"পাহাড় কখনও মানুষের সঙ্গে কথা বলে না। তবু যারা মন খুলে শোনে, তারা জানে—বাতাস, বৃষ্টি আর নীরবতারও নিজস্ব ভাষা আছে।"
কলকাতার একঘেয়ে কোলাহল থেকে কয়েক দিনের মুক্তি খুঁজছিল তিন বন্ধু—ঋত্বিক, সৌরভ আর নীল। অফিসের কাজ, শহরের ধোঁয়া, আর প্রতিদিনের ব্যস্ততা তাদের মনকে ক্লান্ত করে তুলেছিল। তাই বর্ষার মাঝামাঝি এক সকালে তারা ব্যাগ কাঁধে তুলে রওনা দিল উত্তরবঙ্গের পাহাড়ের দিকে।
ট্রেনের জানলার বাইরে শহর ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সবুজ মাঠ, নদী, চা-বাগান আর দূরে নীলাভ পাহাড় যেন নতুন এক পৃথিবীর দরজা খুলে দিল।
পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি এগোচ্ছিল। চারদিকে মেঘ নেমে এসেছে। কখনও রাস্তার ওপরে, কখনও পাইনগাছের ডালে। গাড়ির কাঁচ বেয়ে নেমে আসা বৃষ্টির ফোঁটাগুলো দেখে নীল মৃদু স্বরে বলল,
—"এমন বৃষ্টিতে শহর কেবল ভিজে যায়, কিন্তু পাহাড় যেন বেঁচে ওঠে।"
ড্রাইভার হেসে উত্তর দিল,
—"বর্ষার পাহাড়কে ছোট করে দেখবেন না বাবুরা। এখানে পথও কখনও কখনও মানুষকে পরীক্ষা নেয়।"
বিকেলের দিকে তারা একটি ছোট বনবাংলোয় পৌঁছাল। সামনে গভীর উপত্যকা, নিচে গর্জন করা নদী, চারপাশে পাইন আর বুনো ফুলের গন্ধ। প্রকৃতির এমন নীরবতা তারা আগে খুব কমই অনুভব করেছে।
সন্ধ্যার আগে কাছের পাহাড়ি পথ ধরে হাঁটতে বেরোতেই বনবাংলোর বৃদ্ধ পাহারাদার বললেন,
—"রাত হলে আর বাইরে বেরোবেন না। বর্ষায় পাহাড় নিজের নিয়মে চলে।"
ঋত্বিক হেসে বলল,
—"আমরা একটু ঘুরেই ফিরে আসব।"
বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না। শুধু আকাশের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
রাত নেমে এলো খুব দ্রুত।
টিনের ছাদে বৃষ্টির শব্দ যেন একটানা বাজতে লাগল।
কিন্তু অভিযানের নেশা তিন বন্ধুকে বসিয়ে রাখতে পারল না। রাত আটটার দিকে তারা আবার বেরিয়ে পড়ল। হাতে টর্চ, পিঠে ব্যাগ।
পাহাড়ি পথ ক্রমশ সরু হতে লাগল। কুয়াশা এত ঘন যে সামনের মানুষটাকেও স্পষ্ট দেখা যায় না।
হঠাৎ নীল হাত তুলে সবাইকে থামাল।
—"শুনছিস?"
দূরে কোথাও কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে !
সুরটা অদ্ভুত। না আনন্দের, না দুঃখের। যেন বহু পুরোনো কোনো স্মৃতি ভেসে বেড়াচ্ছে বৃষ্টির ভেতর।
সৌরভ বলল,
—"এদিকে তো কোনো গ্রাম নেই!"
তবুও তিনজন সেই সুরের দিকেই হাঁটতে শুরু করল।
কিন্তু যতই এগোয়, বাঁশির শব্দ ততই দূরে সরে যায়।
মনে হয়, পাহাড় যেন তাদের নিয়ে খেলছে।
"সব পথ গন্তব্যে পৌঁছায় না। কিছু পথ শুধু মানুষকে নিজের ভেতর পৌঁছে দেয়।"
হঠাৎ টর্চের আলো নিভে গেল।চারদিকে শুধু বৃষ্টি।শুধু কুয়াশা।শুধু পাহাড়ের নিঃশ্বাস।
মোবাইলে কোনো নেটওয়ার্ক নেই।তারা বুঝল—পথ হারিয়েছে।
ঠিক তখনই কুয়াশার ভেতর একটা ক্ষীণ আলো দেখা গেল।
একটি ছোট কাঠের ঘর।
দরজার সামনে বসে একজন বৃদ্ধা চা বানাচ্ছেন।
তিনি যেন তাদের আসার অপেক্ষাতেই ছিলেন।
—"এসো। ঠান্ডা লেগে যাবে।"
তিনজন কোনো কথা না বলে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
মাটির চুলোর আগুন, ধোঁয়ার গন্ধ আর গরম লাল চা—শরীরে আবার উষ্ণতা ফিরে এল।
বৃদ্ধা শান্ত গলায় বললেন,
—"ভোর হলে ডানদিকের পথ ধরে চলে যেও। বাঁদিকের পথ কখনও ছোট নয়।"
ঋত্বিক হেসে বলল,
—"আপনি একা থাকেন এখানে?"
বৃদ্ধা শুধু মৃদু হেসে জানলার বাইরে তাকালেন।
উত্তর দিলেন "না"।
রাতের শেষ ভাগে তিন বন্ধু ঘুমিয়ে পড়ল।
ভোরে চোখ খুলতেই দেখল বৃষ্টি থেমে গেছে।
বৃদ্ধা নেই।চুলোর আগুন নিভে গেছে।তারা বাইরে বেরোল।
কিছু দূরে সত্যিই রাস্তা দু'ভাগ হয়েছে।
ঋত্বিক বলল,
—"বাঁদিক দিয়ে গেলে সময় বাঁচবে।"
সৌরভ সঙ্গে সঙ্গে বলল,
—"না। বৃদ্ধার কথা মনে আছে তো?"
শেষ পর্যন্ত তারা ডানদিকের পথই নিল।
ঘণ্টাখানেক হাঁটার পর একটি ছোট পাহাড়ি গ্রামে পৌঁছে তারা রাতের ঘটনাটা বলতেই সবাই অবাক হয়ে গেল।
একজন বৃদ্ধ ধীরে ধীরে বললেন,
—"ওখানে কোনো ঘর নেই। পনেরো বছর আগে বড় ধসে সব ভেসে গিয়েছিল।"
নীল চমকে উঠল।
—"অসম্ভব! আমরা তো সেখানে রাত কাটিয়েছি!"
বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
—"এই পাহাড়ে মাঝে মাঝে কেউ কেউ পথ হারায়। আবার কেউ কেউ অলৌকিকভাবে ফিরে আসে। আমরা শুধু এটুকুই জানি—যারা ফিরে আসে, তারা সবাই বলে... দূরে কোথাও বাঁশির সুর শুনেছিল।"
তিন বন্ধু আবার সেই জায়গায় ফিরে গেল।কিন্তু সেখানে ছিল না কোনো ঘর।
না কোনো চুলা।
না কোনো বৃদ্ধা।
শুধু ভেজা পাথর, কুয়াশা আর পাহাড়ি বাতাস।
হঠাৎ খুব দূর থেকে আবার ভেসে এল সেই একই বাঁশির সুর।তিনজন একসঙ্গে তাকিয়ে রইল।
এবার আর কেউ এগিয়ে গেল না।
তারা বুঝেছিল, সব রহস্যের উত্তর খুঁজতে নেই।কিছু রহস্যকে সম্মান করতে হয়।
কলকাতায় ফিরে জীবনের ব্যস্ততা আবার শুরু হয়ে গেল।
কিন্তু বর্ষার রাতে জানলার কাঁচে যখন বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে, তখন ঋত্বিক, সৌরভ আর নীলের মনে একসঙ্গে ভেসে ওঠে সেই পাহাড়ি রাত, সেই কুয়াশা, সেই অচেনা বৃদ্ধা...
আর দূরে কোথাও বাজতে থাকা— শেষ বাঁশির সুর।
"প্রকৃতি কখনও অলৌকিকতা দেখায় না; সে শুধু মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—সবকিছুর ব্যাখ্যা জানা জরুরি নয়। কিছু অজানা থেকেই পৃথিবী সুন্দর হয়ে থাকে।"
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।