কী দেখছ অমন করে ?”
শর্বরী ঘাড় ঝাঁকিয়ে বলল, “থামো তো ! সেই কবেকার কথা। আমি তো ভুলেই গেছি।” এই বলে মুচকি হাসল। জানে, একথা বললেই শুভেন্দু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠবে।
হলও তাই। শুভেন্দু মুখ গোমড়া করে বলল, “তা তো বটেই। ভুলে তো যাবেই।”
এবার শুভেন্দুর মুখের ভাব দেখে হি হি করে হেসে উঠল শর্বরী। আর এতক্ষণে শর্বরীর বদমাইশি টের পেয়ে শুভেন্দুও হেসে উঠল। ওদের মিলিত হাসিতে ঝলমল করে উঠল সকালটাও। তারপরেই পেছনের দিকে তাকিয়ে শুভেন্দু তাড়া দিল শর্বরীকে, “চলো চলো। জল উঠে আসছে। এরপর আর ফেরা যাবে না।”
ওরা ফিরতে শুরু করল ঝাউবন থেকে। জল ততক্ষণে তার বাহু বিস্তার করে ফেলেছে বালিয়াড়িটা জুড়ে। নানাদিক দিয়ে ছড়িয়ে পড়ে গোড়ালি পর্যন্ত উঠে এসেছে সমুদ্র। জুতো খুলে হাতে নিয়ে জল মাড়িয়ে ওরা চলে এল এদিকটায়। একপাশে দু-তিনটে নৌকা বাঁধা ছিল বালিয়াড়ির ওপরেই, জোয়ার আসার অপেক্ষায়। তার সামনে পেছনে নানা ভঙ্গীতে ছবি তুলতে তুলতেই পুরোপুরি জোয়ার এসে পড়ল গোটা বালিয়াড়ি জুড়ে। বালি আর দেখা যাচ্ছে না, সমুদ্র তার অধিকার কেড়ে নিয়েছে এখনকার মতো।
ওরা সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে গেল। তারপর কিছুক্ষণ মার্কেটের দোকানগুলোয় ঘোরাঘুরি আর দু-একটা জিনিষ কেনাকাটা। শর্বরী ঘর সাজানোর জিনিষ কিনতে খুব ভালোবাসে। সেরকমই দু-একটা হ্যান্ডিক্র্যাফ্টের জিনিষ কেনা হল। কিছুক্ষণ পরে ওরা ফিরে চলল গাড়ির স্ট্যান্ডের দিকে।আর ফেরার বাঁকটা ঘুরে ঢালু পথটায় পা দিয়েই শুভেন্দুর বুকে হঠাৎ রক্ত ছলাৎ করে উঠল।
এ কী ? ও কাকে দেখছে শুভেন্দু ? ওটা মাধবী না ?
ঢালু রাস্তাটার ওপর দিকটায় একটা গাড়িতে এক দম্পতি তখন উঠে বসছে। কয়েক পা এগিয়ে আসতে না আসতেই শুভেন্দু দেখল, গাড়িটা স্টার্ট দিয়ে বেরিয়ে গেল ফেরবার রাস্তার দিকে। কিন্তু শুভেন্দুর চোখ ভুল কিছু দেখেনি। ভুল তার হতেই পারে না। পার্পল কালারের শাড়ি পরা মেয়েটা নিশ্চিতভাবে মাধবীই ছিল। কিন্তু … তার মানে … ওরাও কি দীঘাতেই এসেছে ? কোন্ দীঘায় ? নিউ দীঘা না ওল্ড দীঘা ? কোথায় উঠেছে ওরা ? কোন্ হোটেলে ? আর কি দেখা হবে ? আর একবার কি দেখা হবে দুজনের ?
শুভেন্দু দাঁড়িয়ে পড়েছিল। শর্বরী হাঁটতে হাঁটতে পিছন ফিরল, “কী হল ? দাঁড়িয়ে পড়লে ?”
শুভেন্দু অন্যমনস্কভাবে মাথা নেড়ে বলল, “না। কিছু না। চলো।”
“এই মাধু ! কী ব্যাপার কী ? হঠাৎ কী হল তোমার ?” খুব ক্যাজুয়ালিই জিজ্ঞেস করছিল শুভেন্দু। যদিও উৎপলের হাতে চিঠিটা পাবার পর থেকেই একটা অদম্য কৌতূহল ওকে তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। কারণ মাধবী আজ পর্যন্ত ওকে একটা চিঠিও লেখেনি। এই প্রথম।
অথচ এই তিন বছরের মধ্যে শুভেন্দু অন্তত খান পনেরো চিঠি তো দিয়েছেই। তার বদলে একটা চিঠিও শুভেন্দু পায়নি। সেখানে আজ, এই প্রথম ওকে চিঠি লিখেছে মাধবী। তাও শুধুমাত্র আজই দেখা করার কথা জানিয়ে, যখন আগামী পরশুই ওদের দেখা করার নির্দিষ্ট দিন। তাহলে হঠাৎ কী এমন এমার্জেন্সি হল ? আর ফোন না করে চিঠিই বা লিখল কেন হঠাৎ ? সেই থেকে কৌতূহলের সঙ্গে একটা শিরশিরে ভয় কাজ করছিল শুভেন্দুর মনে। বারবার মনে হচ্ছিল, কিছু একটা আছে, বিশেষ কিছু, যার মধ্যে লুকিয়ে আছে বিপদসংকেত।
মাধবীর গার্লস কলেজের সামনে এসে ওর এক বান্ধবীকে দিয়ে ডাকিয়ে বাইরে বার করল শুভেন্দু। তারপর কোন কথা না বলেই বাইকে চাপিয়ে সটান গঙ্গার ধারের সেই নির্জন কোণটায়, যেখানে অনেকবার ওদের অনেক নিভৃত সময় কেটেছে। ঠিক সেইরকম মুখোমুখি বসে তার মাধুর দিকে তাকিয়ে এতক্ষণে প্রশ্নটা করল শুভেন্দু, “কী ব্যাপার মাধু ? কী হয়েছে ?”
মাধবীর অতলান্ত চোখদুটোয় জটিল সব রেখার আঁকিবুকি। বেশ কিছুক্ষণ জলের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে সে। শুভেন্দু ক্রমশই অধৈর্য হয়ে উঠছিল মনে মনে। তবুও মাধবীকে সময় দিচ্ছিল সে। মেয়েটার সঙ্গটাই যে তার কাছে অনেক কিছু। এইভাবে পলের পর পল সে কাটিয়ে দিতে পারে মাধবীর মুখের দিকে তাকিয়ে। শুধু এখন মাধবীর জরুরী বার্তাটা জেনে গেলেই নিশ্চিন্ত।
অল্প কিছুক্ষণ পরে, যখন নীরবতা কাটিয়ে শুভেন্দু মরীয়ার মতো কিছু একটা বলতে যাচ্ছে মাধবীকে, হঠাৎই মাধবী মুখ খুলল।না, চোখ তুলল না। পাড়ের নীচে, যেখানে ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ তুলে গঙ্গা অবিরল বয়ে যাচ্ছে দক্ষিণের দিকে, সেদিকে তাকিয়ে আকস্মিকভাবেই বলে উঠল, “তোমার সঙ্গে আর হয়তো আমার দেখা হবে না।”
মাধবীর কথাটা এমন আচমকা ধাক্কা দিল শুভেন্দুকে, সে বোবার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল মাধবীর দিকে। তারপর, তার অনেকটা পর, কোনরকমে তার ঠোঁটদুটো উচ্চারণ করল, “তার মানে ?”
এবার মাধবী মাথা তুলল। অনেকক্ষণ ধরে চেপে রাখা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শুভেন্দুর দিকে তার স্পষ্ট দুচোখের তারা স্থির রেখে সে বলল, “তার মানে হল, বাড়ি থেকে আমার বিয়ে ঠিক করে ফেলেছে।”
“সে কি ? আর তুমি ? তুমি কিছু করলে না ?”
অবাক আর আহত শুভেন্দুর প্রশ্নে একটা হালকা হাসি ছড়িয়ে পড়ল মাধবীর ঠোঁটে, “তুমি তাই ভাবছো ?”
শুভেন্দু সামান্য বিব্রত হয়ে বলল, “না, মানে তাহলে …”
“তাহলে আর কিছুই না। অনেক কান্ডই ঘটেছে, কিন্তু সেগুলো তোমার আর শুনে কোন লাভ নেই। তবে শেষ পর্যন্ত ওরাই জিতে গেছে। আমাদের …”
“না মাধু না,” উত্তেজনায় দুহাতে মাধবীর কাঁধদুটো চেপে ধরে শুভেন্দু, “তুমি তো জানো আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচতে পারব না।”
আস্তে করে নিজের দুটো হাত দিয়ে শুভেন্দুর হাতদুটো নামিয়ে আনে মাধবী। মুঠোয় চেপে ধরে বলে, “সেটা কি আমারও কথা নয় ? কিন্ত কী জানো, গত কয়েকদিন বাড়ির সবার সঙ্গে তর্কবিতর্ক করতে করতে আর সবার কথা শুনতে শুনতে টের পেলাম যে, বাস্তবটা আসলে সত্যিই বোধহয় অন্যরকম। আমাদের ভাবনার থেকে অনেকটাই আলাদা। সেখানে তুমি বা আমি কেউ কিছুই নই।”
মাধবীর কথাগুলো শুনতে শুনতে ক্রমশই অবাক হয়ে যাচ্ছিল শুভেন্দু। এ তো সেই আদুরে মিষ্টি মেয়েটা নয় ! এই দুদিনেই মাধবী এতখানি বদলে গেল কী করে ? হঠাৎ করেই এত ম্যাচিওর্ড হয়ে গেল কী করে ও ? কোন্ মন্ত্রবলে ?
শুনেছিল একটু পরেই। মাধবী যাবার আগে নিজেই তাকে শুনিয়ে গিয়েছিল সেকথা। এতদিন ধরে দুজনে যে স্বপ্নগুলো তৈরী করেছিল একটু একটু করে, হঠাৎ একটা ধাক্কায় তা ভেঙে চুরমার হয়ে যাবার রহস্যটা মাধবী নিজেই শুনিয়ে গিয়েছিল শুভেন্দুকে, আর তা শুনে শুভেন্দু শুধু চুপ করে থাকা ছাড়া আর কিছুই করে উঠতে পারেনি। একটা কথাও তার মুখ দিয়ে বেরোয়নি আর।
আসলে বেশ কিছুদিন আগে, মাধবীর বয়েস তখন হয়তো আট কি দশ, মাধবীর বাবা ভীষণভাবে আর্থিক সমস্যার মধ্যে পড়েন। তখন সেই অসময়ে প্রায় নিঃস্বার্থভাবে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিবেশী সুধাময়বাবু। তারপর বিপদ কেটে গেল ঠিকই, কিন্তু মাধবীর ভালোমানুষ বাবার মন সুস্থির হল না। সুধাময়বাবুকে এই উপকারের বিনিময় হিসেবে কিছু না দেওয়া পর্যন্ত তিনি কিছুতেই শান্ত হতে পারছিলেন না। এদিকে সুধাময়ও কিছুতেই কিছু নেবেন না। খালি হেসেই উড়িয়ে দিতে চান তাঁর প্রস্তাব। শেষ পর্যন্ত অনেক টানাহেঁচড়ার পর সুধাময় বলে উঠলেন, “বেশ, তাহলে এতই যখন তোমার দেবার ইচ্ছে, তাহলে তোমার মেয়েটাকে আমায় দিও। আমার রাজুর বউ হিসেবে নয়, আমার মেয়ে হয়েই নাহয় আমার ঘরে থাকবে সে।”
সুধাময়ের ছিল ব্যাঙ্কের চাকরি। এর কয়েকমাস পরেই মাধবীদের বেলঘরিয়ার পাড়া ছেড়ে তিনি বদলি হয়ে চলে গেলেন কোন্নগর। ফ্যামিলি নিয়ে থাকতে লাগলেন সেখানেই। কিন্তু মাধবীর বাবা তাঁকে ছাড়লেন না। নিজে থেকে ঠিক যোগাযোগ রেখে চললেন তাঁর সঙ্গে। কারণ কথা যখন একবার দিয়েছেন, সেই কথা না রেখে তাঁর শান্তি নেই।
“বিশ্বাস করো শুভেন্দু, আমি এসবের কিচ্ছু জানতাম না। কিচ্ছু না,” টলটলে চোখে শুভেন্দুর দুহাত আঁকড়ে ধরে বলে ওঠে মাধবী, “বাবাও আমাকে এতদিন কিচ্ছু জানায়নি। শুধু অপেক্ষা করছিল রাজুর একটা চাকরির জন্য। সেই চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটারটা এই সবে এসেছে, আর পরশু সেই খবরটা পাওয়ামাত্রই …” বলতে বলতে গলা বুজে আসে মাধবীর। মাথা নামিয়ে কান্নার বেগ রোধ করার চেষ্টা করে বেশ কিছুক্ষণ, তারপর আর পারে না। শুভেন্দুর কোলে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
শুভেন্দু যেমন থম হয়ে বসেছিল, সেইভাবেই বসে থাকে। গঙ্গা নির্বিকারভাবে বয়ে যায় ওদের সামনে দিয়ে।
হোটেলের ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে চুলে চিরুনি বোলাচ্ছিল শর্বরী। এখান থেকে সমুদ্রটা হাল্কাভাবে চোখে পড়ে। সেদিকে চোখ রেখে তার অলস হাত প্রসাধনে ব্যস্ত ছিল। সকালে তালসারি থেকে চন্দনেশ্বর মন্দির দেখে ফিরে আসার পর সমুদ্রে স্নান করে আসতেই বেলা দুটো বেজে গেছে। তারপর খাওয়াদাওয়া আর সামান্য বিশ্রামের পরে শরীর এখন বেশ ক্লান্ত। তবু বিকেলে বেরোতেই হবে। বেড়াতে এসে হোটেলে বসে থাকা ওদের দুজনেরই ধাতে নেই। তাই রেডি হচ্ছিল শর্বরী।
সাড়ে পাঁচটা বেজে গেছে। সমুদ্রের তীরে ক্রমশ একটা দুটো করে দল এসে জুটছে। বীচের প্রাত্যহিক হকাররা যথারীতি ঘোরাফেরা শুরু করেছে। হোটেল থেকে বেরিয়ে সমুদ্রের ধারে এসে ওরা উঁচু পাড়ের একধারে বসল। এই সময়টায় সমুদ্রের আরেক রূপ। রাতের অন্ধকার একটু একটু করে নেমে আসে, আর সেই অন্ধকারে সমুদ্রকে অচেনা আর ভয়াবহ মনে হতে থাকে।
দুজনেই চুপ করে বসে ছিল জলের দিকে তাকিয়ে। শুভেন্দুর মন অস্থির। সকালে মাধবীকে এক ঝলক দেখার পর থেকেই তার মন বিক্ষিপ্ত হয়ে গেছে। বারবার মনে আসছে নানা ঘটনা, নানা দিনের স্মৃতি। তাই বীচে বসে মাঝে মাঝেই এধারে ওধারে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাচ্ছিল। মানুষের জীবন তো নাকি গল্পের চেয়েও অদ্ভুত। সেরকমই কোন ঘটনা যদি এখন ঘটে ! যদি কাকতালীয়ভাবেই মাধবীরা এই নিউ দীঘাতেই উঠে থাকে ! আর যদি এখন ঘুরতে বেরিয়ে হঠাৎ এসে হাজির হয় ওর চোখের সামনে ! বলা তো যায় না কিছুই !
কিন্তু সত্যিই যদি তাই হয়, তাহলে কী করবে শুভেন্দু ? কীভাবে ম্যানেজ করবে সবকিছু ? শর্বরী তো আজ পর্যন্ত জানে না মাধবীর কথা। বলব বলব করেও বলা হয়ে ওঠেনি কোনদিন।
অথচ শর্বরী কিন্তু বলেছিল। একদিন রাতে, হঠাৎ এক অসতর্ক মুহূর্তে, নানা খুনসুটি আর আদরের মধ্যে ভেসে যেতে যেতে আকস্মিকভাবেই শুভেন্দুর সামনে উঠে এসেছিল সেই অজানা অধ্যায়। শর্বরীর জীবনের এক অ্যাফেয়ার। পরিণতি না পাওয়া আর এক যুগলপ্রেমের গল্প।
সেদিন শুভেন্দু তার নিজের জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে শর্বরীর ব্যথায় সমব্যথী হয়েছিল, আরও বেশি করেআঁকড়ে ধরে তার চোখের জল মুছিয়ে দিতে চেয়েছিল, কিন্তু মনের দ্বিধা কাটিয়ে তার নিজের কথাটা কিছুতেই বলে উঠতে পারেনি। বলতে পারেনি যে তার জীবনেও এমন এক কাঁটাতার ছিল, যার তীক্ষ্ণ শলাকাগুলো এখনও মাঝে মাঝে তার বুকেররক্ত ঝরিয়ে যায়।
“গরম চা ! গরম কফি!” কানের পাশেই আওয়াজ শুনে চমকে ওঠে শুভেন্দু। চৌকো টিনের মধ্যে আগুন জ্বেলে চা-কফি বিক্রী করা যে ছেলেগুলোআশেপাশে ঘুরছিল তখন থেকে, তাদেরই একজনের ডাকে সম্বিৎ ফিরে আসে তার। দেখে, শর্বরী হাত তুলে তাকে ডেকে দুটো কফি দিতে বলল। শুভেন্দু পয়সা মিটিয়ে দিয়ে কফির কাপ তুলে নিল হাতে।শর্বরী তার কফিটা ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে করতে বলল, “কফিটা খেয়ে চলো একবার মার্কেটে ঘুরতে যাব, হ্যাঁ ?”
শুভেন্দু নীরবেই মাথা নেড়ে সায় দিল। যদিও এই মুহূর্তে ওর ঘুরে বেড়াবার মতো মানসিকতা আর নেই। হোটেলে ফিরে গেলেই ভাল লাগবে বোধহয়। তবে শর্বরীকে তো আর সেটা বলা চলে না।
একটু পরেই ওরা উঠে পড়ল। এখানে এখন মার্কেটটা আর আগের মতো খোলামেলা বিক্ষিপ্তভাবে নেই। একেকটা জায়গায় বাঁধানো মার্কেট প্লেস করা হয়েছে, সেখানেই ছোট ছোট ঘরে গায়ে গায়ে সব দোকানগুলো সাজানো। ওরা পরের পর সব দোকানগুলোয় ঘুরতে লাগল। নানা ধরণের জিনিষ। কোনটা জামাকাপড়ের দোকান, কোনটা ঘর সাজানোর, কোথাও ঝিনুক থেকে ইমিটেসন, নানা গয়নাগাঁটি, আবার কোথাও খেলনা, চশমা, পেন-পেন্সিলের দোকান। ওরা এ-দোকান থেকে সে-দোকান ঘুরে বেড়াচ্ছিল হাতে হাত ধরে। শুভেন্দুর মন্দ লাগছিল না। আস্তে আস্তে মনের মধ্যে জমা হওয়া মেঘটা কেটে যাচ্ছিল যেন।
আর ঠিক সেই সময় —
ওরা তখন একটা গয়নার দোকানে দাঁড়িয়ে। শর্বরী ঝিনুকের একটা হারের সেট হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে, আর শুভেন্দু তার লাগোয়া দোকানটার সামনে ঝোলানো একটা হ্যামকের দিকে তাকিয়ে আছে, হঠাৎ একটা অচেনা গলায় শর্বরীর নাম শুনে চমকে পেছন ফিরল শুভেন্দু। এক ভদ্রলোক যেতে যেতে থমকে দাঁড়িয়ে হঠাৎ যেন ভূত দেখার মতো চমকে গিয়ে বলে উঠেছেন, “আরে ! শর্বরী !!”
মুহূর্তের প্রতিক্রিয়ায় শর্বরীও পেছন ফিরল, আর নিমেষের মধ্যে তার মুখে বিস্ময়, নার্ভাসনেস, বিপুল আনন্দ আর অবসাদ, এই সবক’টা প্রতিক্রিয়া পরপর খেলে যেতে দেখল শুভেন্দু।
এরপর স্থাণু কয়েকটা মুহূর্ত। বিমূঢ়, অস্বস্তিকর তিন থেকে চার সেকেন্ড। তারপরেইশর্বরী প্রায় আর্ত চিৎকারের মতো বলে উঠল, “এ কী ! রাজর্ষি, তুমি … মানে … তুমি এখানে …”
ভদ্রলোকও ততক্ষণে কিছুটা ধাতস্থ হয়েছেন, “হ্যাঁ, মানে এই তিনদিনের ছুটিটা কাটাতে …” এই বলে শুভেন্দুর মুখের দিকে তাকালেন।
শর্বরী কোনক্রমে বলল, “আমার হাজব্যান্ড, শুভেন্দু। আর শুভ, এই হলরাজর্ষি, মানে …”
শুভেন্দু একটা হাত তুলে থামিয়ে দিল শর্বরীকে। নামটা শোনামাত্র ওর সন্দেহটা সত্যি হয়ে গেছে। মৃদু হেসে বলল, “বুঝেছি। তুমি এঁরই কথা আমায় বলেছিলে তো ?” এই বলে দুহাত বুকের কাছে জড়ো করে বলল, “নমস্কার রাজর্ষিবাবু। শর্বরীর কাছে আপনার নাম কিন্তু শুনেছি আমি।”
ভদ্রলোক একটু থতমত হয়ে একঝলক শর্বরীর দিকে তাকিয়ে শুভেন্দুকে বললেন, “তাই নাকি ? তা … সে তো খুব ভাল কথা। মানে …”
“হ্যাঁ, শুনেছি মানে … আপনি নাকি একই কলেজে শর্বরীর সিনিয়ার ছিলেন। আর পড়াশোনাতেও নাকি ভীষণ ভালো ছিলেন। মাঝে মাঝেই নোটসের ব্যাপারে শর্বরীকে খুব হেল্প করতেন, এইটুকুই আর কি।”
ভদ্রলোককে এর বেশি আর বিব্রত করতে চাইছিল না শুভেন্দু। তবে কথাগুলো বলতে বলতে স্থির দৃষ্টিতে তাঁকে লক্ষ্য করছিল সে। এই লোকটাই শর্বরীর প্রেমিক ছিল ? কী আশ্চর্য ! এ তো নিতান্তই সাদামাটা একটা লোক। দেখলেই বোঝা যায় স্রেফ একজন ভেতো বাঙালি ছাড়া আর কিছুই না। অথচ এ-ই একসময় শর্বরীর মতো মেয়ের হার্টথ্রব হয়ে উঠেছিল ! আশ্চর্য ! প্রেম যে কত খেলা দেখাতে জানে !
শর্বরী এতক্ষণ একেবারেই চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার কেমন একটা ধরা গলায় বলে উঠল, “তা তুমি কোথায় উঠেছ ? আর একলা কেন ? তোমার বউ …”
রাজর্ষি বললেন, “না না, একলা কোথায় ? আমরা দুজনেই তো এসেছি। ও ওই গেটের কাছে দোকানটায় একটা শালোয়ার কিনছে। আমি একটা জলের বোতল কিনব বলে এদিকে এসেছিলাম। দাঁড়াও ডাকছি।” বলে পকেট থেকে মোবাইলটা বার করে ডায়াল করতে করতেই বলে উঠলেন, “ওই তো ও আসছে। মাধু, এই যে এদিকে, এদিকে এসো।” ভদ্রলোক হাত নাড়তে লাগলেন জোরে জোরে।
শুভেন্দু স্তম্ভিতের মতো সেদিকে তাকিয়ে দেখল, হাতে একটা প্যাকেট নিয়ে ক্রীমরঙা একটা ড্রেস পরে এদিকে এগিয়ে আসছে তার মাধবী।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।