খগেন চক্রবর্তী, বাড়ি নবদ্বীপ বেনে পাড়া, পেশা যজমানি। ছিপছিপে অষ্টবক্র গড়ন, মুখশ্রী কালশিটে তুবড়ানো ভাতের হাঁড়ির পিছনটা যেমন। দৃষ্টি শকুনের চেয়েও দৃঢ়। যখন শিকার খুঁজতে বের হন, ঠোঁটের কোনে মিনষে হাসিটা গতিজাড্যেই রাখেন। মাত্র পাঁচশ টাকার বিনিময়ে পিণ্ড খান। এক কথায় অগ্রদানী ব্রাহ্মণ অর্থাৎ প্রেতোদ্দিষ্ট দান গ্রহণকারী পতিত ব্রাহ্মণ। লোকাল শ্মশানে অগ্রদানী ব্রাহ্মণদের খাতায় নিজের নামটাও ঢুকিয়েছেন সরকারি ভাতার জন্য। পাড়ার ছেলেপুলেরা পিণ্ডিখেকো ব্রাহ্মণ বলে টিটকিরিও মারে, যদিও তাতে উনার কিচ্ছুটি যায় আসে না। ব্রাহ্মণ ঠিকই, তবে ব্রহ্মজ্ঞান শূন্য। ছেলেবেলা থেকেই বখাটে। লেখাপড়া টেনেটুনে ঐ মাধ্যমিক। গাঁয়ের লোকে ভক্তিভরে ঠাকুরমশাইকে সচরাচর ডাকে না, নেহাত পুরোহিতের ক্রাইসিস না হ’লে। এখন বয়স বাহাত্তর, দিব্যি ফাজলামো করেই জীবনটা কাটিয়ে দিলেন। তবে ইনি যে সে পুরোহিত নয় বাপু, গাঁয়ে তিন তনটি শনি মন্দির প্রতিষ্ঠা করেছেন। আর ঐ তিনটি মন্দিরেরই ম্যানেজিং ডিরেক্টর স্বয়ং নিজে। স্বামী স্ত্রীর এক ফালি সংসার। নিজেই ঘটকালী ক’রে একমাত্র মেয়ের বিয়েও দিয়েছেন কৃষ্ণনগর নেদের পাড়ায়। স্ত্রী কমলাদেবী কেবল যে ঘর সংসারই করেন তা নয়, তিনি একজন নামী পেশাদার রুদালী। এমন শব্দ দূষিত মরাকান্না কাঁদবেন, বিদেহী আত্মা সাত প্রজন্মে ভুলেও ফ্ল্যাশব্যাকে আসবে না। আজ বিকেলেই সুদূর কলকাতার একটা বড় অর্ডার পেয়েছেন। শিয়ালদা শার্পেনটাইন লেনের সম্ভ্রান্ত কঞ্জুষ আড়তদার বিশু মিওিরের মা গতকাল মধ্যরাতে পরলোকের গাড়িতে চেপেছেন। বুড়ির শেষ ইচ্ছে ছিল, তাঁর এ দেহ যেন নবদ্বীপ মহাশ্মশানে দাহ করা হয়। মাত্র একশ বছর তিন মাস পনেরো দিনে পদার্পণ ক’রে বুড়ি চলে গেলেন মিওির পরিবারের সকলের মুখে হাসি ফুটিয়ে। এই তো দিন কয়েক আগেও মিওির পরিবারে দুঃখের ঘন কালো মেঘ নেমে এসেছিল, কী অভিশপ্ত ছিল সেই দিনটি। সেদিন বুড়ি প্রায় যায় যায়, সকলে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায়, নাতি পুতিরা সকলে মিলে প্রায় শ’দেড়েক শেলফী তোলা হয়ে গেছে, সেগুলো একের পর এক ফেসবুক, ইনষ্টাগ্রামে আপলোড চলছে। বড়দের মধ্যেও টানটান উত্তেজনা। ডাক্তার নৃপেন শীল বলেই গেছেন ম্যাক্সিমাম আর ঘণ্টা পাঁচেক। ভিজিট নেননি, ডেথ সার্টিফিকেট লিখে একবারে নেবেন। স্বর্গরথও এসে গেছে তাও ঘণ্টা দুয়েক হতে চলল। অপেক্ষার ধাক্কায় আর মশা মারতে মারতে ড্রাইভারের হাফ প্যাকেট বিড়িও প্রায় শেষ। একটা গুমোট ওয়েদার বাড়ির উঠোনে। হঠাৎ বুড়ি তাঁর এক নাতিকে চোখের ইশারায় কাছে ডাকল। নাতি ছুটে এসে বুড়ির কানের গোড়ায় মুখটা নামিয়ে অসহায় জিজ্ঞাসা, হ্যাঁ ঠাকুমা বলো। অ্যা, কী বললে? মাখা সন্দেশ খাবে? সকলের দিকে চেয়ে কান্না জড়ানো গলায় নাতি বলে, কেলো করেছে, ঠাকুমা তো এখন মাখা সন্দেশ খেতে চাইছে। ড্রাইভার স্বর্গরথের জানলা থেকে মুখটা ঈষৎ বাড়িয়ে বলে, বুড়ির শেষ ইচ্ছেটা চট জলদি মিটিয়ে দিন, তবে ঐ জল চাইলে দেবেন না যেন, তাহলেই খেল খতম। অথচ কী সাংঘাতিক কাণ্ড, দেখতে দেখতে প্রায় ঘণ্টা ছ’য়েক তো হয়েই গেল, বুড়ি এবার জল চাইছে। চোখের সামনে মুখে জল না দিয়ে কি সে দৃশ্য চোখে দেখা যায়? সন্দেশ ও জল খেয়ে বুড়ি এখন দিব্য পিটপিট করে চোখ নাচাচ্ছে। স্বর্গরথ জলপানির টাকা নিয়ে বুড়িকে মুখ খিস্তি করে ফিরে গেছে, ক্লান্ত আগাম শ্মশান যাত্রীরাও যে যার ঘরে ফিরেছে, যারা ফ্রী-তে ইসকন মন্দির দেখবে ব’লে কিলবিল করছিলো তারাও। সেদিনের মতো গেম পোস্টপণ্ড। শেষে কিনা ক্যাওড়াতলার এক অগ্রদানী ব্রাহ্মণ নিদেন দিলেন, এ বুড়ির জীবদ্দশায় শ্রাদ্ধ শান্তির আয়োজন করতে হবে, খরচ প্যাকেজে মাত্র কুড়ি হাজার। রেটিনা স্থির রেখে বিশু মিওির এক কথায় রাজি। চট জলদি আয়োজন, ইনভেস্টমেন্ট বিফলে যায়নি, যেমন কর্ম তেমন ফল। শ্রাদ্ধের মাত্র তিন দিনের মাথায় খেল খতম। সেদিন মধ্যরাত, সবার চোখে মুখে হাসির ঝলক, চারিদিকে ফোনাফোনি, মিওির বাড়িতে আজ যেন মহোৎসব। ক্যাওড়াতলার ব্রাহ্মণের দিব্যদৃষ্টির তারিফ করতেই হয়। আর তাঁরই আদেশে প্রেতাত্মা চিরতরে ভ্যানিস করতে কন্ট্রাক্ট করা হয় নবদ্বীপের স্বনামধন্য রুদালি শ্রীমতী কমলাদেবীর সাথে।
সেদিন পাড়ার চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যেই সবেমাত্র বেরিয়েছেন খগেনবাবু। সারাটা দিন চায়ের ঠেক গুলোয় আড্ডা দিয়েই খুচরো পূজো আছড়ার কাজ জোগাড় করেন, ফ্রিতে চা-টাও জুটিয়ে নেন। তবে ঐ শনিবার ক’রে তিনি যেন কোন মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির ম্যানেজিং ডিরেক্টর। পাড়ায় উনার শনি পুজায় একশ শতাংশ আস্থা। সেদিনের উঠতি সেয়ানা ইয়াং পুরোহিত নব শিকদার ছুটতে ছুটতে এসে একটা থলে হাতে এগিয়ে বলে, এটা ধরুন ঠাকুরমশাই, মা আপনাকে দিতে বলেছেন। চোখ গোল পাকিয়ে বকের মতো সরু গলাটা বাড়িয়ে খগেনবাবুর বিস্ময়ের জিজ্ঞাসা, তা এতে আছেটা কী? সাদাসিধে নব উত্তর দেয়, পুকুর বাগানের গাছের তাল, খুব মিষ্টি, কেটে শাঁস খাবেন। এ কী কাণ্ড, সাত সকালেই প্রাপ্তিযোগ। খগেনবাবুর চোখ থেকে যেন এক মুঠো অভ্র ঝরে পড়ল। ঝিকিমিকি দৃষ্টিতে নব বলে, আপনার আশীর্বাদেই গোপালের বাবার শ্রাদ্ধের কাজটা পেয়েছি ঠাকুরমশাই। অমনি খগেনবাবুর চোখ দু’টো নুইয়ে যায়। বিড়ির ধোঁয়া ঢোক গিলে বলেন, প্রথমে আমাকেই বলেছিল গোপাল। খুব হাতটান ওদের, তাই ফিরিয়ে দিয়েছি। থলের হ্যান্ডেল দু’টো দু’হাতে ফাঁক করে দেখলেন ভেতরে দু’টো প্রমাণ সাইজের তাল। মনে মনে বলেন, শালা অনামুখো শিকদার, কেসটা ঠিক হাতিয়ে নিয়েছে। আমাকে কী তালকানা ভেবেছে? এ দেখছি বাপেরও এককাঠি বাঁরা। থলেটা হাতে নিয়ে ফুলকি হেসে বিড়িতে একটা ধর্মটান মেরে সামনের পথ ধরলেন। তখনই পাশের বাড়ির উচ্চিংড়ে পল্টন ছুটতে ছুটতে এসে বলে, ঠাকুরমশাই শিগগির বাড়ি যান ঠাকুমা আপনাকে গরু খোঁজা খুঁজছে, কলকাতার কেস। পুরুত অমনি ইউ টার্ন। পল্টন পথ আটকে বলে, ভালো খবরটা দিলাম দু’টো টাকা দাও।
এই যে অনামুখো, আমি একটু গোবর আনতে বেরিয়েছি কি এসে দেখি তুমি হাওয়া। বলি শোনো, কলকাতার এক বুড়ি মরেছে, নবদ্বীপ ঘাটে আনছে। টাকার কথাটা ফাইনাল হ’লো না, যা একখান মরণদশা ফোন। আজ এক হপ্তা হতে চলল, কোন কাজ জোটাতে পারোনি, অকোম্মার ঢেঁকি একটা। গোপালের বাবার কাজটাতো নব হাতিয়ে নিয়েছে, বলি সে খবর কি রাখো? আ’ মরণ, এ ব্যাগে আবার কী? কলকাতার কেস শুনে খগেনবাবুর চোখ থেকে এবার সোনা ঝরছে। কালো কোদালের মত দাঁত ক’খান বার করে বলেন, ওহে গিন্নি সে খবরটা পেলাম বলেই তো নবর থেকে এই ভেট। এবার এই তাল দু’খান কাটার ব্যবস্থা করো দিকি। বিস্ময়ে কমলাদেবীর চোখ কপালে, ও মা, নব দিলো? কিন্তু তাল কাটার মতো তেমন ধারালো দা-কাটারি আমাদের নেই গো। ও তুমি যা পারো করো।
পঞ্চাশ বছর বয়সী দাও-টা নিয়ে বুড়ো নিজেই ময়দানে নামলেন। একটা তালকে কুপিয়ে কুপিয়ে থেঁতো করে বেতাল বানিয়ে ছাড়লেন। খত খত শব্দ শুনে গিন্নি ছুটে এসে বলে, এই ভোঁতা দাও আর থেঁতো বুদ্ধি নিয়ে কি সুষ্ট ভাবে কোন কাম সম্ভব? আমি না দেখলে তো ঐ তালটারও একই হাল করে ছাড়তে। বলি, যদি শাঁস খেতেই হয় তো ওটাকে নিয়ে গিয়ে বাজার থেকে কাটিয়ে আনো। আর শোনো তোমার কিছু কাজও আছে, ব্রাহ্মণ ভাতার পেছনে এবার একটু ছোটাছুটি করো বুঝলে। মাসে হাজার টাকা ব’লে কথা। দু-খান পাসপোর্ট ছবি চেয়েছে শ্মশানে। আগে গজেনের দোকানে ছবি তুলে তারপর তাল কাটিয়ে বাড়ি ফিরবে। ও হ্যাঁ, শ্মশান থেকে বলেছে কী একটা ফরম ফিলাপ করতে হবে, ঐ যে সাইবাবার ক্যাফে না কি বলে, ওখানে গিয়ে। কী হ’লো, এমন ড্যাবড্যাব করে চেয়ে আছো যে, কথাগুলো কানে গেল কী?
তা বাবা গজেন তোমরা সকালে চা-টা খেয়েছো তো? সে তো সারাদিন চলতেই থাকে পুরুতমশাই। কিন্তু আপনি হঠাৎ কী মনে করে? যা বলার জলদি বলেন, গোপালের বাবার ছবিটা আজকের মধ্যেই ডেলিভারি দিতে হবে, আর্জেন্ট কেস। খগেনবাবুর মনটা দুম ক’রে গুমরে গেল। মনিটরের দিকে হেলে গোপালের বাবার ছবিটা এক ঝলক দেখে আনমনা হ’য়ে বলেন, আমার দুইখান পাসপোর্ট ছবি লাগবে। চোখ দু’টো উপরের দিকে তুলে গুরুগম্ভীর গজেন বলে, ছোট বড় মিলিয়ে মোট নয়টা ছবি পাবেন, ষাট টাকা পড়বে, এখন চাইলে এখনই হাতে গরম পাবেন। গোপালের বাবার ছবিটা দ্যাখার পর থেকেই কেমন যেন মুষড়ে গেছেন পুরুতমশাই। গজেনের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল চেয়ে কোনরূপ দরাদরি না করে ঈষৎ ঘাড়টা হ্যালান। ছবি তুলে তালে গোলে তালের ব্যাগটা ঐ ঘরের কোনায় ফেলে বেরিয়ে যান। মেজাজটা খিটখিটে হয়েই বোধহয় এই ভুল। পা দু’টোই কেবল হাঁটছে, শরীর যেন আর এগোচ্ছে না, তিনি থমকে আছেন গোপালের বাবার ছবিতে।
বাড়ির উঠোনে চরণ রাখতেই, একি এতো ঘামছো কেনো, শরীর খারাপ লাগছে? কমলাদেবী খগেনবাবুকে বগল পাঁজা ক’রে ঘরে তোলেন। ল্যাকপ্যাকে খাটটায় বসতে বসতে খগেনবাবু বলেন, না তেমন কিছু নয়, পাখাটা একটু চালিয়ে দাও তো গিন্নি। দু-ঢোক জল গলায় ঢেলে চোখটা বন্ধ রেখেই বলেন, হ্যাঁ, এই তো এবার একটু ভালো লাগছে। কমলাদেবী হাত দু’টো কপালে ঠেকিয়ে, যাক বাবা, কিন্তু তোমার সেই তালের ব্যাগটা দেখছি নাতো? অমনি খগেনবাবুর কপালে হাত। এই যাহ, ব্যাগটা গজেনের দোকানে। ব্যাতিব্যাস্ত গিন্নি বলে, শিগগির যাও তবে, হে ঠাকুর কি এক তালকানা মানুষের গলায় ঝুলেছি গো। খগেনবাবু কিছুক্ষণ থমকে থেকে, নাহ ও তাল অভিশাপের, আর স্পর্শ করবো না। শালা নবটা কতবড় ধড়িবাজ। বুঝলে গিন্নি, কথায় বলে হিংসের গাছ দ্রুত বাড়ে।
দিন দুয়েক পর গজেনের কর্মচারী ভজার চোখ পড়ে ঐ তালে। গজেনদা এ তাল কার? চোখ মুখ বেঁকিয়ে গজেন বলে, তাল? জানিনা তো, কেউ তো খোঁজও করেনি। থাকনা পড়ে, নয়তো কেটে খেয়ে নে। তবে এ ব্যাগটা তো দু’দিন ধরেই এখানে দেখছি মনে হচ্ছে। আরও দিন তিনেক তাল দুটি উক্ত স্থানেই থলেতে ঝিমচ্ছে। ভজা বলে, গজেনদা এ তাল তো কেউ নিতে এলোনা। আমার মা কাল বলছিল কেউ ইচ্ছে করে রেখে যায়নি তো? আজকাল তোমার দোকানের ওপর আবার অনেকের নজর পড়েছে। এ তাল অভিশাপের নয় তো? গজেনের চোখ কপালে, কী ফালতু বকছিস? ব্যাগটা ধরে ছুঁড়ে ফেলে দে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে গজেন বলে, আর কিছু বলেছে তোর মা? ভজা এগিয়ে এসে ফিসফিসিয়ে বলে, বলেছে তো, মা বামুনের ঘরের মেয়ে। বলছিল যদি তাই হয়, তবে এ তাল বেতাল কাণ্ড ঘটিয়ে ছাড়বে কিন্তু। মা নিদেনও দিয়েছে, কোনো অগ্রদানী পুরুত দিয়ে যজ্ঞ করতে হবে, তালের পিণ্ড খেয়ে ঐ যজ্ঞের আগুনেই তালটাকে পুড়িয়ে ভস্ম করতে হবে। গজেনের মাথায় হাত, সে তো অনেক খরচ রে। চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে বলে, তুই এক কাজ কর, এই সাত সকালে এখনো কেউ দোকান খোলেনি, একটু সিঁদুর মাখিয়ে তাল দু’টো জগার শাটারের সামনে রেখে আয়, দেখিস কেউ যেন না দ্যাখে।
ক্ষণিক পর জগা দোকান খুলতে এসে চক্ষুস্থির। গজেন, এই গজেন এ তাল দু’টো কোত্থেকে এলো রে? গজেনের সটান উত্তর, তাল, আমি কি ক’রে বলবো? এই তো সবে দোকান খুললাম। এগিয়ে এসে কী কেস বলতো জগা, এ তো দেখছি আবার সিঁদুর মাখানো। তোর দোকানের ওপর ফের কেউ নজর টজর দিলো নাতো? চোখ কপালে তুলে জগা বলে, কী যা তা বলছিস? সক্কাল সক্কাল কী যে সব ঝক্কি ঝামেলা। শালা দু’দিন ধরে এমনিতেই বিক্রি বাট্টা কম। শোন গজেন, আমি এখনো শাটার খুলিনি, এক কাজ করি, তাল দু’টোকে তারকের দোকানের সামনে ফেলে আসি, ও ব্যাটা চা আনতে গেছে। গো বেচারা তাল দু’টো এভাবেই গোটা দিনভর পুরো মার্কেট চরকি মেরে ক্লান্ত। কে কার দোকানের গোঁড়ায় রেখেছে এই নিয়ে দোকানদারদের অন্তরদ্বন্দ্ব পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রিতে। এবার হাতাহাতির উপক্রম। এবার এ তালের কিছু একটা হিল্লে করতেই হবে, নয়তো মার্কেট শুদ্ধ সবার ব্যবসা লাটে। ততক্ষণে বাজার চত্বরে রটেও গেছে অশুভ তালের অদৃষ্ট শক্তির নানান রোমহর্ষক গল্প। খদ্দেরের আনাগোনাও কমছে। কেউ আবার অনিচ্ছাসত্ত্বেও তালের দিকে দৃষ্টি গেলেই স্নেক বাইটের মতো ঘাড় ঘুরিয়ে নিচ্ছে। কী সাংঘাতিক অদৃশ্য শক্তি। অনাথ তাল দু’টোই এখন ব্রেকিং নিউজ। ক্রমশ ভয়াবহ মেঘে ছেয়ে যাচ্ছে চৌহদ্দি। মার্কেটের প্রেসিডেন্ট বিকেলেই ইমারজেন্সি মিটিং কল করেন। মিটিং এর সমাপ্তিতে প্রেসিডেন্টের শেষ কথা, সকল সভ্য বিচক্ষণ সদস্যদের সমবেত মতামতকে মান্যতা দিয়ে, সভায় উপস্থিত সকল সদস্যদের সম্মতিক্রমে ব্যবসার দুর্দিন ঘোচাতে এবং অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটাতে দ্রুত কোন পিণ্ড ভক্ষণকারী অগ্রদানী ব্রাহ্মণ ডেকে যজ্ঞের আগুনে তাল দু’টিকে ভস্ম করতে যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় হবে, প্রত্যেক দোকানদারদের সমান হারে কন্ট্রিবিউট করতে অণুরোধ রাখছি। নিরীহ তাল দু’টোর মৃত্যুর ঘণ্টা চালু। সকলের চোখে মুখে হালকা স্বস্তির কিরণ। মিটিং থেকে লাফিয়ে বেরিয়েই গজেনের চিল চিৎকার, ভজা’রে শিগগির পিণ্ডি খেকো খগেন পুরুতকে খবর দে।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।