চৈতন্যবাটী নামের এই গ্রামটি ছিল আমাদের গ্রামের পাশে। এটি সবুজ গাছ আর পুকুরে ভরা ছিল। পাশ দিয়ে নদ বয়ে যায়। আর সেই গ্রামের বাস স্ট্যান্ড ও রেল স্টেশনের খুব কাছে একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছিল। এটির এক দিকে ছিল বাস স্ট্যান্ড ও অন্য দিকে ছিল রেল স্টেশন। মাঝখানে এটি - একটি গ্রামীণ সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র । প্রায় ১১-১২ কিলোমিটারের মধ্যে এই একটিই স্বাস্থ্য কেন্দ্র ছিল, আর অন্য কোনো স্বাস্থ্য কেন্দ্র সেখানে তখন ছিল না। হ্যাঁ - এটি কি করে এখানে হল? বলি তাহলে -
এখানকার পুরোনো বনেদী রাজবাড়ির একটা অংশ হাসপাতালের জন্য দান করে দিয়েছিলেন রাজবাড়ির বর্তমান বংশধররা - আর সেইটাই হল এইটা। সেই রাজ বংশের মানুষেরা এ দেশে মাঝে মধ্যে আসেন। তাঁরা আমেরিকায় থাকেন। অনেকেই ওনারা আবার ডাক্তার। আর সে দেশেও ওনাদের নিজেদের নার্সিং হোম আছে।
স্বাস্থ্য কেন্দ্রটি যেহেতু পুরোনো রাজবাড়ীর অংশ,
তাই ডাক্তারদের কোয়ার্টার , মেটারনিটি ওয়ার্ড, এমারজেন্সি সবকিছুর জন্য বিশাল বিশাল ঘর ছিল। ওয়াসরুমের সাইজও ছিল খুবই বড়। কিন্তু গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্র হওয়ার দরুন পরিষেবা খুব একটা উন্নত ছিল না, সোনোগ্রাফি করাতে হলেও ছুটতে হত বহু দূরে, সেই কলকাতায়।
আর সেই হাসপাতালের মেটারনিটি ওয়ার্ড এ ভরতি ছিল আমার বান্ধবীর এক আত্মীয়া, তার বিবাহিতা দিদি। তার নাম ছিল শৈবা। তার সাথে আমার আলাপ বছর ছয়েক আগে। তার বিয়ের অনুষ্ঠানে। বরের নাম ছিল কৌস্তুভ, সে মিউনিসিপ্যালিটিতে জব করত। আমাদের গ্রামেই তার বাড়ি ছিল। আর বউয়ের নাম ছিল - শৈবা। শৈবা দূরে কোথাও থাকত। জব করত। তাই দিব্যার মুখে তার নাম শুনলেও আলাপ ছিল না। এই প্রথম পরিচয় হল।
মাঘ মাসের রাত - সাড়ে বারোটা নাগাদ আমি, সিনেমা দেখা শেষ করে তারপর ডিনার করেছিলাম। তো খেয়ে দেয়ে উঠে আঁচাচ্ছি, শীতে কাতর আমি তখন - এমন সময়, আমার বান্ধবী - দিব্যা এসে ডাক দিয়েছিল, "অঞ্জু! অ্যাই অঞ্জু! শোন! দিদির যন্ত্রণা শুরু হয়েছে.....শিগগির চল!"
অত রাত, তার ওপরে শীত কাল, গ্রামের মধ্যে কোন গাড়ি পাওয়া যায় নি। তাই ভ্যান রিক্সায় করে কৌস্তুভদা আর আমরা দু-জন মিলে দিদিকে নিয়ে হাসপাতাল পৌঁছালাম। সঙ্গে সঙ্গে ডাক্তারবাবু চেক আপ করে বললেন "ভর্তি করে দিন, যদিও লেবার পেন নয়, তাও - রিস্ক নিয়ে লাভ নেই।"
সুতরাং দিদি ওষুধ খেয়ে - গায়ে ঢাকা দিয়ে নাক ডাকিয়ে ঘুমাতে শুরু করে দিল। আর আমরা তিনজন হাসপাতালের বারান্দায় পাতা বেঞ্চে বসে বসে ঢুলতে লাগলাম। এমন সময় না ঢুলে দিব্যা তার ফোন খুলল। এক মনে তার মোবাইল ফোনে চেস খেলতে শুরু করল। সে তো আর ঘাড় তুলছেই না। এমন সময় আমি আমার অনেক দূরে থাকা, বৈজ্ঞানিক, অর্বাচীন বয়ফ্রেনডটাকে ফোন করব কিনা ভাবছি। কারণ আমার এখানে এখন গভীর রাত হলেও তার ওখানে এখন ভর দুপুর বেলা। হয় তো গবেষণাগারে আছে। দেখি একটু - কথা বলি। আমার চোখ বুজে আসছে। আর কৌস্তভদা গালে হাত দিয়ে বসে বসে আকাশ পাতাল ভেবেই চলেছে। মাঝে মধ্যেই আবার ঢুলে পড়ছে।
হাসপাতালের কোথাও একটা পুরনো ঘড়ি আছে - ' ঢং ঢং' শব্দে সেটা সময় জানান দিয়ে দিল ...... শব্দটার রেশ কাটতে বেশ একটু সময় লাগল। এখন আবার সেই আগের মতই ঝিঁঝিঁ পোকার এক নাগাড়ে ডেকে যাওয়া। এ ছাড়া আর কোনও আওয়াজ নেই। পাশেই মেন রোড - আমরা যত ক্ষণ সেখানে বসে তত ক্ষণ পর্যন্ত সেই রাস্তা দিয়ে তিনটি গাড়ি গিয়েছে কিনা সন্দেহ। লোক জন তো নেইই। মাঝে মধ্যে দু একটা বাদুড় ডানায় ও মুখে শব্দ করে এদিক থেকে ওদিক উড়ে যাচ্ছে।
"পেশেনটের বাড়ির লোক কে আছেন?" খ্যানখ্যানে গলায় চমকে উঠলাম তিনজনেই । দরজার মুখে বয়স্কা হেড নার্সটি দাঁড়িয়ে, বড় বড় গোল গোল চোখে দেখে, বললেন। সাদা পোশাক। মোটা দেহ। ফর্সা। "ফর্মটা কে ভরবেন? ভরে দিন জলদি!" কৌস্তুভদা হাত বাড়ান - "দিন!" উনি ফর্ম এগিয়ে দিয়ে বলেন "ফর্ম ভরে সবাই বাড়ি চলে যান! আর কেউ থাকতে চাইলে বাইরের চায়ের দোকানে বসুন! হাসপাতাল চত্বরে বসবেন না!" হ্যাঁ, এই চায়ের দোকানটা সারা রাতই খোলা থাকে। শীতকালে যারা এই রাস্তা দিয়ে যাওয়া আসা করে তারা ও যারা হাসপাতালে আসে ও কাজ করে, তারা খায়, তাই।
নার্সের গলার স্বরটা বড্ড অস্বস্তিকর।
"কেন? হাসপাতালের ভিতরে বসা যাবে না কেন? কৌস্তুভদা রেগে যান।
"দেখুন স্যার! মেয়ে দু জনকে মেটারনিটিতে জায়গা দিতে পারি, আপনি এখানে বসবেন না! আমি আপনার মায়ের বয়সী হব, আমার কথাটা শুনুন!" যদিও সে গলায় মাতৃস্নেহের ছিটেফোঁটা ছিল না, তবু এমন কথা শুনলে আর রাগ হলেও মুখের উপরে কিছু বলা যায় না।
কৌস্তুভদা স্বর নরম করেন "আরেকটু বসি?"
-"দশমিনিট" ..... কৌস্তভদার ভরে দেওয়া ফর্মটা হাতে নিয়ে উনি ভিতরে চলে যান।
“কৌস্তভদা তুমি বাড়ি চলে যাও বরং, আমরা তো আছি, দরকার হলে ফোন করে নেব....” দিব্যা ওর জামাইবাবুকে এই নামেই ডাকে। কাকিমা মানে কৌস্তভদার মা মারা যাওয়ার পরে কৌস্তভদা আর ওর বাবা, দিব্যাদের বাড়িতে ভাড়া থাকত। নিজেদের আগের বাড়িটা ছেড়ে দিয়েছিল। মায়ের স্মৃতি ভরা ছিল তো। কষ্ট হত। তাই। দিব্যার মা ও বাবা ওদেরকে ভাড়াটে কম আপন ভাবত বেশি। তারপরে দিদির সঙ্গে প্রেম ও বিয়ে। তাই কৌস্তভদা ওকে নিজের বোনের মত দেখে আর সেও তাই জামাইবাবু বলে না আর।
একটু ইতস্ততঃ করেন উনি....." আমি বরং বাইরের চায়ের দোকানে বসি?"
দিব্যা জোর গলায় বলে "ফোন আছে তো, আমি ফোন করে নেব!"
শেষে রাজি হয়ে কৌস্তভদা ভ্যানচালককে ফোন করেন, তারপরে কথা বলে আমাদের দিকে তাকান ও বলেন, "ভিতরে আসতে চাইছে না।" আমি বললাম, "হাসপাতালের মধ্যে এত রাতে আসতে হয় তো ভয় পাচ্ছে - মানুষ তো এখানে মারা যায়। হয় তো ভূত, প্রেত্নীর ভয়! তার উপরে এত শুনশান।" আমার এই কথায় দিব্যা হেসে ওঠে সশব্দে...... "হা হা বীর পুরুষ স-অ-ব...."
"এটা হাসপাতাল" - পিছন থেকে আবার সেই খ্যানখ্যানে গলা। আমরা দু জনে মুখ চেপে হাসতে থাকি। কৌস্তুভদা ফোনের আলোতে রাস্তা দেখে এগোন। আমরা তার সঙ্গে গেলাম। হাসি একটু থামিয়ে দিব্যা গলা ঈষৎ তুলে বলে, "আমি ফোন করে নেব।"
আমি এবার ওকে তাড়া দিই। "চল চল ভিতরে যাই।"
গ্রামে আদি বাড়ি হলেও আমি পড়াশুনোর জন্য বরাবর কলকাতায় থেকেছি, এত অন্ধকার, নৈঃশব্দ্য আমার ভাল লাগে না, আর এই হাসপাতালটা তো কেমন যেন, গা ছমছমে বললে কম বলা হয়। সেখানেই তো দিব্যার সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা গাঢ় হয়।
আমরা ভিতরে ঢুকতেই হেড নার্সটি দরজা বন্ধ করে তালা লাগিয়ে দিলেন ভিতর থেকে। ভিতরে ২১ টি বেড, তার মধ্যে চারটিতে চারজন প্রসূতি, বাকি গুলো খালি। একটা বেডে আমরা দু জন বসি, গুটিসুটি - শীত তো। উঃ, ঠাণ্ডাটা জম্পেশ পড়েছে!
"বড় লাইট নিভিয়ে দেব।" একজন কমবয়সী নার্স বলে ওঠেন। কথাটা আমাদের অনুমতির জন্য নয় শুধু অবগতির জন্য জানানো হল। সেটা জেনেও মাথা নাড়ালাম । হাল্কা নীল সবুজ আলোয় ১৫০০ স্কয়ার ফিট এর মেটারনিটি ওয়ার্ড আর তার মধ্যেকার কয়েক জন মানুষ। যাদের মধ্যে বেশিরভাগ মানুষই ঘুমন্ত, কেউ কারোকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিল বলে বোধ হয় না।
শুধু হেড নার্সটি টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ওষুধ মিলিয়ে গুছিয়ে রাখছিলেন। তার বলিরেখা ভরা মুখে নার্সসুলভ অভিব্যক্তি ছিল না, সেটা এতদিন ধরে বয়ে আসা জীবিকার ভার নাকি অন্য কিছু !
আমি মনে মনে প্রার্থনা করছিলাম, শৈবাদির লেবার পেন যেন সকালের আগে না শুরু হয়। দিব্যাও চুপ করে বসেছিল।
এভাবে কতক্ষন বসে জানা নেই, দুজনেরই ঢুলুনি এসে গিয়েছিল। হঠাৎ দরজায় প্রচণ্ড জোরে শব্দ " ঠক ঠক --ঠক ঠক" ... কেউ যেন পাগলের মত ধাক্কা দিচ্ছে দরজায়।
আমি খাটের ধারে বসেছিলাম, চমকে নেমে পড়তেই হেড নার্সটি ধমকে ওঠেন চাপা স্বরে, " চুপ করে বোসো!" উনিও চুপ করে চেয়ারের হাতল ধরে বসে আছেন দেখে দিব্যা বিরক্ত হয় -"সে কি? আপনি দরজা খুলবেন না? "
-"যে এসেছে , সে চলেও যাবে " বলে ভদ্রমহিলা আবার ওষুধ গোছাতে থাকেন । বাকি নার্সদেরও বিশেষ হেলদোল না দেখে দিব্যা ফোনের আলোতে দরজার দিকে এগোয় । দরজা ভিতর দিয়ে তালা দেওয়া, ফোনের আলোতেই দরজাটা ভাল করে দেখতে গিয়ে শিউরে উঠে সরে আসি দু জনেই । " এ বাবা , এ তো রক্ত ! বাইরে নিশ্চয় কেউ আহত "
দরজার চৌকাঠ গলে চুইয়ে চুইয়ে রক্ত আসছে। একদম টাটকা ।
দিব্যা চিৎকার করে ওঠে "দরজা খুলুন , আপনারা কি মানুষ?"
হেড নার্সটি এবার নড়েচড়ে নিজের চেয়ার থেকে ওঠেন , এবং বড় আলো জ্বালিয়ে দিলেন, দিব্যা তখন রাগে ফুঁসছে । "দ্যাখো গো মেয়ে , কোথায় রক্ত " আমি দরজার দিকে তাকাই , আর তারপর দিব্যার কাঁধে হাত রাখি। দরজার গায়ে, মেঝেতে কোথাও কোনও রক্ত নেই। ছিটকে সরে আসি আমি, দিব্যাও কিছুটা হতভম্ব ।
নার্সটি এবার মুচকি হেসে আলো বন্ধ করে দ্যান ফের । ওঁর হাসি বড়ই রহস্যময় , কিন্তু অর্থবহ , তবে সে মুহূর্তে আমাদের যা মনের অবস্থা, তার পাঠোদ্ধার আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না ।
বেডের দিকে এগোতে এগোতে আমি দিব্যার গা ঘেঁসে বলি , "আমার খুব ভয় করছে । "
দিব্যা অবজ্ঞার স্বরে বলে ওঠে "হুহ ! ভীতু" ওর গলা শুনে মনে হয় না ও ভয় পেয়েছে। আসলে দিব্যা ভয় পায় না , ভয় দিব্যাকে ভয় পায় । অন্য সময় ওর এই সাহসটা আমাকেও সাহস যোগায় ,কিন্তু কেন জানি না অস্বস্তি হতে শুরু করে ওই সময় ।
' উন্মেষকে ফোন করব !' মনে মনে ভাবি। হ্যাঁ উন্মেষ আমার প্রেমী। অবশ্যই সে আমার সঙ্গে কথা বললে আমার ভয় কেটে যাবে! ফোন লকটা খুলে দেখি নেট ওয়ার্ক নেই । বেডের উপর বসতেই একটা মর্মভেদী আর্তনাদ আমদের কাঁপিয়ে দিল । দাঁড়িয়ে থাকলে আমি নির্ঘাত পড়ে যেতাম ।
কমবয়সী নার্স দুজন থরথর করে কাঁপছে , বয়স্কা নার্সটি চেয়ারে বসে আছেন , টেবিল ল্যাম্পের আলোয় ওঁর ঝুলে পড়া মুখের চামড়া, ঈষৎ ঘোলাটে চোখ , তোবড়ানো গাল , আতঙ্কিত মুখ -- সব মিলিয়ে আমার ওঁকে দেখেই বেশি ভয় করছিল । ওঁর চোখ গুলো কেমন যেন দয়া মায়া হীন , কোনও নার্সের চোখ অমন হয় ?
. আমি দিব্যার গায়ে হেলান দিয়ে বসি , ভয়ে ভয়ে । মনে মনে ভাবছি , আজ রাতটা কোনও রকমে কাটলে হয় । পিছন ফিরে দেখি দিব্যা ফোনে গেম খেলছে । আমি কমবয়সী নার্স দু জনের একজনকে বলি , "একটা ফোন করা যাবে, এখানে ফোন আছে? "
নার্সটি অদ্ভুত ভয়ের দৃষ্টি নিয়ে তাকায় আমার দিকে , তার হয়ে উত্তর আসে খ্যানখ্যানে গলায় " ফোন আছে, কিন্তু রাতে সেটা দিয়ে ফোন করা আর মৃত্যুকে ডেকে আনা দুটোই এক" , এবার সে কণ্ঠস্বর হিমশীতল ।
দিব্যা জিগ্যেস করে "কেন?" আমি ওর হাত চেপে ধরে ওকে চুপ করাতে চাইতে ও হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে বলল , "দাঁড়া , কি ঘটছে এগুলো , আমাকে জানতেই হবে "
বয়স্কা নার্সটি এবার ফোনের রিসিভার তুলে এগিয়ে দ্যান আমাদের দিকে , দিব্যা হাত বাড়াতে আমি ওর হাত চেপে ধরি শক্ত করে , "না , দরকার নেই " দিব্যা জেদ ধরে থাকলেও আমি একরকম ওকে জোর করে বেডের ওপরে বসিয়ে দিই । কিছুক্ষণ সব চুপচাপ , কানের কাছে একটা দুটো মশার ডাক ছাড়া কোনও আওয়াজ নেই ,কোত্থাও ।
হঠাৎ বাইরে এম্বুলেন্সের শব্দে সবাই চমকে ওঠে ঘরের মধ্যে । এতক্ষণ ব্যঙ্গের হাসি হাসা নার্সটিও ভয়ে কুঁকড়ে যান। আর কেনই বা নার্সটি অত ভয় পাচ্ছেন ? হঠাৎ আতঙ্কিত গলায় উনি প্রশ্ন করলেন , ‘তোমাদের সাথে যে ছেলেটি ছিল’ – দিব্যা উদ্বিগ্ন হয় , ‘আজ্ঞে হ্যাঁ ,উনি- আমার জামাইবাবু’ – “ সে ফেরেনি?”
এবার আমি উত্তর দিই “ হ্যাঁ কৌস্তভদা অনেকক্ষণ হল ফিরে গিয়েছে তো”
“তাহলে ও এম্বুলেন্স আজ চলছে কেন ফের ? কাকে পেল বাইরে?”
প্রিয়জন এর বিপদের আশঙ্কায় অনেক সাহসী মানুষ ভয় পায় , দিব্যাও রীতিমত ভয় পেয়ে বলল , “দরজাটা প্লিজ খুলুন , ফোনে নেটওয়ার্ক নেই- একটা ফোন করব” উনি কাঁপা হাতে ঘরের অ্যাটাচড টয়লেট দেখিয়ে বললেন, “ওর ভিতরে নেটওয়ার্ক পাবে , দ্যাখো” , আমরা দুজন ফোন হাতে নিয়ে সেই গন্ধময় টয়লেট এ ঢুকে পাগলের মত ফোনে নেটওয়ার্ক সার্চ করতে থাকি , মিনিট পাঁচেকের চেষ্টায় দিব্যার ফোনে নেটওয়ার্ক আসতে ও ফোন করল , লাউড স্পিকারে ওই দিকের ফোনের রিং টোন বাজছে , কেউ ধরছে না – প্রতিটা মুহূর্ত যেন এক একটা ঘণ্টা মনে হচ্ছে , শেষ রিং এ গিয়ে – “হ্যালো” – কৌস্তভ ঝাঁঝিয়ে উঠল “কোথায় ছিলে দাদা? ফোন ধরতে কি হয়?” –“ইয়ে , মানে , আমি একটু পটিতে—“
“পটি ছাড়া তোমাদের আর কোনও কাজ আছে? ছেলেদের?” –“কোনও সমস্যা হয়েছে? আসব?” –“না , ফোন করলে ফোন রিসিভ করবে, এটুকু করো , তাহলেই হবে” ফোনটা কেটে দ্যায় দিব্যা । একটু ধাতস্থ হয়ে টয়লেট থেকে বেরিয়ে আসলাম। আমি আর দিব্যা দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়ে পড়ি কোনওরকমে ।
এবার একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল আমার , জানলার খড়খড়ি গুলোর ফাঁক দিয়ে কেউ যেন দেখছে আমাদের , দিব্যকে ফিস্ফিস করে কথাটা বলতে ও আমার কথায় সায় দ্যায় ।
ফের এম্বুলেন্সের শব্দ বাইরে , কেউ যেন এম্বুকেন্সটিকে এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে আর আসছে ।
হঠাৎ দরজায় ফের ঠকঠক – “ দিব্যা, দরজা খোল” , কৌস্তভদার গলা না! ভাবার সাথে সাথে কৌস্তভদা..... সম্ভাব্য পরিণতির কথা ভেবে শিউরে উঠি আমরা। দিব্যা ছুটে যায় দরজার কাছে , দরজায় বিশাল তালা – “আপনার দুটি পায়ে পড়ি , দরজা খুলুন” , বয়স্কা নার্সটি চাবির গোছাটা বুকে চেপে চিৎকার করে ওঠেন-- “নাঃ , ও-ই দরজা কিছুতেই খোলা হবে না, ও সব ভাঁওতা , তোমাদের জামাইবাবু নয় ওটা, শক্তসমর্থ জোয়ান ছেলেটা মারা গেল এই করে--” ,
-- “এ কি , এম্বুলেন্সটি নিজে নিজে চলছে--” কৌস্তভদার কণ্ঠস্বর ভয়ার্ত , ওটার শব্দের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে মনে হয় , এম্বুলেন্সটা ফিরে আসছে – দিব্যা হিংস্রভাবে নার্সের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চাবিটা কেড়ে নেয় , তারপর পাগলের মত চাবি হাতড়ে চার-পাঁচ বারের চেষ্টায় খুলে ফ্যালে তালাটা ।
দরজাটা খুলতেই একরাশ ঠাণ্ডা হাওয়া ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘরের মানুষগুলোকে কাঁপিয়ে দ্যায় । বাইরে কেউ নেই – সব ভোঁ ভা ।কোথায় কৌস্তভদা? দিব্যা বাইরে উকি মারে , তারপর কি যেন দেখে ছুটে বেরিয়ে যায় । আমি চিৎকার করে উঠি , “ দিব্যা!” কেউ আমায় পিছন থেকে ধরে ফ্যালে । বয়স্কা নার্সটি তাড়াহুড়োয় দরজা বন্ধ করতে গিয়ে হোঁচট খেয়ে বাইরে পড়ে যেতেই সশব্দে দরজা বন্ধ হয়ে যায় । খ্যানখ্যানে গলায় বাইরে থেকে আর্তনাদ আসে “বাঁচাও”,তারপর এম্বুলেন্সের আওয়াজ ছাড়া আর কিচ্ছু শুনতে পাইনি । সে রাতে অনেক চেষ্টাতেও আর দরজা খুলতে পারিনি আমরা ভিতর থেকে ।
ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে কৌস্তুভদা ও আরও কয়েকজন এসে দরজা খোলেন ।
“এ কি! তুমি? কাল রাতে তুমি বাইরে ছিলে না?” আমি কৌস্তভদাকে জিগ্যেস করেছিলাম । “না, আমি তো সারারাত জেগে জেগে ভোর হতেই ছুটে এসেছি, দিব্যা কোথায় ?” নার্সদিদিকে পাওয়া গিয়েছিল মেটারনিটির সামনের উঠনে, মৃত , চোখ দুটো বড় বড় গোল গোল করে বীভৎস ভাবে খোলা , যেন দারুণ ভয়ে ওঁর হৃদপিণ্ড কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে হঠাৎ । ওঁর দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনের দিকে তাকাতেই দেখলাম – দিব্যা হাসপাতালের গেটের সামনে উপুর হয়ে শুয়েছিল । কৌস্তভদা ওর কাছে গিয়ে ওর দেহটা সোজা করে মারাত্মক ভয়ে ছিটকে সরে আসতে গিয়ে পা স্লিপ করে পড়ে যান , দিব্যার চোখদুটোর জায়গায় বিশাল দুটো কালো গহ্বর, দু গাল নেই। ঠোঁট নেই। দাঁতগুলি খিঁচিয়ে। বুক বেয়ে রক্ত নেমে এসে জমাট বেঁধে শুকিয়ে গিয়েছিল।
--“শৈবাদি বোনের মৃত্যুশোক সহ্য করতে পারেনি , সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মারা যায়, কৌস্তভদা কেমন আছেন কি জানি, বহুদিন যোগাযোগ নেই!” । সন্তানটা কার কাছে, কোথায় আছে, জানি না।
--“আর এম্বুলেন্সেটা?”
--“এম্বুলেন্স রহস্য, রহস্যই থেকে গিয়েছিল , গেটের পাশে ওটাকে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায়, শুধু দিব্যার চোখ দুটো রাখা ছিল এম্বুলেন্সের উপরে। মাঝে পাঁচ বছর কেটে গিয়েছে, শুনেছি এম্বুলেন্সেটা তারপরে আর কোনও দুর্ঘটনা ঘটায় নি ”
-“তবে আমি এখনও মাঝে মাঝে বুঝতে পারি দিব্যা ঘরের মধ্যেই আছে ,আমার আশেপাশে ,আমার দিকে তাকিয়ে আছে , ওর চোখের কালো গহ্বরগুলো বড্ড অস্বস্তি দেয়।” আমি ফিসফিস করে নিজের মনে বলি। আর পরে দিনের বেলায় আমার মনে যা আসে তাইই লিখে রাখি।
আধো অন্ধকার ঘরে আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছিলাম – ওর চোখদুটোর জায়গায় বিশাল দুটো কালো গহ্বর । একটা এম্বুলেন্স এগিয়ে আসার শব্দ আসছিল। আমার ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ। আমি মারা যাবো, নিশ্চিত হয়ে গেলাম। হ্যাঁ, আমি অঞ্জু। কিন্তু সে রাতে আমি মরলাম না।
পরের দিনটি ভালভাবে কাটিয়ে দিলাম। রাতে আমি লেখালিখি শেষ করে নিলাম। এবার রাত বাড়তে লাগল। তাই শুয়ে পড়লাম। এরপরে আর কোনো লেখা ছিল না।
এই গল্পটা অঞ্জুর শেষ লেখা ছিল। ওর ঘর থেকে উন্মেষ ডায়েরিটা পেয়েছিল। এখন সেটাকেই নিজের মত করে লিখে পাণ্ডুলিপি তৈরী করল উন্মেষ । কালকেই জমা দিতে হবে লেখাটা । প্রাক্তন প্রেমিকার, অঞ্জুর অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা এভাবে কাজে লেগে যাবে ভাবে নি সে। ইদানীং লেখালিখিতে একটু নাম হচ্ছে ।
লাইট অফ করে বিছানায় শুয়ে আড়ামোড়া ভাঙতে গিয়ে একটা এম্বুলেন্সের শব্দ কানে আসতে লাগল । চমকে বেড স্যুইচটা জ্বালিয়ে দিল । উঠে জানলা দিয়ে দেখল। জানলার কাছে এটা কি চলছে? এটা তো একটা পুরোনো ভাঙ্গা এম্বুলেন্স। শব্দ করে এটা নিজে নিজেই এদিকে ওদিকে চলছে...
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।