ছোটবেলা থেকেই মাকড়সাকে ভয় সঞ্চারীর। বাড়ির সবাই হাজার চেষ্টা করেও এই ভয় দূর করতে পারে নি। কলেজে পড়ছে....তবুও সেই আতঙ্ক তার সারা মন জুড়ে। অনেকেরই থাকে এইরকম ফোবিয়া। কারো -- আরশোলা , কারো সাপে , কেউ বা আবার টিকটিকি। জগতে কতরকম ফোবিয়া আছে , শুনলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। বিরাট এক লিস্ট হয়ে যাবে।
সঞ্চারীরা থাকতো বাগনানে। ওদের বাড়িটা বেশ পুরোনো। সামনে আবার একটা পুকুর। ও এইজন্যে আরও ভয়ে সিঁটিয়ে থাকতো। বিশেষ করে বাথরুমে যেতে গেলে। ওর মায়ের কাজ ছিলো। মেয়ে বাথরুমে যাবার আগে ঝাঁটা হাতে টয়লেটে ঢুকে ভালোভাবে দেখা। কোথাও কোন মাকড়সা আছে কি না ?
সঞ্চারীর বারো বছরের ভাই রজত এই নিয়ে দিদিকে প্রায়ই ক্ষেপাতো। কিন্তু যারা এই রকম ভয়ের শিকার -- তাদের সাথে ভয়ের বস্তু নিয়ে কখনও ইয়ার্কি বা ভয় দেখানো উচিত নয়। এতে হিতে বিপরীত হতে পারে। ইদানিং সঞ্চারীর ভয়ের মাত্রা আরও বেড়েছে। খবরের কাগজে পড়েছে -- বাগনানে বিষাক্ত ট্যারান্টুলা মাকড়সা দেখা গেছে। সারা বাগনানে খবরটা ছড়িয়ে পড়েছে।
সঞ্চারী এতো ভয় পেয়ে গেছে -- ভীত স্বরে মাকে বললো।
"আমাকে কয়েকদিন মাসির বাড়িতে পাঠিয়ে দাও। " বাবা মা অনেক করে বোঝালো অবশেষে ঢোঁক গিললো ও ..। মেয়েটা যেন তটস্থ হয়ে রইলো সারাক্ষণ। চোখে এক ভয়ার্ত দৃষ্টি ! বাথরুমে যেতেও অনীহা। বাথরুমটা ওর কাছে যেন বৈদ্যুতিক চুল্লি। ওখানে ঢুকলেই সে মরে যাবে। মায়ের মনে এক অজানা আশংকা। পরবর্তী সময়ে মেয়েটা কি করবে কে জানে ?
সেদিন বিকেল থেকে হঠাৎ আকাশ কালো করে বৃষ্টি নামলো। কোথায় যেন একটা নিম্নচাপ হয়েছে। ওয়েদার কিছু সময়ের মধ্যে বদলে গেলো। গরম ভাবটা পরিবর্তন হয়ে ধরিত্রী শীতল হতে শুরু করলো। বৃষ্টি ভেজা বাতাস চারিধারে এক ঠান্ডার আমেজ নিয়ে এলো। রাত্রের খাবার একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নেওয়া হলো। এই কয়েকদিন গরমে কারো ঘুম ভালো হয়নি। সবাই চাইছে বিছানায় যেতে।
যে যার শুয়ে পড়েছে। সঞ্চারী নিজের ঘরে বসে কলেজের পড়া করছে। জানলার খোলা পাল্লা দিয়ে জলকণা ভর্তি বাতাস ঘরে ঢুকছে। বেশ আরাম লাগছে। সামনের পুকুরে একটানা বৃ্টি পড়ার শব্দ , কানে এক আবেশের সৃষ্টি করে চলেছে। দাদুর আমলের পুরোনো বাড়ি ওদের। উঁচু উঁচু কড়িকাঠ। লোহার গরাদ দেওয়া লম্বা লম্বা জানলা। সঞ্চারীর চোখেও ঘুম নেমে আসছে। বড়ো দেওয়াল ঘড়িতে দেখলো। এগারোটা বাজছে। একটা হাই তুলে ও বই বন্ধ করলো। ঘর থেকে বেরিয়ে দালানে এলো। ছোট একটা বাল্ব টিমটিম করে জ্বলছে। দালানের শেষ প্রান্তে বাথরুম। বাড়ির সবাই ঘুমে অচৈতন্য। সব কিছু নীরব নিশ্চুপ। শুধু বাইরে থেকে ভেসে আসছে বৃষ্টি পড়ার রিমঝিম শব্দ। আর ব্যাঙের ডাক।
বাথরুমের আলোর সুইচটা অন করে দু পাল্লার দরজাটায় হাত ছোঁয়াতে -- এক নিমেষে , গুগলে দেখা ট্যারান্টুলার ছবিটা দু চোখের সামনে ওর ভেসে উঠলো। সারা শরীরে একটা শিহরণ খেলে গেলো। যদি দরজা খুলে ভেতরে এক গাদা মাকড়সা দেখতে পায় ? কথাটা মনে হতেই সারা মুখে ভয় কামড়ে ধরলো। বাথরুমের কাঠের পাল্লাটা থেকে ও হাতটা দ্রুত সরিয়ে নিলো। যেন কোন অজগর -টজগর ছুঁয়ে ফেলেছে। পুরোনো ভয় সারা দেহে খেলা করতে শুরু করলো। .
এখন ও কি করবে ? মা- কে গিয়ে ডেকে তুলবে ? কিন্তু মা , সংসারের সারা রাজ্যের কাজ সেরে সবে ঘুমিয়েছে। ঠোঁটে ঠোঁট কামড়ে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করে সে। বাবার কথা মনে পড়লো। বাবা সেদিনও তাকে বুঝিয়েছে। -- দ্যাখ , ভয়-কে তুই যত ভয় করবি ! ভয় তোকে তত ভয় দেখাবে। ভয়-কে জয় করতে হবে। দু চোয়াল শক্ত করে গভীর শ্বাস নিলো সঞ্চারী। তারপর ধীরে ধীরে দরজার একটা পাল্লা খুললো !
বাথরুমের ভেতর হলদে আলোয় একটা আলো আঁধারি -র পরিবেশ। সঞ্চারীর চোখের সামনে ভেসে উঠলো , নোনা ধরা দেওয়ালে অজস্র মাকড়সা -র মেলা। ওর চোখ মুখে আতঙ্কের ঘন পর্দা নেমে এলো। কি বীভৎস , কুৎসিৎ বিভিন্ন রকমের মাকড়সাগুলো যেন ওর আগমনের অপেক্ষায় বসে আছে ! বুকটা ধড়ফড় করে উঠলো তার। গোলাপি ঠোঁটগুলো শুকিয়ে গেলো। দেহের স্নায়ু গুলো শিথিল লাগছে। আর্তনাদ করার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলো। পুঁথির দানার মতো মাকড়সার জ্বলজ্বলে চোখগুলো তাকে অসাড় করে দিয়েছে। শরীরের গ্রন্থিগুলো এলোমেলো ব্যবহার করতে শুরু করেছে।
বোধহয় এই দৃশ্য এক মিনিটের কম সময় ও দেখতে সমর্থ হয়েছে। তার মধ্যে শরীরের সাহস তলানিতে ঠেকেছে ! কাঁপা পায়ে বাথরুমের দরজার সামনে থেকে পিছু হটতে গিয়ে ওর মুখে বিস্ময় দেখা দিলো। -- কোথায় মাকড়সা ? পরিষ্কার দেওয়াল। ক্ষুদ্র একটা পোকাও নেই ! তাহলে কি তার দৃষ্টি বিভ্রম ঘটলো ? বাবার কথাগুলো মনে পড়লো। -- ওকে সাহস দেবার জন্যে বারবার বলে। ভয়কে জয় করতে শেখ। ভয় যত পাবি...ভয় তোকে আরও বেশি করে ভয় দেখাবে। কথাটা খানিকটা সত্যি। মনের সাহসটা ক্রমশ ফিরে এলো। একটু আগে ভয় পেয়ে সে , মা- কে ডাকতে যাচ্ছিলো ! ওরা এলে , নিজেই বোকা বনে যেতো। রজত আরও ক্ষ্যাপাত।
ও বাথরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করতেই --- চোখের সামনে সাক্ষাৎ মৃত্যুকে দেখতে পেলো। বাথরুমের দরজার ওপর একটা খয়েরি রঙের রোমশ মাকড়সা বসে আছে। বেশ বড়োসড়ো গোছের। সঞ্চারী এতক্ষণ যে সাহস সঞ্চয় করেছিল , তা এক লহমায় উড়ে গেলো। মাকড়সাটা থির থির করে কাঁপছে ! চোখের সামনে কোন বীভৎস আত্মা দেখলেও ও হয়তো এতো ভয় পেতো না ! সঞ্চারী বুঝতে পারছে -- এখান থেকে বেরোনো এক প্রকার অসম্ভব। কারণ দরজার ছিটকিনি খুলতে গেলে , ওই যমদূতের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। যা ওর পক্ষে কল্পনার অতীত। যেন , মাকড়সার জালে আটকে পড়া একটা নিরীহ মাছি !
ওর মস্তিস্ক কোন কাজ করছে না। শুধু বিস্ফারিত চোখে ওই পুরুষ্ট মাকড়সার কার্যকলাপ লক্ষ্য করে চলেছে। দেহের অনুভূতিগুলো এক যোগে তাকে ভয়ের সমুদ্রে নাকানি চোবানি খাওয়াচ্ছে ! শরীরের রক্ত চলাচল ক্রমশ কমে আসছে। সারা দেহে শিথিলতা গ্রাস করে চলেছে। মাকড়সাটা একটু একটু করে দরজার ছিটকিনি-র দিকে এগোচ্ছে। ওর মুক্তির পথ বন্ধ করতে। গলা শুকিয়ে কাঠ। মুখ থেকে একটু শব্দ বার করতেও সে ভয় পাচ্ছে। ওর আর্তনাদে চমকে গিয়ে যদি আটপেয়ে- টা সঞ্চারীর মুখে লাফিয়ে পড়ে ? সে ঘটনা ঘটার আগে অবশ্য তার হৃদপিন্ড ভয়াল আতঙ্কে বন্ধ হয়ে যাবে।
সে বেশ বুঝতে পারছে , এই বন্ধ বাথরুমে তার আজ জীবনের শেষ দিন। দরজা থেকে যতদূর সম্ভব সে দেওয়ালের দিকে সরে গেছে। এর ফলে নরকের কীট-টার থেকে দূরত্ব বেড়েছে। কিন্তু মুক্তি ? চেঁচামেচি করলে , যদি বাড়ির লোক শুনতে পেয়ে ছুটে আসে। তারপর ? তারা দরজায় ধাক্কা দেবে। তখন ওই কালান্তক যম দ্রুত গতিতে ছোটাছুটি করবে ! সঞ্চারী সেকথা ভাবনাতেও আনতে চায় না। ওর মুখের সমস্ত রক্ত উধাও হয়ে গিয়ে সাদা কাগজের মতো হয়ে গেছে। যে জন্যে বাথরুমে এসেছিলো , তা এখন সম্পুর্ণ ভুলে গেছে।
আচমকা বাথরুমের দরজায় বাইরে থেকে ধাক্কা পড়লো। হয়তো কেউ বাথরুম করতে এসেছে। এই ভয়টাই সঞ্চারী পাচ্ছিলো। আতঙ্কের চোখে সে দেখলো , ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মাকড়সাটা দরজা থেকে ঝুপ করে মেঝেতে পড়লো। ও জানে , এবার ওটা দৌড়ে তার কাছেই আসবে। অনেকক্ষণ উত্তেজনার সাগরে সঞ্চারী সাঁতার কাটছিলো। আর উত্তেজনা তার শরীর মেনে নিতে পারলো না। মাকড়সা দৌড় শুরু করার আগেই সঞ্চারী-র দু চোখে অন্ধকার নেমে এলো। ফুসফুসটা এক বিন্দু বাতাসের জন্যে হাহাকার করে উঠলো। যে চাপা আর্তনাদ গলায় আটকে ছিল, সেটা গলা চিরে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এলো। হাঁটু দুটো ভেঙে সে বাথরুমের জলে ভেজা মেঝেতে বসে পড়লো। বুঝতে পারছে ....সে জ্ঞান হারাচ্ছে।
জ্ঞান যখন ফিরলো তার , দেখলো বিছানায় শুয়ে আছে। খাটের চারপাশে বাড়ির সবার উদ্বিগ্ন মুখ গুলো। ঘরের জানলা দিয়ে দিনের আলো প্রবেশ করছে। চেয়ারে ডাক্তার বাবু বসে আছে। ওর জ্ঞান ফিরতে সকলের মুখে স্বস্তির ছায়া। শুধু ভাই রজত মুখ নিচু করে কাঁদো কাঁদো মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বাবা বলে উঠলো।
" তোর এই অবস্থার জন্যে আসল কালপ্রিট রজত ..। ওর বাঁদরামির জন্যে দরজা ভেঙে তোকে বার করতে হয়। সারা রাত ডাক্তারবাবু তোর জ্ঞান ফেরার জন্যে বসে আছেন। " ডাক্তার বক্সী উঠে দাঁড়ালো।
" চলি আমি। আপনারা আসল ঘটনা ওকে বলুন। তাহলে যদি ওর ফোবিয়া কাটে। " ডাক্তার চলে যাবার সাথে সাথে রজত দিদির পাশে বসে কান্না গলায় বললো।
" আমি আর কোনদিন এমন কাজ করবো না দিভাই। তুই আমাকে ক্ষমা করে দে। " সঞ্চারী অবাক চোখে দেখলো ...। রজতের হাতের দু আঙুলে ধরা রবারের মাকড়সাটা। যেটা নাকি ও বাথরুমের দরজায় চিপকে রেখেছিলো দিদিকে ভয় দেখাবার জন্যে।
রজতের চোখে জল দেখে সঞ্চারী- র মনে কষ্ট হলো। প্রথমে ভয় লাগলেও , পরে রবারের মাকড়সাটা নিজেই হাত দিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে - হেসে ফেললো। ইস , এই খেলনাটাই তাকে কত ভয় দেখিয়েছে। একটু যদি নজর করে দেখতো কাল রাতে , তাহলে এই অবস্থা হতো না। মা বলে উঠলো।
" কাল যদি তোর দিদির কিছু একটা হয়ে যেতো ...। " মায়ের রাগী মুখ দেখে, সঞ্চারী বলে ওঠে।
" ও এসব ভেবে করেছে নাকি ? আমিও তো যদি খেয়াল করে দেখতাম ! এখন দেখছি বাবা ঠিকই বলে। ভয় যত পাবো , ভয় তত বেশি ভয় দেখাবে। "
এরপর থেকে , সঞ্চারী মাকড়সা দেখে অত বেশি ভয় পেতো না। একটু গা শিরশির করতো বটে। তবে আগের মতো নয়।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।