সুব্রত ছেলেটা এক্কেবারে অন্যরকম। বয়স মোটে কুড়ি, চোখেমুখে সারাক্ষণ একটা দুরন্ত ছটফটে ভাব। পাড়ায় ওকে চেনে না এমন কেউ নেই, মাঠেঘাটে ওর দাপট আর সাহসের গল্প সবার মুখে মুখে ঘোরে। বিশেষ করে ফুটবল মাঠে যখন ও নামে, প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের রীতিমতো পা কাঁপা শুরু হয়ে যায়। বল কাড়তে বা গোল লক্ষ্য করে এগোতে ও সিধ্যহস্ত, একদম ভয়হীন। বন্ধুরা তো মজা করে বলত, "সুব্রতকে যদি বাঘের সামনেও দাঁড় করিয়ে দেওয়া যায় তবে বাঘটাই মনে হয় দুবার ভাববে কামড়াতে যাওয়ার আগে!"
কিন্তু ওই যে বলে না, যতই বাঘের মতো সাহস হোক, মানুষের মনের কোথাও না কোথাও একটা দুর্বল জায়গা থেকেই যায়। সুব্রতেরও ঠিক তেমনই একটা ভয় ছিল, টিকটিকি! ওইটুকু একটা নিরীহ জীব, তাও ওর নাম শুনলেই সুব্রতের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হুহু করে উঠত। দেয়ালে জাস্ট চুপচাপ বসে থাকা একটা টিকটিকিও ওর কাছে যেন কোনো একভয়ানক ডাইনোসরের বংশধর, গিলে খাবে তাকে।
সেদিনও ছিল তেমনই একটা বৃষ্টিমুখর শনিবারের বিকেল। পাড়ার মাঠে সুব্রত সেদিন যা খেলেছে না, জাস্ট একদম ফাটিয়ে দিয়েছে! ওর পায়ের জাদুতে পরপর দুটো দারুণ গোল এল। বিশেষ করে শেষ গোলটা... উফ, অমন একটা বাঁক খাওয়ানো শট, দেখে বন্ধুরা তো মাঠের মধ্যেই চিৎকার করে ওকে "রবার্তো" বলে ডাকতে শুরু করে দিল। জয়ের সেই চওড়া হাসিটা মুখে নিয়েই, ভিজা জার্সি গায়ে ও যখন বাড়ি ফিরল, তখন কে জানত ওর জন্য এই জিনিস অপেক্ষা করছে।
আসলে, ওই আনন্দটা বেশি ক্ষণ টিকল না। ঘরের মেইন দরজার ঠিক পাশের স্যাঁতসেঁতে দেয়ালটায় একটা টিকটিকি একদম পাথর হয়ে বসে আছে কি নিশ্চিন্তে। বাইরে তখন মড়মড় করে বাজ পড়ছে, হয়তো জানলার ফাঁক গলে একটু আশ্রয়ের খোঁজে ঢুকে পড়েছে ভেতরে। প্রাণীটা একদম নড়াচড়া করছে না সত্যি, কিন্তু সুব্রতের মনে হতে লাগল, ওটা যেন একদৃষ্টে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে আর সেই পলকের মধ্যে মাঠের সব আনন্দ, গোল করার উন্মাদনা কোথায় যেন উবে গেল।
বুকের ভেতর কেমন একটা অস্বস্তি ভাব দানা বাঁধতে শুরু করল। সে একটু দূর দডীয়ে, রান্নাঘর থেকে একটা লাঠি এনে বেশ ভয়ভয়ে ওটাকে তাড়ানোর চেষ্টা করল কিন্তু টিকটিকিটা যেন ওকে পাত্তাই দিল না! যেমন দেয়ালে লেপ্টে ছিল, তেমনই রইল তাই অগত্যা সুব্রত একটু বিরক্ত হয়েই বাথরুমে চলে গেল ফ্রেশ হতে। ভাবল, থাক গে,কিছুক্ষণ পর নিজে থেকেই চলে যাবে হয়তো।
কিন্তু সে আর হোলো কই! সময় পেরিয়ে যেতে লাগল। পড়াশোনা নিয়ে বসল সুব্রত তারপরে ঘরের টুকটাক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করল আর কী কিন্তু যতবার ওই মেইন দরজার কাছ দিয়ে যাচ্ছে, চোখটা কেমন যেন আপনাআপনি ওই দেয়ালের দিকে চলেই যাচ্ছে। আর প্রতিবার ওটাকে একই জায়গায়, ওই একই ভাবে বসে থাকতে দেখে ওর শিরদাঁড়া দিয়ে কেমন একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছিল।
তারপর যথারীতি সন্ধে নেমে এল তার সাথেই বৃষ্টির আওয়াজটাও যেন আরও ভারী হয়ে উঠল চারদিকে। ঘরের কোণে অন্ধকার জমছে আর ওই আবছা আলো-আঁধারির মধ্যে টিকটিকিটার ওই দুটো ছোট্ট চোখ যেন আরও চকচক করে উঠল। সুব্রতের খালি মনে হচ্ছিল, ওই দানবটি ওকেই দেখছে সারাক্ষণ, একদম নীরবে।
আসলে একা থাকলে মানুষের কল্পনাশক্তি বড্ড বেশি এদিক ওদিক ছূটে বেড়ায়, আর সেটাই হয় আসল শত্রু। মাথার মধ্যে কত রকম আজগুবি চিন্তা আসতে লাগল, যদি হুট করে মাথার ওপর লাফিয়ে পড়ে? যদি রাতে ঘুমিয়ে থাকার সময় বিছানায় উঠে আসে? মন বলছিল, ধুর! এমন কিচ্ছু হবে না কিন্তু ভয় কি আর অত যুক্তি-টুক্তি বোঝে?
রাতের খাওয়া শেষ করে নিজের ঘরে যাওয়ার আগে ও আর একবার উঁকি মেরে দেখল। টিকটিকিটা তখনও ঠিক ওখানেই ঠায় বসে আছে।
বাইরে একনাগাড়ে বৃষ্টির শব্দ, দূরে কোথাও ব্যাঙের ডাক, আর ঘরের ভেতর এই এক অদ্ভুত চাপা আতঙ্ক, এর মধ্যেই সুব্রত একসময় চোখটা বূজে এলো। তবে ঘুমিয়ে পড়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ওর মনের কোণে একটা অন্যরকম প্রশ্ন উঁকি দিয়েছিল,
জীবটা কি সত্যিই ওকে ভয় দেখাচ্ছে? নাকি এই বৃষ্টিভেজা রাতে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁইয়ের জন্যই সে বাড়ির দেয়ালশ আশ্রয় নিয়েছে?
পরদিন, রবিবার বলে সুব্রতের ঘুমটা ভাঙতে ভাঙতে একটু বেলা হয়ে গেল, ঘড়িতে তখন ওই আটটা ছুঁইছুঁই। তবে ওঠার সাথে সাথেই কিন্তু কালকের ওই দুটো গোলের কথা মাথায় এল, বিশেষ করে সেকেন্ড গোলটা… উফ! ডান দিক থেকে বলটা কেটে ভেতরে এনে অমন একটা বাঁক খাওয়ানো শট! বলটা যখন জালে জড়াল না, কয়েক সেকেন্ডের জন্য ওর সত্যিই মনে হচ্ছিল ও যেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের কোনো বড় ক্লাবের হয়ে খেলছেআরনিজের অজান্তেই ঠোঁটের কোণে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল।
ওই হাসিমুখটা নিয়েই ফ্রেশ হতে বাইরে এল সুব্রত আর স্বভাবদোষে চোখটা চলে গেল মেইন দরজার পাশের দেয়ালটায়। ব্যস! নিমেষে হাসি গায়েব।
টিকটিকিটা তখনও ওখানেই সেটে আছে, একদম সেম জায়গায়। যেন সারারাত এক ইঞ্চিও নড়েনি। সুব্রত তো থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ আর অবাক কাণ্ড তো, বাড়ির আর কারও এই নিয়ে কোনো হেলদোলই নেই! মা রান্নাঘরে ব্যস্ত, বাবা খবরের কাগজে মুখ গুঁজে দুনিয়ার খবর নিচ্ছে অথচ চোখের সামনে দেওয়ালে একটা জ্যান্ত প্রাণী বসে আছে, কারও কোনো পাত্তাই নেই। আর চুমকি? মানে ওদের বাড়ির বিড়ালটা, যে নিজেকে এই বাড়ির অঘোষিত রানি মনে করে। সারাদিন এমন আলসেমি দিয়ে শুয়ে থাকবে যে মনে হবে দুনিয়ার সব দায়িত্ব থেকে রিটায়ার করেছে কিন্তু শিকারের সময় ওর চোখ দুটো আলাদাভাবে জ্বলে উঠত! ইঁদুর, আরশোলা বা ছোটখাটো টিকটিকি, ওর নজর এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। কিন্তু আজ? আজ চুমকিও কেমন যেন ম্যাড়মেড়ে হয়ে আছে, সে একবারের জন্যও টিকটিকিটার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। শেষমেশ ধৈর্যের বাঁধটা ভেঙেই গেল ওর, "আজ তোকে তাড়াবই," মনে মনে গজগজ করতে করতে রান্নাঘর থেকে একটা লাঠি নিয়ে ও পা টিপে টিপে এগোল।
টিকটিকিটাও বোধহয় বিপদের টের পেয়েছিল। ব্যাস, পলকের মধ্যে দেয়াল বেয়ে নেমে এমন এক ছুট লাগাল যে সুব্রত শুধু চোখের সামনে একটা ধূসর ছায়া দেখতে পেল এবং সোজা গিয়ে ঢুকল পাশের খোলা দরজাটা দিয়ে, মানে সুব্রতের নিজের শোওয়ার ঘরে!
"লে হালুয়া! এবার তো গেল!" মুখটা শুকিয়ে চুন হয়ে গেডীয়ে, আজ রাতে নির্ঘাত ওটা বিছানায় উঠবে, নয়তো বালিশের পাশে এসে বসবে! ভাবতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। লাঠিটা আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, বুক ঠুকে ও ঘরের ভেতর ঢুকল।
ঘরে জানলা দিয়ে সকালের চিলতে রোদ এসে মেঝেতে পড়েছে। বাইরে কোথাও একটা পাখি ডাকছে, পাশের বাড়ি থেকে রান্নার আওয়াজও আসছে হালকা কিন্তু ঘরের ভেতরটা একদম থমথমে। টিকটিকিটা দরজার ওপাশে গিয়ে জাস্ট থমকে দাঁড়িয়েছে।
সুব্রত খুব সাবধানে পা বাড়িয়ে এগিয়ে গেল। আর তখনই ওর নজর পড়ল প্রাণীটার ওপর। ওমা, টিকটিকিটার ছোট্ট বুকটা কেমন ধকধক করে ওঠানামা করছে! ওইটুকু শরীরটা থরথর করে কাঁপছে, ঠিক যেন রেস জিতে এসে হাঁপাচ্ছে কেউ। সুব্রত আর এগোতে পারল না, ওখানেই স্টপ হয়ে গেল। এই সেই জীব, যাকে দেখে গত দুটো দিন ধরে ওর নিজের হার্টবিট বেড়ে যাচ্ছিল? কিন্তু এখন ওটার চোখে কোনো শয়তানি নেই, কামড়াতে আসার কোনো লক্ষণও নেই। আছে শুধু ভয়।
বড্ড চেনা, বড্ড চেনা একটা ভয়।
সুব্রত ঠায় দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। হাতের লাঠিটা হঠাৎ কেমন যেন ভারী ঠেকল ওর কাছে আর তখনই মাথার মধ্যে একটা অদ্ভুত চিন্তা খেলে গেল…আচ্ছা, এতক্ষণ যাকে ও নিজের এনিমি ভাবছিল, সেও কি সুব্রতকে দেখে সমান ভয় পাচ্ছে? একটা টিকটিকির চোখে মানুষ তো একটা আস্ত রাক্ষস, যে চাইলেই এক সেকেন্ডে ওটাকে পিষে দিতে পারে আর তখনই সুব্রত প্রথমবার নিজের ভয়ের আয়নায় অন্য একটা ভয়ের রিফ্লেকশন দেখতে পেল।
হাতটা আলগা হয়ে এল ওর, লাঠিটা মেঝেতে নামিয়ে রাখল আলতো করে। কিছুক্ষণ কেউ নড়ল না। একদিকে একটা মানুষ, অন্যদিকে একরত্তি একটা সরীসৃপ। দুজনেই নার্ভাস, দুজনেই অ্যালার্ট, অথচ তারা কেউ কাউকে অ্যাটাক করছে না।
এই থমথমে ভাবটার মধ্যেই হঠাৎ দেয়াল ঘড়ির দিকে নজর গেল সুব্রতের। সর্বনাশ! সাড়ে ন'টা বেজে গেছে!
১০টায় ম্যাচ, পৌঁছাতে হবে ঠীক সময়ে। তারপর আর ভাবার টাইম পেল না সে, তাড়াতাড়ি জার্সিটা গলিয়ে, বুট জোড়া হাতে নিয়ে, কিটব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে প্রায় এক দৌড়ে বাড়ি থেকে বেরল। দরজার কাছে গিয়ে অবশ্য একবার পেছন ফিরে তাকাশ, টিকটিকিটা তখনও দরজার আড়ালে চুপটি করে বসে আছে।
মাঠে পৌঁছালেও সুব্রতের মনটা কিন্তু খেলায় ছিল না। সুযোগ এসেছিল বেশ কয়েকবার গোলে বলটা জড়িয়ে দেওয়ার, সাধারণত ও এসব চান্স মিস করে না কিন্তু প্রতিবারই ফিনিশিংয়ের সময় শটটা হয় বাইরে চলে গেল, নয়তো গোলকিপার ক্যাচ লুফে নিল। শরীরটা মাঠে দৌড়াচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু মনটা যেন বাড়ির ওই বন্ধ ঘরেই পড়েছিল, শেষমেশ ১-০ গোলে হেরে মাঠ ছাড়তে হলো ওদের।
ফেরার পথে বন্ধুরা তো নিজেদের ভুলত্রুটি নিয়ে পুরো পোস্টমর্টেম শুরু করে দিল। কেউ রেফরির ওপর চিললাচ্ছে, কেউ গোলকিপারের গুফ-আপ নিয়ে রেগে আগুন। "আরে ওই বলটা কেউ মিস করে?" বা "রেফারি ওখানে ফাউলটা দিলই বা কেন, মাথায় ঢুকল না!"এই সব ছোলছে, সুব্রত কিন্তু পুরো বোবা হয়ে রইল। ওর মাথায় শুধু ওই একটাই দৃশ্য ঘুরপাক খাচ্ছিল, দরজার আড়ালে কাঁপতে থাকা ওই ছোট্ট বুকটা।
মাঠ থেকে ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে ও যখন নিজের ঘরে ঢুকল, দেখল টিকটিকিটা তখনও আছে। ঠিক একই জায়গায়। একই রকম শান্ত।
আজ কিন্তু আর ওটাকে দেখে সুব্রতের গা রি রি করে উঠল না, উল্টে কেমন যেন একটা মায়া হলো। বেচারা হয়তো বৃষ্টির চক্করে বাইরে বেরোতে পারেনি, কাল থেকে কিচ্ছু খায়ওনি বোধহয়। ভাবতে ভাবতেই ও রান্নাঘরে গেল আর মুড়ির কৌটো খুলে অল্প কটা মুড়ি হাতে নিয়ে ফিরে এল। যদিও ও শিওর না যে টিকটিকি আদৌ মুড়ি খায় কি না। তাও... ট্রাই করতে ক্ষতি কী? খুব কাছে যাওয়ার সাহসটা এখনও হয়নি, তাই একটু দূরের একটা তাকের ওপর মুড়িগুলো রেখে দিল তারপর একটা ছোট্ট বাটিতে একটু জল এনেও পাশে রাখল। টিকটিকিটা নড়ল না, জাস্ট স্ট্যাচু হয়ে রইল। সুব্রতও আর ঘাঁটাল না ওটাকে।
সন্ধে নামার পর আরও দু-একবার ঘরে ঢুকেছিল সে আর প্রতিবারই অজান্তে আগে চোখ যাচ্ছিল দেয়ালের দিকে। ওটা তখনও ওখানেই বসে আছে স্থিরভাবে কিন্তু একটা অদ্ভুত চেইঞ্জ হয়ে গেছে সুব্রতের নিজের ভেতরে। যে ভয়টা দুদিন আগেও ওর বুক কাঁপিয়ে দিত, সেই ভয়ের জায়গায় এখন কেমন যেন অন্য একটা ফিলিং দানা বাঁধছে, খুব স্লোলি, একদম চুপিসারে।
মায়া... হ্যাঁ, মায়াই তো!
সেদিন রাতে ও চুমকিকেও নিজের ঘরে ঢুকতে দিল না। বলা তো যায় না, যদি ভুল করে ওটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে!
রাত যখন বেশ নিশুতি হলো, বাইরের বৃষ্টির আওয়াজটাও কমে এল আস্তে আস্তে। জানলার কাঁচে দু-এক ফোঁটা জলের টুপটাপ শব্দ হচ্ছিল শুধু। সুব্রত বিছানায় শুয়ে পড়ল আর আজ কেমন যেন আশ্চর্যভাবে ঘুমটাও তাড়াতাড়ি চলে এল ওর চোখে।
রাতভর ঝমঝমিয়ে বৃষ্টির পর, ভোরে বৃষ্টিটা এক্কেবারে থেমে গিয়েছে। তার ফোঁটাগুলো তখনও ওই কার্নিশের ধারে ধারে টুপটুপ করে ঝুলছিল। পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলোটা ফুটতেই মনে হলো, চারপাশটা যেন কেউ সুন্দর করে ধুয়ে-মুছে সাফ করে দিয়েছে। উঠোনটা পুরো ভিজে, মাটির গন্ধের সাথে কেমন একটা মিষ্টি সোঁদা সোঁদা গন্ধ ভেসে আসছে পুরো বাড়িটায়। দূরে কোথাও কাক ডাকছে, শালিকের কিচিরমিচির শোনা যাচ্ছে, বৃষ্টির পর প্রকৃতি যেন একটা লম্বা দম নিয়ে আবার নতুন করে বাঁচতে শুরু করেছে।
সুব্রতের অবশ্য অত সিনারি দেখার টাইম নেই আজ, বড্ড ব্যস্ত দিন। ভোরে মাঠের প্র্যাকটিস, তারপর কলেজ, বিকেলে আবার ডিপার্টমেন্টাল হেডের কাছ থেকে কিছু ইম্পর্ট্যান্ট নোটস নেওয়ার কথা আছে। ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো করে জামাকাপড় গুছিয়ে ও যখন দরজার দিকে এগোচ্ছিল, ঠিক দরজাটা খোলার আগেই হুট করে ওর পা দুটো জাস্ট জমে গেল।
দেয়ালটা পুরো ফাঁকা!
এক সেকেন্ডের জন্য সুব্রত পুরো ব্ল্যাঙ্ক হয়ে গেল, চোখ দুটো ভালো করে রগড়ে নিয়ে আবার তাকাল ওখানটায়। না, সত্যি তো, কেউ নেই! ও তখন ঘরের এদিক ওদিক খুঁজতে শুরু করল, জানলার ধারটা দেখল, আলমারির পেছনে উঁকি মারল, দরজার আড়ালটাও ভালো করে চেক করল কিন্তু কোথাও কিচ্ছু নেই।
টিকটিকিটা চলে গেছে।
আসলে বৃষ্টির আশ্রয়টা তো শেষ হয়ে গেল, আকাশও একদম পরিষ্কার তাই যে গেস্ট দুটো দিন কিচ্ছু না বলে, কোনো ঝামেলা না করে ঘরের একটা কোণে পড়েছিল, সেও চুপচাপ নিজের দুনিয়ায় ফীরে গেছে।
পেছন থেকে মা রান্নাঘর থেকেই চেঁচিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "কী রে, অত কী খুঁজছিস সকাল সকাল?"
সুব্রত একটু চুপ থেকে ফিরে তাকাল, "না না, কিছু না তো।"
মা একটু হেসে বললেন, "ওই টিকটিকিটার কথা বলছিস তো ? তোকে তো বললামই, বৃষ্টিটা থামলেই ও ঠিক চলে যাবে।"
সুব্রত আর মুখ খুলল না কিন্তু ওর মনের ভেতরটা কেমন যেন খামচে ধরল। বড্ড অদ্ভুত একটা ফিলিং। যে প্রাণীটাকে প্রথম দিন দেখেই ও লাঠি নিয়ে মারতে গিয়েছিল, আজ সেটা চলে যেতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
ও আস্তে আস্তে তাকটার কাছে এগিয়ে গেল। কালকে যে মুড়িগুলো রেখেছিল, ওগুলো যেমনকার তেমনই পড়ে আছে, পাশের ওই ছোট্ট বাটির জলটাও পুরো অক্ষত। দেখে নিজের ওপরই কেমন একটা হাসি পেয়ে গেল সুব্রতের। মনে মনে বলল, "ধুর, আমি একটা আস্ত গাধা!" টিকটিকি কি কখনও মুড়ি খায় নাকি! তাও... তখন কেন যেন মনে হয়েছিল একটা ক্ষুধার্ত অতিথি এসেছে বাড়িতে, ওর জন্য কিছু একটা রাখা দরকার। ভুল ভেবেছিল ঠিকই, কিন্তু সেই ভুলের পেছনে যে খাঁটি মায়া ছিল, সেটা তো আর ভুল ছিল না।
সুব্রত জানলাটা পুরো খুলে দিল আর সাথে সাথেই সকালের ওই ঠান্ডা হাওয়াটা হু হু করে ঘরে ঢুকে পর্দাটা উড়িয়ে দিল। আর ওই হাওয়ার সাথেই যেন গত দুটো দিনের একগাদা স্মৃতি একসাথে হুড়মুড় করে ফিরে এল ওর মাথায়। প্রথম দিনের সেই মারাত্মক ভয়, দেয়ালে ওটাকে দেখে চমকে ওঠা, লাঠি উঁচিয়ে তেড়ে যাওয়া তারপর দরজার ওপাশে কাঁপতে থাকা ওই একরত্তি শরীরটা আর ওই দুটো ছোট্ট চোখ, বড্ড ভীতু, বড্ড হেল্পলেস।
সুব্রত বেশ কিছুক্ষণ জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব আস্তে আস্তে একটা জিনিস রিয়ালাইজ করল, এতদিন ও ভাবত টিকটিকিটাই ওর ভয়ের কারণ, কিন্তু আসল সত্যিটা তো তা নয়। ওটাও তো সুব্রতকে দেখে সমান ভয় পেয়েছিল! দুজনেই আসলে নার্ভাস ছিল, শুধু ভয়ের রূপটা আলাদা ছিল আর কী।
চুমকি কখন যে গুটিসুটি মেরে ঘরের ভেতর ঢুকে বিছানায় বসে পড়েছে, সুব্রত টেরই পায়নি। বিড়ালটার দিকে তাকিয়ে ও একটু হাসল, তারপর আলতো করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিল আর চুমকিও ওর ওই অলস চোখ দুটো একবার খুলল, তারপর জাস্ট পাত্তাই দিল না আবার চোখ বুজে ফেলল, যেন দুনিয়ার কোনো কিছু নিয়েই ওর বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই।
সুব্রত আবার জানলার বাইরে তাকাল। এই মুহূর্তে টিকটিকিটা কোথায় আছে কে জানে! হয়তো কোনো কড়া রোদ ওঠা দেয়ালে গিয়ে রোদ পোয়াচ্ছে, নয়তো গাছের পাতার আড়ালে লুকিয়ে আছে কিংবা অন্য কোনো বাড়ির কার্নিশে ঢুকেছে। হয়তো আর কোনোদিনই দেখাই হবে না ওটার সাথ, ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন খচখচ করে উঠল। বিদায়টা যেন ঠিকঠাক হলো না, শেষবারের মতো ওই চোখ দুটোও দেখা হলো না।
ঘড়ির কাঁটা তো আর থেমে থাকবে না, ওটা টিকটিক করে এগিয়ে চলেছে। মাঠে যাওয়ার টাইম হয়ে এসেছে। সুব্রত কিটব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল আর দরজার কাছে এসে একবার থামল, তারপর শেষবারের মতো তাকাল ওই ফাঁকা দেয়ালটার দিকে। ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটে উঠল ওর।
সুব্রত দরজাটা টেনে বাইরে বেরিয়ে গেল। পেছনে পড়ে রইল ফাঁকা ঘরটা, আর ওই খালি দেয়ালটা। কোথাও কোনো টিকটিকি নেই। শুধু পড়ে রইল দুদিনের একটা ছোট্ট চেনা গল্প, একটি বর্ষার সকাল, একটি আশ্রয়প্রার্থী প্রাণ, আর এক যুবকের মনে বড্ড নিঃশব্দে জন্ম নেওয়া এক অদ্ভুত সহমর্মিতা।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।