দরজায় দুবার টোকা পড়তেই বিছানায় শুয়ে শুয়েই চোখ খুলল অনিকেত। দরজা-জানলা বন্ধ থাকায় বাংলোয় ঘরের ভেতরে আবছা অন্ধকার। সকাল হয়েছে কিনা ঠাহর করা গেলো না। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো, ভারি কম্বলটা আঁকড়ে আদুরে মেয়ের মতো তখনও ঘুমোচ্ছে সুতপা। দরজায় টোকার শব্দে ঘুম ভাঙেনি ওর। বাদামী রঙের মোলায়েম চুলগুলো লেপটে আছে ফরসা কপালের কাছে। সিঁদুরে মুখ মাখামাখি। অনিকেত একবার ভাবল, ডাকবে কিনা, তারপর ডেকেই ফেলল, ওর কণ্ঠস্বর বেশ মোটা। সুতপা বলে, অনেকটা ষাঁড়ের মতো।
সুতপা ওঠো -
ওর ডাক সুতপা শুনতে পেল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। তবে চোখ-বোজা অবস্থাতেই পাশ ফিরে শুলো। এবার অনিকেত ওকে ঠেলল ডান হাত দিয়ে। প্রায় সঙ্গে সঙ্গে ভুরু কুঁচকে ঝামেটে উঠল সুতপা।
বাবারে বাবা, একটু ঘুমোনোর পর্যন্ত উপায় নেই। দরজাটা একটু খুলেই দেখ না -
দক্ষ ব্যায়ামবীরের মতো এবার এক লাফে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়ল অনিকেত। টেবিলের ওপর থেকে হাতঘড়িটা টেনে নিয়ে সময় দেখল। আটটা দশ। ওঃ, বড্ড দেরি হয়ে গেছে। অথচ আজ তো আর মাত্র আধঘন্টার মধ্যেই ওদের দুজনের বেরিয়ে পড়বার কথা। আজ সারাদিন ধরে সিরকাবাদে ডাক্তারের বাংলোয় পিকনিক।
গায়ে শালটা জড়িয়ে দরজা খুলতেই দেখল, বাংলোর চৌকিদার সোমনাথ দাঁড়িয়ে। হাতে চায়ের ট্রে থেকে ধোঁয়া উঠছে। চায়ের পট, দুধ, চিনি, একজোড়া সদৃশ মেটে রঙের কাপ-ডিশ।
ক্ষমা চাওয়ার মতো কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল 'সোমনাথ, চা দিতে একটু দেরি হয়ে গেল। ঘুম ভাঙতে...'
ওকে কথা শেষ না করতে দিয়ে অনিকেত বললো, 'কোনো ব্যাপার না, এক বালতি গরম জল চাপাও জলদি। মেমসাহেবের জন্য। বেরোতে হবে এখনই।'
শীতের সকালেও স্নান করার জন্য ওর নিজের গরম জল লাগে না। পাহাড়ে-জঙ্গলে থাকতে-থাকতে ঠাণ্ডা জলেই স্নান করার অভ্যাস দাঁড়িয়ে গেছে। সব সময় হাতের নাগালে গরম জল পাবেই বা কীভাবে। কিন্তু সুতপা কলকাতার কেতাদুরস্ত মেয়ে, যোধপুর পার্কে ওদের নিজেদের তিনতলা বাড়ি, মোজাইক করা বাথরুম, গীজার। গরম জল না পেলে ওর হয়তো আজ স্নানই হবে না সারাদিন।
সোমনাথের হাত থেকে চায়ের ট্রে নিয়ে ভেতরে ফিরে এলো অনিকেত।
'কে, সোমনাথ নাকি?' মশারির ভেতর থেকে প্রশ্ন করলো সুতপা।
'চা। এবার চটপট উঠে পড়ো। আজ পিকনিক না? মনে নেই?'
'ওঃ, তাই তো। ভুলেই গেছিলাম বেমালুম।'
টেবিলের ওপর কাপ-দুটো পর পর সাজালো অনিকেত। চায়ের লিকার ঢেলে তাতে দুধ চিনি মেশানো মাত্র চা তৈরি। চা তৈরি করতে করতে অনিকেতের মনে পড়ল তার স্বর্গতা মায়ের কথা। ছেলেদের ঘর-সংসারের কোনো কাজ-টাজ করা কিছুতেই বরদাস্ত করতে পারতেন না তিনি। বলতেন, 'ছেলেরা ঘরের কাজ করবে কী? বাইরের কত ঝক্কি-ঝামেলা ওদের পোহাতে হয় তার নেই ঠিক!'
আজকাল মনে হয় মা ছিলো বড্ড সেকেলে। এখন বেঁচে থাকলে দেখতে পেত, তাঁর নিজের ছেলেই নিজের বৌয়ের জন্য বেড-টি তৈরি করছে।
চা তৈরি করে অনিকেত বাথরুমে গেল মুখ ধুতে। বাসীমুখে চা খেতে ওর অস্বস্তি হয়। সুতপা অবশ্য খাটের ওপর আধশোয়া অবস্থাতেই বেশ আয়েস করে চায়ের চুমুক দিচ্ছে।
'কী যে চা বানাও, চিনি কম। এক্কেবারে আনাড়ি। চা বানাতে শেখোনি?' ওর মুখে বিদ্যুতের ঝিলিকের মতো হাসি। 'মিষ্টি লাগবে?' এগিয়ে এলো অনিকেত। ওর মুখে দুষ্টুমির হাসি।
চায়ের কাপটা টেবিলের ওপর রেখে আচমকা সুতপাকে জড়িয়ে ধরলো পাশ থেকে। নিজের ঠোঁট-দুটো বসিয়ে দিলো সুতপার ঠোঁটে। আঙুরের মতো নরম আর টসটসে দুটো ঠোঁট।
'এই কী হচ্ছে?' ঝিকিয়ে উঠলো সুতপা।
'আনাড়ি!' হাসল অনিকেত।
হঠাৎ দরজার পর্দায় কার ছায়া পড়তেই সচকিত হয়ে উঠলো দুজনে। এক বালতি গরম জল নিয়ে সোমনাথ হাজির।
চায়ের পাট চুকিয়ে সুতপা স্নান করতে ঢুকল লাগোয়া বাথরুমে। অনিকেত জানে, সুতপার স্নান সারতে প্রায় আধঘন্টা। এই ফাঁকে ড্রাইভারের সঙ্গে দু'চারটে জরুরি কথা সেরে রাখতে হবে। অনিকেত সিগারেট ধরাল।
ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের এই বাংলোটা পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ের মাথায়। সুন্দর সাজানো-গোছানো নিরিবিলি ছিমছাম একতলা বাংলো। বারান্দার দেওয়াল বেয়ে বাগানবিলাসের লতা উঠে গেছে ছাদের দিকে। অজস্র লাল-বেগুনি ফুলে ছেয়ে আছে সমস্ত বারান্দা। বাংলোর পেছন দিকে মসৃণ ইউক্যালিপটাস গাছগুলোর পাশে সোমনাথের আস্তানা। ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং হলে আসতেই দূর থেকে চোখে পড়ল, সোমনাথ জঙ্গল থেকে এক বোঝা কাঠ বয়ে আনছে, আর ওর দেহাতি বউ বাইরে কাঠের উনুনে কী যেন সেদ্ধ করছে। মায়ের ধার ঘেঁষে বাঁশের একটা চাটাই পেতে শীতের নরম রোদে গুটিশুটি মেরে বসে আছে সোমনাথের তিন ছেলেমেয়ে। সোমনাথের পাশের ঘরটায় আপাতত আস্তানা নিয়েছে অনিকেতদের ড্রাইভার অলোকনাথ। অনিকেত সোমনাথের মারফত ডেকে পাঠালো অলোকনাথকে।
ডাইনিং হল পেরিয়ে বাইরের বারান্দায় দাঁড়ালো অনিকেত। বাংলোর চতুর্দিকে নিবিড় নিঃশব্দ বনভূমি। শাল, পিয়াল, মহুল, নিম ইত্যাদির ঘনবদ্ধ অরণ্যের ফাঁক দিয়ে, সামান্য সাদা রঙ ধরা একফালি আকাশ নজরে আসে।
বাংলোর উত্তরে কুসুম গাছটার ডাল থেকে কী একটা পাখি সুমিষ্ট স্বরে ডেকে উঠলো। দূরে গগন ঠাকুরের ছবির মতো আবছা সবুজ উপত্যকা। এখানে দাঁড়িয়ে জঙ্গলের দিকে তাকালেই অনিকেতের মনে পড়ে যায় আরব্ধ কাজের কথা। জঙ্গলে পাহাড়ে ঘুরে ঘুরে পাথরের বুকে নানাবিধ খনিজের সন্ধান করছে অনিকেত। কাজটা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য এবং মাঝে মাঝে খুবই একঘেয়ে হয়ে ওঠে। তবে এখন আগের মতো সেই নিঃসঙ্গতা অনিকেতের আর নেই। কাজেই এবারের অরণ্যবাস সত্যিই আনন্দদায়ক হয়ে উঠবে। বিশেষত সুতপার মতো সুন্দরী স্ত্রী যখন কাছেই রয়েছে। সমস্যা কেবল একটাই, জঙ্গলের এই জীবন সুতপার একেবারেই ভালো লাগছে না।
সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে ফেললে সুতপাকে অবশ্যই সুন্দরীই বলতে হবে। পাঁচ ফিট পাঁচ ইঞ্চির মতো লম্বা, পাকা কেঁদ ফলের মতো রঙ, ঝকঝকে ইস্পাতের মতো নাক, সরু কোমর, টেনিস ৱ্যাকেটের মতো কব্জি, নিটোল বুকের গড়ন এবং চেহারায় মসৃণ আভিজাত্য। এই আভিজাত্য ব্যাপারটাই অনিকেতের চেহারায় অনুপস্থিত। তবে তা না থাকলেও অনিকেত যথেষ্ট স্বাস্থ্যবান, চওড়া কাঁধ এবং কব্জি। লম্বায় প্রায় পাঁচ ফিট দশ। গায়ের রঙ বেশ ফরসা। আত্মীয়স্বজনরা বলতো ছেলেমানুষ এতো ফরসা হলে ভালো লাগে না। তা ছাড়া, বনে-জঙ্গলে কাজ করে চেহারায় একরকম রুক্ষ ভাব এসে গিয়েছে।
মাঝে মাঝে ভাবে অনিকেত, সুতপার সঙ্গে ওর বিয়েটা কি আশ্চর্য এক যোগাযোগ! না হলে ওর মতো এক এক সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরের ছেলের সঙ্গে সুতপার মতো শৌখিন আদুরে মেয়ের বিয়ে কোনোভাবেই সম্ভব নয়। পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ওর স্কুলমাস্টার বাবা চিঠি দিয়েছিলেন। তারপর মাত্র দুমাসের মধ্যেই বিয়েটা হয়ে যায়। এটা ওর জীবনের একটা বিশিষ্ট ঘটনা।
'স্যার -'
অনিকেত ফিরে তাকায়। ড্রাইভার অলোকনাথ দাঁড়িয়ে।
'আপনে বোলা থা, আট বজে সিরকাবাদ জায়েঙ্গে -'
'হাঁ থোড়া দের হো গিয়া, ঠিক হ্যায় তুমহে জানে কি জরুরাত নাহি হ্যায়, ম্যায় ড্রাইভ কার লুঙ্গা।'
'জাইসা আপ বোলে হুজুর।'
অলোকনাথ চলে গেল। অলোকনাথের নমনীয় ব্যবহারে তৃপ্ত বোধ করে অনিকেত। লোকটাকে ওর বিশ্বস্ত এবং ভরসাযোগ্য মনে হয়। জঙ্গলে-পাহাড়ে এরকম লোক না পেলে স্বস্তি নিয়ে কাজ করা মুশকিল।
অনিকেত ঘড়ি দেখল। প্রায় ন'টা। ঘরের দিকে ফিরতেই সুগন্ধী আর শ্যাম্পুর গন্ধে নাকে নেশা লেগে যায়। একটু আগেই স্নান সেরে ঘরে ঢুকেছে সুতপা। পরনে ফ্রিল দেওয়া রঙিন সায়া। বুকের ওপর আকাশি রঙের টার্কিশ তোয়ালে শিথিলভাবে জড়ানো। সুতপার কপালে মুক্তোর মতো ফোঁটা ফোঁটা জল, মাথার চুল চূড়ার মতো করে মাথায় জড়ো করা। এরকম মুহূর্তে সুতপাকে মনে হয় পরম লোভনীয়। সুতপার দিকে দস্যুর মতো এগিয়ে গেল অনিকেত।
'এই না, না, কী হচ্ছে? দরজা খোলা আছে না!'
'কোনো ভয় নেই, পর্দা সরিয়ে এই ঘরে কেউ ঢুকবে না।'
একটানে আকাশি তোয়ালেটা সরিয়ে ফেলতেই বেরিয়ে পড়লো পরিপুষ্ট যৌবন। ভেজানো জানলার ফাঁক দিয়ে সূর্যের একফালি পাতলা রশ্মি এসে পড়ছে সুতপার বুকের ঠিক মাঝখানে। সেই আভাতে সব কিছু যেন এখন স্বর্গীয় সুষমায় মণ্ডিত। একটু থমকে যায় অনিকেত। কিন্তু তা কেবল এক মুহূর্তের জন্যই। আচমকা মজবুত দুটো হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে সুতপাকে। তারপর বিছানায় ফেলে পরম আশ্লেষ সহকারে চুমু খেতে শুরু করে সুতপার সর্বাঙ্গে।
'কী পাগলের মতো করছ, যেতে হবে না!' সুতপার কণ্ঠস্বর নিস্পৃহ।
জিপে চড়ে দশ মাইল জংলী পাহাড়ি পথ পেরিয়ে নিচের উপত্যকায় সিরকাবাদে ডাক্তারের বাংলোয় যখন ওরা পৌঁছলো তখন বেলা প্রায় সাড়ে দশটা। পাহাড়ের কোলে ছবির মতো সুন্দর বাংলো, দেখলেই মনে হয় কোনো বিশ্ববরেন্য শিল্পীর ক্যানভাস।
'কী ব্যাপার স্যার, এতো দেরি?' সস্ত্রীক ওদের দিকে এগিয়ে আসলেন ডাক্তার অভিজিৎ সেন। দিলখোলা লোক অভিজিৎ, চল্লিশের কাছাকাছি বয়স।
'আসুন, পরিচয় করিয়ে দিই। সুতপা, আমার স্ত্রী। আর ইনি ডক্টর অভিজিৎ সেন আর ওঁর স্ত্রী মৌমিতা -'
এরপর একে একে সকলের সঙ্গে পরিচয় করাতে শুরু করলো অনিকেত। অভিজিতের সুন্দরী শ্যালিকা অর্পিতা বড়দিনের ছুটিতে বেড়াতে এসেছে। প্রেসিডেন্সিতে ইতিহাসের ছাত্রী। স্থানীয় বিডিও রাকেশ মিত্র, তাঁর স্ত্রী সৌমিলি, ছেলে অঙ্কুর, এখানকার স্কুলেই পড়ে। ফরেস্টের রেঞ্জ অফিসার চকচকে টাকওয়ালা গোবিন্দ কর্মকার, এখানে একলাই থাকেন, স্ত্রী-সন্তানরা থাকে আসানসোলে। আদিবাসী উন্নয়ন অফিসার দীপঙ্কর ঘোষ। অকৃতদার, কাজ-পাগলা লোক। এছাড়া স্থানীয় ব্লক অফিসার কিছু তরুণ কর্মী এবং তাদের স্ত্রীরা। সব মিলিয়ে প্রায় বারো-চোদ্দ জনের ছোটখাট একটা দল। বড়দিন উপলক্ষে ডাক্তারের বাড়িতে পিকনিক। যদিও পিকনিক এখানে কেবল একটা উপলক্ষ মাত্র, আসল উদ্দেশ্য সকলের সঙ্গে সকলের পরিচয় এবং পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়।
সুতপা সকলকেই স্মিতমুখে নমস্কার জানালো। অনিকেত বারবার তাকিয়ে দেখছিল সুতপাকে। ও এমনিতেই খুব স্মার্ট। কিন্তু আজ বোধ-হয় তুলনাহীন। মেরুন রঙের সিল্কের শাড়ি নাভির নিচে নামিয়ে পরেছে, স্লিভলেস ব্লাউজ, আধখোলা হলুদ কার্ডিগান, কপালে ঢাউস সাইজের সবুজ টিপ, লিপস্টিক-দেওয়া পাতলাম ঠোঁট, চোখে হালকা নীল সানগ্লাস। পায়ে হাইহিল জুতো পরে সব মেয়েদেরই মাথায় ছাড়িয়ে গিয়েছে। আজকের এই পিকনিক পার্টির ভিড়ে এক ঝলকেই আলাদা করে ফেলা যায় একমাত্র সুতপাকে। সাজপোশাক হোক কিংবা কথাবার্তা, সবেতেই ও সকলের চেয়ে আলাদা। মধ্যবিত্ত মানসিকতার মানুষ অনিকেত উগ্র আধুনিক সাজপোশাক বিশেষ পছন্দ করে না, অন্ততঃ বিয়ের আগে তো করতোই না। কিন্তু আজ এটুকু উদার হতে পারে কেবল নিজের সুন্দরী স্ত্রী সুতপার জন্যই।
বাংলোর পেছনের চত্বরে ইটের উনুন পেতে রান্নার আয়োজন। মাছের কালিয়া, পোলাও, বনমুরগীর ঝোল, পেঁপের চাটনি, মিষ্টি। আসানসোল থেকে আনা ঠাকুর রান্না করছে আর তদারকির ভার গোবিন্দ কর্মকারের। লোকটি নিঃসন্দেহে খুবই চৌকস।
অর্পিতার সঙ্গে সুতপার খুব জমে গেল। দুজনেই কলকাতার মেয়ে। ওদিকে ছেলেছোকরার দল ছোটাছুটি করছে বাইরের উন্মুক্ত সবুজ প্রান্তরে। বড়রা মজেছে তাসে। তাসের ফাঁকে-ফাঁকে রাজনীতি, সিনেমা, আদিবাসী জীবন ইত্যাদি ঘুরে-ফিরে আসছিলো। রাকেশ মিত্র ভালো শিকারী। নিজের শিকারী জীবনের কয়েকটি কাহিনী বলে আসর মাতিয়ে ফেললেন। জাপানি স্টিরিওবক্সে কে যেন গান চালিয়ে দিল। রবীন্দ্রসংগীত।
হঠাৎ, দূর থেকে ভেসে এলো দ্রুত ধাবমান মোটরসাইকেলের শব্দ। নিস্তব্ধ উপত্যকায় আলোড়ন তুললো সেই শব্দ।
জানলা দিয়ে ওদের সকলের চোখে পড়লো, পেছনে ধুলোর ঝড় তুলে ঢেউ-খেলানো পথ দিয়ে ছুটে আসছে গাঢ় নীল রঙের একটা মোটরসাইকেল। ক্রমে সেই ধুলোর ঝড় স্থির হয়ে থামলো বাংলোর সামনে।
'আরে প্রদীপ, কী ব্যাপার, এত দেরি - আমি তো ভাবলাম, আর বুঝি এলেই না -'
বাইক থেকে লাফিয়ে নামলো প্রদীপ। চোখ থেকে উইন্ড-ব্রেকার চশমা খুলে ফেলে বললো, 'আর বলবেন না অভিজিৎদা, এদিককার রাস্তার যা অবস্থা...
'আচ্ছা শোনো, প্রদীপ, পরিচয় করিয়ে দিই। আমার বন্ধু অনিকেত চ্যাটার্জি, পেশায় জিওলজিস্ট- আর আমার ছোট ভাইয়ের মতো, প্রদীপ দত্ত। ডাক্তারি পড়া ছেড়ে এখন মেডিকেল রিপ্রেজেন্টেটিভ। আপাতত জামশেদপুরে পোস্টেড।'
'গ্ল্যাড টু মিট ইয়ু।' পরিষ্কার উচ্চারণ করে প্রদীপ। অনিকেত তাকিয়ে দেখে, দীর্ঘদেহী এই যুবকের অবয়ব যেন কোনো ইতালীয় ভাস্করের তৈরি। প্রায় ছ'ফুট দীর্ঘ শরীর, পরনে গাঢ় নীল রঙের জিন্স, পায়ে স্নিকার্স, গায়ে চামড়ার কালো পুলোভার, হলিউডের নায়কদের মতো লম্বা চুলগুলো পনিটেল করে বাঁধা, মুখভর্তি পরিপাটি বাদামি-কালো দাড়ি, টকটকে ফরসা রং। স্বাস্থ্যবান সপ্রতিভ যুবক, প্রাণচাঞ্চল্যে টগবগ করছে মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনটার মতোই।
বাংলোর বাগানে গল্প করছিল অর্পিতা আর সুতপা। কলকাতার জীবনের গল্প, জঙ্গলের বৈচিত্র্যহীন জীবন, সিনেমা, কলেজ-জীবনের ফেলে আসা স্মৃতি, ইত্যাদি। মোটরসাইকেলের শব্দে ওরাও ঘুরে তাকিয়েছিল।
অভিজিৎ বলল, 'ইনি মিসেস চ্যাটার্জি, অনিকেতের স্ত্রী, আর এটি আমার প্রিয় শ্যালিকা, অর্পিতা। প্রেসিডেন্সি, হিস্ট্রি অনার্স।
'আরে - তুমি, মানে এখানে - নো ওয়ে -'
'কী ব্যাপার, তোমরা একে অন্যকে চেনো নাকি?' অভিজিতের কণ্ঠে কৌতূহল স্পষ্ট।
এক মুহূর্তের জন্য প্রদীপের মতো স্মার্ট ছেলেকেও কেমন যেন অপ্রতিভ মনে হয়।
'সে কি, আমাকে চিনতে পারছো না, প্রদীপদা? ইটস সুতপা।' পিংপং বলের মতো লাফিয়ে ওঠে সুতপা।
'ওঃ, ইটস ইয়ু। হঠাৎ এই পরিবেশে তোমাকে দেখে তো চেনাই যাচ্ছে না এসব শাড়িটাড়ি পরে।'
অনিকেতের দিকে তাকায় সুতপা। অনিকেত কেমন হতভম্ব হয়ে গেল।
'এই শুনছো, আমার দাদার বন্ধু, একসঙ্গে কলেজে পড়তো। যা ক্রিকেট খেলে না -'
কথা বলতে-বলতে সুতপার চোখেমুখে হাজার বাতির রোশনাই ঠিকরে বেরোয়। এত সাবলীল, স্বছন্দ সুতপাকে যেন আগে কখনও দেখেনি অনিকেত।
প্রদীপ সিগারেট ধরিয়ে অনিকেতকেওঃ অফার করলো।
'নো থ্যাংকস। অন্য ব্র্যান্ড চলে না আমার।'
পুরুলিয়ার খরার মতো রুক্ষ স্বরে ব্যক্তিত্ব ফোটাতে চেষ্টা করে অনিকেত। কিন্তু কোথায় যেন ছন্দপতন ঘটে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে আর ঠিক সহজ করতে পারছে না অনিকেত। কারণটা হয়তো জানা, আবার হয়তো জানাও নয় ঠিক। নিজের স্ত্রীর পূর্বপরিচিত কোনো বন্ধুর সঙ্গে আচমকা দেখা হয়ে যাওয়াটাই কি আসল কারণ? প্রশ্ন করে নিজেকে মনে মনে। কিন্তু সেটা কী আর এমন, নিজের মনকে বোঝাতে চেষ্টা করে অনিকেত। বন্ধু তো বন্ধুই হয়। আর বিশেষত আজকের যুগে একটি ছেলের সঙ্গে একটি মেয়ের বন্ধুত্ব তো খুব সাংঘাতিক অসাধারণ কখনো ঘটনা নয়। কিন্তু তারপরেও... কোথায় যেন পোস্তদানার মতো কী একটা খচখচ করছে। মনের অন্ধ গলিতে কি ঈর্ষার জন্ম হচ্ছে অনিকেতের? নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো মনে মনে, তুমি কেন সুতপার সঙ্গে এতটা স্বাভাবিক হতে পারো না?
অভিজিতের স্ত্রী এসে প্রদীপকে নিজেদের ঘরে নিয়ে গেল কী একটা জিনিস দেখাতে। আবার জমে উঠলো আড্ডা, কিন্তু অনিকেত বুঝতে পারলো নিজেকে আর কোনোভাবেই এই সব কিছুর মধ্যে খাপ খাওয়াতে পারছে না সে।
দুপুরে রান্নাবান্নার পর্ব মিটলে সবাই মিলে হই-চই করে একসঙ্গে খাওয়াদাওয়া করলো। মুরগির ঠ্যাং নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে গেল এর ওর মধ্যে। খাওয়াদাওয়া মিটলে পান চিবোতে চিবোতে আবার আড্ডা মেয়েরা কেউ কেউ একটু গড়িয়ে নিলো।
বিকেলের দিকে সামনের নদীতে সবাই মিলে দল বেঁধে বেড়াতে গেলো। শুধু শরীর খারাপের অজুহাত দেখিয়ে গেলো না অনিকেত।
অভিজিতের স্ত্রী মৌমিতা ডাকল অনিকেতকে, 'একা একা বসে আছেন কেন? চলুন না, ঝর্ণা দেখে আসি। বেশ লাগবে।'
মিঃ ঘোষ বললেন, 'চলুন না, ওদিকে আদিবাসীদের একটা মডেল গ্রাম করেছি। ওদের নাচ দেখবেন চলুন।'
'না থাক, দুপুরের খাওয়াটা হেভি হয়ে গেছে।' অনিকেত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে চেষ্টা করল।
'ওষুধ দেব নাকি?' অভিজিতকে চিন্তিত স্বরে জিজ্ঞেস করলো।
'আরে না না, কোনো ব্যাপার না। একটু বিশ্রাম নিলেই ঠিক হয়ে যাবে।'
সুতপা এসে ডাকল, 'ঝর্ণা দেখতে যাবে না? চলো না, কী সুন্দর পাহাড়ি ঝর্ণা নাকি ওখানে আছে।' সুতপার কণ্ঠে জলপ্রপাতের ঝংকার।
কিন্তু অনিকেতের মনে হলো, খুব সুন্দর অভিনয় করতে শিখেছে সুতপা। সব কিছু বুঝে-শুনেও লোকজনের সামনে দিব্য বানিয়ে বানিয়ে মিষ্টি সুরে কথা বলছে।
'আহা, বললাম তো যাব না। তোমরা যাও।' অনিকেত হাতের পোড়া সিগারেটটা ছুঁড়ে দিলো গোলাপ গাছের একটা ঝাড়ে। চাপা হলেও অনাবশ্যক রুক্ষ শোনালো ওর কণ্ঠস্বর।
'সব ব্যাপারেই তোমার জেদ আর বাড়াবাড়ি।' সুতপার চিবুক পাথরের মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। অনিকেত দেখলো, একটা জরুল গাছের গায়ে হেলান দিয়ে খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রদীপ।সুতপা চলে গেলো সকলের সঙ্গে। যাওয়ার সময় পেছন ফিরে একবারওঃ তাকালো না। অনিকেত বাংলোর দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলো, ওরা ক্রমে ছোট হতে হতে একসময় মিলিয়ে গেলো গাছগাছালির ফাঁকে।
বিকেলের শেষ আলো ফুরিয়ে আসছে। বাতাসে হিমের হাওয়া, সামনে আকাশ জুড়ে গাঢ় সবুজ রঙের অযোধ্যা পাহাড়, ঘন জঙ্গল। তারই কোল ঘেঁষে ছোট্ট পাহাড়ি নদীটা বয়ে চলেছে। একসময় বাংলো ছেড়ে আনমনে নদীর দিকে হাঁটতে শুরু করলো অনিকেত। পায়ে-হাঁটা রাস্তা শেষ হয়ে শুরু হয়েছে উঁচু-নিচু এবড়ো-খেবড়ো কাঁকরময় রাস্তা, এদিক-সেদিক ছড়িয়ে আছে পাথরের বড় বড় বোল্ডার আর তারই ফাঁকে ফাঁকে বয়ে চলেছে তিরতিরে জলের ধারা। নদীর পাড়ে অজস্র গাছপালা - পলাশ, শিমুল, শাল, মহুল গাছের জটলা।
চলতে-চলতে দূরে চোখে পড়লো, ওরা ফিরে আসছে নদী থেকে, আঁকাবাঁকা রেখায়। প্রথমে বিন্দুর মতো, পরে বিন্দুগুলো বড় হতে হতে ক্রমে চলমান মানুষ হয়ে উঠলো। সামনে অভিজিৎ, মিঃ ঘোষ, গোবিন্দ এবং রাকেশ ; পেছনে মৌমিতা, অর্পিতা, সৌমিলি ওঃ বাচ্চারা। সামনে একটা মহুয়া গাছের আড়াল, তাই দূর থেকে অনিকেতকে দেখতে পাচ্ছে না ওরা। সবচেয়ে পেছনের সারিতে দীর্ঘকায় প্রদীপ, পাশে সুতপা হাঁটছে, হাসছে, নাচছে। বসন্তে ফুটে-থাকা পলাশ যেমন গাছের শাখায় দোল খায়, ঠিক সেরকম। সুতপা কি প্রদীপের হাত ধরল! ওরা দুজনে কি এখন অনেক কাছাকাছি? অনিকেতের মনে হলো, ওরা যেন হালকা হাওয়ায় ফুরফুরে করে উড়ছে বাঘছাল প্রজাপতির মতো। মহুল গাছের একটা ডাল নির্মমভাবে ভেঙে ফেলল অনিকেত।
দ্রুতপায়ে প্রায় বুলেটের গতিতে বাংলোয় ফিরে আসলো অনিকেত। বুকের মধ্যে উথালপাথাল চলছে ওর। হালকা হালকা ঘাম দিচ্ছে কি? চারপাশে এই অভ্রংলিহ বনস্পতির মাঝে নিজেকে হঠাৎ বড্ড একা মনে হতে লাগলো অনিকেতের। একবার ভাবল, এই গাছগুলোর চেয়েও কি বেশি বয়স ওদের দুজনের সম্পর্কের?
অবশেষে ফিরে এলো সবাই। মৌমিতা হেসে বললো, 'ধন্যি আপনাকে, একা একা বেরসিকের মতো এমন সুন্দর বিকেলটা বসে বসে নষ্ট করলেন।' অর্পিতা আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল, 'ঝর্ণাটা কী অসম্ভব সুন্দর!'
রাকেশ বলল, 'অনেক প্রজাপতি ধরলাম আমরা।'
সুতপা বলল, 'প্রদীপদা কী ভালো গাইল!'
সুতপার এই কথায় অনিকেতের মুখটা সামান্য বিকৃত হয়ে উঠলো। ওর মাথায় যেন একটা টাইম-বোমা বসানো আছে। কোনো একসময় আচমকা ফেটে উঠবে সেটা নির্দয়ের মতো।
অভিজিৎ জিজ্ঞেস করলো, 'কি স্যার, শরীর এখন একটু ভালো লাগছে কি? নাকি ওষুধ দেব!'
মনে মনে নিজেকেই বললো অনিকেত, ওষুধ আমার লাগবে বটে, তবে এখন নয়।
কিন্তু মুখে বলল, 'না না, এখন শুধু ফিরতে হবে।' অনিকেতের কথায় মেয়েরা সবাই প্রতিবাদ করে উঠল।
'সেকি, এক্ষুনি ফিরবেন কেন! এই তো আমরা সবাই মিলে ঠিক করলাম, ছোটখাট একটা জলসা হবে। এই সুতপা, বলো না অনিকেতকে।' মৌমিতা ঠেলল সুতপাকে।
অনিকেত তাকিয়ে দেখল, প্রদীপ তাকিয়ে রয়েছে সুতপার দিকে, নিঃশব্দে ইঙ্গিত করছে থেকে যাওয়ার জন্য।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ঠিক করে ফেলল অনিকেত, 'না ম্যাডাম, আর থাকতে পারছি না। শরীরটা বড্ড খারাপ লাগছে।'
'জিপে এতখানি রাস্তা যাবেন?' অভিজিৎ সাবধান করতে চাইল।
জংলা রঙের জিপটা ক্ষুধার্ত বাঘের মতো গর্জে উঠল যেন। বিস্মিত প্রদীপের দিকে একবারও না তাকিয়ে অ্যাকসিলেরেটরে চাপ দিল অনিকেত। তখন অযোধ্যা পাহাড়ের গভীরে গহন অন্ধকার নামছে। চড়াই পাহাড়ি রাস্তা দিয়ে আগুনের মতো হলুদ দু'চোখ জ্বালিয়ে ছুটে চলেছে অনিকেতের জিপ। পাশে মমির মতো বসে রয়েছে সুতপা। কিছুক্ষণ আগের উজ্জ্বল মুখটা এখন যেন শুকনো পাতার মতো নিস্পৃহ। সুতপার এই নিস্পৃহতা অনিকেত মজ্জায়-মজ্জায় অনভব করছে এই মুহূর্তে। আজ সকালে আলিঙ্গনের মহূর্তে এই নিস্পৃহতাই ওকে ছিটকে ফেলে দিয়েছিল বিছানা থেকে, অপ্রয়োজনীয় বাতিল কাগজের মতো।
'সারাদিন খুব এনজয় করলে তা-হলে?' অনিকেতের কণ্ঠে ব্যঙ্গ ঝলসে উঠল ধারালো তরোয়ালের মতো।
'হ্যাঁ করলাম। কিন্তু তোমার ব্যবহারে লজ্জায় মাথা কাটা গেল।' সুতপার কণ্ঠস্বর সামান্য তীব্র।
ডিসেম্বরের শীতের সন্ধ্যা। বাইরে থেকে হিমেল হাওয়া ঝাপটা দিচ্ছে হিংস্র বাঘের কামড়ের মতো।
'তা-হলে এই তোমার প্রাক্তন প্রেমিক, কী বলো?' ড্যাশবোর্ডের আলোয় দেখা গেল, সুতপার সারা মুখে পুঞ্জীভূত ক্রোধ, যেন ফেটে পড়বে ডিনামাইটের মতো যে-কোনও মহূর্তে।
'জংলী ছোটলোকের মতো কথা বলো না।' সাপের মতো হিসহিস করে উঠল সুতপা।
'জংলী' শব্দটা অনিকেতের মগজের কোষে আগুন ধরিয়ে দিল হঠাৎ। অনিকেত আর কোনও কথা না বলে গাড়ির গতি উদ্দাম করে তুলতে শুরু করলো।
'গাড়ি থামাও, গাড়ি থামাও, এক্ষুনি নেমে যাব আমি। ফিরে যাব কলকাতায়।'
'কেন, প্রদীপের কাছে?' কী এক অজ্ঞাত প্রতিশোধের নেশায় নির্মম হয়ে উঠল অনিকেত।
গাড়ি থামলো না, দুর্বার গতিতে দু'পাশের প্রাগৈতিহাসিক অরণ্যকে দু'পাশে রেখে পাথুরে রাস্তায় ছটে চললো হিংস্র জন্তুর মতো। এক ঝটকায় সুতপা আচমকা সরে গেল দরজার দিকে। একটা বাঁকের কাছে আসতেই, অনিকেতের মনে হলো, সুতপা যেন জিপ থেকে লাফিয়ে পড়ছে।
'এই করছ কী, কী করছো -' সঙ্গে সঙ্গে কোনরকমে ব্রেক কষে অনিকেত সুতপাকে জাপটে ধরলো। কিন্তু টাল সামলাতে না পেরে জিপটা ধাক্কা মারলো পাথরের একটা বোল্ডারে!
জ্ঞান ফিরলে ধীরে-ধীরে চোখ খুলল অনিকেত। মাথার ওপরে কালো আকাশ, অগুণতি তারা মিটমিট করে জ্বলছে। চাঁদ উঠেছে এক ফালি। আধশোয়া অবস্থায় দেখতে পেলো অনিকেত, একপাশে উল্টে পড়ে আছে জিপটা। সারা শরীরে বেশ ব্যথা, তবে বোধ-হয় হাত-পা ভাঙেনি। শুধু গালের কাছে কেটে গেছে খানিকটা, রক্ত বেরোচ্ছে অল্প-অল্প। কিন্তু সুতপা? শরীরের সমস্ত শক্তি জড়ো করে কোনরকমে উঠে দাঁড়ালো অনিকেত।
চাঁদের আবছা আলোয় দেখল, সুতপা পড়ে আছে জংলী ফুলের ঝোপে সংজ্ঞাহীন অবস্থায়। দ্রুত নাকের কাছে হাত পাতলো অনিকেত। গরম নিঃশ্বাস বইছে অর্থাৎ প্রাণ আছে। কিন্তু এখন উপায়? এই পাহাড়ী চড়াই রাস্তায় নির্জন নিশীথে লোক পাবে কোত্থেকে? ক্রমে ধীরে ধীরে সমস্ত শরীরে খুব অদ্ভুতভাবে কোথা থেকে যেন যন্ত্রের মতো জোর পেলো অনিকেত। অচেতন সুতপাকে দু'হাত দিয়ে অবলীলায় তুলে নিলো নিজের কাঁধে। তারপর টালমাটাল এলোমোলো পদক্ষেপে ধীরে-ধীরে চলতে শুরু করলো বাংলোর দিকে।
কিন্তু ক্রমশ ঘাড়ের ওজন বাড়তে শুরু করলো এক জটিল গাণিতিক নিয়মে। চলতে-চলতে অনিকেতের মনে হলো ওর সমস্ত শরীরটা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। চাঁদের আবছা আলোয় অনেক দূরে ভেসে উঠেছে বাংলোর চূড়া। কিন্তু অসাড় বিশাল এই হাড়-রক্ত-মাংসের পিন্ড কাঁধে নিয়ে কত দূর যেতে পারবে অনিকেত! আর কতক্ষণ, এভাবে বয়ে নিয়ে যাবে এই ভার!
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।