জ্যোতির বিয়ে। জ্যোতির অমতে জ্যোতিকে বিয়ে দিচ্ছে তার বাবা। এই বিয়েতে জ্যোতির মায়ের মত নেই। এমনকি এই বিয়েতে জ্যোতির দাদু-ঠাকুমা বা অন্য কোনো আত্মীয় স্বজনদের মত নেই। জ্যোতির বাবা একাই জোর করে জ্যোতিকে শুধুমাত্র মোটা টাকা পাওয়ার লোভে একজন মদখোরের সঙ্গে বিয়ে দিচ্ছে। যার সঙ্গে জ্যোতির বিয়ে হচ্ছে, তার নাম কিঙ্কর। কিঙ্কর জ্যোতির বাবার সাথে বসে একসঙ্গে মদ খায়। কিঙ্করের প্রচুর টাকা-পয়সা আছে। সে একটা কোম্পানিতে কাজ করে। তাই তার অঢেল টাকা। আর এই টাকার লোভ দেখিয়ে জ্যোতিকে বিয়ে করছে কিঙ্কর। এমনিতে কিঙ্করের চরিত্র ভালো নয়। বিভিন্ন বাজে মহিলাদের সঙ্গে কিঙ্করের চলাফেরা। তার ওপরে মদ খেয়ে নেশা করে কোথায় কখন পড়ে থাকে, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।

জ্যোতির বয়স সবে পনেরো। জ্যোতিরা পাঁচ ভাই-বোন। জ্যোতির চেয়ে বড়ো একটা দাদা আছে। জ্যোতি, তার পরেই। জ্যোতি দেখতে অপূর্ব সুন্দরী। লেখাপড়া শেখেনি। আসলে তার বাবা তাকে লেখাপড়া শেখাতে পারেনি। সারাদিন দিনমজুরি খেটে যে কটা টাকা রোজগার করে, তার বেশিরভাগটাই যায় মদের নেশায়। সংসারও ভালোভাবে চলে না। বাচ্চাদের জামাকাপড়ও দিতে পারে না। জ্যোতির ছোট ভাইটার বয়স তিন বছর। যেখানে অভাবের জন্য সে সারাটাদিন উলঙ্গ অবস্থায় ঘুরে বেড়ায়, পরনের পোশাক তার বাবা দিতে পারে না; সেখানে পড়াশোনা শেখানো তার বাবার কাছে বিলাসিতা মাত্র। এই অভাবের জন্যই কিঙ্করের দেওয়া প্রস্তাব জ্যোতির বাবা হাতছাড়া করেনি। কিঙ্কর যে পাত্র হিসেবে ভালো নয়, সেটা জ্যোতির বাবা ভালো করেই জানে।

বিয়ের দুইমাস যেতে না যেতেই জ্যোতি শ্বশুর বাড়ি থেকে পালিয়ে যায়। কারণ পনেরো বছরের মেয়ের পক্ষে সম্ভব হয়নি ৩৭ বছরের একজন লোকের পাশবিক অত্যাচার ও নির্যাতন সহ্য করা। কিঙ্কর তার শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য দিনের পর দিন অকথ্য অত্যাচার করতে থাকে জ্যোতির ওপর। জ্যোতির ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি কিঙ্কর। তাই অসহায় হয়ে জ্যোতি সেখান থেকে পালিয়ে আসে। কিন্তু বাপের বাড়িতে সে যায়নি। কারণ বাপের বাড়িতে গেলে সমাজের লোক তাকে সুস্থভাবে থাকতে দিত না। তাছাড়া জ্যোতির বাবাই হয়তো আবার জোর করে কিঙ্করের কাছে পাঠিয়ে দিত। তাই সে প্রাণ বাঁচাতে পাগলির ছদ্মবেশে ট্রেনে করে জঙ্গল মহলে মাসির বাড়ি চলে যায়। সেখানে মাসিকে সব কথা খুলে বলে। মাসি পরম স্নেহে তাকে বুকে স্থান দেয়। মাসির কোনো সন্তান না থাকায় জ্যোতি সেখান সন্তানস্নেহে দিন কাটাতে থাকে।

কিন্তু তার কপালে সুখ বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। জঙ্গল মহলে সর্বত্র ডাকাতের উপদ্রব দেখতে পাওয়া যায়। ফলে একরাতে জব্বর সিং তার দলবল নিয়ে এসে জ্যোতিকে তুলে নিয়ে যায়। সেইরাতে একের পর এক মোট নয়জন তার শরীরে পুরুষত্বের প্রমাণ রাখে। শুধুমাত্র একজন ডাকাত তাদের আটকানোর চেষ্টা করেছিল। জ্যোতির ওপরে যখন একের পর এক টর্নেডো, হ্যারিকেন তাদের বিষদাঁত ফুটিয়ে আনন্দ উপভোগ করছিল, সেই সময়ে আবছা চোখে জ্যোতি দেখেছিল — জ্যোতির জন্য সাগর সিং -এর অন্তর হাহাকার করছিল।

ডাকাত হওয়া সত্ত্বেও সাগর সিং -এর চোখে জ্যোতি দেখতে পেয়েছিল সহানুভূতিশীল আবেগ। ডাকাত সর্দার জ্যোতিকে তাদের দলে রেখে দেয়। আর দিনের পর দিন জ্যোতিকে দেওয়া হয়ে থাকে ডাকাতির ট্রেনিং। ট্রেনিং দেওয়ার দায়িত্ব গিয়ে পড়ে সাগর সিং -এর উপর। ফলে ট্রেনিং -এর সূত্রে দুজন দুজনের কাছে আসে, একে অপরকে বেশি করে জানার সুযোগ পায়। 

এতদিন পরে জ্যোতি যেন প্রকৃত ভালোবাসার মানুষকে খুঁজে পায়। কারণ আজ পর্যন্ত পৃথিবীর কেউ তার জন্য ভাবেনি, চোখের জল ফেলেনি। সাগর সিং জ্যোতিকে খুব ভালোবাসে ও যত্ন করে। জ্যোতি না খেলে সাগর সিং ও খায় না। জ্যোতির আনন্দে সাগর সিং মনে আনন্দ পায়। বহুদিনের কালো মেঘ কেটে গিয়ে জ্যোতির মনে সাদা মেঘের দল বেজায় খুশিতে খেলা করতে থাকে। বদ্ধ নদীটিও উচ্ছ্বল গতিতে বইতে থাকে। বর্ষার ময়ূর যেন ময়ূরীর কানে কানে বলে ওঠে — আমি শুধু তোমার, আমি তোমাকেই ভালোবাসি। কখনো দুজনে নির্জন অবস্থায় থাকলে তারা একে অপরের হাতে হাত রেখে স্বপ্ন দেখে — একটা ছোট সুখের ঘর বাঁধার। সাগর সিং বলে, "আমি তোমাকে বিয়ে করব। ডাকাতি ছেড়ে দেব। আমরা দুজনে জব্বর সিং -এর নাগাল পেরিয়ে চলে যাব অনেক অনেক দূরে। সেখানে আমরা একটা ঘর বানাব। সেখানে আমরা শান্তিতে বসবাস করবে।" জ্যোতি বলে, "ওটাই ভালো হবে গো। ওখানে আমাদেরকে কেউ চিনবে না। আমরা নতুন পৃথিবী গড়ে তুলব। আমাদের সুখের পৃথিবীতে একটা ছোট সন্তান তার কচি কচি পা নিয়ে হেঁটে বেড়াবে সারাদিন। আর আমরা দুজন অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকব তার দিকে। সে টলমল পায়ে দৌড়ে এসে আমাদের গালে এঁকে দেবে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদের ছোঁয়া।"

এদিকে জ্যোতি আর সাগর সিং -এর সম্পর্কের কথা তাদের দলের মধ্যে জানাজানি হয়ে যায়। দলের সর্দার জব্বর সিং জানায়, "এ বিয়ে তাদের হবে না।" একদিন চক্রান্ত করে সাগর সিংকে এই দুনিয়া থেকে সরিয়ে ফেলে। ফলে জ্যোতি আবার সাগরকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ে। যে জ্যোতি সাগরের চোখ দিয়ে পৃথিবীর সুখ দেখতে পেয়েছিল, সেই সাগরের মৃত্যুতে জ্যোতির যেন পৃথিবীটাই অন্ধকার হয়ে যায়। চারিদিকে হায়নার মতো পুরুষের তৈরি সমুদ্র থেকে উদ্ধার পেতে সাগর সিংই একমাত্র আশা-ভরসার সম্বল ছিল। জ্যোতি একেবারে অভাগা হয়ে পড়ে। অভাগা যেদিকে চায়, সাগর শুকায়ে যায়।