মুখোশের আড়ালে কে মানুষ আর কে নয় —তা কি সত্যি কেউ জানে?
"আমার নাম রিচার্ড, আর আপনার? এখানকার বাসিন্দা?"
"আমি ইলিনা গোমেস... "
“একদম এই প্র্যাকলির বাসিন্দা আমি, এই মাটির মধ্যেই মিশে আছে আমার অস্তিত্ব।”
“এই শহরটা তো হন্টেড! নানা মিথ ঘোরাফেরা করে এই শহর জুড়ে...”
একটা মৃদু হাসি হাসল ইলিনা। "ঠিকই শুনেছেন। এখানে মুখোশের আড়ালে কে মানুষ আর কে ভূত, তা কেউ জানে না। শোনা যায়, প্রতি হ্যালোইনে এখানে কেউ না কেউ শিকার হয়, আর তারপর তাদের রক্তের ফোঁটা এই মাটিতে পড়লেই তাদের আত্মা আর মুক্তি পায় না। কী ভয়ংকর, বলুন রিচার্ড!”
“কিন্তু এসব তো লোককথা, সত্যি কি?"
"সত্যি নয় বলছেন?"
দূরের একটা বাড়ির দিকে আঙুল তুলল ইলিনা। বাড়িরটার দিকে তাকালেই বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে ওঠে—ওটাকে বাড়ি না বলে ধ্বংসস্তূপ বললেই সঠিক বলা হয়।
"ওখানে থাকতেন মিসেস মেরি জোন্স। কয়েক বছর আগে আজকের দিনে নিজের প্রিয় বিড়ালটাকে খুঁজতে গিয়ে খুন হন উনি। মাথা কেটে খুন করে খুনি। সেই থেকে নাকি প্রতি রাতেই এখানেই ঘুরে বেড়ান নিজের কাটা মাথাটা হাতে নিয়ে! নিজের বিড়ালের খোঁজে।কিন্তু মানুষ ভাবে কী দারুণ হ্যালোইন মেকআপই না করেছেন... কিন্তু না, ওই যে বললাম, কে আসল আর কে প্রেত তা বোঝা কঠিন।"
এতক্ষণ বেশ মন দিয়ে শুনছিল রিচার্ড। এবার সে বলল, "আপনি এসব বিশ্বাস করেন কেন?"
"কেন করব না? আমি যে দেখেছি! একটু বেশি রাত অব্দি বসলে আপনিও দেখতে পাবেন।"
"ওই যে রাস্তার ধারে ওই অন্ধকার বাড়িটা দেখছেন, ওটা লিলি আর মিলির বাড়ি—দুই বোন। গত বছর দুজকেই খুন হতে হয়। গলা কেটে খুন করে ঝুলিয়ে দিয়েছিল দুজনকে পাশাপাশি গাছে। ওই যে দেখুন, ওখানে ওদের লাশ আজও ঝুলে আছে! আপনি বলবেন দারুণ ডেকোরেশন, কিন্তু না মশাই, ওটা ডেকোরেশন নয়, ওটা আসল! সামনে গিয়ে দেখুন ওদের পা দিয়ে রক্ত ঝরছে, এক ফোঁটা জিভে দিয়ে দেখুন রক্তের স্বাদ পাবেন।"—হেসে ফেলল ইলিনা।
রিচার্ডের এবার একটু ভয় পেল। কথা ঘোরাতে সে বলল, "আপনাকে কিন্তু এই ভূতের সাজে দারুণ মানিয়েছে! মুখে মাস্ক, হাতে ছুরি—ঠিক ওই সিরিয়াল কিলারের মতো।"
"তাই নাকি?
“একদম, সুন্দরী এক খুনির সমান! তা, আপনার মতো সুন্দরীর হাতে খুন হতে তো দারুণ লাগবে।"
"সত্যিই যদি তাই হয়..."
"মানে?" অবাক হলো রিচার্ড।
"মানে, কোথাও কি লেখা আছে খুনি কেবল পুরুষই হয়?"—হেসে উঠল ইলিনা।
রিচার্ডের দিকে তাকিয়ে সে আবার বলল, "খুনি সুন্দরিও তো হতে পারে, দেখুন যেমন আমি! জানেন তো রিচার্ড, প্রতি বছর এই প্র্যাকলিতে গণনা হয়—না, জনগণনা নয়, মৃতদেহের গণনা! এক রাতে কটি খুন হয়েছে, তার গণনা।"
ইলিনা দেখল, রিচার্ডের মুখটা যেন ধীরে ধীরে ভয়ে তার থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। উঠে দাঁড়াল রিচার্ড। ইলিনার সেই সুন্দর মুখে ফুটে ওঠা চরম হিংস্রভাব এখন আরও নির্মম দেখাচ্ছে। তার দিকে এক অদ্ভুত বীভৎস ভঙ্গিমায় তাকিয়ে আছে ইলিনা, যেন সুযোগ পেলেই তার বুক চিরে রক্ত পান করবে। পালানোর কথা ভাবতেই হেসে ফেলল ইলিনা।
"আরে আরে, ভয় পেলেন যে!"
খুব সাবলীল গলায় বলে উঠল ইলিনা। পিছন ফিরে দেখল রিচার্ড, ইলিনার মুখের সেই নির্মমভাব উধাও হয়ে সেখানে ফুটে উঠেছে মিষ্টি হাসি। সে ঘাড় কাত করে একটা আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে বলল, "আরে, আমি তো আপনাকে ভয় দেখাচ্ছিলাম! আজকের রাতে এটুকু মশকরা তো করাই যায়।"
ধপ করে বসে পড়ল রিচার্ড। ইলিনা এবার তার কাছে এগিয়ে এসে বলল, "আপনি তো ভীষণ নার্ভাস মানুষ মশাই! তবে আমার এমনটাই ভালো লাগে।"
কিন্তু রিচার্ড স্থির।
ইলিনা আবার বলল, "আরে, এই ছুরিতে একটুও ধার নেই, এটা নকল!"
একটু চুপ করে থেকে ইলিনার চোখের দিকে তাকাল রিচার্ড। কী সুন্দর ওর চোখ দুটো! যেন একটা শান্ত সমুদ্র, যেখানে ডুব দিতে ইচ্ছে করে।
ইলিনার খুব কাছে এগিয়ে এসে একদম চোখে চোখ রেখে রিচার্ড ফিসফিস করে বলে উঠল, "আপনি কিন্তু একটা কথা ভুল বলেছেন ইলিনা, আপনাকে কেউ বলেনি—আসলে যে খুন করে, সে মিশে থাকে সাধারণের মাঝেই। ঠিক যেমন আমি!"
চমকে উঠল ইলিনা। এইমাত্র তার দৃষ্টির আড়ালে একটা লম্বা ছুরি ঢুকে গেছে তার পেটে, আর সেখান থেকে গলগল করে রক্ত বেরিয়ে আসছে। যন্ত্রণায় কুঁকড়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল ইলিনা। কিছুক্ষণ ছটফট করে তারপর সব স্থির। তার দিকে তাকিয়ে পকেট থেকে একটা মাস্ক বের করে মুখে পরে নিল রিচার্ড। তারপর তার নিথর রক্তমাখা দেহটা তুলে নিল নিজের কাঁধে।
এগিয়ে চলল শহরের মাঝখান দিয়ে।
কিন্তু কেউ টের পেল না। কেউ বলল কী ভয়ংকর, আবার কেউ বলল কী ভালো মেকআপ! তারা কেউ জানলই না যে এইমাত্র মোস্ট ওয়ান্টেড সিরিয়াল কিলার মিশে গেছে তাদেরই মাঝে।
কারণ, সিরিয়াল কিলারের কোনো আসল রূপ হয় না।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।