বসন্তের শেষ বিকেল। গ্রামের পথের ধারে শিমুলগাছের ছায়ায় দাঁড়াইয়া ছিল অয়ন। তাহার দৃষ্টি বারবার গিয়া পড়িতেছিল পথের বাঁকে। সেই পথ দিয়াই প্রতিদিন বিদ্যালয় হইতে ফিরিত মেঘলা।
প্রথম পরিচয় ছিল বইয়ের পাতার সূত্রে, পরে কথার সূত্রে, আর অজান্তেই হৃদয়ের সূত্রে। কিন্তু ভালোবাসা যতটা সহজে জন্মে, তাহার প্রকাশ ততটা সহজ নহে। অয়ন ছিল স্বভাবতই নীরব; মেঘলাও কম লাজুক ছিল না।
একদিন মেঘলার সহিত বাজারে অপর এক যুবককে দেখিয়া অয়নের মনে সন্দেহ জন্মিল। সে ভাবিল, হয়তো মেঘলার জীবনে অন্য কেহ স্থান পাইয়াছে। অপরদিকে, অয়নের এই আকস্মিক দূরত্ব মেঘলার মনেও প্রশ্নের জন্ম দিল। সে ভাবিল, হয়তো অয়ন তাহাকে আর পূর্বের ন্যায় ভালোবাসে না।
মানুষের মন কখনো কখনো সত্যের অপেক্ষা কল্পনাকেই অধিক বিশ্বাস করে। তাহাদের ক্ষেত্রেও তাহাই ঘটিল।
গ্রামের লোকেরা কথায় কথায় গল্প বানাইতে লাগিল। কেহ বলিল, "মেঘলার বোধহয় বিয়ে ঠিক হইয়া গিয়াছে।" আবার কেহ বলিল, "অয়ন নাকি শহরে চাকরি পাইয়া অন্যত্র মন দিয়াছে।"
গুজবের ডানায় ভর করিয়া ভুল বোঝাবুঝি আরও গভীর হইতে লাগিল। অথচ সত্য ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যাহাকে লইয়া অয়ন সন্দেহ করিয়াছিল, সে মেঘলার মামাতো ভাই। আর অয়ন শহরে যায় নাই; সে কেবল নিজের অভিমান লইয়াই নীরব হইয়া ছিল।
কয়েক মাস পর এক বর্ষার সন্ধ্যায় হঠাৎ মন্দিরের চত্বরে তাহাদের দেখা হইল। চারিদিকে বৃষ্টির শব্দ, আর মাঝখানে বহুদিনের জমিয়া থাকা নীরবতা।
মেঘলাই প্রথম বলিল, "তুমি কি একবারও জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়োজন বোধ করিলে না?"
অয়ন মাথা নিচু করিয়া রহিল। তারপর ধীরস্বরে কহিল, "আমি শুনিয়াছিলাম, তুমি অন্য কাউকে ভালোবাসো।"
মেঘলা মৃদু হাসিল। সেই হাসির মধ্যে ছিল কষ্ট, অভিমান ও করুণা।
"শুনিয়াছিলে? কিন্তু কখনো জানিবার চেষ্টা করিলে না?"
অয়ন উত্তর খুঁজিয়া পাইল না।
সেই মুহূর্তে তাহারা বুঝিল, সম্পর্ক ভাঙিবার জন্য সবসময় বিশ্বাসঘাতকতার প্রয়োজন হয় না; অনেক সময় অল্প কিছু ভুল ধারণা, কিছু অব্যক্ত কথা এবং সমাজের অবাঞ্ছিত মন্তব্যই যথেষ্ট।
বৃষ্টি তখনও ঝরিতেছিল। কিন্তু দুই হৃদয়ের মধ্যকার দূরত্ব আর ছিল না। কারণ সত্য অবশেষে কথার পথ খুঁজিয়া পাইয়াছিল।
সেদিন অয়ন মনে মনে উপলব্ধি করিল— ভালোবাসার সবচেয়ে বড় শত্রু মানুষ নহে, ভুল বোঝাবুঝি; আর তাহার সবচেয়ে বড় সহচর নীরবতা।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।