এ গল্প অনেকদিন আগেকার, তা প্রায় আজ থেকে ৫০ বছর আগে। তখন দিনকাল আজকের মতো ছিল না। এরকম একটা সময়ে মালা আর নীলিমা দুই বান্ধবী ছিল। নীলিমা চট্টোপাধ্যায় আর মালা গুহ, দুই বান্ধবী একই পাড়াতে থাকে, একসঙ্গে স্কুলে যায়। তারপর একদিন ওরা উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কলেজে ভর্তি হল। মালা ভালো ছাত্রী, রসায়ন নিয়ে ভর্তি হল, নীলিমা ভর্তি হল ইতিহাস নিয়ে। বিষয় আলাদা, কিন্তু তাতে ওদের বন্ধুত্বে কোন ছেদ পড়ল না।
ওরা কলেজের প্রাতঃবিভাগে পড়ে, রোজ ভোরবেলা একসাথে কলেজ যায়। তখন একান্নবর্তী পরিবার। দুজনেরই বেশ বর্ধিষ্ণু পরিবার। মালাদের বাড়ির সবাই খুব শিক্ষিত, বাবা-কাকা সবাই বিভিন্ন বড় আপিসে চাকরি করে। মালার দাদাও ডাক্তারি পড়ছে কলকাতার সেরা মেডিকেল কলেজে।
নীলিমাদের বিশাল ব্যবসা, ওদের বইয়ের প্রকাশনী আছে। বই নিয়ে ব্যবসা করলেও কিন্তু ওদের বাড়ির কেউ বইপ্রেমী নয়, পড়াশোনায় সকলেই সাধারণ। নীলিমার বাবাই একমাত্র গ্র্যাজুয়েট, ওর জ্যেঠা-কাকারা সবাই ওই ম্যাট্রিকই পাশ করেছে।
সে যাই হোক, ওদের দুই বন্ধুর তাতে কিছু এসে যায় না। ওদের খুবই বন্ধুত্ব। মালার দাদু বলেন, হরিহর আত্মা। উনি একটি স্কুলের প্রধানশিক্ষক হয়ে অবসরগ্রহণ করেছেন। ওদের দুই পরিবারেরও সামনে খুবই ভাব। যেকোন উৎসব অনুষ্ঠানেই একে অপরকে ডাকা চলতেই থাকে। তবে মনে মনে একটা রেষারেষি, ঠাণ্ডা লড়াই চলতে থাকে।
নীলিমার ঠাকুমা তো ও কলেজ থেকে ফিরলেই রোজই বলতে থাকেন, 'হ্যাঁরে, ওর সাথে একসাথে কিছু খাসনি তো? ওরা তো বামুন নয়।' নীলিমা বলে, 'কি যে বলো ঠাক্মা, খেলে কি হবে। সব অনুষ্ঠানেই তো একসাথে খাওয়া হয়।' ঠাকুমা বলেন, 'না না, সে তো ঠাকুরে রান্না করে। আর একপাতেও তো নয়।' রোজই এক কথা, নীলিমার গা সওয়া হয়ে গেছে।
ওদিকে মালার বাড়িতেও প্রতিবার বিজয়া করতে গিয়ে নীলিমা বিপদে পড়ে। ওর ঠাকুমা আবার পা ছুঁতে দেন না, বলেন, 'বামুনে পা ছুলে পরজন্মে তো ম্লেচ্ছ হবো, আমার সগ্গে যাওয়া হবে না।' এভাবেই চলছে সবকিছু। তবু ওদের বন্ধুত্বে কোন ছেদ পড়েনি।
প্রথম ধাক্কাটা এলো মালার মাধ্যমে। মালার সাথে ওর কলেজেরই এক প্রাক্তনীর ভাব-ভালোবাসা চলছে। ছেলেটার নাম গৌরব মুখার্জী, সে একটা বড় অফিসে সদ্য চাকরি পেয়েছে। তারপর বাড়িতে বিয়ের কথা পেড়েছে। তারফলে মালাও নিজের বাড়িতে এসে সোজা ওর দাদাকে জানিয়েছে, 'আমি গৌরবকে ভালোবাসি আর ওকেই বিয়ে করবো। তুই দাদুকে বল্। গৌরবের বাড়ি থেকে লোকজন আসবে।'
নীলিমা শুনে বলল, 'তোর লজ্জা করলো না তোর দাদাকে ঐভাবে ভালোবাসা-বিয়ের কথা বলতে?' মালা বলল, 'সত্যি কথা বলতে ভয় কি?' কিন্তু এদিকে গৌরবের দিদা আবার নীলিমার ঠাকুমার সই। নীলিমার ঠাকুমা তো সব জানতে পেরেই ছুটলেন সইয়ের বাড়ি। বললেন, 'হ্যাঁ গো, সই, তোমার নাতি অব্রাহ্মণের মেয়েকে নিজে ভাব-ভালোবাসা করে বিয়ে করতে চাইল আর তোমরা রাজি হয়ে গেলে?'
সই বললেন, 'আমি তো দিদা হই গো, আমার কথা কে মানবে! ওদের বাড়ি খুব আধুনিক, ওরা ওসব জাতপাত মানে না। ওর দাদু তো কমিউনিস্ট, ওদের মত আলাদা। ওরা তাই কোন আপত্তি করে নি।' নীলিমার ঠাকুমা বললেন, 'ওদের পরিবারটা উচ্ছন্নে যাবে এবার। তবু ভালো, তোমার পরিবারটার কিছু ক্ষতি হবে না।'
বাড়ি এসে নীলিমাকেও বললেন, 'ওই গুহদের পাজি মেয়েটার সাথে আর একদম মিশবি না। ও বখে গেছে, তুইও যাবি।' বাবা শুনতে পেয়ে বললেন, 'না, নীলু, একদম নয়। বন্ধু বন্ধুই হয়, তাতে কোন ভেদাভেদ থাকে না। তোদের বন্ধুত্ব যেন আগের মতোই থাকে। আর ওর বিয়েতেও তুই সবসময় ওর পাশেপাশেই থাকবি।' বাবার কথার ওপর ঠাকুমা কোনদিনই কিছু বলেন না। তাই আজকেও থেমে গেলেন।
তবে এখনই মালার বিয়ে হল না। মালা গ্র্যাজুয়েট হয়ে একটা চাকরি জোগাড় করবে, তারপরই ওদের বিয়ে হবে। দুই পরিবারই রাজি হয়ে গেল। শুধু মালার ঠাকুমার একটাই দুঃখ – 'নাতজামাই পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতে পারবে না, দূর থেকেই প্রণাম আর আশীর্বাদ সারতে হবে।'
এইভাবেই বেশ কিছুদিন চলল। ওদিকে মালার দাদা ডাক্তারি পাশ করে গেল। ইন্টার্নশিপ করতে শুরু করল। এদিকে নীলিমার ঠাকুমা ওর বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠে-পড়ে লেগেছেন। বিভিন্ন ঘটককে দিয়ে এদিকওদিক খোঁজ লাগাচ্ছেন। জেঠুর মেয়েদেরও ঠাকুমাই খুঁজেপেতে বিয়ে দিয়েছেন। এবারও তার অন্যথা হোক, উনি চান না।
এরকম যখন অবস্থা, তখন একদিন সকালে নীলিমা আর মালা কলেজ যাওয়ার পথে, মালার দাদা শান্তনু ওদের পথ আটকে দাঁড়ালো। নীলিমার দিকে তাকিয়ে বলল, 'নীলিমা, আমি তোকে বিয়ে করতে চাই।' এরকম কথা শুনে তো নীলিমা আর মালা দুজনেই হকচকিয়ে গেল। তারপর কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থেকে নীলিমা পিছন ফিরে বাড়ির দিকে হাঁটা দিল। মালা ওর পিছন পিছন দৌড়ল, 'এই, তুই কলেজ যাবি না?'
নীলিমা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, 'এরকম কথা শুনে কি আর মাথার ঠিক থাকে? তোদের কাছে সবই সহজ। যা মনে আসল, বলে দিলাম। রাস্তায় আরো যারা ছিল, শুনলো। এবার খবরটা পাঁচকান হবে।' আজ আর কলেজ যাওয়া হল না।
বাড়ি ফিরতেই মা নীলিমাকে বললেন ,'কি হয়েছে'। 'শরীর খারাপ লাগছে' বলে নীলিমা ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল। বেলা হতেই ঠাকুমা ঠিক খবর পেয়ে ঘরে চলে এলেন, বললেন, 'ওর এতো সাহস হয় কি করে আমার নাতনির দিকে হাত বাড়ায়।' ওদিকে গুহবাড়িতে অশান্তি শুরু হয়ে গেল। দুপক্ষই এ ওকে দোষ দেয়। দুজনদের মধ্যে আর কোন মিত্রতা রইল না মনে হয়।
এরপর দুই বাড়ির ছেলেরা মিলে আলোচনায় বসলেন। তাঁরা আলোচনা করে ঠিক করলেন যে, শান্তনু তো মনের কথা বলেই দিয়েছে। এবার জানতে হবে নীলিমা কি চায়। কিন্তু সে তো মুখচোরা মেয়ে, কাউকে কিছু বলবে না। শেষপর্যন্ত মালাকে ডেকে দায়িত্ব দেওয়া হল খবরটা জানার।
মালা, নীলিমাকে চেপে ধরল, 'তোর কি দাদাকে পছন্দ?' নীলিমা বলল, 'ওইভাবে কখনো ভেবে দেখিনি।' মালা বলল, 'এবার ভেবে দেখ্, দাদা নাকি তোর ঠাক্মার ঠিক করা অচেনা ছেলে, কে ভালো?' নীলিমা কিছু বলল না, মুখ নিচু করে রইল। তারপর একটু পরে বলল, 'তুই থাকতে ভয় কি? চেনা লোকই তো ভালো।' মালা মুচকি হেসে বলল, 'ব্যস, বুঝে গেছি। চল্, বড়দের বলে তোদের চারহাত এক করি।'
এরপর দুই বাড়ি মিলে ঠিক হল, শান্তনু যখন হাউসস্টাফ হয়ে যাবে, ওদের বিয়ে হবে। যদিও দুই বাড়ির ঠাকুমাদের এই দুটো বিয়েই মনোঃপূত হল না।
এর কিছুদিন পর, হঠাৎ করেই নীলিমার দাদু অসুস্থ হলেন। যথেষ্ট জটিল অবস্থা, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দিয়ে অপারেশন করাতে হবে। এদিকে শহরে তখন পুজোর সময়, চিকিৎসকরা বেশিরভাগ শহরের বাইরে বেড়াতে গেছেন। এমতাবস্থায় শান্তনু, ওর প্রফেসর ডক্টর বসুকে অনুরোধ করল, 'স্যার, আমার দাদুকে আপনি অপারেশন করে সুস্থ করুন। দাদু আমাদের খুব কষ্ট পাচ্ছেন।' ডক্টর বসু প্রিয় ছাত্রের অনুরোধ ফেলতে পাড়লেন না। অপারেশন হল ও দাদু অনেকটা সুস্থও হলেন।
হাসপাতালে সকলে এসেছে। নীলিমার ঠাকুমা শান্তনুকে দেখে মাথায় হাত দিয়ে কেঁদে ফেললেন, 'তুমি আমার যোগ্য নাতি হয়ে উঠলে বাবা। আর আমি তোমাদের অব্রাহ্মণ বলে কুকথা বলতাম।' মালা পাশ থেকে বলে উঠল, ' ও ঠাক্মা, নাতি নয় গো, নাতজামাই বলো। তোমায় তাহলে পথে আনলো বলো।'
এবার মালার ঠাকুমা বললেন, 'হ্যাঁ, নাতজামাইরাই পথে আনে গো। আমার নাতজামাই তো পায়ে হাত ছুঁয়ে দিল গো।' গৌরবও ছিল। হাসতে হাসতে বলল, 'হ্যাঁ, ঠাক্মা, আপনার আর স্বর্গলাভ হবে না। আমাদের সঙ্গে এই নরকেই থেকে যেতে হবে।'
সবাই হোহো করে হাসতে লাগল। নীলিমা মনে মনে ভাবলো, 'যাক্, যার শেষ ভালো তার সব ভালো। সবাই আবার এক হয়ে গেল। এই তো মধুরেণ সমাপয়েৎ'।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।