বিচের এদিকটা বেশ নির্জন। সারি সারি নারিকেল গাছের পাশ দিয়ে বালুতট ঢালু হয়ে সাগরে মিশেছে। লাল গোলকটা দিগন্তরেখার আড়ালে ঝুপ করে ডুব দিল বলে। ডুব দেবার আগে সে যেন আকাশে মুঠো মুঠো লাল আবির ছড়িয়ে দিয়েছে। সমুদ্রের দিক থেকে ঠান্ডা হওয়া এসে রিমির চুলগুলো এলোমেলো করে দেয়।
হাঁটতে হাঁটতে রিমির একসময় খেয়াল হয় যে ও বিচ থেকে অনেকটা দূরে চলে এসেছে। এদিকে ক্রমে অন্ধকার ঘনাচ্ছে। রিমি ভাবল নির্জন জায়গায় এমন পরিবেশে একলা হাঁটা কি নিরাপদ হবে? নাহ! এবার ফেরা যাক।এইসব ভাবছে এমন সময় আচমকা কিছুতে একটা ঠোক্কর খায় ও। নিচু হতেই দেখে সাদা মতো কিছু একটা পড়ে আছে বালির ওপর । রিমি কৌতুহলী হয়ে কুড়িয়ে নেয় জিনিসটা।
এটা তো বেশ বড়সড় একটা শঙ্খ! এখানে কিভাবে এল? সমুদ্রতীরের বালিতে কত শামুক,ঝিনুক পড়ে থাকে। ছোটবেলায় এসব কুড়ানো একটা শখ ছিল রিমির। কুড়িয়ে ব্যাগভর্তি করে নিয়ে যেত।
এখন মনে পড়লে হাসি পায়। কেমন নেশার মত ছিল সেইসব জিনিস জমানো। মা বকুনি দিত। বলত 'এসব জঞ্জাল কুড়িয়ে কেন ব্যাগ ভরতি করছ?' কিন্তু রিমি কিছুতেই শুনত না।
তা শামুক, ঝিনুক ভেসে আসতে পারে, কিন্তু তা বলে একটা আস্ত শঙ্খ? যাই হোক, শঙ্খটা দেখতে কিন্তু বেশ। রিমি ওটা হাতব্যাগের মধ্যে ঢুকিয়ে রাখে।
দুর থেকে রিমিকে দেখেই রাত্রি চেঁচিয়ে ওঠে" উফ! যা চিন্তায় ফেলেছিলি। এদিকে সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। আমরা তো তোকে খুঁজতে যাচ্ছিলাম আরেকটু হলে।" রিমি কিছু বলেনা, মুচকি হেসে ওদের সাথে ফেরার পথ ধরে।
সেদিন রাতে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখল রিমি। ও কোনো সমুদ্রতীর ধরে হাঁটছে। আচমকা দেখে সামনে প্রায় দুই মানুষ সমান উঁচু একটা বিশাল শঙ্খ। এতবড় শঙ্খ আবার হয় নাকি?কোথা থেকে এল এটা? রিমি হতভম্ব হয়ে পড়ে। তবে কৌতূহলবশত সামনের ফাঁকা অংশ দিয়ে শঙ্খের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
ঢুকেই এক বিশাল হলঘর। তার মেঝে, দেওয়াল সবই শ্বেতপাথরের। স্তম্ভ, দেওয়ালের গায়ে অপূর্ব সব কারুকার্য, ভাস্কর্য খোদিত। হলঘরটা পেরোতেই রিমি দেখল এক অপূর্ব দীঘির সামনে ও দাড়িয়ে আছে। দীঘিতে পদ্ম ফুটে আছে। মরাল গ্রীবা উঁচিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে রাজহাঁস।
"এসো রিমি!" আশেপাশের কোথা থেকে যেন এক বজ্রমন্দিত কণ্ঠস্বর ধ্বনিত হল।
রিমি কেমন স্বপ্নদিষ্টের মত ওই কন্ঠস্বর লক্ষ্য করে চলতে থাকে। চলতে চলতে একসময় চন্দনের এক অপরূপ সুগন্ধে ওর মন ভরে ওঠে। হঠাৎ প্রবল আলোর ঝলকানিতে চোখ ধাঁধিয়ে যায়। ও দাঁড়িয়ে পড়ে। চোখ একটু সয়ে গেলে রিমি দেখে এক অনিন্দ্যকান্তি পুরুষ আধশোয়া হয়ে একটি সিংহাসনে উপবিষ্ট। শঙ্খ, চক্র গদা, পদ্মধারী কে এই তেজোদীপ্ত পুরুষ ? তার নীলবর্ন দেহ, হাতে বরাভয় মুদ্রা, মাথায় সহস্র সর্পের কালনাগ যেন ছত্রী ধারন করেছে।
এ কি দেখছে ও? অনেক জন্মের তপস্যার পরেও বহু সাধক যার দর্শনে লালায়িত থাকে তিনি স্বয়ং রিমির সামনে। এ কি ওর পূর্বজন্মের পুণ্যের ফল? রিমি কতক্ষণ হতচকিত হয়ে দাঁড়িয়েছিল জানে না। একসময় সম্বিৎ ফিরতে অজান্তেই হাত জোড় হয়ে আসে ওর। পুজোর সময় মায়ের কাছ থেকে শোনা নারায়ণমন্ত্র স্তব করতে থাকে ।
মন্ত্র পাঠ করতে করতে রিমি কেমন বিভোর হয়ে যায়। হঠাৎ খেয়াল করে কে যেন ওকে ঠেলছে।
আচমকা চোখের সামনে থেকে মুছে যায় সব দৃশ্য। সেখানে ভেসে ওঠে ওর রুমমেট মেঘলার মুখ। ও রিমিকে ধাক্কা মারছে আর বলছে " কিরে! ঘুমের ঘোরে কি বিড়বিড় করছিস তখন থেকে?"
"কিছু না। ওই একটা স্বপ্ন দেখছিলাম। তাই.."এই বলে রিমি পাশ ফিরে শোয়। কিন্তু শুয়ে থাকলেও ঘুম আসে না ওর। এরকম অদ্ভুত স্বপ্ন ও কেন দেখল? এর সাথে ওই কুড়িয়ে পাওয়া শঙ্খের কোনো সম্পর্ক নেই তো? পরক্ষণে নিজের বোকামিতে হেসে ওঠে ও। ধুস! আরে স্বপ্ন তো স্বপ্নই।
পরদিন ওদের ট্রেন ধরার কথা। এই কদিন বেশ হইহই করেই কাটলো। বাড়ি ফিরে আবার সেই কলেজ, পড়াশোনা, রুটিন বাধা জীবনে ফিরে যেতে হবে। সবার মন বিষন্ন হয়ে। কেউ কেউ এই কদিনের আনন্দময় মুহূর্তগুলোর স্মৃতিচারণা করতে ব্যস্ত।
তবে রিমি ওদের মধ্যে থেকেও যেন নেই। ও একটু দূরে একলা বসে আছে জানলার বাইরে তাকিয়ে। কালকের স্বপ্নটার কথা বারবার মনে পড়ছে। আর তাতেই মনটা একটু বিক্ষিপ্ত হয়ে আছে।
"আরে একলা বসে কি ভাবছিস?" চমকে মুখ তুলে রিমি দেখে রাত্রি দাঁড়িয়ে। রাত্রি ওর খুব কাছের বন্ধু। যে কজনকে মনের কথা খুলে বলা যায়, রাত্রি তাদের অন্যতম। রিমি একটু দোনোমনো করলেও একসময় শঙ্খ কুড়িয়ে পাওয়া থেকে শুরু করে কালকের স্বপ্নের ঘটনাটা পুরোটাই বললো রাত্রিকে।
রাত্রি শুনে গম্ভীর হয়ে গেল। কেমন অদ্ভুত চোখে দেখতে লাগল রিমিকে। রিমির একটু অস্বস্তি হচ্ছিল।
খানিক পরে নীরবতা ভেঙে রাত্রি বললো "রিমি তুই খুব ভাগ্যবান রে! এরম ঘটনা খুব কম মানুষের সাথেই হয়। আগের জন্মে অনেক পূণ্য করেছিলি। এটা তারই ফল। আর আমার যতদূর মনে হচ্ছে ওটা একটা দিব্য শঙ্খ। ওটাকে সাবধানে রাখিস।"
রাত্রির এমনিতেই দেবদ্বিজে ভক্তি একটু বেশি। ওর সাথে সবসময় একটা বালগোপালের মূর্তি থাকে। ও যেখানেই থাক, সকালে উঠে তাকে পুজো করবেই। ফলে এই ঘটনায় ও যে এমন রিঅ্যাকশন দেবে সেটাই প্রত্যাশিত।
স্বপ্নে তো মানুষ কত কিছু দেখে! সব কিছুর কি আর সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব? কিন্তু শঙ্খটা কুড়িয়ে পাওয়ার দিনই অমন স্বপ্ন দেখায় রিমি ভাবে এই দুটোর মধ্যে কি আদৌ কোনো যোগসূত্র আছে? নাকি সবটাই ওর মনের ভুল?
"বাহ! কি সুন্দর রে! কোত্থেকে কিনলি? এটা কিন্তু আমি নেব।"
রিমি সত্যি কথাই বলল "এটাকে আমি সমুদ্রের ধরে কুড়িয়ে পেয়েছি।"
মা তো শুনে অবাক ,"আরে! সমুদ্রের ধারে তো ঝিনুক, শামুক পড়ে থাকে বলে শুনেছি। তা বলে আস্ত একটা শঙ্খ? সে যাই হোক। আমার ঠাকুর ঘরের শঙ্খটা অনেক পুরানো হয়ে গেছে। ভাবছিলাম নতুন একটা কিনব। যাই গিয়ে এটাকে ঠাকুরঘরে রেখে আসি।"এই বলে মা শঙ্খটাকে নিয়ে ঠাকুর ঘরে চলে যায়।
পরদিন রিমি কলেজ থেকে ফিরে ফ্রেশ হয়ে সবে খেতে বসেছে, মা ঘরে ঢুকলেন। মুখটা গম্ভীর। কিছুটা যেন উদ্বিগ্নও। উনি বলে ওঠেন "আজ ঠাকুরঘরে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে, জানিস রিমি।"
"কি হয়েছে?" রিমির অবাক জিজ্ঞাসা।
মা বলতে শুরু করলেন " অন্যদিনের মতোই পুজোর সময় শাঁখটা হাতে নিয়ে বাজাতে যাচ্ছি, হঠাৎ একটা চাপা কোলাহলের শব্দ কানে ভেসে এল। প্রথমে ভাবলাম বাইরের কোথাও আওয়াজ হচ্ছে বুঝি। কিন্তু খেয়াল করতে বুঝলাম যে আওয়াজটা শঙ্খের ভেতর থেকে আসছে। একটু কৌতুহল হল। ওটা কানে চেপে ধরলাম।
মনে হল কিছু লোক আকুল স্বরে যেন কাউকে ডাকছে। আচমকা কানে ভেসে এল সমুদ্রের জলোচ্ছাসের শব্দ। মনে হল আমার চারপাশে জল থইথই করছে আর আমি যেন ডুবে যাচ্ছি। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। শাঁখটাকে ঠাকুরঘরে রেখে নিচে নেমে আসি। মাথাটা কেমন ঘুরছিল। মুখে চোখে জল দিয়ে একটু স্বস্তি পেলাম। এটা কি হল বল তো রিমি? সবটাই কি আমার মনের ভুল?"
রিমি চমকে উঠল। ওর নিজের সেই স্বপ্নের কথা মনে পড়ল। শঙ্খটা কুড়িয়ে পাওয়া ইস্তক এসব কি ঘটছে? এটার সাথে ঘটে চলা ঘটনাগুলোর কোনো যোগসূত্র আছে কি? যদিও মুখে এসব কিছই প্রকাশ করল না। মাকে সব খুলে বললে উনি ঘাবড়ে যাবেন। টেনশনে পড়ে প্রেশার বেড়ে যাওয়াও বিচিত্র নয়।
তাই মা'র কথাটা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গিতে ও বলল "ধুর ওসব কিছু নয়। তোমার প্রেশারটা বোধহয় একটু বেড়েছে। তাই এসব ভুলভাল শুনছো।"
"তাই কি? কিন্তু এতটা ভুল শুনলাম। কি জানি। হবে হয়ত।" মা যেন কেমন দোলাচলে পড়ে চলে গেলেন।
পরদিন রিমি কলেজ থেকে ফিরেছে। মা টিফিন বানিয়ে রেখেছে। সেটা খেতে খেতেই ওর মাথায় ভাবনাটা আসে। ওকে নিজে একবার পরীক্ষা করে দেখবে? যেমন ভাবা তেমন কাজ।
মা শুয়ে পড়েছে। ও চুপিচুপি ঠাকুরঘরে যায়। একটু খুঁজতেই পেয়ে যায় শঙ্খটা। ওটা রাখা আছে একটা তাকের ওপর। ও কেমন দুরুদুরু বুকে এগিয়ে যায় শঙ্খটার দিকে। ওটা হাতে তুলে নেয়। তারপর ধীরে ধীরে মুখের কাছে আনতেই খুবই চাপা একটা গুঞ্জন যেন কানে আসে। তবে কান খাড়া করে না শুনলে এর অস্তিত্ব বোঝা যায়না।
ও ভাবল শঙ্খটা একবার বাজিয়ে দেখবে নাকি?
যেমন ভাবা তেমন কাজ। রিমি একটা গভীর শ্বাস নিয়ে সজোরে ফুঁ দিল শাঁখটায়।
ফুঁ দিতেই একটা অনাস্বাদিত অনুভূতির স্বাদ পেল রিমি। রোমাঞ্চে গায়ের রোম খাড়া হয়ে উঠল। ও স্পষ্ট শুনতে পেল চারপাশে জলোচ্ছ্বাসের শব্দ। তবে ধীরে ধীরে সেই শব্দ একসম়য় থেমে যায়। ওই চাপা গুঞ্জনও কমে আসে। আচমকাই নিস্তব্ধতা নেমে আসে। এক অদ্ভুত প্রশান্তি অনুভব করতে থাকে রিমি। হঠাৎ এক তীব্র জ্যোতির উন্মেষে চোখ ধাঁধিয়ে যায় ওর। মনে হল চারপাশে যেন সহস্র সূর্য প্রজ্বলিত হচ্ছে।
তার মধ্যে আবছায়া এক অবয়ব ক্রমশ প্রকট হতে থাকে যেন। কে ও? স্বপ্নে দেখা সেই অনিন্দ্যকান্তি পুরুষই কি আবির্ভূত হচ্ছেন?
জ্যোতির তেজ যেন কমেই বাড়ছে। রিমি আর সহ্য করতে পারেনা। চোখ বন্ধ করে ফেলে। চার পাঁচটা প্রচন্ড গরম হয়ে আছে গা পুড়ে যাচ্ছে যেন। একটু পরে অবশ্য সবকিছু স্বাভাবিক হয়ে ওঠে।
রিমির চোখ খুলে দেখে কোথায় কি? ও তো নিজের ঠাকুর ঘরেই দাঁড়িয়ে আছে। হাতে সেই শঙ্খ। রিমি বুঝল ও রীতিমত ঘেমে গেছে। কেমন ভয় ভয় করছিল। তড়িঘড়ি ও শাঁখটাকে ঠাকুরঘরের তাকে রেখে নিচে নেমে আসে।
বিছানায় শুয়ে রিমির ঘুম আসে না। ঠাকুরঘরের অদ্ভুত ঘটনাটার কথা ওর মনে পড়ছিল। ওই তীব্র জ্যোতির উৎস কি? মায়েরও কি একই রকম অনুভূতি হচ্ছিল? সেদিনের স্বপ্নের কথা মনে পড়লো ওর। তাহলে কি সত্যিই শাঁখটার মধ্যে কোনো অলৌকিক ব্যাপার আছে? নাকি পুরোটাই ওর মনের ভ্রম?যাই হোক, এসব ঘটনার পর থেকে রিমি অথবা ওর মা কেউই আর শঙ্খটা বাজাতে চাইত না।
কিছুদিন পরের কথা। মাঝরাতে হঠাৎ একটা আর্ত চিৎকারে রিমির ঘুম ভেঙে গেল। মা ওর পাশে শোয়। দেখল মাও উঠে বসেছে।
'কার চিৎকার বলতো?' মায়ের গলায় ভয়ের সুর। নিশুতি রাতে আচমকা এমন একটা চিৎকার শুনে রিমিও কেমন হকচকিয়ে গিয়েছিল। তারপর বাইরে কিছু লোকের আওয়াজ শুনে সাহসে ভর করে দরজাটা খুলল। দরজা খুলে অবাক হয়ে দেখে দাদা দাঁড়িয়ে। পাড়ার কিছু লোকও ওদের বাড়ির সামনে জড়ো হয়েছে।
জটলার মাঝখানে একটা লোক পড়ে কাতরাচ্ছে। লোকটার মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া চুল, মুখটা কাটা দাগে ভর্তি। দেখতে কেমন জেলখাটা আসামি টাইপের।
একটু খোঁজ নিতেই বেরিয়ে এল এক ভয়ানক তথ্য। লোকটা রিমিদির বাড়িতে চুরি করতে ঢুকেছিল। সবে কার্নিশে উঠছে, এমন সময় কে যেন ওকে ধাক্কা মেরে ফেলে দেয়। লোকটা কাউকে দেখতে পায়নি। তবে ও নাকি অদৃশ্য কারুর উপস্থিতি পরিষ্কার বুঝতে পেরেছিল। সে নাকি ওকে চড় থাপ্পড়ও মেরেছে।
'আবার বাজে কথা!" এই বলে জটলার মধ্যে থেকে কয়েকজন রে রে করে তেড়ে এল চোরটার দিকে। যদুবাবু হাত তুলে ওদের নিরস্ত করলেন। "আইন হাতে নিয়ে লাভ নেই। পুলিশকে আসতে দাও। ওরাই যা করার করবে।"
পুলিশ অবশ্য কিছুক্ষণের মধ্যেই এসে উপস্থিত হল। এসে উপস্থিত সকলকে আর রিমিদের রুটিন জিজ্ঞাসাবাদ করে আর চোরটাকে নিয়ে চলে যায়।
পুলিশ চলে যাবার পরে জটলায় আলোচনা চলতে থাকে। পাড়ায় চুরি ডাকাতি বেড়েই চলেছে, পুলিশ জেগে ঘুমোচ্ছে কিনা ইত্যাদি ইত্যাদি।
চোরটা ওরকম পড়ে না গেলে বাড়িতে আজ যে কি ঘটত ভেবেই বুক শুকিয়ে যাচ্ছে রিমিদের। কিন্তু লোকটা চড় মারার কথা বলছিল না? কে নাকি ওকে ধাক্কা মেরেছে?
"আরে দূর! নেশা করে এসে ভুলভাল বকছে। নেশার ঘোরে কার্নিশে উঠতে গিয়ে পা পিছলে পড়ে গেছে।" বাবা চোরটার কথার কোন পাত্তা দিতে চান না।
" এ তো একটা দাগি চোর। সে চুরির সময় কোনো বাড়িতে এরকম নেশা করে ঢুকবে? ও কি জানতো না যে ধরা পড়লে বেধড়ক মার খেতে হবে?" রিমি সংশয়ের সুরে বলে।
বাবা বলেন "আরে চোর বলে কি মানুষ নয় নাকি? দাগি অপরাধীদেরও তো কত ভুল হয়।"
কিন্তু রিমির মন থেকে খটকা কিছুতেই দূর হয় না।
চোরটা এরকম মিথ্যা কথা বলবে? নাকি এটা নিছকই একটা দুর্ঘটনা? রিমি কেমন বিশ্বাস অবিশ্বাসের একটা দোলাচলে দুলতে থাকে। মন বলছিল এক, কিন্তু যুক্তি বুদ্ধি তাতে কিছুতেই সায় দিতে চাইছিল না।
যাই হোক, একসময় উত্তেজনা থিতিয়ে এলে সবাই ব্যাপারটা নিয়ে আলোচনা করতে করতে বাড়ির পথ ধরে।
এর বেশ কিছুদিন পরের কথা। একদিন বিকেলে একটা চিঠি এল কুরিয়ারে। আচমকা কুরিয়ার আসাতে বাড়ির সবাই বেশ অবাক। কে কি পাঠালো ওদের? এরকম চিঠি বাড়িতে বড় একটা আসে না। বাবার সামনে কৌতূহলী রিমি চিঠিটা খুলেই ফেলল।
আরে! চিঠিটার ওপরের কোণে একটা অশোকস্তম্ভ। আর তার পাশে তো একটা সরকারি সংস্থার নাম। চিঠির প্রথম দু তিন লাইন পড়েই রিমি ব্যাপারটা বুঝে গেল। এটা একটা সরকারি সংস্থার অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার।
রিমির দাদা অশোক অনেকদিন ধরে চাকরির পরীক্ষায় বসছে। বেসরকারি চাকরিতেও বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউ দিয়েছে। কিন্তু কিছুতেই কিছু হচ্ছিল না। ও ক্রমে হতাশ হয়ে পড়েছিল। অবশেষে ভাগ্যদেবী বোধহয় মুখ তুলে চাইলেন।
রিমির চিৎকার শুনে দাদা বেরিয়ে আসে। তারপর তো দু ভাইবোন মিলে আনন্দে লাফালাফি জুড়ে দিল।
মা রান্না করছিলেন। চেঁচামেচি শুনে বাইরে এসে সব শুনে উনিও চোখের জল ধরে রাখতে পারলেন না। বিস্ময়, আনন্দে বাবাও কেমন স্থবির হয়ে গেছেন।
পরপর ঘটে চলা এইসব ঘটনাগুলো রিমির মনে গভীর রেখাপাত করেছিল। ও একদিন কলেজ থেকে ফিরে খেতে বসেছে, মা এসে পাশে বসে। মায়ের মুখ দেখে বোঝা যায় কিছু বলতে চাইছে।
"রিমি! তোকে একটা কথা বলার ছিল।"
"তুমি কি ওই শঙ্খটার ব্যাপারে কথা বলবে।"
"হ্যাঁ, আসলে যেসব ঘটে চলছে, তুই কি একবার মধুদার সাথে এ ব্যাপারে কথা বলবি?"
মধুদা ওরফে মাধব রায় হলেন মায়ের খুড়তুতো ভাই। পুরান, শাস্ত্রের ব্যাপারে ওনার অগাধ জ্ঞান। বেদ, বেদান্ত যেন গুলে খেয়েছেন। হ্যাঁ, মা সঠিক লোকের কথাই বলেছেন। উনিই এই শঙ্খের ব্যাপারে আলোকপাত করতে পারবেন।
উত্তর কলকাতার এক গলিতে পুরানো আমলের শরিকি বাড়িতে মাধবমামা একটা চাকরকে নিয়ে একাই থাকেন।
সেই কোন ছোটবেলায় রিমি এখানে এসেছিল আবছা মনে পড়ে ওর। বাইরের পলেস্তেরা খসে খসে পড়ছে।বাড়িতে ঢুকতেই একটা সোঁদা গন্ধ নাকে ভেসে আসে। এই লাল মেঝে, উঁচু উঁচু কড়িবর্গাওয়ালা ঘরগুলো সেই কোন যুগের স্মৃতি বহন করছে।
এই গুগল এর যুগেও মাধব রায় যেন সিধুজ্যাঠা। কথা বলে রিমি বুঝলো উনি যেন একটি জীবন্ত বিশ্বকোষ। সেই কোন ছোটবেলায় রিমিকে দেখেছিলেন। এতদিন পর রিমিকে রেখে খুশি হলেন।
"আয় আয়! কত বড় হয়ে গেছিস। তো এতদিন পরে মামাকে মনে পড়ল? কোন বিশেষ দরকার বুঝি?"
মামার কথায় রিমি লজ্জিত হয়ে ঘাড় নাড়ে। সত্যিই তো! সেই কবে এখানে এসেছে! আর আজ তো নিজের স্বার্থেই ও এসেছে।
রিমি ধীরে ধীরে সব কিছুই খুলে বলল। মানে সেই শঙ্খ কুড়িয়ে পাওয়া থেকে শুরু করে ওদের বাড়িতে ঘটে চলা অদ্ভুত ঘটনাগুলো অবধি।এমনকি ওর সেই স্বপ্ন, শঙ্খ বাজানোর সময়কার বিচিত্র অনুভূতি কিছুই গোপন করল না।
মাধববাবু বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর রিমির হাত থেকে শঙ্খটা নিয়ে ভালো করে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন। অদ্ভুত দৃষ্টিতে রিমির দিকে চেয়ে বললেন "তুমি খুব ভাগ্যবতী মা। তুমি জানো কি অসামান্য রত্ন তুমি কুড়িয়ে পেয়েছ?"
"তুমি পাঞ্চজন্যের নাম শুনেছো?"
রিমি একটু ভেবে বলল "মানে ওই মহাভারতের শ্রীকৃষ্ণ যে শঙ্খ.."
মাধব মামা ওর মুখের কথা কেড়ে বললেন "একদম ঠিক ধরেছ। এটি হলো বিষ্ণুর শঙ্খ। স্কন্দপুরান অনুযায়ী, পাঞ্চজন ছিলেন একজন দুষ্ট দৈত্য যিনি প্রভাস সাগরের গভীরতম গভীরে বিশাল শঙ্খের মধ্যে বাস করতেন। সমুদ্রমন্থনের সময় উদ্ভূত বিভিন্ন পদার্থের মধ্যে এটি একটি বলে উল্লেখ করা হয়। মহাভারত অনুসারে, পুরুষোত্তম বিষ্ণু বিশ্বকর্মা দ্বারা নির্মিত চক্রবন নামে পর্বতে পাঞ্চজন নামে একজন দৈত্যকে হত্যা করেছিলেন এবং পাঞ্চজন যে শঙ্খে বাস করত সেটি দখল করেছিলেন। দৈত্যের নামে শঙ্খের নামকরণ করা হয়েছে। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ এটি বাজিয়েই কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের সূচনা করেছিলেন।
এই দেবদুর্লভ জিনিস তুমি যে পেয়েছো তা তোমার কয়েক জন্মের তপস্যার ফল। শুধু তাই নয়, বহু জন্ম ধরে মানুষ যার দর্শনে উন্মুখ হয়ে থাকে সেই ঈশ্বরের দর্শন তুমি পেয়েছ। একি কম সৌভাগ্যের কথা? এরকম ভাগ্য পৃথিবীতে লাখে একজনের হয়।"
রিমি তো হতভম্ব। এসব কি বলছে মাধবমামা?
রিমির মুখের দিকে তাকিয়ে মাধববাবু একটু হাসেন। তারপর একটু থেমে আবার বলতে আরম্ভ করেন
"আসলে কি জানো! এ সবই হচ্ছে তোমার মায়ের জন্য। তোমার মা'কে তো আমি ছোটবেলা থেকেই চিনি!উনি একজন ধর্মপ্রাণা মহিলা। নারায়নের প্রতি তোমার মায়ের এই অগাধ, অচল ভক্তিতে তুষ্ট হয়েই ভগবান বোধহয় তোমাদের এই কৃপা করেছেন।"
রিমি যেন রাত্রির কথার পুনরাবৃত্তি শুনতে পারছিল মধুমামার মুখ থেকে। রিমির এমনিতে এসব অলৌকিক ঘটনায় বিশ্বাস নেই। কিন্তু শঙ্খটা পাওয়ার পর থেকেই ওদের বাড়িতে যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যাই বা কিভাবে করা যায়? সবই কি কাকতালীয়? আর সব থেকে বড় কথা ঠাকুর ঘরে ঢুকে শঙ্খটা হাতে নিয়ে যেরকম বিচিত্র অনুভূতি হয়েছিল সেটার কারণই বা কি?
রিমি মাধবমামাকে জিজ্ঞাসা করল "তাহলে এখন আমাদের কি করণীয়?"
মাধববাবু একটু গম্ভীর হয়ে মাথা নেড়ে বললেন "আমার মনে হয় যেখানকার জিনিস সেখানেই ফিরিয়ে দাও। এর থেকে তোমরা অনেক উপকার পেয়েছ। কিন্তু এসব দিব্য জিনিস বেশিদিন নিজেদের কাছে রাখা ঠিক নয়।"
রিমিও মনে করল সেটাই ঠিক হবে। যেসব কান্ড ঘটছে তাতে শঙ্খটা নিজেদের কাছে রাখা আর নিরাপদ বলে মনে করছিল না রিমিও।
বাড়ি ফিরে রিমি মাধবমামার সাথে হওয়া কথাবার্তা সব মাকে খুলে বলে। মা কিছুক্ষন চুপ করে থাকেন। তারপর বলেন "মাধব বোধহয় ঠিকই বলেছে রে! ঠাকুরের জিনিস তার কাছে ফিরিয়ে দেওয়াই ভালো। উনার অসীম কৃপা, তাই আমাদের এত দয়া করেছেন।" এই বলে মা ওপরের দিকে তাকিয়ে প্রণাম করেন।
বাবা এসব অলৌকিকে বিশ্বাস করেন না। উনি তাই রিমিকে জিজ্ঞেস করেন "তোরও কি মনে হয় এসব যা কিছু হচ্ছে সব ওই শঙ্খের জন্য?"
রিমি চুপ করে থাকে। কি বলবে ও? যেসব ঘটনা ঘটে চলেছে তার সাথে এই শঙ্খের সত্যিই কি কোনো যোগ আছে? অলৌকিকে বিশ্বাস না করলেও মাঝে মাঝে মানুষের জীবনে এমন সব ঘটনা ঘটে, যাতে বিশ্বাসের ভিত নড়ে যেতে বাধ্য।
যাবার দিন শঙ্খটাকে বুকে জড়িয়ে মা হাউ হাউ করে কেঁদে ফেললেন। বাবার চোখের কোণটাও কি চিকচিক করছে? দাদা অফিসে যাবার আগে শঙ্খটাকে একবার প্রণাম করে গেল।
শঙ্খটা হাতে নিয়ে রিমি ভাবল একবার পরখ করে দেখে। ও ওটাকে কানের কাছে নিয়ে এল। কিন্তু কোথায় সেই সমুদ্রের গর্জন?মানুষের চাপা কলরব? কিছুই তো শোনা যাচ্ছে না। মনে হচ্ছে এটা আর পাঁচটা শঙ্খের মতই সাধারন একটা শাঁখ। তাহলে কি মাধবমামার কথাই সত্যি? এর কাজ শেষ হয়ে গিয়েছে?
আবার সেই গোপালপুরের সী বিচ। তবে এবার আর রিমি বন্ধুদের সাথে নয়, বাবার সাথে এসেছে। সূর্য পাটে বসার উপক্রম করছে। বেশ জোরালো হওয়া বইছে সমুদ্রের দিক থেকে। মানুষজন ইতস্তত বসে আছে এদিক ওদিক। কেউ কেউ হেঁটে বেড়াচ্ছে।
যেখানে শঙ্খটা পাওয়া গেছিল রিমি সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়। বাবা একটু দূরে বসে আছেন। রিমি একটু এগিয়ে শঙ্খটাকে বালিতে রেখে পিছিয়ে আসে। দু হাত জড়ো করে চোখ বন্ধ করে। ভগবান বিষ্ণুকে স্মরণ করে মায়ের শেখানো নারায়ণ স্তব পাঠ করতে থাকে। অন্ধকার কেটে গিয়ে ধীরে ধীরে একটা জ্যোতি যেন প্রকট হতে থাকে। তার মধ্যে বরাভয় মুদ্রা হাতে কে দাঁড়িয়ে? একটু পরেই একটা প্রবল জলোচ্ছাসের শব্দে রিমির চটক ভাঙে। ও চোখ মেলে দেখে বিশাল একটা ঢেউ আছড়ে পড়েছে ওর পায়ে। স্রোতটা ধীরে ধীরে ফিরে গেল। রিমি তাকিয়ে দেখল শঙ্খটাও আর নেই।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।