প্রথম পর্ব, 

কাল বেলা । সাতটা বাজে । পূর্ব আকাশে সূর্য দেখা যাচ্ছে । অনেক দিন পর সূর্যোর আগমন । আব্দুল্লাহ ছেলে বারান্দাতে বসে খেলা করিচ্ছে । তাঁর খেলার জিনিস সামগ্রী হলো , মাটির ব্যাংকের ভাঙা খোলা । একটু আগে থেকে খেলা শুরু করেছে । গতকাল মাটির ব্যাংকটি ভেঙেছে । সর্বমোট চারশত দশ টাকা জোগাড় হয়েছে । ' সারাদিন পরিশ্রম করে দিনশেষে বেতন পেলে যেমন কষ্ট ভুলে যায় , তেমনি আমরা গরিব ঘরের সন্তান পরিবারের এতো কষ্ট থাকার পরেও এত গুলো টাকা ছেলেটি জোগার করতে পেরেছে এটাই শ্রেষ্ঠ মহৎ । টাকার নেশা আর নারীর নেশা ছেলেদের প্রধান নেশা । শৈশবে বিশেষ করে টাকার নেশা থাকে । ছেলেটি টাকা প্রতি এতো মায়া তা প্রমাণিত হলো , টাকাগুলো পকেটে রেখে খেলা করিচ্ছে । এমন ঘটনা দেখে আব্দুল্লাহ আনানো বিড়াল পুষির মনে খুব হিংসা হচ্ছে । কেনো না , আগে তো ছেলেটি পুষিকে নিয়ে খেলা করতো , এখন তো তা হচ্ছে না , ছেলেটি খেলা নিয়ে ব্যস্ত । পুষির মনে হচ্ছে 'একে যেনো সালা মেরে ফেলি ' রাগ করে পুষি দূরে গিয়ে বসলো । ছেলেটি বুঝতে পেরে খেলা বন্ধ করলো । 

আব্দুল্লাহ ছেলের নাম মোহাম্মদ আরাফাত হোসাইন । দেখতে চিকন - শ্যামলা কালো বর্ণ - বয়স তেরো - যৌবনকাল চলিচ্ছে । শরীরে যেমন পোশাক পরবে তাতেই দেখতে খুব সুন্দর লাগে । ' চোখে আমার অকালের বৃষ্টি হাসে ' 

আব্দুল্লাহ হাঁস - মুরগির ব্যবসা করতেন । ছোটো - খাটো ব্যাপারি , চাপা বেশ । ফজরের নামাজ পরে , দুইটা মোরগ নিয়ে বের হয়েছিল এইমাত্র বাড়িতে এলেন । গোয়াল ঘরে গেলো , হাঁস - মুগরির খাঁচা বের করলেন , পলিথিন থেকে ধান বের করে খাঁচার মধ্যে ছিটিয়ে দিলেন , হাঁস টাকে খাঁচার মধ্যে থেকে বের করলেন , মুখ ভরে ধান দিয়ে তর্জনি আঙুল দ্বারা ঠেসে ঠেসে দিচ্ছে । আব্দুল্লাহ মুখে উচ্চারণ করলো ' খাবি না কেনো খা সালা ওজন যাতে বেশি হয় ' 

আব্দুল্লাহ স্ত্রীর নাম মোছা : আখিঁ বেগম । এক বাপের এক বেটি - বংশের প্রথম সন্তান - ছোটো থেকেই কামিল মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে বড় হয়েছেন । আব্দুল্লাহ তাঁর মামাতো ভাই - 2013 সালে তাঁদের বিবাহ অনুষ্ঠিত হয় । পল্লী আম্মু আখিঁ বলল - ক্যা আরাফাতের বাপ কই গেলা - ভাত খেয়ে যাও - আমি আবার কাপড় ধুতে যাবো । 

' বাবা আরাফাত ভাত খেয়ে যাও ' বাবা -

প্রকৃত পরিবার তারাই যেখানে বাবা - মা মিলে সন্তানকে প্রতিটা ধাপে শিক্ষা দেয় , ভাত খাওয়ার সময় আব্দুল্লাহ বলল , ' বড়দের সাথে যখন খেতে বসলে তাঁদের থালের দিকে দেখা যাবে না - কারণ , ছোটোদের চোখ ভরে তো মন ভরে না । তুমি যখন ছোটোদের সাথে খেতে বসবা তখন তুমি তোমার থালের বড় খাবার টা তাকে তুলে দিবা - দেখবা সে অনেক খুশি হয়েছে , এই যে আমি প্রতিদিন ভালো খাবারটা তোমার আম্মুর পাতে তুলে দেই এটা আমার দায়িত্ব । ছেলেটি টাকা গুলো তাঁর আম্মুর কাছে রেখে দিলো । এক বছর কেটে গেলো । 

 দ্বিতীয় পর্ব ,

মিষ্টি মিষ্টি রোদ । খুব ভালো লাগিচ্ছে , টুলে বসে ছেলেটি বলল , এই পুষি চল দুইজন মিলে করতোয়া - কাটাখালি খেলি । পুষি মাথা নাড়িয়ে হ্যাঁ প্রকাশ করলো । ছেলেটি মতে খেলাটি হলো , ছেলেটি খোলা ফিক মারবে পুষি তা কুড়ে আনবে । কিছুক্ষণ ভালুই খেলা হলো । এবার ছেলেটি ইচ্ছা করেই জোরে খোলা ফিক মারছে , তা বাড়ির তল্লা বাঁশের থোপে গিয়ে পরছে , তাই পুষি খুঁজে পাচ্ছে না । ছেলেটি বলল , কই রে পেলি ? পুষি মাথা নাড়ালো : না , না । খোলা খুঁজা বাদ দিয়ে দুইজনে ঘরের মধ্যে ঢুকলো । ছেলেটি জানালার পাশে শুয়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গান - গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙ্গামাটির পথ আমার মন ভুলায় রে ' শুনিচ্ছে রেডমি A3 মোবাইল ফোনে । 

হঠাৎ করে বাড়ির পাকা রাস্তা দিয়ে আইসক্রিম ওয়ালা যাচ্ছে - ঘন্টা বাজাচ্ছে - ঘন্টার শব্দ শুনে ছেলেটি ঘর থেকে বার হয়ে এক দৌড়ে আইসক্রিম ওয়ালার কাছে গেলো । ছেলেটি বলল , দারান আমি আসিচ্ছি ! দৌড়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকলো - বাবার দেখা পেয়ে বলল , বাবা , ও বাবা টাকা দাও তো আইসক্রিম খাবো ? আব্দুল্লাহ বলল , খালি খাওয়া - তুই বুঝিস ন্যা - কেবলি গরুর গুরা , ভুষি নিয়ে এলাম - তোর খালি হেসকারি ন্যা - এতো স্বাদ কেমনে খাবার মন চায় । আব্দুল্লাহ রাস্তায় বার হয়ে বলল - ও ভাই আইসক্রিম ওয়ালা আপনি


"
এখান থেকে , যান্ তো , দিনের মধ্য কতো দোকানদার আসে , যানতো ভাই - যান , ছল বায়না ধরছে । ' আমার মনে হচ্ছে - আকুল বংশরীতির কোনো আবদার নেই ' 


তৃতীয় পর্ব ,

দুপুরে যোহরের আযান দিচ্ছে । রোদ ওঠছে । ছেলেটি সাবান কেচ হাতে নিয়ে , নদীর দিকে রওনা দিলো পুষিকে নিয়ে । নদীর পাড়ে ছোট্ট ছেলে - মেয়ে গোসল করিচ্ছে । দৃষ্টি মোর পবিত্রতা পায় - কেউ ফরজ গোসল করিচ্ছে - কেউ লাফালাফি করিচ্ছে - জেলেরা মাছ ধরিচ্ছে - পাখিরা উড়ে যাচ্ছে - প্রকৃতির মন মাতানো রুপ - সব মিলে যৌথ পরিবার গঠিত হয়েছে মনে হচ্ছে ' এগুলো যৌথ পরিবারের বৈশিষ্ট্য ' ছেলেটি পুষিকে উপরে রেখে নিচে নামলো । গোসল সভায় একটা কথা প্রকাশ পাচ্ছে ' তারা ফুটবল খেলা দেখতে যাবে । ছেলেটি বলল , আমিও যাবো ! কয় টাকা লাগবি ? অসীম নামে ছেলেটি বলল , 50 টাকা লাগবে ? ছেলেটি বলল , ঠিক আছে আমিও যাবো , আরেকটি ছেলে বলল , তাহলে তো ভালুই হলো আমাদের আটোর একটা সিট ফাঁকাও আছে আরাফাতকে নিয়ে তা পরিপূর্ণ হলো।

অসীম বলল , আরাফাত এই জায়গা থেকে গিয়ে রেডি হবা আমরা দেরি করবো না ! নদীর উতাল - পাতাল ঢেউয়ের মতো ছেলেটির মনে ঝড় ওঠেছে । 

বাড়িতে গেল - কাপড় বদলায় - নতুন পোশাক পরিধান করল । ছেলেটির কাছে বিশ টাকা আছে আরো 30 টাকার প্রয়োজন । ছেলেটি বলল , আম্মু,

ও আম্মু , পল্লীআম্মু পাশের বাড়ি থেকে বের হয়ে এলো ' বলল - কই যাচ্ছো বাবা ? নতুন জামা পরছো ? ছেলেটি বলল , আম্মু আমার কাছে 20 টাকা আছে আপনি 30 টাকা দেন তো ? ফুটবল খেলা দেখতে যাবো গোবিন্দগঞ্জ মিনি স্টুডিয়ামে । 

পল্লীআম্মু বলল - তোর এতো আমোদ ক্যা - খালি ঘোরা ঘুরি - মানুষের সাথে ওতো স্বাদ ক্যা - তোর বাপের কামাই আছে ক্যা - রাতের বেলা খরজ পাতি কিছুই নাই ? ছেলেটি কাঁদতে কাঁদতে ঘরে মধ্যে ঢুকে দরজা লেগে দিলো । দুই মিনিট পরে বাড়ির উঠানে আটোগাড়ি এলো , সবাই আরাফাত বলে ডাক দিলো । ছেলেটি ডাক শুনে আরো কাঁদতে শুরু করলো । ' আহা - রে পল্লী আম্মু দুঃখ দেখাবে কারে - একমাত্র সন্তান তাঁর আশা মিটাতে পারে না - মুখে ওড়না দিয়ে কাঁদতে থাকে । একটা ছেলে গাড়ি থেকে নেমে এসে ঘরের দরজার সামনে দারালো বলল , আরাফাত কই যাবি না ? ছেলেটি চোখের পানি মুছে খিণ্য কন্ঠে দরজার ওপার থেকে বলল , যাবো না । ছেলেটি বলল , যাবি না তা নাম দিলি ক্যা ? প্রশ্ন উওর না দিয়ে ছেলেটি খাটের উপর শুয়ে কাঁদতে আরম্ভ করলো । 

চতুর্থ পর্ব , 

বিকেলের রোদটা ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে ।  উঠোনের কাঁঠাল গাছের ছায়া লম্বা হয়ে পড়েছে । আটোগাড়ির শব্দ দূরে মিলিয়ে গেছে । চারপাশ হঠাৎ করে খুব চুপচাপ । সেই চুপচাপের ভেতরেই আরাফাতের বুকের ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে ।

খাটের উপর শুয়ে শুয়ে সে জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে । মনে হচ্ছে—আজকের আকাশটা খুব বড় , আর তার নিজের মনটা খুব ছোট । পুষি এসে খাটের নিচে বসেছে । লেজ নেড়ে নেড়ে বারবার তাকাচ্ছে ছেলেটির দিকে । একটু পরে লাফ দিয়ে খাটে উঠে ছেলেটির বুকে মাথা রাখল । ছেলেটি কিছু বলল না , শুধু পুষির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো । এই সময় দরজার বাইরে পায়ের শব্দ । আব্দুল্লাহ এসে দাঁড়াল । কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল — কিরে আরাফাত... দরজা খুলবি না ? ছেলেটি কোনো উত্তর দিল না । আব্দুল্লাহ ধীরে ধীরে বলল — — শোন বাবা , আম্মু তোকে বকা দিয়েছে ঠিকই , কিন্তু মন খারাপ করে নে । সংসারে হিসাব না করলে চলে না । দরজা খুলে দিলো । আরাফাতের চোখ দুটো লাল । আব্দুল্লাহ ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল । সে পকেট থেকে ভাঁজ করা কিছু টাকা বের করল ।

— এই নে , ত্রিশ টাকা । কিন্তু একটা কথা মনে রাখিসব— আজ খেলাটা মিস করলেও জীবন থামে না । আরাফাত অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল । টাকা হাতে নিয়ে কিছু বলার আগেই আব্দুল্লাহ যোগ করল — — তুই বড় হবি , তখন বুঝবি — সব না পাওয়ার মাঝেই মানুষ তৈরি হয় । আরাফাত মাথা নোয়াল । চোখের কোণে জমে থাকা পানি মুছে বলল — বাবা... আমি খেলাই দেখতে চেয়েছিলাম , খারাপ কিছু না । আব্দুল্লাহ মৃদু হাসল — আমি জানি বাবা । বাইরে তখন মাগরিবের আজান ভেসে আসছে । আকাশে লালচে আলো । আরাফাত পুষিকে কোলে নিয়ে বারান্দায় এসে বসলো । মনে হলো — আজকের ফুটবল ম্যাচ সে দেখেনি ঠিকই , কিন্তু জীবনের একটা কঠিন পাঠ সে শিখে ফেলেছে ৷ পরান ফাটে কখনো না পাওয়ার কষ্টে , আবার কখনো ফাটে বাবার নীরব ভালোবাসায় ।