শুক্রবার। পবিত্র জুমার দিন। এই দিনে নবীজির ওপর বেশি দরুদ পড়তে হয় — "আল্লাহুম্মা সাল্লি ওয়া সাল্লিম ওয়া বারিক আলা নাবিয়্যিনা মুহাম্মাদ।" সকালবেলা। আজ কোনো পড়াশোনা নেই , শুধু খেলাধুলা। আমি সাইকেল বের করে মাঠের দিকে রওনা দিলাম। যাবার পথে রফিক ও সফিককে সঙ্গে নিলাম। ফুটবলটা সোহাগ কাকুর বাড়ি থেকে আনলাম। মাঠে প্রথমে দুই-তিনজন খেলছিল, পরে সব খেলোয়াড় এসে যোগ দিল। ছোট-বড় মিলিয়ে খেলা চলছে। আমরা ছোট, তাই আমাদের খেলোয়াড় বেশি। কাকার বড় দল, তাই তাদের খেলোয়াড় কম। আমাদের কোচ মানিক ভাই বলল,

— ওই , আল্লাহর কসম! যদি আজকে খেলায় জিততে পারি, তাহলে দশ টাকা মসজিদে দান করব। (ইনশাআল্লাহ) সবার মনে জেতার অনুভূতি কাজ করছিল। আমাদের মাথায় চিন্তা — জিততেই হবে, না হলে ইজ্জত কমে যাবে। আর কাকার দল ভাবছে— হারলে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। ঝামেলা, তর্ক, তক্কাতক্কি — সবকিছুর পর ম্যাচ ড্র হল। শেষে পেনাল্টিতে আমরা এক গোলে জিতলাম। আমরা সবাই খুশিতে সিজদায় পড়ে গেলাম। জয়ের আনন্দ নিয়ে আমরা নদীর চরে গেলাম। কারোর হাত-পা ব্যথা করছে, কারোর পা ফুলেছে। লেবু ভাইয়ার ঠোঁট ফেটে গেছে। নদীর পানিতে সবাই কমবেশি ডুবে আছে। কারোর কাছে সাবান নেই। শরীরে অনেক ময়লা লেগে গেছে। হঠাৎ স্বপন ভাইয়া বলল,

— চল, সময় নেই। আজকে জুমার দিন, তাড়াতাড়ি মসজিদে যেতে হবে।

মানিক ভাইয়া বলল,

— চলো, বাড়িতে গিয়ে গোসলটা শেষ করে নেব।

আমি বললাম,

— ভাইয়া, আমার সাইকেলটা কোথায়?

মানিক ভাইয়া বলল,

— কি রে, সাইকেল আনিসনি?

আমি বললাম,

— না তো!

মানিক ভাইয়া বলল,

— দৌড় যা! সাইকেলটা আমের গাছের সঙ্গে হেলান দিয়ে রাখা আছে।

মাঠে গিয়ে সাইকেল খুঁজলাম, কিন্তু নেই! কে যেন নিয়ে গেছে। এবার আমি শেষ! আম্মুকে গিয়ে কি বলব! ঠিক তখন গ্রামের এক দাদু বলল,

— এই কাঁদিস না। তোর সাইকেল তোর জেঠাতো ভাই নিয়ে গেছে।

আমি এক দৌড়ে বাড়িতে গেলাম। দেখি বড় ভাইয়া সাইকেল নিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে।

ভাইয়া বলল,

— তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে আয়! মসজিদে যাবো, সময় নেই !

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই আম্মু বলল,

— কি রে, কোথায় গেছিলি ? নামাজ পড়তে যাবি না ? একদিনও আযানের আগে যাস না !

আমি পাঞ্জাবি-পায়জামা পরে, মাথায় টুপি দিয়ে সাইকেলের পেছনে বসে ভাইয়ার সঙ্গে মসজিদে গেলাম। দুই রাকাত সুন্নত নামাজ পড়ে হুজুরের বয়ান শুনতে শুরু করলাম।

হুজুরের বয়ানের মূল কথা ছিল—সব সময় আল্লাহর প্রশংসা করা এবং বিপদ-আপদে সর্বপ্রথম আল্লাহকে স্মরণ করা। দুই রাকাত ফরজ নামাজ শেষ হওয়ার পর হুজুর বললেন,

— আপনারা সবাই সুন্নত নামাজ পড়ে বসে থাকবেন। ইনশাআল্লাহ আজ মিষ্টিমুখ করানো হবে।

মজার বিষয় হলো, আজকে কেউ আগে উঠছিল না। সবাই ধীরে ধীরে সুন্নত নামাজ পড়ে বসে রইল। মসজিদের ভেতর তখন এক অন্যরকম আনন্দের পরিবেশ। কেউ বলছে, "উঠবেন না, বসে থাকেন।" কেউ আবার পেছন থেকে সামনে যাওয়ার চেষ্টা করছে। হঠাৎ খুরমো ঢালার শব্দ পেলাম।

মনের আনন্দ যেন পদ্মফুলের মতো ফুটে উঠল—কতদিন পর মসজিদে খাবার দিচ্ছে ! মসজিদের গেটের সামনে খুরমো বণ্টন শুরু হলো। সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে উঠে উনার কাছে গেল।

তিনি বলছিলেন,

— দেখেন, কেউ কিন্তু দুইবার নেবেন না!

আমি পাঁচটা খুরমা হাতে পেলাম। তারপর মসজিদের বাইরে এসে দাঁড়ালাম। ভাইয়ার হাতে অনেক খুরমা দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম,

— ভাইয়া, তুমি এতগুলো খুরমা কেমন করে পালে ?

ভাইয়া হাসতে হাসতে বলল,

— আরে বোকা ! আমি তো তিন-চারবার নিয়েছি!

ভাইয়ার কথা শুনে আমি কিছুক্ষণ চুপ করে সাইকেলের পেছনে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম—আংকেল তো বলেছিলেন, কেউ যেন দুইবার না নেয় । আমি ভাইয়াকে বললাম,

— ভাইয়া, আংকেল তো নিষেধ করেছিলেন। তাহলে তুমি এতবার নিলে কেন ?

ভাইয়া একটু লজ্জা পেল। তারপর হাসতে হাসতে বলল,

— আরে, সবাই তো নিচ্ছে !

আমি মনে মনে ভাবলাম—সবাই যদি ভুল করে, তাই বলে কি আমাকেও সেই ভুল করতে হবে?

সেদিন মসজিদ থেকে বের হয়ে আমি একটা কথা ভালোভাবে বুঝলাম—মসজিদের খাবার শুধু পেট ভরানোর জন্য নয়, বরং আমাদের শিখানোর জন্যও। সত্য কথা বলা, লোভ না করা এবং অন্যের হক নষ্ট না করা—এগুলোই একজন ভালো মানুষের গুণ।

খুরমা হাতে নিয়ে বাড়ির গেটে সাইকেল রেখে মনে মনে আল্লাহর কাছে দোয়া করলাম—

হে আল্লাহ, আমাদেরকে সৎ ও ভালো মানুষ হওয়ার তৌফিক দান করুন।