গভীর রাত। গ্র্যান্ড ওয়াল ক্লকে ঢং ঢং করে তিনটে বাজলো। বাইরে তুমুল বৃষ্টি পড়ছে। শুধু বৃষ্টি নয়—ঝাঁপিয়ে পড়া, আছড়ে পড়া, যেন আকাশের ভেতর জমে থাকা সব রকম জলের শব্দ একসঙ্গে নেমে আসছে। জানলার কাঁচে সেই বৃষ্টির ধাক্কা লেগে এক অদ্ভুত ছন্দ তৈরি করছে, যা শুনতে শুনতে মনে হচ্ছে কেউ যেন একটানা দরজায় কড়া নাড়ছে। কারেন্ট নেই সন্ধ্যা থেকেই। প্রথমে মনে হয়েছিল কিছুক্ষণের ব্যাপার, কিন্তু সময় গড়াতে গড়াতে অন্ধকার যেন ঘরের ভেতর নিজের জায়গা পাকা করে ফেলেছে। ইনভার্টারটাও শেষ পর্যন্ত হার মেনেছে। এখন পুরো ফ্ল্যাটটা অন্ধকারে ডুবে—একটা জমাট, ভারী, নিঃশ্বাস আটকে দেওয়া অন্ধকার।
এই অন্ধকারের মধ্যে আমার একমাত্র সঙ্গী আমার ফোন। তার স্ক্রিনের ক্ষীণ আলোটা যেন একটা ছোট্ট দ্বীপের মতো, যার বাইরে সবকিছু অজানা। কিন্তু সেই আলোও খুব বেশিক্ষণ থাকবে না—চার্জ মাত্র পাঁচ শতাংশ। সেই সংখ্যাটা চোখে পড়লেই বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ তৈরি হচ্ছে। যেন এই পাঁচ শতাংশ শুধু ফোনের নয়, আমার নিজের সাহসেরও শেষ ভাণ্ডার। আমি অরিত্র। এই শহরের ভিড়ের মধ্যে থেকেও এই মুহূর্তে আমি একেবারে একা। বেহালার শখের বাজারের এই তিনতলার ফ্ল্যাটটা দিনে খুব সাধারণ লাগে—চারপাশে মানুষের শব্দ, গাড়ির হর্ন, দূরের দোকানের ডাক। কিন্তু এখন, এই গভীর রাতে, সবকিছু যেন কোথাও গায়েব হয়ে গেছে। পাশের ফ্ল্যাটটা ফাঁকা। অনেকদিন ধরে। দরজাটা বন্ধ, কিন্তু সেই বন্ধ দরজার ভেতর থেকে যেন এক ধরনের শূন্যতা বেরিয়ে আসে, যা এই অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গিয়ে আরও ভারী হয়ে উঠেছে। জানলাটা খোলা। বৃষ্টির ছাঁট ভেতরে ঢুকছে। ঠান্ডা জল হাওয়ার সঙ্গে মিশে এসে গায়ে লাগছে। প্রথমে এই ঠান্ডা স্পর্শটা ভালো লাগছিল—একটা স্বস্তি, একটা স্বাভাবিকতার অনুভূতি। কিন্তু এখন সেই একই স্পর্শ কেমন যেন অস্বস্তিকর লাগছে। যেন কেউ বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে হাত বাড়াচ্ছে। আমি উঠে দাঁড়ালাম জানলাটা বন্ধ করতে। পা মেঝেতে পড়তেই ঠান্ডা একটা স্রোত অনুভব করলাম—জল জমে আছে। হাঁটার সময় পায়ের তলায় ‘চপচপ’ শব্দ হচ্ছে, আর সেই শব্দটা অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন এই পুরো ফ্ল্যাটটা ফাঁকা, আর আমি একা এই শব্দ তৈরি করছি—যেন আমার উপস্থিতির একমাত্র প্রমাণ এই শব্দটাই।
জানলার কাছে গিয়ে হাত বাড়াতেই হঠাৎ একটা জোর হাওয়া এল। পর্দাটা এক ঝটকায় উড়ে উঠে আমার মুখে এসে পড়ল। ঠান্ডা, ভেজা কাপড়ের স্পর্শে আমি একটু পিছিয়ে গেলাম। বুকের ভেতর হঠাৎ করেই একটা ধক করে উঠল—কোনো কারণ ছাড়াই, শুধু একটা অজানা আশঙ্কা। ঠিক সেই মুহূর্তেই বিদ্যুৎ চমকাল। এক সেকেন্ড। মাত্র এক সেকেন্ডের জন্য চারপাশটা আলোয় ভেসে উঠল। আর সেই ক্ষণস্থায়ী আলোর মধ্যে আমি দেখলাম—গ্রিলের ওপাশে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।
সে একদম স্থির। কোনো নড়াচড়া নেই। যেন সে অনেকক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে, শুধু এই এক মুহূর্তের অপেক্ষায়। আমার দিকে তাকিয়ে। কিন্তু সেটাই অসম্ভব—এটা তিনতলা, এখানে কোনো বারান্দা নেই, দাঁড়ানোর মতো জায়গা নেই। তবু সে দাঁড়িয়ে আছে। যেন বাতাসের ওপর ভর করে। আলো নিভে যেতেই আবার সব অন্ধকার। কিন্তু সেই এক ঝলকই যথেষ্ট ছিল। আমার শরীর যেন জমে গেল। আমি নড়তে পারছিলাম না, চোখ সরাতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আবার যদি বিদ্যুৎ চমকায়, সে তখনও থাকবে।
কিছু সেকেন্ড কেটে গেল—বা হয়তো অনেকক্ষণ, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না। তারপর কাঁপতে কাঁপতে ফোনের টর্চ জ্বালালাম। আলোটা সরু, দুর্বল, কিন্তু সোজা গিয়ে পড়ল জানলার গ্রিলের ওপর। কেউ নেই। শুধু বৃষ্টি। জল গড়িয়ে পড়ছে লোহার গায়ে, সেই একই শব্দ, সেই একই দৃশ্য—যেন কিছুই ঘটেনি। কিন্তু আমি জানি, আমি যা দেখেছি তা শুধু চোখের ভুল নয়। সেই দৃশ্যটা এখনো আমার মাথার ভেতর স্পষ্ট হয়ে আছে।
আমি দ্রুত জানলাটা বন্ধ করলাম। ছিটকিনি লাগালাম, দু’বার চেক করলাম। হাত দিয়ে ঠেলে দেখলাম—ভালো করে আটকে আছে। যেন এই ছোট্ট ধাতব ছিটকিনিটাই আমাকে রক্ষা করতে পারে। তারপর ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এলাম। মোমবাতিটা খুঁজে বের করলাম। ম্যাচ জ্বালাতে গিয়ে দেখলাম হাত কাঁপছে। তিনবার চেষ্টা করার পর শিখাটা জ্বলল। সেই ছোট্ট আলোটা ঘরের মধ্যে একটা নরম, হলুদ আবরণ তৈরি করল। দেয়ালে ছায়াগুলো নড়তে লাগল—কখনো লম্বা, কখনো বিকৃত, কখনো যেন মানুষের মতো।
আমি চেয়ারে বসে পড়লাম। চোখ বারবার জানলার দিকে চলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, ওখানেই কিছু একটা আছে—যা আমি দেখতে পাচ্ছি না, কিন্তু সেটা আমাকে দেখছে। ঠিক তখনই আমি শুনলাম—একটা শব্দ। খুব হালকা, খুব নির্দিষ্ট। টক। যেন কাঁচে কেউ আঙুল দিয়ে টোকা মারল। আমি চমকে উঠলাম। আবার—টক। তারপর আরেকবার। তিনবার। জানলা থেকেই আসছে শব্দটা। আমি ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালাম। কাঁচের ওপাশে শুধু অন্ধকার আর বৃষ্টির রেখা। কেউ নেই। তবু শব্দটা একদম স্পষ্ট। আমি উঠে দাঁড়ালাম না, শুধু তাকিয়ে রইলাম। ঠিক তখনই আবার বিদ্যুৎ চমকাল। সেই এক সেকেন্ডের আলোয় আমি দেখলাম—কাঁচের ওপাশে একটা হাতের ছাপ। পাঁচটা আঙুল, স্পষ্ট, ভেজা। জল গড়িয়ে পড়ছে নিচে। আমার ভেতরটা হঠাৎ ফাঁকা হয়ে গেল। আমি তো জানলাটা বন্ধ করেছি। ছিটকিনি লাগানো। তাহলে এই হাত এল কী করে? গলা শুকিয়ে গেল। আমি কথা বলতে চাইলাম—“কে?”—কিন্তু শব্দ বেরোল না। শুধু ঠোঁট নড়ল। আবার টোকা পড়ল, এবার একটু জোরে। কাঁচ কেঁপে উঠল। মোমবাতির আলো দুলে উঠল। ছায়াগুলো যেন আরও অস্থির হয়ে উঠল।
তারপর হঠাৎ মোমটা নিভে গেল। হাওয়ায় নয়—আমি স্পষ্ট দেখলাম, শিখাটা এক মুহূর্ত স্থির হয়ে থাকল, তারপর যেন কেউ খুব কাছে থেকে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। ঘরটা আবার অন্ধকারে ডুবে গেল। আর সেই অন্ধকারে আমি একটা শব্দ শুনলাম—নিঃশ্বাসের শব্দ। ভেজা, ঠান্ডা, খুব কাছে। আমার সামনে।
আমি আর দেরি করলাম না। ফোনের আলো জ্বালালাম। আলোটা সামনে পড়তেই আমি তাকে দেখলাম। সে দাঁড়িয়ে আছে—আমার সামনে, খুব কাছে। তার জামা ছেঁড়া, গা ভেজা। জল টপটপ করে পড়ছে। তার মুখ ধীরে ধীরে ওপরে উঠল। আমি ভয়ে যেন জমে গেলাম। তার চোখ নেই—শুধু ফাঁকা কোটর, যার ভেতরে কিছু একটা নড়ছে। ভালো করে দেখে বুঝলাম যে ছোট ছোট পোকা সেখান থেকে বের হয়ে আসছে। তার শরীরের চামড়া ফুলে আছে, জলে ডোবা লাশের মতো। আর তার গা থেকে একটা পচা গন্ধ বেরোচ্ছে—শ্যাওলা আর মৃতদেহের মিশ্র একটা গন্ধ যেন বা।
সে কিছু বলল না। শুধু ধীরে ধীরে হাত তুলল। তার আঙুলের নখ পচে গেছে। সে আমার দিকে ইশারা করল। আমি পিছিয়ে গেলাম, দেওয়ালে পিঠ ঠেকল। আর সে এগিয়ে এল—কিন্তু তার পায়ের কোনো শব্দ নেই। সে যেন মেঝেতে হাঁটছে না, ভাসছে। মেঝেতে তার কোনো ছাপ পড়ছে না, অথচ তার শরীর থেকে জল পড়ছে।
সেই মুহূর্তে আমি বুঝলাম—সে জানলা দিয়ে আসেনি। জানলা দিয়ে ঢুকেছে আমার ভয়।
সে যখন আমার দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন সময়টা যেন থেমে গিয়েছিল। ঘড়ির কাঁটা এগোচ্ছে কি না, বাইরে বৃষ্টি পড়ছে কি না—এসব কিছুই আর আলাদা করে বোঝা যাচ্ছিল না। শুধু একটা জিনিস স্পষ্ট ছিল—আমার আর তার মধ্যে দূরত্বটা ধীরে ধীরে কমছে। আমি দেওয়ালে ঠেকে দাঁড়িয়ে, আর সে ভেসে ভেসে এগিয়ে আসছে। কোনো শব্দ নেই তার চলার মধ্যে, তবু একটা উপস্থিতি আছে—যেন ঠান্ডা জল ঘরের ভেতর ছড়িয়ে পড়ছে, আর সেই জলের মধ্যেই সে মিশে আছে। আমার বুকের ভেতর ধকধক করছে, কিন্তু সেই শব্দটাও যেন বাইরে বেরোচ্ছে না। আমি শুধু নিজের শরীরের ভেতর সেই ভয়টা অনুভব করছি—ঘন, জমাট, শ্বাসরোধ করা ভয়।
সে থামল আমার ঠিক সামনে। এতটাই কাছে যে তার শরীর থেকে পড়া জলের ফোঁটা আমার পায়ের কাছে এসে জমা হচ্ছে। কিন্তু অদ্ভুতভাবে সেই জল মেঝেতে কোনো চিহ্ন রেখে যাচ্ছে না—যেন সে বাস্তব, আবার বাস্তব নয়। তার মুখটা আমার দিকে। চোখ নেই—ফাঁকা কোটর। সেই কোটরের ভেতরে ছোট ছোট কিছু নড়ছে, যেন জীবন্ত কিছু তার ভিতরে বাসা বেঁধেছে। আমি তাকিয়ে থাকতে পারছিলাম না, কিন্তু চোখ সরাতেও পারছিলাম না। ভয় কখনো কখনো মানুষকে এমন জায়গায় নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও থাকে না, পালানোর শক্তিও না—শুধু স্থির হয়ে থাকা।
ঠিক তখনই সে খুব ধীরে মাথাটা একটু কাত করল। যেন আমাকে চিনতে চাইছে। যেন এই মুখটা তার কাছে নতুন নয়। তারপর তার ঠোঁট নড়ল। প্রথমে কোনো শব্দ বেরোল না, শুধু জল গড়িয়ে পড়ল তার ঠোঁটের কোণ দিয়ে। তারপর একটা ফিসফিসে আওয়াজ—খুব নিচু, খুব ভাঙা, যেন গলার ভেতর দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে।
“তুই… দেখেছিলি…”
শব্দগুলো শুনেই আমার শরীরের ভেতর কিছু একটা ভেঙে গেল। আমি যেন এই শব্দগুলো আগে কোথাও শুনেছি। এই গলা—এই টান—এই অভিযোগ—সবকিছুই অচেনা অথচ অদ্ভুতভাবে পরিচিত। আমি কিছু বলতে পারলাম না। গলা যেন বন্ধ হয়ে গেছে।
সে আবার বলল, এবার একটু স্পষ্ট—
“তুই বলিসনি…”
আমার মাথার ভেতর তখন হঠাৎ করেই কিছু দৃশ্য ভেসে উঠতে শুরু করল। কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই, কোনো সতর্কতা ছাড়াই। আমি আর এই ফ্ল্যাটে নেই—আমি চলে গেছি অনেক বছর আগে, আমার ছোটবেলায়। গ্রাম। একটা বড় পুকুর। চারপাশে গাছ। দুপুরের রোদ। আর একটা ছেলে—আমার বয়সী। আমরা একসঙ্গে খেলতাম। তার নামটা মনে পড়ছে না, কিন্তু তার মুখটা স্পষ্ট। সে হাসছে, দৌড়াচ্ছে, তারপর হঠাৎ পা পিছলে জলে পড়ে গেল।
আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম পুকুরের ধারে।
আমি দেখেছিলাম।
সে হাত-পা ছুঁড়ছিল। ডুবছিল, উঠছিল, আবার ডুবছিল। আমি চিৎকার করতে পারতাম। কাউকে ডাকতে পারতাম। কিন্তু আমি করিনি। কেন করিনি—আমি জানি না। ভয় পেয়েছিলাম? নাকি ভেবেছিলাম সে নিজেই উঠে আসবে? সেই কয়েক সেকেন্ড—যা হয়তো তার বাঁচার জন্য যথেষ্ট ছিল—আমি স্থির দাঁড়িয়ে কাটিয়েছিলাম।
তারপর সে আর ওঠেনি।
আমি পালিয়ে গিয়েছিলাম। কাউকে কিছু বলিনি। সন্ধ্যায় যখন সবাই তাকে খুঁজছিল, তখনও আমি চুপ ছিলাম। তিন দিন পর তার লাশ ভেসে উঠেছিল। ফুলে যাওয়া শরীর, চোখ নেই—মাছ খেয়ে নিয়েছিল। আমি দূর থেকে দেখেছিলাম, তারপর আবার পালিয়ে গিয়েছিলাম। সেই ঘটনার পর অনেক রাত আমি ঘুমোতে পারিনি। স্বপ্নে তাকে দেখতাম। সে জলের তলা থেকে তাকিয়ে আছে, হাত বাড়াচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই স্মৃতি ফিকে হয়ে গিয়েছিল। আমি নিজেকে বোঝাতে শিখেছিলাম—আমি কিছু করতে পারতাম না, এটা আমার দোষ নয়।
কিন্তু আজ—
সে আমার সামনে দাঁড়িয়ে।
একই মুখ, একই ফুলে ওঠা চামড়া, একই ফাঁকা চোখ।
শুধু এখন সে আর জলের তলায় নেই—সে আমার ঘরের মধ্যে।
“আমায় একা রেখেছিলি…” সে ফিসফিস করে বলল। তার গলার ভেতর দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছে, শব্দটা ভেঙে যাচ্ছে।
সে ধীরে ধীরে হাত বাড়াল। তার হাতটা যখন আমার গলার কাছে এল, তখন আমি প্রথমবার বুঝলাম সেই ঠান্ডাটা কতটা গভীর। এটা শুধু ঠান্ডা নয়—এটা যেন জল, অনেক গভীর পুকুরের তলা থেকে উঠে আসা ঠান্ডা। তার আঙুলগুলো আমার গলায় বসে গেল। শক্ত করে না—কিন্তু এমনভাবে, যেন আমি নড়তে না পারি।
আমার শ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে লাগল। আমি হাত দিয়ে তার হাত সরাতে চাইলাম, কিন্তু আমার হাত যেন তার শরীরের ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে। সে আছে, আবার নেই। আমার আঙুলে শুধু ঠান্ডা জল লাগছে।
“এবার তুই একা থাক…” সে বলল।
এই কথাটা বলার সময় তার গলার আওয়াজটা বদলে গেল—আরও গভীর, আরও ফাঁকা। যেন অনেক দূর থেকে আসছে। আমার মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। চোখের সামনে অন্ধকার নেমে আসছে।
ঠিক তখনই আমার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল। আলোটা মেঝেতে পড়ে নিভে গেল। ঘর আবার সম্পূর্ণ অন্ধকারে ডুবে গেল।
আমি শুধু তার হাতের চাপ অনুভব করছি, আর নিজের শ্বাস বন্ধ হয়ে আসার সেই ভয়। মনে হচ্ছিল, আমি আবার সেই পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে আছি—কিন্তু এবার আমি জলে ডুবছি।
হঠাৎ—
সে হাতটা ছেড়ে দিল।
আমি জোরে কাশতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, আমার গলার ভেতর দিয়ে জল উঠছে। সত্যিই যেন পুকুরের জল—নোনতা, পচা গন্ধযুক্ত। আমি হাঁফাতে লাগলাম, মেঝেতে পড়ে গেলাম প্রায়।
ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চমকাল।
এক মুহূর্তের জন্য বিদ্যুৎ চমকাল, আর সেই ক্ষণস্থায়ী আলোয় যেন পুরো ঘরটা নিজের অস্তিত্ব ফিরে পেল। আমি চারদিকে তাকালাম—শ্বাস বন্ধ হয়ে আসা এক ধরনের তাড়নায়, যেন কিছু একটা খুঁজে বের করতে হবে, কিছু একটা প্রমাণ করতে হবে। কিন্তু ঘর ফাঁকা। কোথাও কেউ নেই। জানলাটা শক্ত করে বন্ধ, ছিটকিনি আগের মতোই আঁটসাঁট বসে আছে, যেন কোনোদিন খোলাই হয়নি। মেঝে শুকনো—এক ফোঁটা জলও নেই, যেন এই ঘরে কখনো কোনো ভেজা উপস্থিতি আসেনি। সবকিছু এমন স্বাভাবিক, এমন নিরীহ, যে মনে হতে পারে এইমাত্র যা ঘটল তা কেবলই আমার মাথার ভেতরের কোনো ভাঙন, কোনো ভুল দেখা, কোনো ক্লান্ত মস্তিষ্কের প্রতারণা। কিন্তু আমি জানি—এটা স্বাভাবিক নয়, কিছুতেই নয়। কারণ আমার নিজের শরীর সেই স্বাভাবিকতার সঙ্গে মেলে না। আমার গা ভেজা, জামা থেকে এখনো টপটপ করে জল পড়ছে, ঠান্ডা সেই স্পর্শ এখনো লেগে আছে ত্বকে। আর সবচেয়ে বড় কথা—আমার গলায় স্পষ্ট পাঁচটা আঙুলের দাগ, গাঢ় নীল হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে, যেন ভেতর থেকে কেউ আমাকে চেপে ধরেছিল, এমনভাবে, যা কোনো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু শরীর ভুলতে পারে না। আমি ধীরে ধীরে উঠে বসে রইলাম, বুঝতে পারছিলাম না এই মুহূর্তে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে—বাস্তবের ভেতরে, নাকি কোনো দুঃস্বপ্নের গভীরে। নিজের মনে প্রশ্ন উঠছিল—আমি কি সত্যিই এটা অনুভব করেছি, নাকি আমি ধীরে ধীরে পাগল হয়ে যাচ্ছি? কিন্তু সেই দাগটা, সেই ঠান্ডা স্পর্শটা, সেই শ্বাসরুদ্ধ করা অনুভূতিটা—সবই এত স্পষ্ট, এত নির্দিষ্ট, যে তাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। আর তার থেকেও ভয়ঙ্কর হলো—আমার ভেতরে যে স্মৃতিটা এতদিন চাপা পড়ে ছিল, যেটাকে আমি ভুলে থাকার ভান করেছিলাম, সেটাই আবার জেগে উঠেছে, একেবারে জীবন্ত হয়ে। সেই রাতটা যেন আর শেষ হচ্ছিল না, সময় এগোচ্ছিল না, শুধু আমার চারপাশে জমাট বেঁধে থাকছিল। আর সেই স্থিরতার মধ্যে আমি খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারছিলাম—এটা কোনো এক রাতের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, কোনো হঠাৎ ভয়ের মুহূর্ত নয়। বরং বহুদিন থেকে যেন এই সময়ের জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আর এই সময়টা মাত্র শুরু হয়েছে।
সেই রাতটা শেষ হয়েছিল কি না, আজও আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি না। কারণ ভোর হয়েছিল ঠিকই—আকাশ ধূসর হয়েছিল, পাখিরা ডাকতে শুরু করেছিল, দূরে গাড়ির শব্দ ফিরে এসেছিল—কিন্তু আমার ভেতরের অন্ধকারটা কোথাও যায়নি। আমি সারা রাত বসে ছিলাম প্রায় একই জায়গায়, দেওয়ালে ঠেস দিয়ে, গলা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছিলাম সেই দাগটা সত্যিই আছে কি না। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছিল, একটু আগে যা ঘটেছে তা হয়তো এক ধরনের দুঃস্বপ্ন, কিন্তু আঙুলের নিচে যখন সেই ফুলে ওঠা, নীলচে চিহ্নটা অনুভব করতাম, তখন আবার সবকিছু বাস্তব হয়ে উঠত। শরীরের ওপর একটা অদ্ভুত ক্লান্তি নেমে এসেছিল—যেন আমি শুধু একটা রাত জেগে থাকিনি, বরং অনেক বছর ধরে জমে থাকা ভয় একসঙ্গে আমাকে আক্রমণ করেছে। ভোরের আলো জানলার ফাঁক দিয়ে ঢুকছিল, কিন্তু সেই আলোয় কোনো স্বস্তি ছিল না—বরং সবকিছু আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছিল, আর সেই স্পষ্টতাই ভয়ঙ্কর।
কারেন্ট এল প্রায় ভোর পাঁচটার দিকে। হঠাৎ করেই ফ্যান ঘুরতে শুরু করল, টিউবলাইট জ্বলে উঠল। এতক্ষণ যে অন্ধকারটা আমাকে ঘিরে রেখেছিল, সেটা হঠাৎ করে সরে গেল—কিন্তু তার জায়গায় একটা অদ্ভুত শূন্যতা এসে বসে রইল। আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম, যেন নিজের চোখে সবকিছু দেখে নিতে হবে। আয়নায় নিজেকে দেখে প্রথমে মনে হল, আমি যেন কয়েক বছরের বড় হয়ে গেছি এক রাতেই। চোখের নিচে কালি, মুখ শুকনো, ঠোঁট ফেটে গেছে। কিন্তু আমার চোখ আটকে গেল অন্য জায়গায়—আমার গলায়। সেখানে স্পষ্ট পাঁচটা আঙুলের দাগ, গাঢ় নীল, যেন চামড়ার নিচে জমাট বেঁধে আছে। আমি হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম—ব্যথা হচ্ছে, হালকা জ্বালা করছে। এটা কোনো স্বপ্নের দাগ নয়, এটা বাস্তব।
আমি একটু ঝুঁকে আরও কাছে থেকে নিজের মুখের দিকে তাকালাম। আর ঠিক তখনই আমি সেটা দেখলাম। প্রথমে খুব ক্ষীণ—যেন চোখের ভেতর কোনো ছায়া নড়ছে। আমি চোখ মিটমিট করলাম, ভেবেছিলাম হয়তো ঘুমের অভাবে এমন লাগছে। কিন্তু না—আবারও দেখলাম। আমার চোখের ভেতর, ঠিক কালো অংশের মধ্যে, খুব ছোট ছোট কিছু নড়ছে। যেন পোকা। আমি হঠাৎ পিছিয়ে এলাম। বুকের ভেতর ধাক্কা লাগল। এটা কি সম্ভব? আমি কি ভুল দেখছি? আমি আবার আয়নার সামনে গেলাম, এবার আরও মন দিয়ে তাকালাম। কিছুক্ষণের জন্য কিছুই দেখা গেল না। যেন সব স্বাভাবিক। কিন্তু সেই অস্বাভাবিক অনুভূতিটা থেকে গেল—যেন আমার চোখের ভেতরে কিছু একটা বেঁচে আছে, নড়ছে, অপেক্ষা করছে।
সেদিন আমি অফিসে যাইনি। ফোনে একটা মেসেজ করে দিয়েছিলাম—শরীর খারাপ। আসলে শরীর নয়, মনটাই ভেঙে পড়েছিল। আমি সারাদিন ঘরের ভেতরেই ছিলাম। জানলার দিকে তাকাতে ভয় করছিল। তবু বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল। যেন জানলাটা শুধু বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ নয়—আরও কিছুর দরজা। দুপুরে একবার সাহস করে জানলার কাছে গেলাম। ছিটকিনি খুলে একটু ফাঁক করলাম। বাইরে তখন রোদ উঠেছে। সবকিছু স্বাভাবিক। নিচে লোকজন হাঁটছে, দূরে গাড়ি চলছে। সবকিছু এত সাধারণ যে মনে হতে পারে রাতের ঘটনাটা শুধু একটা ভ্রম। কিন্তু জানলার গ্রিলের দিকে তাকাতেই আমার গা শিরশির করে উঠল। সেখানে খুব হালকা, প্রায় অদৃশ্য একটা দাগ—পাঁচটা আঙুলের মতো। শুকনো। যেন কেউ ভেজা হাতে একবার ছুঁয়ে গিয়েছিল, তারপর তা মিলিয়ে গেছে, কিন্তু পুরোপুরি নয়।
আমি জানলাটা আবার বন্ধ করে দিলাম। এবার আরও শক্ত করে। যেন যত শক্ত করে বন্ধ করব, তত দূরে রাখতে পারব সেই অদৃশ্য উপস্থিতিকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে একটা বোধ কাজ করছিল—এটা কোনো বাইরের ব্যাপার নয়। এটা শুধু জানলার ওপাশে নেই। এটা আমার ভেতরেও আছে।
সেই রাতের পর প্রথম বৃষ্টি এল দু’দিন পরে। সন্ধ্যার দিকে আকাশ কালো হয়ে এল। দূরে বিদ্যুৎ চমকাতে শুরু করল। আমি তখন থেকেই অস্বস্তি অনুভব করতে লাগলাম। যেন শরীর আগে থেকেই জানে, কী আসতে চলেছে। আমি সব জানলা বন্ধ করে দিলাম, পর্দা টেনে দিলাম। ঘরের সব লাইট জ্বালিয়ে রাখলাম। টিভি চালালাম, শব্দ বাড়িয়ে দিলাম—যেন কোনোভাবেই নীরবতা ঢুকতে না পারে। কিন্তু তবু সেই নীরবতা ছিল—সব শব্দের ফাঁকে ফাঁকে, সব আলোর আড়ালে।
রাত বাড়তে লাগল। বৃষ্টি শুরু হল। প্রথমে হালকা, তারপর ধীরে ধীরে জোরে। আমি নিজেকে বোঝাচ্ছিলাম—কিছু হবে না, সব ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক রাত তিনটার সময়, হঠাৎ করে কারেন্ট চলে গেল।
ঘরটা অন্ধকার।
এক মুহূর্তে।
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল। ঠিক সেই আগের রাতের মতো। আমি ফোনটা খুঁজতে লাগলাম। হাত কাঁপছিল। অবশেষে ফোনটা পেলাম, আলো জ্বালালাম। সেই ক্ষীণ আলো আবার আমার চারপাশে একটা ছোট্ট বৃত্ত তৈরি করল।
আমি জানলার দিকে তাকালাম না, তবু শব্দটা এড়াতে পারলাম না। প্রথমে একবার—টক। তারপর একটু বিরতি, যেন কেউ অপেক্ষা করছে আমার প্রতিক্রিয়ার জন্য, তারপর আবার—টক টক। শব্দটা এত স্পষ্ট, এত কাছের, যে মনে হচ্ছিল সেটা শুধু কাঁচে নয়, আমার বুকের ভেতরেও প্রতিধ্বনি হচ্ছে। বুকের মধ্যে হঠাৎ এক ধরনের চাপ অনুভব করলাম, যেন অদৃশ্য কোনো হাত ভিতর থেকে চেপে ধরেছে। আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম, নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—না দেখলে কিছুই নেই, সবই মনের ভুল, সবই ভয়। কিন্তু ভয় তো চোখ বন্ধ করলেই থামে না; বরং অন্ধকারের মধ্যে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। শব্দটা থামল না। বরং ধীরে ধীরে কাছে আসতে লাগল, ভারী হয়ে উঠল, স্পষ্ট হয়ে উঠল—টক টক টক। এবার আর মনে হল না যে শব্দটা জানলার ওপাশ থেকে আসছে; বরং মনে হল সেটা ঘরের ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, দেয়ালের ভেতর থেকে, মেঝের নিচ থেকে, কিংবা আমার নিজের শরীরের ভেতর থেকে।
আমি ধীরে ধীরে চোখ খুললাম, যেন এই দেখাটাই শেষ সাহস। ফোনের আলোটা সামনে ধরলাম, আলোটা কাঁপছিল—হয়তো আমার হাত কাঁপছিল বলে। সামনে কেউ নেই, কোনো মানুষ নেই, কোনো ছায়াও না। কিন্তু আমার দৃষ্টি আটকে গেল মেঝেতে। ঠিক আমার সামনে, অন্ধকার আর আলোয়ের মাঝামাঝি জায়গায়, একটা ভেজা দাগ। তারপর বুঝতে পারলাম—ওটা শুধু দাগ নয়, একটা পায়ের ছাপ। স্পষ্ট, ভেজা, যেন কেউ ঠিক এইমাত্র হেঁটে গেছে। একটা। তারপর আরেকটা। তারপর আরও একটা। একটার পর একটা ভেজা পায়ের ছাপ এগিয়ে আসছে আমার দিকে, কিন্তু সেখানে কেউ নেই—কোনো শরীর নেই, কোনো ছায়া নেই, শুধু উপস্থিতির প্রমাণ রেখে যাওয়া জল। আমি নড়লাম না, পালালাম না; শুধু দাঁড়িয়ে দেখছিলাম, যেন এই দৃশ্যের বাইরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। আর সেই মুহূর্তেই আমার ভেতরে একটা ঠান্ডা উপলব্ধি জন্ম নিল—সে শুধু ফিরে আসেনি। সে এখন আমার ভেতর থেকেও বাইরে আসতে পারে।
সেই মুহূর্তে আমি নড়তে পারিনি, কিন্তু আমার ভেতরের কিছু একটা নড়ে উঠেছিল—একটা বোধ, যা ভয়কে ছাড়িয়ে গিয়ে অন্য কিছুতে পরিণত হচ্ছিল। এতক্ষণ আমি ভাবছিলাম, সে বাইরে থেকে এসেছে, কোনো অদৃশ্য পথ দিয়ে ঢুকেছে, জানলা, অন্ধকার, বৃষ্টি—এই সবকিছুর সঙ্গে যুক্ত কোনো উপস্থিতি। কিন্তু সেই ভেজা পায়ের ছাপগুলো যখন আমার চোখের সামনে নিজে নিজে এগিয়ে এল, তখন প্রথমবার আমি বুঝলাম—এই ঘটনাটা বাইরের নয়, এটা আমার ভেতরের। সেই ছাপগুলো ঠিক আমার সামনে এসে থামল। যেন সে আমার একেবারে সামনে দাঁড়িয়ে, কিন্তু আমি তাকে দেখতে পাচ্ছি না। শুধু তার অস্তিত্বের প্রমাণ—জল, ঠান্ডা, আর সেই অদ্ভুত গন্ধ—পচা জল আর শ্যাওলার মিশ্রণ—ঘরের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল। আমি অনুভব করলাম, আমার শ্বাস আবার ভারী হয়ে আসছে, যেন বাতাসে অক্সিজেন কমে গেছে। আমি ধীরে ধীরে হাত বাড়ালাম, যেন অন্ধকারে কিছু স্পর্শ করতে চাইছি। আমার আঙুলের সামনে কিছুই ছিল না, তবু এক মুহূর্তের জন্য মনে হল, আমি কিছুর খুব কাছে পৌঁছে গেছি—একটা ঠান্ডা, সরে যাওয়া উপস্থিতি, যা আমাকে ছুঁয়ে না ছুঁয়েও ছুঁয়ে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই আমার মাথার ভেতর আবার সেই পুকুরের দৃশ্যটা ফিরে এল—কিন্তু এবার সেটা স্মৃতি হিসেবে নয়, যেন আমি আবার সেই জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছি। আমি দেখতে পাচ্ছি জলটা, তার ভেতরে অন্ধকার, তার নিচে ডুবে যাওয়া শরীর। কিন্তু এবার আমি শুধু দর্শক নই। আমার পা ধীরে ধীরে জলে নামছে। ঠান্ডা জল গোড়ালি ছুঁয়ে উঠছে, তারপর হাঁটু, তারপর কোমর। আমি পিছিয়ে আসতে চাই, কিন্তু পারছি না। মনে হচ্ছে, কেউ আমাকে টানছে—ধীরে, স্থিরভাবে। আর সেই টানের মধ্যে একটা পরিচিতি আছে—যেন এটা আমারই কোনো সিদ্ধান্ত, আমারই কোনো অপরাধের ফল। আমার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। আমি চোখ খুলে দেখি—আমি এখনো আমার ঘরেই দাঁড়িয়ে, কিন্তু সেই ভেজা অনুভূতিটা আমার শরীরে লেগে আছে। যেন আমি সত্যিই জলে নেমে গিয়েছিলাম।
তারপর আমি একটা শব্দ শুনলাম—কিন্তু সেটা বাইরে থেকে নয়, ভেতর থেকে। আমার নিজের গলার ভেতর থেকে। খুব নিচু, ভাঙা একটা আওয়াজ—যেন কেউ আমার কণ্ঠস্বর ব্যবহার করছে। আমি আতঙ্কে গলা ছুঁয়ে দেখলাম। ঠান্ডা। কিন্তু এবার কোনো হাত নেই। তবু শব্দটা স্পষ্ট—
“বলিসনি কেন…”
আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম—সে শুধু আমার সামনে দাঁড়িয়ে নেই, সে আমার ভেতরেও ঢুকে পড়েছে। সেই স্মৃতি, সেই অপরাধবোধ, যেটাকে আমি এতদিন চাপা দিয়ে রেখেছিলাম, সেটা এখন একটা আলাদা সত্তা হয়ে উঠেছে। আমি আয়নার দিকে তাকাতে ভয় পাচ্ছিলাম, তবু নিজেকে আটকাতে পারলাম না। ধীরে ধীরে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। ফোনের আলোটা তুলে ধরলাম নিজের মুখের দিকে। প্রথমে সব স্বাভাবিক। তারপর—আমার ঠোঁট একটু নড়ল। আমি নড়াইনি, তবু নড়ল। আমার গলা দিয়ে একটা শব্দ বেরোল—কিন্তু সেটা আমার নয়।
“তুই পালিয়েছিলি…”
আমি পিছিয়ে এলাম। কিন্তু আয়নায় যে প্রতিচ্ছবি, সেটা পিছোয়নি। সে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে একটা অদ্ভুত স্থিরতা। তারপর ধীরে ধীরে তার চোখের ভেতর সেই নড়াচড়াটা আবার দেখা গেল—ছোট ছোট কিছু, যেন জীবন্ত। আমি হঠাৎ বুঝতে পারলাম—ওগুলো শুধু পোকা নয়। ওগুলো স্মৃতি। প্রতিটা নড়াচড়া, প্রতিটা কিলবিল করা অনুভূতি—সবকিছুই আমার সেই ভুলে যাওয়া মুহূর্তের টুকরো।
হঠাৎ আয়নার ভেতরের আমি হাত তুলল। আমার দিকে। কিন্তু আমি হাত তুলিনি। আমি স্থির। তবু আয়নার ভেতরের হাত ধীরে ধীরে আমার গলার দিকে এগিয়ে এল। আর সেই মুহূর্তেই আমি বাস্তবে আবার সেই চাপ অনুভব করলাম। কেউ নেই, তবু আমার গলায় চাপ পড়ছে। আমি হাঁসফাঁস করতে লাগলাম। আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখি—আমার প্রতিচ্ছবি এখন আর আমি নেই। তার মুখ ফুলে উঠছে, চামড়া টানটান হয়ে যাচ্ছে, চোখের কোটর অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সে সেই জলের লাশের মতো হয়ে উঠছে।
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু শব্দ বেরোল না। কিছুক্ষণ পরে যখন আবার চোখ খুললাম, আয়না আবার স্বাভাবিক। আমি একা দাঁড়িয়ে। আমার শ্বাস ভারী, গলা ব্যথা করছে। কিন্তু সেই অনুভূতিটা থেকে যাচ্ছে—আমি আর একা নই। সেই রাতের পর আমি বুঝতে পারলাম, সমস্যাটা কোনো নির্দিষ্ট সময় বা জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটা শুধু রাত তিনটে, বা বৃষ্টির শব্দ, বা লোডশেডিংয়ের অন্ধকার নয়। এগুলো শুধু দরজা—যার মাধ্যমে সে বেরিয়ে আসে। কিন্তু সে থাকে সবসময়। আমার ভেতরে। আমার স্মৃতির মধ্যে। আমার অপরাধবোধের গভীরে।
দিনের বেলায় সবকিছু স্বাভাবিক লাগে। আমি বাইরে যাই, মানুষের সঙ্গে কথা বলি, হাসি, কাজ করি। কিন্তু মাঝেমধ্যে হঠাৎ করে আমি থেমে যাই। কারণ আমি অনুভব করি—আমার ভেতর থেকে কেউ যেন তাকিয়ে আছে। আমি যখন কারও সঙ্গে কথা বলি, তখন মনে হয়, আমার চোখের ভেতর দিয়ে আরেকটা দৃষ্টি বাইরে তাকাচ্ছে। আমি যখন আয়নায় তাকাই, তখন কখনো কখনো মনে হয়, আমার প্রতিচ্ছবি এক সেকেন্ড দেরিতে নড়ছে—যেন সে আগে থেকে কিছু ভাবছে। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হয় রাত হলে। আমি যতই আলো জ্বালিয়ে রাখি, যতই নিজেকে ব্যস্ত রাখি, একটা সময় আসে যখন নীরবতা ঢুকে পড়ে। আর সেই নীরবতার মধ্যে আমি আবার শুনতে পাই—জলের শব্দ। খুব দূর থেকে। তারপর ধীরে ধীরে কাছে আসে। তারপর—টক। আমি এখন জানি, সেই টোকাটা শুধু জানলায় পড়ে না।
সেটা পড়ে আমার ভেতরে। আর প্রতিবার সেই শব্দটা শুনলেই আমার মনে হয়—আমি আবার সেই পুকুরের ধারে দাঁড়িয়ে, আর এবার হয়তো পালানোর সুযোগ নেই।
এরপর থেকে দিন আর রাতের মধ্যে পার্থক্যটা ধীরে ধীরে মুছে যেতে লাগল। আগে রাত মানেই ছিল ভয়, আর দিন মানেই স্বস্তি—কিন্তু এখন সেই বিভাজন আর কাজ করে না। দিনের আলোতেও আমি মাঝে মাঝে থমকে যাই, কারণ হঠাৎ করেই মনে হয় আমার চারপাশে যে বাস্তবতা, সেটা পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য নয়। মানুষের ভিড়ের মধ্যেও দাঁড়িয়ে আমি অনুভব করি—আমার ভেতরে আরেকটা উপস্থিতি আছে, যে এই পৃথিবীকে আমার চোখ দিয়ে দেখছে, কিন্তু আমার মতো করে নয়। আমি কথা বলি, হাসি, স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করি, কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তে একটা অদৃশ্য নজর আমাকে অনুসরণ করে। যেন আমার ভেতরে কেউ বসে আছে, যে অপেক্ষা করছে—ঠিক সময়ের, ঠিক অন্ধকারের।
আমি ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, এই অভিজ্ঞতাকে শুধু ভয় বলে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটা অপরাধবোধের এক অদ্ভুত রূপ, যা সময়ের সঙ্গে মুছে যায়নি—বরং জমে জমে একটা মানবিক সত্তা হয়ে উঠেছে। সেই ছোটবেলার ঘটনাটা—যেটাকে আমি এতদিন একটা দুর্ঘটনা বলে নিজেকে বুঝিয়েছি—আসলে আমার ভেতরে একটা অসমাপ্ত গল্প হয়ে রয়ে গিয়েছিল। আমি কাউকে বলিনি, কাউকে জানাইনি, এমনকি নিজেকেও পুরোটা স্বীকার করিনি। আর সেই চেপে রাখা সত্যটাই আজ এই রূপ নিয়ে ফিরে এসেছে। সে শুধু প্রতিশোধ নিতে আসেনি—সে আমাকে স্মরণ করাতে এসেছে, যে কিছু ভুল কখনো মুছে যায় না, তারা শুধু অপেক্ষা করে সঠিক মুহূর্তের জন্য।
রাত হলেই এখন আমি সব জানলা বন্ধ করে দিই, দরজা লক করি, ঘরের প্রতিটা আলো জ্বালিয়ে রাখি। কিন্তু আমি জানি—এসব কোনো প্রতিরক্ষা নয়, শুধু একটা ভ্রম। কারণ সে জানলা দিয়ে আসে না, দরজা দিয়ে ঢোকে না। সে আসে যখন চারপাশে অন্ধকার জমে, আর তার থেকেও বেশি—যখন আমার ভেতরের আলো নিভে যায়। অনেক রাত আমি ঘুমোতে পারি না। চোখ বন্ধ করলেই সেই পুকুরের দৃশ্যটা ফিরে আসে। এবার আমি শুধু দর্শক নই—আমি জলের মধ্যে, নিচে নামছি, আর ওপরে থেকে কেউ তাকিয়ে আছে। কখনো মনে হয়, সেই কেউটা আমি নিজেই—দুইটা সত্তা, দুইটা সময়, একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে।
একদিন ভোরবেলা আমি সিদ্ধান্ত নিলাম—এইভাবে আর চলতে পারে না। আমি বেরিয়ে গেলাম সেই গ্রামে, বহু বছর পরে। জায়গাটা প্রায় বদলে গেছে, তবু পুকুরটা আছে। আগের মতোই নিঃশব্দ, স্থির। আমি পুকুরের ধারে গিয়ে দাঁড়ালাম। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম।
গলা কেঁপে যাচ্ছিল। “আমি ভয় পেয়েছিলাম… আমি কাউকে ডাকিনি…” এই স্বীকারোক্তি করতে করতে মনে হচ্ছিল, আমার বুকের ভেতর জমে থাকা একটা ভার ধীরে ধীরে নামছে। কিন্তু আমার এত করে দোষ স্বীকারের পরেও পুকুরের স্থির জল নিস্তব্ধ হয়েই রইল। আমি অপেক্ষা করছিলাম—কোনো উত্তর আসবে কি না। কিন্তু নাহ, বৃথা আশা ফলপ্রসূ হল না। কেউ কোনও উত্তর দিল না আমাকে। কিছুই হল না।
কোনো হাত উঠল না, কোনো ছায়া ভেসে উঠল না, কোনো ফিসফিসানি শোনা গেল না। শুধু সেই নীরবতা। প্রথমে মনে হল—সবকিছুই হয়তো আমার কল্পনা ছিল। কিন্তু তারপর আমি বুঝলাম—সব প্রশ্নের উত্তর শব্দে আসে না। কিছু উত্তর শুধু অনুভূতিতে থাকে। আমি শহরে ফিরে এলাম। জীবন আবার ধীরে ধীরে তার ছন্দে ফিরতে লাগল—কাজ, মানুষ, ব্যস্ততা। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি—আমি এখনো রাতে বৃষ্টি হলে অস্বস্তি বোধ করি। জানলার কাছে গেলে এখনো বুক ধক করে ওঠে। মাঝে মাঝে এখনো সেই টোকা শুনি—টক টক টক। পার্থক্য শুধু একটাই—এখন আমি জানি, সেই শব্দটা কোথা থেকে আসে।
একদিন গভীর রাতে আবার কারেন্ট গেল। অন্ধকার নেমে এল ঘরে। আমি বিছানায় বসে ছিলাম, চোখ খোলা। বাইরে বৃষ্টি। সেই চেনা শব্দ। আর তারপর—
টক—একবার। আমি চুপ করে রইলাম, যেন সেই শব্দটাকে নিজের ভেতর ঢুকে যেতে দিচ্ছি, প্রতিরোধ করছি না। আবার—টক টক। এবার আমি ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। জানলার দিকে এগোলাম, পা ফেলতে ফেলতে মনে হচ্ছিল প্রতিটা পদক্ষেপ কোনো অদৃশ্য স্মৃতির ওপর পড়ছে। হাত বাড়িয়ে ছিটকিনি ছুঁলাম—ঠান্ডা, স্থির। খুললাম না। শুধু দাঁড়িয়ে রইলাম, যেন এই না-খোলাটাই এক ধরনের স্বীকারোক্তি। তারপর খুব আস্তে করে বললাম, “আমি আর পালাব না।” কথাটা বলার পর ঘরটা যেন আরও নিস্তব্ধ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কোনো শব্দ হল না, যেন চারপাশ অপেক্ষা করছে। তারপর খুব হালকা, প্রায় শোনা যায় না এমন একটা ফিসফিসানি ভেসে এল—দূরের জল থেকে উঠে আসা কণ্ঠের মতো—“তুই মনে রেখেছিস…” আমি চোখ বন্ধ করলাম। বুকের ভেতর তখন অদ্ভুত একটা অনুভূতি—ভয় আর শান্তি একসঙ্গে মিশে আছে, যেন দুটোই একে অপরকে বাতিল না করে বরং পূর্ণ করছে। আমি জানি না সে চলে গেছে কি না, বা কোনোদিন যাবে কি না, কিন্তু এতটুকু বুঝলাম—এই গল্পের কোনো শেষ নেই। এটা কোনো এক রাতের ভৌতিক ঘটনার সমাপ্তি নয়, বরং একটা জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্মৃতির ধারাবাহিকতা, যা সময়ের সঙ্গে বদলায়, কিন্তু মুছে যায় না। আজও বৃষ্টি হলে আমি জানলা বন্ধ রাখি, তবু সেই টোকা পড়ে—টক টক টক। কারণ সে জানলা দিয়ে আসে না। সে আসে যখন অন্ধকার নামে, যখন চারপাশ নিঃশব্দ হয়, যখন আমি একা হয়ে পড়ি, আর সবচেয়ে বেশি—যখন আমি নিজেকে ভুলতে চাই। কারণ ভয়ের জানলা বাইরে নয়, ভেতরে। আর সেই জানলাটা আমি নিজেই একদিন খুলেছিলাম। এখন সেটা আর পুরোপুরি বন্ধ হয় না।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।