প্রেমের স্বভাব বড় বিচিত্র। কখন কিভাবে আসে, কখন চলে যায় কেউ বলতে পারে না। যারা প্রেম করে বা প্রেমে পড়ে, তারাও না। আমি তো কোন ছার। সত্যি কথা বলতে কি, আমার প্রেম করার মুরোদ-ই ছিল না। আমি জানতাম, পকেটে অন্তত বাদাম ভাজা খাওয়ার পয়সা না থাকলে,পাখি ফুরুৎ। পাঁচ টাকা হাত খরচ নিয়ে হৃদয়দার দোকানে বড় জোর চা বিস্কুট হতে পারে, কারোর হৃদয়হরণ করা, নৈব নৈব চ।
হাঁ, যা বলছিলাম। সেটা স্বাধীনতার এক দশক পরের কথা। গ্রামের স্কুলে পড়াশুনা করেছি। অধিকাংশ লোকের ছিল দিন আনে, দিন খাই অবস্থা। সেখানে প্রেমের আবির্ভাব খুব একটা স্বাভাবিক ছিল না।
হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করার পর, ১৯৬৯ সালে সিউড়ি কলেজে ইংরেজি অনার্স নিয়ে ভর্তি হলাম। অনার্স সাবজেক্ট ছাড়া আরও দুটো বিষয় পড়তে হতো। আমার ছিল বাংলা ও সংস্কৃত। সংস্কৃতে একটা বই ছিল অভিজ্ঞান শকুন্তলম। দুষ্মন্ত-শকুন্তলার
প্রেম কাহিনী। পড়াতেন ডঃ সচ্চিদানন্দ মুখোপাধ্যায়। ফরসা মোটাসোটা চেহারা। মাথায় অল্প কিছু সাদা চুল। পরণে সাদা ধুতি পাঞ্জাবী। পায়ে পাম সু। বয়স ষাটের কাছাকাছি। বিশিষ্ট পন্ডিত। তবে একটু রাগী। পড়াতেন খুব ভালো। এক একটা শ্লোক পড়তেন, আর "ব্যঞ্জনা হচ্ছে" -- বলে শুরু করতেন তার ব্যাখ্যা।
প্রত্যেক শ্লোকের অন্তর্নিহিত বক্তব্য এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে বইটা পড়ার দরকার হত না। এইভাবে একদিন বোঝালেন প্রেমের দশ দশা কি কি----
১) চক্ষুঃপ্রীতি--চোখে চোখ পরা এবং ভালো লাগার শুরু।
২) মনঃসঙ্গম--মনের মধ্যে ভালো লাগা মানুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা ও তাকে ভাবতে থাকা।
৩) সংকল্প --প্রিয় মানুষকে কাছে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছা বা সংকল্প।
৪) চিন্তা --সারাক্ষণ সেই মানুষের চিন্তায় মগ্ন থাকা।
৫) গুণকীর্তন--প্রিয় মানুষের প্রশংসা ও গুণাবলী সর্বসমক্ষে তুলে ধরা।
৬) উদ্বেগ --প্রিয় মানুষকে হারিয়ে ফেলার আশংকায় অস্থির হওয়া।
৭) বিলাপ--তার বিরহে কান্না ও আক্ষেপ করা।
৮) প্রলাপ -- বিরহের তীব্রতায় মানসিক ভারসম্য হারানোর মত অবস্থা।
৯) ব্যগ্রতা--প্রিয় মানুষের সাথে মিলিত হওয়ার উদগ্র বাসনা /আকুলতা।
১০) মরণ-- তার চুড়ান্ত অনুপস্থিতিতে মৃতপ্রায় অবস্থা।
এইসব শুনে পিছনের বেঞ্চে কিছু ছেলে মেয়েকে ফিকফিক করে হাসতে দেখে ডঃ মুখার্জি রেগে গেলেন। "প্রেমের কথা শুনেই এই অবস্থা! আমি কি তোমাদের সঙ্গে রসিকতা করছি"--বলে এক ধমক।
কলেজে ঢুকে অনেক ছেলে মেয়ে অবাধ স্বাধীনতার স্বাদ পেয়ে যায়। কারো কারো পাখা গজাতে থাকে। কেউ প্রেমের কবিতা লেখে, কেউ সরাসরি প্রাকটিক্যাল ফিল্ডে নেমে পড়ে। তাই পরের তিন বছরে অনেককেই দেখলাম পটাপট প্রেমে পড়তে। আমাদের অনার্স ক্লাসে তিরিশ জনের মধ্যে ছিল সাতজন মেয়ে। একটি মেয়ে ছিল খুব ফর্সা, সুশ্রী, গোলগাল চেহারার। রক্ষণশীল পরিবারের বলেই মনে হত। সবার সঙ্গে মিশতে পারতো না। কথাবার্তা খুব কম বলতো।আর ছেলেদের মধ্যে ছিল প্রলয় মজুমদার (নাম পরিবর্তিত ), প্রায় ৬ ফুট লম্বা দোহারা চেহারা। এসেছিলো অন্য একটা কলেজ থেকে এক বছর লস্ করে। আমাদের থেকে বয়সে একটু বড়ই হবে। আমরা প্রলয়দা বলতাম।এসেই ছাত্র পরিষদের নেতাদের সঙ্গে ছাত্র রাজনীতি শুরু করলো। খুব ভালো বক্তৃতা করতে পারতো। আমরা ভাবতাম পড়াশুনা শেষে রাজনীতি করলে, ও ভালো পার্লামেন্টারিয়ান হবে। যাই হোক্, কিছু দিন পরেই বোঝা গেল সেই প্রলয়দা ঐ ললিতার প্রেমে পড়েছে। সেই খেলা চলল প্রায় দুবছর ধরে। কিন্তু ওদের কপাল খারাপ। পরিণতি হল মর্মান্তিক। আসলে ১৯৭০ এর দশকে বাংলা তথা বীরভূম ছিল নকশাল আন্দোলনের অন্যতম ঘাঁটি। তখন শ্রেণী শত্রু খতম শুরু হয়েছে। জোতদারদের সঙ্গে কংগ্রেসের নেতা কর্মীরাও তাদের টার্গেট। কংগ্রেসের যুব সংগঠন ছাত্র পরিষদ। অতএব তারাও বাদ গেল না। একদিন এক ছাত্র নেতা তার এক সঙ্গীকে নিয়ে সিনেমা দেখে রিকশা করে ফিরছিল। হল থেকে একটু দূরে একটা অন্ধকার জায়গায় তারা আক্রান্ত হয়। ভুলবশত নেতার জায়গায় তার সঙ্গী সমরেশ ছুরিকাহত হয়। হসপিটালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে।
এরপর ছাত্র নেতারা সতর্ক হয়ে চলতে লাগলো। প্রলয়দাও একদিন হস্টেল, একদিন বন্ধুর বাড়ি, অন্য দিন প্রেমিকার বাড়িতে রাত্রিবাস করতে লাগলো। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। প্রলয়দা, সেদিন কোনো কারণে সিউড়ির কাছেই তার গ্রামের বাড়িতে গেছিল। রাতে ফিরতে পারেনি। নকশাল নেতারাও হয়ত সুযোগের অপেক্ষায় ছিল। সেই রাতেই তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে একটা শুকনো পুকুরের মধ্যে ছুরি মেরে খুন করে পালালো। গ্রামের লোকেরা কোন সাহায্য করতে পারেনি। পরে ললিতার কি হয়েছিল জানা যায়নি।
আব্দুল হাসিম (নাম পরিবর্তিত) নামে আমাদের ব্যাচের আর একটি ছেলে, অন্য শাখার বৈশাখীর (নাম পরিবর্তিত) প্রেমে পড়ল। কলেজ, ইউনিভার্সিটি পর্যন্ত সেই পর্ব চলল। মেয়ের বাড়ি মেনে নেয়নি। অগত্যা বাড়ির অমতে বিয়ে করে কয়েক বছর সংসার করেছিল। তাদের কোন সন্তান হয়নি। দুজনেই রোগভোগে অল্প বয়সেই মারা যায়।
ইউনিভার্সিটিতেও সেই ধারা বজায় রইল। আমাদের ব্যাচের একজনের সঙ্গে সংস্কৃত ডিপার্টমেন্টের এক পাঠিকার প্রেমপর্ব চলল দুবছর। আমার তখন বন্ধুদের খুব চিঠি লেখার শখ ছিল। পুজোর ছুটিতে সেই বন্ধুকে পোষ্টকার্ডে চিঠি লিখে তার প্রেমপর্ব কেমন চলছে জানতে চাই। দুর্ভাগ্যক্রমে চিঠিটা তার বাবার হাতে পড়ে। পরিণতি সহজেই অনুমেয়। যথারীতি ছুটির পরে আমার নির্বুদ্ধিতার উপযুক্ত
পুরস্কার মেলে। যাই হোক, তাদের প্রেম পরিণয়ে রূপান্তরিত হয়, এখন তাদের সুখী পরিবার।
আর এক বন্ধু থাকতো আমাদের হোস্টেলে। রাজ কলেজের এক ছাত্রীকে ইংরেজি পড়াতো। Arms and the Man পড়াতে পড়াতে মেয়েটি তার প্রেমে পড়ে যায়। (নাটকটি এক পলাতক সৈনিক যে বাড়িতে আশ্রয় নেয়, সেই বাড়ির মেয়ের সঙ্গে তার প্রেমের গল্প)। দীর্ঘ এক চিঠি লিখে তার মনের কথা জানায়। ছেলেটির কোন ইন্টারেস্ট না থাকায়, সে কোন উত্তর দেয়নি। কয়েকমাস অপেক্ষায় থেকে মেয়েটি বিরক্ত হয়ে, তার এক পাড়াতুতো মস্তান দাদাকে নিয়ে ছেলেটিকে রাস্তায় ধরে। অনেক তর্কাতর্কির পর তার লেখা চিঠি উদ্ধার করে ছাড়ে। একতরফা প্রেমের সেখানেই ইতি।
আমি তখন পাটনা ব্রাঞ্চে। প্রবেশনের শেষ ব্রাঞ্চ। ব্রাঞ্চের উপরেই থাকার ব্যবস্থা। আমি ও তিন জন অফিসার ছিলাম তিন তলায়। চারতলায় থাকতেন ব্রাঞ্চ ম্যানেজার তার পরিবার নিয়ে। তার এক কিশোর ছেলে প্রেমে পড়ে যায়,এক মেয়ে প্রবেশনারের সঙ্গে। জানাজানি হতেই ব্রাঞ্চ ম্যানেজার তার প্রভাব খাটিয়ে মেয়েটিকে অন্য ব্রাঞ্চে বদলি করে নিশ্চিন্ত হয়।
আর একটি ঘটনার কথা বলে, প্রেমকাহিনী শেষ করবো। এ গল্পটিও চাকরি জীবনে। শুনে ছিলাম এক সহকর্মীর মুখে। সহকর্মী তখন বেনারসে এক SBBJ ব্রাঞ্চে ৬ মাস প্রবেশনে ছিল। তখন ব্যাংকে পার্টটাইম করণিক নেওয়া হত। সেই রকম এক মহিলা করণিক তার প্রেমে পড়ে যায়। সহকর্মীর তখনো চাকরি পাকা হয়নি। সে মা বাবার আপত্তি জানিয়ে মেয়েটির প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। পরে সে অন্য ব্রাঞ্চে গেলে মেয়েটির থেকে এক হুমকি চিঠি পায়, সে যদি তাকে স্বীকার না করে, সে (মেয়ে টি) গঙ্গায় ঝাঁপ দেবে। চিঠি পেয়ে ছেলেটির আত্মারাম খাঁচা। যাই হোক বড়দের পরামর্শে সে আর মেয়েটির সঙ্গে যোগাযোগ রাখেনি। পরিণতি কি হয়েছিল, সে খবরও সে জানতে পারে নি।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।