ই নিয়ে ন'বার দেখাশোনায় বসলাম। প্রতিবারের মতো এবারেও পাত্রপক্ষ আমাকে দেখে খুশি হয়নি, বোঝা গেল। পাত্রপক্ষের বাড়ির লোক বলাবলি করছিল — মেয়েটি খুব রোগা, মেয়েটির গায়ের রং খুব চাপা, তার ওপরে হাইটটাও ঠিকঠাক নয়। তাই হয়তো তাদের পছন্দ হয়নি।সান্ত্বনা হিসেবে পাত্রপক্ষ আমাকে পাঁচশ টাকা দিয়ে গিয়েছিল। তবে দেওয়ার সময়ও বোঝাই যাচ্ছিল যে তাদের টাকাটা জলে গেল। এই ন'বারই পাত্রপক্ষের জন্য জল-মিষ্টির আয়োজন করতে বাবার অনেক টাকা খরচ হয়ে গিয়েছে। এবারও বাবার টাকাগুলো নষ্ট হল, বোঝাই যাচ্ছে। তবে রচনা লেখার সময় যেমন উপসংহার লেখা বাধ্যতামূলক, তেমনি আমায় দেখে পাত্রপক্ষ চলে যাওয়ার সময় তারা বলে গিয়েছে — বাড়িতে গিয়ে তারা জানাবে। কিন্তু আমিও জানি — কেউই কিছুই জানাবে না। আসলে আমার মতো মেয়েকে কে বা বউ করে কারো বাড়িতে নিয়ে যেতে চাইবে! আমি দেখতে সুন্দর নই। তার ওপরে রোগা এবং কালো। 

    সমাজে একটা কথা প্রচলিত আছে — মেয়ে জন্মানোর আগে নাকি ছেলে জন্মায়। অর্থাৎ একটা মেয়ে জন্মানোর অনেক আগেই নাকি তার স্বামীর জন্ম হয়। এই কথাটা যদি সত্যি হতো, তাহলে আমার মতো রোগা, কালো, দেখতে অসুন্দর মেয়েদেরকে বাজারের পণ্য হতে হতো না। খরিদ্দার যেমন আলু, পটল দেখে বা হাত দিয়ে নাড়াচাড়া করে পছন্দ না হলে অন্য দোকানে চলে যায়, ঠিক তেমনি আমার মতো মেয়েদেরও পাত্রপক্ষের বাড়ির লোক চুল থেকে গোড়ালি পর্যন্ত খুঁটিয়ে দেখে পছন্দ না হলে আবার চলে যায়। আমার জন্য বাবাকে অনেক চিন্তা করতে হয়, অনেক রাতে আমার চিন্তায় বাবার ঘুম আসে না।

      বাবা তো মাকে গতকাল বলছিল, "এরকম কেল্টি মেয়েকে কে বিয়ে করবে? এ মেয়ের বিয়ে হবে না। এমনকি টাকা দিলেও এ মেয়ের বিয়ে হবে না।" তাই অনেক আগে থেকেই বাবা আমার দেখাশোনা শুরু করেছে। কিন্তু এতবার দেখাশোনা আসার পরেও আমার বিয়ে হচ্ছে না। বাজারে ছোট আলু, শুকনো সব্জিকেও মানুষ অল্প দামে বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু আমার মতো মেয়েদেরকে কোন মানুষ তাদের বাড়িতে নিয়ে যায় না।

     সমাজের চোখে, আত্মীয়-স্বজনের চোখে, বাবা-মায়ের চোখে আমি সমাজের জঞ্জাল স্বরূপ। আমাকে দেখলে সবাই মুখ বাঁকায়, চোখ বাঁকায়। কিন্তু আমি তো বুঝতেই পারি না — আমি এমন হয়েছি, সেটা কি আমার জন্য? আমি কি চেয়েছিলাম, আমি এমন কালো, রোগা, দেখতে অসুন্দর হই! নাকি আমার জন্মের সময় আমার কোনো হাত ছিল? যতই কবিরা আমাদের নিয়ে কাব্য করুক, যতই গ্রন্থ লেখা হোক আমাদের নিয়ে, বাস্তবে কালো, রোগা, অসুন্দর মেয়েরা বিধাতার অভিশাপ স্বরূপ। তাই আমার এ জীবন আমি আজ রাতে শেষ করে দেব। আমি এ পৃথিবীতে না থাকলে বাবা-মা হয়তো কিছুদিন কাঁদবে। কিন্তু সারাজীবন তো আমার জন্য তাদের মাথা হেঁট হবে না, সারাজীবন তো আমার জন্য তাদের চোখের জল ফেলতে হবে না। তাই বিদায়।