ক্রিং ক্রিং করে কলিংবেল বেজে উঠল। এই রকম অসময়ে দুপুরবেলা কে এল ? দরজা খুলে দেখি পিয়ন দাঁড়িয়ে, হাতে একটা চিঠি । চিঠি এসেছে আমার বন্ধু অমিয়-র কাছ থেকে । অমিয়-র সঙ্গে বন্ধুত্ব সেই স্কুল থেকে ।তারপর উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে ও কলকাতায় ছলে গেল। নামী কলেজে ভর্তি হল । আমি চলে এলাম রামপুরে। সেখানে একটি কলেজ থেকে পাশ করে যখন বেরুলাম তখন তিন – চার বছর কেটে গাছে । এই তিন – চার বছরে আমাদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ প্রায় হয়নি বললেই চলে । মাঝে মাঝে চিঠিপত্র আদান প্রদান হয়েছে এই যা । তারপর একটা স্কুলে চাকরি নিয়ে এই রামপুর গ্রামেই আমি স্থায়ী আস্তানা গেড়ে বসলাম। অমিয়-র খবর তারপর চার-পাচ বছর প্রায় পায়নি বললেই চলে। হঠাত্‌ ওর চিঠি পেয়ে খুব অবাক হলাম। তদিন পর ও যে আমায় মনে রেখেছে সেটা ভেবে খুব ভালো লাগল। আর সেই সঙ্গে আমি ওর কোনো খোঁজ নিইনি বলে নিজেকে খুব অপরাধী বলে মনে হতে লাগল । যাইহোক চিঠিটা তাড়াতাড়ি খুললাম।

অমিয় তার চিঠিতে লিখেছে, “ভাই শ্যামল, অনেক পর তোকে চিঠি লিখছি। দীর্ঘদিন তোর কোনো খবর নিতে পারি নি বলে নিজের কাছে নিজেরই লজ্জা লাগছে । অনেক কষ্টে তোর ঠিকানা জোগার করে তোকে এই ছিঠি লিখছি। সম্প্রতি লোচনপুর গ্রামে খুব সস্তায় একটা বাড়ী কিনেছি । গ্রামের পরিবেশ সম্বন্ধে তোকে কি আর বলব? তা ভাই তুই একদিন সময় করে কয়েকদিনের ছুটি নিয়ে লোচনপুরে আমার বাড়ীতে একবার ঘুরে যা, অনেকদিন পর দেখা সাক্ষাৎ হবে। খুব ভালো লাগবে। বাড়ির ঠিকানা আর কি করে আসতে হবে তা চিঠির নিচে দিয়ে দিয়েছি”।

এই পর্যন্ত পড়ে একেবারে আনন্দ ভরে উঠল। ঠিক করলাম পরের সপ্তাহে শনিবারই দুগ্‌গা দুগ্‌গা বলে বেড়িয়ে পড়ব।

টুকিটাকি জিনিস গুছিয়ে নিয়ে , খেয়ে-দেয়ে যখন বাড়ী থেকে বেরুলাম তখন বেশ দুপুর হয়ে গেছে। আকাশের অবস্থা থম্‌থমে, গুমোট ভ্যপসা একটা গরম,আকাশ মেঘে ঢাকা। মাঝে মাঝ আবার মেঘ ডাকছে। স্টেশনে পৌঁছে শুনি লোচনপুরের দুটো ট্রেন বাতিল হয়ে গেছে। পরের গাড়িও আসতে দেরি হবে।

লোচনপুরে যখন নামলাম তখন বেশ রাত হয়ে গেছে।চারিদিক ঘুট্‌ঘুটে অন্ধকার। তার মধ্যে আবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেছে। অমিয় চিঠিতে যে গরুর গাড়ীর কথা বলেছিল সেগুলো একটাও নেই।খুব সম্ভবত বৃষ্টির জন্য সবাই ভেগেছে।

প্যান্ট টা গুটিয়ে , ছাতা মাথায় চলতে শুরু করলাম। রাস্তা-ঘাট চিঠিতেই বলা ছিল যে, কেমন করে আসতে হবে ।অন্ধকারে বেশ ঘন্টাখানেক চলার পর মনে হল যে আমি ভুল পথে চলে এসেছি।এদিকে টর্চের আলোটাও কমে এসেছে। এমন সময় হঠাত্‌ তুমুল ব্রিশটি শুরু হল সেই সঙ্গে মারাত্মক ঝড়। দিক্‌বিদিক্‌ জ্ঞানশূর্ন্য হয়ে ছুটতে লাগলাম মাথা বাঁচাবার জন্য। এমন সময় দূরে একটা আলোর রেখা দেখলাম। একটা পাতা ছাওয়া ঘরের মধ্যে একটা লোক লণ্ঠণ জ্বেলে বসে আছে । কোনো চিন্তা না করেই সেই ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়লাম।

লণ্ঠনটার অবস্থা শোচনীয়, লণ্ঠণের কাঁচে ভুসো পড়ে একেবারে হাল খারাপ।লোকটা দরজার দিকে পিছন ফিরে বসে আছে আর একমনে বিড়ি টানছে ।

আমি গলা খাকরি দিয়ে বললাম, ‘ও মশাই শুনছেন ?’ লোকটা কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না । একমনে যেমন বিড়ি টানছিল তেমন টানতে লাগল। বার কয়েক জিজ্ঞাসা করে আমি বিরক্ত হয়ে যেই ছুপ করে গেলাম তখনি লোকটা হঠাত্‌ আমার দিকে ফিরে বলল, ‘বাবু কিছু বলছেন? লোকটার দিকে তাকিয়ে আমার চক্ষু স্থির হয়ে গেল। লোকটার দু চোখ কোটরগত কিন্তু যেন ধক্‌ধক্‌ করে জ্বলছে। গাল দুটো বসে একেবারে হাড় বেরিয়ে গেছে, তার মধ্যে মুলোর মতো বড় বড় সাদা সাদা দাঁত গুলো একেবারে ঝক্‌ ঝক্‌ করছে। এরকম বৃষ্টি ভেজা নিশুতি কালো রাতে , অচেনা অজানাএক গ্রামে এই রকম পরিস্থিতিতে আমার গা-টা কেমন ছম্‌ছম্‌ করে উঠল। যাই হোক মনে সাহস এনে বললাম, ‘কি নাম তোমার? আর লোচনপুর গ্রামটা কত দূর?’

লোকটা অদ্ভুত ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলে উঠল,’আমার নাম দীননাথ। আপনি বাবু পথ ভুল করে লোচনপুর গ্রাম থেকে মাইল খানেক দূরে শ্মশানে এসে পড়েছেন। আমি এই শ্মশানের ডোম। এক নামে এ গ্রামের সবাই আমায় চেনে’। এই পর্যন্ত বলে সে হ্যা হ্যা করে হাঁপাতে লাগল। আমি বুঝলাম লোকটার বয়স হয়েছে তারপর নেশা ভাং করে করে শরীরের এই অবস্থা করেছে আর তার মধ্যে ঠাণ্ডা লাগিয়ে আবার হাঁপানি বাঁধিয়েছে। তবে লকটার সামনে বসে কথা বললেও, ‘কথাগুলো যেন অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে বলে মনে হচ্ছে।ওসব পাত্তা না দিয়ে আমি বললাম, ‘শরীরের তো এই অবস্থা , ঐসব নেশা-ভাং কর কেন? তোমাকে কি দেখার কেউ নেই?’ দীননাথ আমার প্রশ্ন শুনে জুল জুল করে আমার পানে তাকিয়ে হাসতে লাগল। ওর মুলোর মতো সাদা দাঁতগুলো লণ্ঠণে ম্রিয়মাণ আলোয় একেবারে ঝক্‌ ঝক্‌ করতে লাগল। দীননাথ বলল, ‘আমার বাবু তিনকূলে কেউ নেই।বাপ-মা জন্মের পরেই মারা গেছে , আর আমিও বিয়ে করিনি। আর বাবু আমার ভাগ্য খুব খারাপ। সব সময় একটা ফাঁড়া যেন লেগেই আছে। আমি বললাম, ‘কি রকম ফাঁড়া?’ ও বলল, ‘এই বছর তিনেক আগে আমার বন্ধু ভদা ওর দেশের বাড়ি গেল। যাবার সময় বলে গেল যে , যতদিন না ও ফেরে ততদিন আমি যেন ওর আখের রস বানাবার ব্যবসাটা চালিয়ে যাই’। এই পর্যন্ত বলে দীননাথ খুব হাঁপাতে লাগল। তারপর বড় বড় শ্বাস নিয়ে সে বলল , ‘তা সেই আখের মেশিন চালাতে গিয়েই তো বিপত্তি। মেশিনে হাতটা ঢুকে গিয়ে একেবারে ভেঙ্গে ‘দ’ হয়ে গেল। এই বলে সে চাদর সরিয়ে তার ডান হাতটা দেখাল। কব্জির নিচ থেকে পুরো নুলো হয়ে গেছে । ও হাসতে হাসতে বলল, ‘আমার আর বাবু বেঁচে কাজ নেই’। আমি বললাম, কেন? ও একই রকম ভাবে হাসতে হাসতে বলল, ‘আর বলবেন না ! গেল বছর পুজোর সময় সদরে গিয়েছিলাম। সে এক বিপত্তি! গাঁয়ের মানুষ, সদরের আদব-কায়দা, নিয়ম-কানুন জানি না । পথ চলতে চলতে হঠাত্‌ একটা বাস পিছন থেকে এসে মারল এক ধাক্কা’। আমি চমকে উঠলাম , বললাম,’তারপর কি হল?’ ও বলল, ‘প্রাণে তো সে যাত্রা বেঁচে গেলাম কিন্তু একটা পা আমার বাদ হয়ে গেল’। বলে সে বিশ্রী ভাবে হাসতে লাগল। তারপর সে বলল,’আর এই মাস খানেক আগের কথা তো না বললেই নয়!’ আমি বললাম, আবার কি হল? দীননাথ একটু জিড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এই মাস তিনেক আগে ট্রেনে করে যাছছিলাম । ট্রেনে সেদিন খুব ভীড় আর আমি একেবারে দরজার কাছে ঝুলছিলাম। হঠাত্‌ একটা কিসে যেন ধাক্কা লেগে একেবারে ছিটকে ট্রেনের চাকার তলায় চলে গেলাম। এই পর্যন্ত বলে সে ছুপ করে গেল। আমি অত্যন্ত অবাক হয়ে বললাম, ‘কি যা তা বলছ? এই তো আমার সামনে দিব্যি বসে আছ। ট্রেনের তলায় পড়লে কে কেউ বাঁচে?

দীননাথ এইবার বেশ্রী ভাবে হাসতে লাগল বলল, ‘বাবু ট্রেনের তলায় পড়ে আমার মাথাতা একেবারে ধর থেকে আলাদা হয়ে গেল’। এই বলে সে এক টানে নিজের মাথাটা ধড় থেকে আলাদা করে আমার সামনে ধরে বলল, কি বিশ্বাস হচ্ছে না ? এই দেখুন। আমার চোখ দুটো ভয়ে বিস্ফোরিত হয়ে গেল। হৃদ্‌পিণ্ড টা মনে হল একলাফে শরীরের বাহিরে বেরিয়ে আসবে । আমি জোরে চিৎকার করে একলাফে চালার বাইরে এসে পড়লাম আর অন্ধকারে বৃষ্টির মধ্যে ছুটতে লাগলাম। পিছন থেকে দীননাথের অট্টহাসি আমাকে তাড়া করে ফিরতে লাগল ।কতক্ষণ ছুটেছি ঠিক নেই , হঠাত্‌ দুটো বরফের মতো ঠাণ্ডা হাত আমাকে একেবারে পিছন থেকে জাপটে ধরল। আমি আতঙ্কে জ্ঞান হারালাম।

যখন জ্ঞান ফিরল তখন দেখি একটা খুব পরিপাটি করে পাতা বিছানায় আমি শুয়ে আছি আর মাথার কাছে অমিয় বসে মাথায় বাতাস করছে । তাড়াতাড়ি ধড়ফড় করে উঠতে গেলাম, অমিয় আমায় জোর করে শুয়েই দিল, বলল,’তুই আসবি জেনেই আমি রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাত্‌ দেখি তুই উদ্‌ভ্রান্তের মত দিক্‌বিদিক্‌ জ্ঞানশূর্ন্য হয়ে ছুটে আসছিস। দেখে তোকে ধরে ফেললাম কিন্তু তুই জ্ঞান হারালি। ঠিক কি হয়েছিল বলতো? ওরকম ছুটছিলিস কেন? আমি অবাক হয়ে বললাম, কিন্তু তুই কি করে জানলি যে মি আজ আসব? আমি তো তোকে আগে থাকতে কিছুই জানাইনি? অমিয় হেসে বলল, ‘ওরে, তোকে চিঠি পাঠাবার পর থেকেই প্রতিদিন সন্ধ্যাবেলা তোর জন্য অপেকশা করে থাকি। কবে তুই আসবি? এই বাড়ীটা এত ভালো যে তুই কয়েকদিন এখানে থাকলেই আমাদের সঙ্গে একেবারে এক হয়ে যাবি। আমি বললাম, ‘আমার এখানে আর এক দণ্ড থাকার ইচ্ছা নেই। কাল সকালেই আমি চলে যাব।অমিয় একেবারে হাঁ হাঁ করে উঠল, বলল, কেন? আমি ওকে সব খুলে বললাম, শমশানের কথা , দীননাথের কথা । সব শুনে ও খিল খিল করে হাসতে লাগল। হাসতে হাসতে বলল,’ কিরকম ভাবে দীননাথ ওর মাথাটা খুলল বলতো? এই রকম!’ বলে অমিয় একটানে ওর নিজের মাথাটা ধড় থেকে টেনে খুলে এনে আমার সামনে দু হাতে মেলে ধরল।আর ঠিক এই সময় লণ্ঠণ টা দপ্‌দপ্‌ করে জ্বলে উঠে নিভে গেল।আমি বিকট চিৎকার করে একলাফে দরজা খুলে বাইরে এসে পড়লাম আর আবার প্রাণপণে ছূটতে লাগলাম। পিছন থেকে অমিয়-র খিল্‌খিলে্‌ হাসি আর কণ্ঠস্বর ভেসে আসতে লাগল। মারাত্মকভয়ে আমি জ্ঞান হারালাম।

পরদিন সকালে জ্ঞান ফিরতে দেখি আমি সেই শ্মশানের ঘরটার মেঝেতে পড়ে আছি । আমার ব্যাগটা পাশেই পড়ে আছে ।আআর কতগুলি কৌতূহলী মানুষের মুখ আমার দিকে ঝুঁকে পড়ে দেখছে । একটু ধাতস্থ হয়ে ওদের কাল রাতের সমস্ত ঘটনা বললাম ।ওরা শুনে বলল, আপনার ভাগ্য ভালো যে আপনি বেঁচে গেছেন। দীননাথ মাস কয়েক আগে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায় আর দুমাস আগে অমিয়-র মৃতদেহ এই শ্মশানে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

আমি অবাক হয়ে গেলাম। অমিয় তো আমায় একমাস আগে চিঠিটা লিখেছে । তাড়াতাড়ি ব্যাগ হাতড়ে চিঠিটা বার করবার চেষ্টা করলাম কিন্তু ওটা কোথাও খুঁজে পেলাম না।

যাই হোক সেদিন বাড়ি ফিরে রাতে শুয়ে আছি বিছানায় হঠাত্‌ ঘাড়ে খুব ব্যথা অনুভব করলাম। কি হল? বুঝতে না পেরে ঘাড়ে একটু হাত দিতেই আমার মুণ্ডুটা ধড় থেকে আলাদা হয়ে মাটিতে পড়ে গড়িয়ে একেবারে খাটের তলায় ঢুকে গেল।