বৈশাখের প্রথম সকালটা সবসময়ই আমার কাছে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধ আলোয় ভরা মনে হয়—যেন আজ সূর্যের উত্তাপেরও এক নিজস্ব স্নেহ আছে। জানলার বাইরে কচি আমপাতার দোলায় সেই আলো পড়ে তৈরি করে একরাশ সোনালি কম্পন। দূরে কোথাও শাঁখের ধ্বনি, আর তার সঙ্গে মিশে থাকা মৃদু ঢাকের আওয়াজ—সব মিলিয়ে যেন এক ফেলে আসা অতীতের ডাক।
আমি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, হাতে এক কাপ লাল চা। রাস্তার ওপারে ছোট্ট দোকানটায় হালখাতা খোলার প্রস্তুতি চলছে। লাল-হলুদ শালুই কাপড়ে মোড়া খাতা, তার ওপর সিঁদুরের স্বস্তিক চিহ্ন। দোকানদার মধুসূদন কাকু প্রতি বছরের মতোই আজ শুভ্র ধুতি-পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়েছেন, কপালে চন্দনের ফোঁটা। তাঁর মুখে সেই চেনা প্রসন্নতা—যেন জীবনের পুরোনো সব দেনা-পাওনা চুকিয়ে দিয়ে নতুন করে বাঁচার আনন্দ।
কিন্তু আমার ভেতরে আজ সেই আনন্দটা বিন্দুমাত্র সাড়া জাগাচ্ছিল না। বরং এক গভীর শূন্যতা, এক চাপা বিষণ্ণতা মনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছিল। বাবা-মা চলে যাওয়ার পর, এই বাড়িতে এটাই আমার প্রথম বৈশাখ।
গত বছর এই দিনেও সকাল থেকে মা কী ভীষণ ব্যস্ত থাকতেন! রান্নাঘরে পান্তাভাত, মুচমুচে ইলিশ ভাজা, কাঁচা লঙ্কা আর পেঁয়াজ—সবকিছু কী পরম মমতায় সাজিয়ে রাখতেন। আর বাবা? তিনি বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে গামছায় ঘাম মুছতে মুছতে রেডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতেন—“এসো হে বৈশাখ, এসো এসো…”
সেই চেনা সুরটা আজও যেন বাতাসে ভাসছে, কিন্তু রেডিওটা অনেকদিন হলো নিস্তব্ধ।
চোখ বুজলাম। হঠাৎ মনে হলো, যদি এই মুহূর্তে দরজায় কেউ কড়া নাড়ে, আর খুলে দেখি—মা দাঁড়িয়ে আছেন, মুখে সেই প্রশান্ত হাসি! কিন্তু বাস্তব বড় কঠিন। এ বাড়ির দরজায় আজকাল আর কেউ কড়া নাড়ে না।
ঠিক তখনই সত্যিই দরজায় টোকা পড়ল।
আমি চমকে উঠলাম। এত সকালে কে আসবে? ধীর পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলতেই দেখি, এক ছোট্ট মেয়ে দাঁড়িয়ে। বয়স আট কি নয়। পরনে লাল-সাদা ফ্রক, কপালে ছোট্ট লাল টিপ। দু’হাতে ধরা একটা ছোট্ট কাঁসার থালা, তাতে কিছু বেলফুল আর একটুখানি সন্দেশ।
অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কে তুমি?”
মেয়েটা একগাল হেসে বলল, “আমি পাশের বাড়ির মেয়ে। মা বলল, নতুন বছরের প্রণাম করে আসতে।”
আমি একটু বিভ্রান্ত হলাম। পাশের বাড়িতে তো নতুন কোনো ভাড়াটে এসেছে বলে শুনিনি! তবু তাকে ভেতরে ডাকলাম।
সে ঘরে ঢুকে এমনভাবে চারপাশে তাকাল, যেন জায়গাটা তার বড্ড চেনা। তারপর নিচু হয়ে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল।
আমি অপ্রস্তুত হয়ে পিছিয়ে গেলাম, “আরে, এসব করতে হয় না… কী নাম তোমার?”
সে মাথা তুলে বলল, “আমার নাম মেঘলা।”
নামটা শুনেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ছ্যাঁত করে উঠল। মেঘলা—এই নামটা আমি শেষবার উচ্চারণ করেছি অনেক বছর আগে। আমার ছোট বোনের নাম ছিল মেঘলা। সে তখন খুব ছোট। একদিন হঠাৎ জ্বরে পড়ল… আর ফিরে এল না।
আমি মেয়েটার দিকে পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম। তার চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, যেন পৃথিবীর সব না-বলা কথা সে জানে।
“তুমি এখানে একা থাকো?” সে জিজ্ঞেস করল।
আমি আনমনে মাথা নাড়লাম, “হ্যাঁ… এখন একাই।”
সে একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “একলা থাকলে খুব মন কেমন করে, তাই না?”
আমি কোনো উত্তর দিতে পারলাম না। দৃষ্টি জানলার বাইরে নিবদ্ধ রইল।
সে হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চলো, আমরা একটু ছাদে যাই।”
আমি বিস্মিত, “ছাদে?”
“হ্যাঁ, বৈশাখের প্রথম রোদটা তো ছাদ থেকেই সবচেয়ে সুন্দর লাগে!”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। অবিকল এই কথাটাই বলত আমার বোন! আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার পেছন পেছন ছাদে গেলাম।
ছাদে উঠে দেখি, সত্যিই আজ আলোটা বড্ড মায়াবী। হালকা একটা দখিনা হাওয়া বইছে, তার মধ্যে মিশে আছে নতুন দিনের সতেজ ঘ্রাণ। দূরে কোথাও একটা কোকিল ডেকে উঠল।
মেঘলা ছাদের এক কোণে গিয়ে দাঁড়াল। “দেখো, ওই আকাশটা—কী দারুণ নীল, তাই না?”
আমি তার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। আকাশটা সত্যিই আজ শরতের মতো পরিষ্কার।
“জানো তো,” সে হাওয়ায় উড়তে থাকা চুল সরিয়ে বলল, “নতুন বছর মানে শুধু দেওয়ালে নতুন ক্যালেন্ডার ঝোলানো নয়। এর মানে হলো, পুরোনো সব কষ্টকে একটু একটু করে উড়িয়ে দেওয়া।”
আমি অবাক চোখে তার দিকে তাকালাম, “তুমি এসব পাকা পাকা কথা কোথা থেকে শিখলে?”
সে খিলখিল করে হেসে উঠল, “কেউ একজন শিখিয়েছিল।”
“কে?”
সে সরাসরি উত্তর দিল না। আকাশের দিকে তাকিয়েই বলল, “যারা আমাদের খুব ভালোবাসে, তারা কখনও পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। তারা আমাদের সঙ্গেই থাকে—এই রোদে, এই হাওয়ায়, এই সুন্দর স্মৃতিগুলোয়।”
“তুমি কি বিশ্বাস করো?” সে আমার দিকে ফিরে তাকাল।
আমি অস্ফুট স্বরে বললাম, “হয়তো… আজ একটু একটু করছি।”
সে আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল, “এই তো! এটাই তো বৈশাখের আসল মানে—নতুন করে বিশ্বাস করতে শেখা।”
আমরা কিছুক্ষণ চুপচাপ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ সে নিজেই বলে উঠল, "বেলা বাড়ছে, আমাকে এবার যেতে হবে।"
আমি যেন ঘোর থেকে বেরোলাম, “আবার আসবে তো?”
সে মিষ্টি হেসে বলল, “যখনই তোমার খুব মন কেমন করবে, আমি ঠিক চলে আসব।”
এই বলে সে দ্রুত পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
আমি বেশ কিছুক্ষণ ছাদে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর নিচে নেমে এলাম। ঘরে ঢুকে দেখি, বসার ঘরের টেবিলের ওপর একটা পুরোনো বাঁধানো ছবি রাখা। ছবিটা অনেকদিন ধরে আলমারির ড্রয়ারে সযত্নে তোলা ছিল—সেটা কখন যে নিজে থেকে টেবিলে উঠে এল, আমার সত্যিই মনে নেই! ছবিটায় আমি, মা, বাবা—আর আমাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাসছে ছোট্ট মেঘলা।
আমার হাত কাঁপতে লাগল। আমি দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পাশের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়লাম।
এক ভদ্রমহিলা বেরিয়ে এলেন। আমি রুদ্ধশ্বাসে জিজ্ঞেস করলাম, “আপনাদের বাড়িতে কি মেঘলা নামে কোনো ছোট্ট মেয়ে আছে?”
তিনি ভ্রু কুঁচকে বললেন, “না তো… আমাদের তো কোনো মেয়েই নেই।”
আমি হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম।
“আপনি কি অন্য কাউকে খুঁজছেন?” ভদ্রমহিলা আবার জিজ্ঞেস করলেন।
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে যন্ত্রচালিতের মতো নিজের বাড়িতে ফিরে এলাম। ঘরে ঢুকে দেখি, টেবিলের ওপর রাখা সেই ছোট্ট কাঁসার থালাটা—বেলফুল আর সন্দেশসহ—ঠিক আগের মতোই রাখা আছে।
আমি থালাটা দু'হাতে তুলে নিলাম। এক অদ্ভুত, অনাবিল শান্তি ধীরে ধীরে আমার সমস্ত সত্তায় ছড়িয়ে পড়তে লাগল।
হয়তো সে সত্যিই এসেছিল। হয়তো বৈশাখের এই প্রথম সকালে, নতুন বছরের পুণ্যলগ্নে, আমাদের পুরোনো ভালোবাসাগুলো এভাবেই একটুখানি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
আমি রান্নাঘরে গেলাম। পান্তাভাত বাড়লাম। সযত্নে ইলিশ ভাজলাম—ঠিক যেভাবে মা বানাতেন। খাবার টেবিলের ওপর কাঁসার থালাটা রেখে পাশে সেই পুরোনো ছবিটা রাখলাম। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ারে বসে পড়লাম।
বাইরে তখন আবার জোর কদমে ঢাক বাজতে শুরু করেছে। আমি চোখ বন্ধ করে পরম শান্তিতে বললাম, “শুভ নববর্ষ, মেঘলা।”
ঠিক তখনই মনে হলো, খুব চেনা, খুব নরম একটা হাত আলতো করে আমার কাঁধ ছুঁয়ে গেল। আমি চোখ খুললাম না। কারণ আমি জানি—কিছু অনুভূতি কেবল আত্মার গভীরে অনুভব করার জন্যই, চর্মচক্ষে দেখার কোনো প্রয়োজন তার নেই।
বৈশাখের সেই সকালটা আমার জীবনে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছিল। আমি সেদিন বুঝেছিলাম, একাকীত্ব মানেই কেবল শূন্যতা নয়—এ হলো স্মৃতির এক গভীর নদী, যেখানে সত্যিকারের ভালোবাসা কখনও তলিয়ে যায় না।
সেদিনের পর থেকে প্রতি বৈশাখে আমি আর একা নই। প্রতি বছর, নতুন রোদে, নতুন হাওয়ায়, আমি ঠিক তাকে খুঁজে পাই—আমার মেঘলাকে। আর তখন মনে হয়, বৈশাখ কেবল একটি পার্বণ নয়—এ এক আত্মিক পুনর্মিলনের দিন, যেখানে হারিয়ে যাওয়া সব আপনজন আবার ফিরে আসে; নিঃশব্দে, সন্তর্পণে, আমাদের হৃদয়ের একেবারে গভীরে।
এবং সেই চিরস্থায়ী অনুভূতিটাই হয়তো মানবজীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।