দিন পনের হলো আকাশ জুড়ে ঘনকালো মেঘের আনাগোনা লেগেই আছে। বিগত রথের দিন রথেরমেলা বসতে না বসতেই বৃষ্টির দাপটে ভেসে গেল। পরদিন থেকে খেপে খেপে বৃষ্টি হয়েই চলেছে। যখন তখন বৃষ্টি নামছে। সকালে আকাশ পরিষ্কার থাকতে দেখলেও দুপুর গড়াতে না গড়াতেই আকাশ কালো করে ঝেঁপে বৃষ্টি নামছে। মিনিট দশেক পর আকাশ আবার আগের মত মেঘহীন হয়ে যাচ্ছে! দুপুর গড়িয়ে বিকেল ইস্তক মোটামুটি বৃষ্টিহীন হয়ে থাকলেও সন্ধ্যের পর কিংবা মাঝরাতে আবার আচমকা ঝমঝম করে বৃষ্টি নামছে।রাতের আকাশে চাঁদের দেখাও মাঝেসাঝে মিলছে। এমন পরিস্থিতিতে অফিসে যাতায়াত করাটাই বিষম দায় হয়ে উঠেছে। তবুও পেটের দায়ে বাড়ি থেকে বেরোতে হচ্ছে আমাদের।
আজ অফিস থেকে বেরোতেই ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। ওই বৃষ্টিতেই টোটোয় চেপে পাড়ায় এসে বাড়ির সরু গলির মুখে নেমে ছাতায় মাথা ঢেকে সাবধানে পা ফেলে বাড়ির দিকে হাঁটছি।ক'দিন ধরেই লাগাতার বৃষ্টি হবার দরুন গলিটা জলকাদায় মাখামাখি হয়ে আছে।দেখেশুনে সাবধানে পা না ফেলে যখন তখন পা পিছলে ধপাস হলেই কাদায় মাখামাখি হতে হবে। এই গলির সবকয়টা বৈদ্যুতিন বাতিস্তম্ভই প্রতিবেশীদের গাছগাছালি এবং জংলী লতাপাতা আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছে। সেই কারণে সন্ধ্যের পর গলির ভিতর আলোআঁধারি খেলা চলতেই থাকে। নিত্যদিন হাঁটাচলা করার দরুন এই আলোআঁধারিতেই গলি দিয়ে হাঁটাচলা করতে খুব একটা অসুবিধা হয় না কারও।
গলিটা যেখানে থেকে ডান দিকে বাঁক নিয়েছে ওখানেই আমাদের বাড়ি। বাঁকের এক ধারে আমাদের বাড়ি এবং অন্য ধারে পাড় বাঁধান বিশাল একটা পুকুর। পুকুরটার নাম ভঞ্জপুকুর। ওই ভঞ্জপুকুরে মাছচাষ করা হয়।বেপাড়ার এক মাছের কারবারি ওই ভঞ্জপুকুর পাট্টা নিয়ে মাছের চাষ করেন। ভঞ্জপুকুরের জলে চারপোনা ছেড়ে তাদের লালনপালন করে খানিকটা বড় করে নিয়ে বিক্রি করেন অন্য এক মাছচাষির কাছে। সেই মাছচাষিও সেই মাছ লালনপালন করে আকারে এবং ওজনে তাদের শ্রীবৃদ্ধি ঘটিয়ে বিক্রি করেন এলাকারই খুচরো মাছ বিক্রেতাদের কাছে। আমরা ওই মাছই বাজার থেকে কিনে এনে রেঁধে খাচ্ছি।
এই এলাকায় বেশ কিছু নোংরা স্বভাবের মানুষ রয়েছেন। তাঁরা ভঞ্জপুকুরটাকে আবর্জনা ফেলার ডাস্টবিন বানিয়ে নিয়েছে। সর পর ভঞ্জপুকুরের জল আলোড়িত হয় ঝুপঝাপ শব্দে। আমরা ভাবি কোন বড় আকারের মাছ পুকুরের জলে ঘাই মারছে। কিন্তু সকাল হতেই সকলের সামনে আসল রহস্য উন্মোচিত হয়। সকালে দেখা যায় ভঞ্জপুকুরের কিনারের কাছে বাতাস লেগে আবর্জনার পুঁটলিগুলো হেলেদুলে জলের বুকে নড়াচড়া করছে। যিনি ভঞ্জপুকুর পাট্টা নিয়েছেন এই ডাস্টবিন করে নেবার ব্যাপারে তাঁর যেন ক্ষোভের অন্ত নেই।কাউকে হাতেনাতে ধরতেও পারছেন না। হাতেনাতে ধরতে পারলেও মনে হয় না বেপাড়ার মানুষ বলে অপরাধীকে হয়তো তেমন শাস্তি দিতে পারবেন। পাড়ার নোংরা স্বভাবের মানুষেরাও নিশ্চয়ই ছেড়ে দেবে না তাঁকে?
এসব ভাবনায় ডুবে থেকে একটু একটু করে বাড়ির দিকে এগোচ্ছি। সহসা ঝিরঝিরে বৃষ্টি বদলে গেল মুষলধারায়। ঘনকালো মেঘ থেকে বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা তিরের মতো এসে আছড়ে পড়ছে ছাতার ওপর। তাতেই লাগাতার ঝম্-ঝম্-ঝম্ আওয়াজ হচ্ছে।কেন জানি না ওই শব্দের মূর্ছনায় অমনি দুম করে ছেলেবেলায় ফিরে গিয়ে বৃষ্টির ধারাপাতের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বলে উঠলাম, 'পা পিছলে আলুর দম'।
বৃষ্টির ঝম্-ঝম্-ঝম্ শব্দের সঙ্গে তাল মিলিয়ে যেই 'পা পিছলে আলুর দম' বলে উঠেছি অমনি কে যেন আমার পিছনে ধপাস করে পা পিছলে আলুর দম হলো। চকিতে দাঁড়িয়ে পড়ে পিছন ঘুরে দেখতে গেলাম কে আছাড় খেল। কিন্তু আলোআঁধারি হাতড়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ভাবলাম হয়তো আমারই মনের ভুল। সেইভেবে আবার হাঁঅতে শুরু করলাম। বাড়ির দিকে চার কদম এগোতেই কে যেন আমার কানের পাশে ফিসফিস করে বলে উঠল, 'রেলগাড়ি ঝমাঝম/পা পিছলে আলুর দম।'
চমকে উঠে এই আলোআঁধারিতে বক্তাকে দেখার চেষ্টা করছি এমন সময়ে বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে দূর থেকে ভেসে এল রেলগাড়ির ইঞ্জিনের তীব্র হুইশেল! পরমুহূর্তেই কাঁসাইনদীর দুই পাড় কামড়ে চিত হয়ে পড়ে থাকা রেলওয়ে ব্রিজের ওপর দিয়ে একটা লোকাল ট্রেন ঝমঝম করতে করতে কাঁসাইনদীর এক দিক থেকে অন্যদিকে চলে গেল।
পরপর এমন অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটতে থাকায় আমি এতটাই আতঙ্কগ্রস্ত হলাম যে, এক অজানা আশঙ্কায় আমার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। ভয়ে সেখানেই জমে যাচ্ছি বুঝতে পেরে অমন অঝোর ধারায় ঝরতে থাকা বৃষ্টির মধ্যেই জলকাদা ভরা গলির ভিতর দৌড়তে শুরু করলাম। পা পিছলে গিয়ে টাল সামলাতে না পেরে আছাড় খেলে হাড়গোর ভেঙ্গে যাবার ভয় থাকলেও সেই ভয়কে মাথায় উঠে নৃত্য করার সুযোগ না দিয়ে যতটা জোরে সম্ভব সামনের দিকে ছুটতে ছুটতেই মনেমনে হিসেব করে দেখলাম, এমন করে ছুটতে পারলে আর মিনিট চারেক পরই বাড়িতে ঢুকে যেতে পারব।
সহসা আরও একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল আমার সঙ্গে। বৃষ্টিভেজা গলির ভিতর দিয়ে অমন পড়ি কি মরি করে ছুটতে থাকলেও আমি যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেখান থেকে এক চুলও এগোতে পারি নি! মনেহলো কে যেন আমাকে চেপে ধরে আছে ওই একই স্থানে!
বৃষ্টির বেগ এখন আরও বেড়েছে। গলির ডান দিকে পকাইদের বাড়ি। পকাইদের বাড়ির টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটা এমন ঝমঝম আওয়াজ তুলেছে যেন বৃষ্টিভেজার আনন্দে টিনের চালটাই তবলায় বোল ফোটাচ্ছে। কথাটা মাথায় আসতেই কে যেন আমাকে দিয়ে জোর করে বলিয়ে ছাড়ল, 'কাহারবা নয় দাদরা বাজাও।' অমনি বৃষ্টির ফোঁটাগুলো টিনের চালের ওপর তবলায় দাদরা বোল ফোটাতে শুরু করলো!
পরমুহূর্তেই শুনতে পেলাম কে যেন বৃষ্টির ফোঁটাদের গলা তুলে শাসনের ভঙ্গিতে বললো, 'আহ্ শশীকান্ত, উলটোপালটা মারছো চাঁটি।' সেই শুনেই ভয়ে আমার দম বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো। প্রাণপণে ছুটে পালাতে চাইছি অথচ এক চুল এগোতে পারছি না।এইমুহূর্তে আমার কানের পাশে একটাই নাম একটানা বেজে চলেছে, শশীকান্ত-শশীকান্ত-শশীকান্ত...!
শুনতে শুনতে কথাটা আমার মনে পড়ে গেল। একসময়ে শশীকান্ত নামের একজন বেকার যুবক এই গলিতেই থাকত।সে রোজ বিকেলে নিজের ঘরে বসে তবলায় রকমারি বোল ফোটাত। এক বছর আমার সঙ্গে ভাব জমাতে এসেছিল। তখন সদ্য চাকরিতে ঢুকেছি বলে শশীকান্তকে মোটেও পাত্তা দিই নি। বেকার যুবকের সঙ্গে খামোখা ভাব জমাতে যাব কেন? সেই ঘটনার মাস পাঁচেক বাদে শশীকান্ত নামের যুবকটি কাউকে কিছু না বলে কোথায় যেন চলে গেল। তারপর থেকে তার আর কোন খোঁজই পাওয়া গেল না! সেও তো সাত বছর আগেকার ঘটনা। এতদিনে পাড়াপ্রতিবেশীরা শশীকান্ত'র কথা হয়তো ভুলেই গিয়েছেন।
আজ আচমকা কেন যেন সেই যুবকটির কথা আবার মনে পড়ে গেল! শশীকান্তর কথা মনে পড়ে যাওয়ায় নিজেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম। বেকার বলে শশীকান্তকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে ঠিক কাজ করি নি। হয়তো তাতেই অপমানিত বোধ করে কাউকে কিছু না বলে কোথাও চলে গিয়েছে সে। শশীকান্ত নিখোঁজ হয়ে যাবার পর ওর মা-বাবাও এই গলি ছেড়ে নিজেদের প্রাচীন বাড়িটাকে পরিত্যক্ত অবস্থায় ফেলে রেখে কাছেরই একটা শহরে গিয়ে উঠেছেন।শশীকান্তর বাবা মৃগাঙ্কবাবু কালেভদ্রে আসেন নিজেদের প্রাচীন বাড়িটির খবরাখবর নিতে। সেসব দিনে পথেঘাটে কদাচিৎ দেখা হয়ে গেলে মৃগাঙ্কবাবু ম্লান হেসে আমাকে শুধোন, 'কেমন আছ চিন্ময়?"
শশীকান্তর ভাবনা ছেড়ে ওই একই স্থান থেকে ক্রমাগত ছোটার চেষ্টা করতে করতে যখন হাঁপিয়ে উঠেছি ঠিক তখনই কে যেন আমাকে ঝপ্ করে বাতাসে ভাসিয়ে দিল! আমিও অমনি জলেভেজা পাখির মত উড়তে শুরু করলাম বৃষ্টিভেজা আকাশে। সেই অজানা শক্তি আমাকে উড়িয়ে নিয়ে গিয়ে ফেললো বাড়ির দোরগোড়ায়। আমিও অমনি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।
এরপর দরজার কড়া নাড়ার জন্য যেই হাত বাড়িয়েছি অমনি গলির অপর দিকে ভঞ্জপুকুরে 'ঝপাং' করে ভারী কোন বস্তু পড়ার আওয়াজ হলো। তাতেই পুকুরের জল এমন করে ছলকে এসে গায়ে পড়ল মনে হলো সাগরের মস্তবড় একটা ঢেউ এসে আছড়ে পড়ল আমার ওপর। অমনি ভয়ে দিশেহারা হয়ে গেলাম।
সহসা শশীকান্তদের পরিত্যক্ত প্রাচীন অট্টালিকার একটা অংশ হুড়মুড় করে ভেঙ্গে পড়ল।একটা ইটের টুকরো ছিটকে এসে পড়ল আমারই পায়ের কাছে। ভাগ্যিস ওই পরিত্যক্ত বাড়িতে আজ আর শশীকান্তদের পরিবারের কেউ থাকে না। যদি কেউ থাকতো তাহলে সে এখনই দেয়াল চাপা পড়ে মারা যেত।
আচমকা কাছেপিঠে কোথাও বিকট আওয়াজ করে বাজ পড়ল। ওই বাজের আলোয় দেখলাম, একটা যুবকের লাশ চিৎ হয়ে ভঞ্জপুকুরের জলে ভাসছে! পরমুহূর্তে ধারেকাছে আরও একটা বাজ পড়ল। এবার ওই বাজের আলোয় জলে ভাসমান যুবকটির মুখ দেখতে পেয়ে ভয়ে কাঠ হয়ে গেলাম।শশীকান্ত! এরপর আর দাঁড়িয়ে থাকার সাহস হল না আমার। ভয়ের জড়তা কাটিয়ে বন্ধ দরজায় দমাদম করাঘাত করতে থাকলাম। মা এসে দরজা খুলে দিলেন আর আমিও বাড়ির ভিতর ঢুকে এলাম।
আমার আতঙ্কগ্রস্ত চেহারা দেখে বাবা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, "তোমার অমন চেহারা হয়েছে কেন চিনু?" মা-বাবা আমার চিন্ময় নামটা কেটেছেটে 'চিনু' করে নিয়েছেন। পুকুরের জলে শশীকান্তকে ভেসে থাকতে দেখে এলাম শুনে বাবা তক্ষুনি ছাতা মাথায় দিয়ে পাঁচ ব্যাটারির টর্চ নিয়ে পুকুরের চারধারে ভাল করে দেখে এসে আমাকে ভৎসনার সুরে বললেন, "কই, তেমন কিছু তো আমার চোখে পড়ল না চিনু! নিশ্চয়ই তোমার দেখার ভুল হয়েছে।শশীকান্ত কেন, ওই পুকুরে কোন মানুষেরই লাশ ভাসছে না।"
ভোরের দিকে বৃষ্টি থামল। বাড়ি ভেঙে পড়ার সংবাদ পেয়ে শশীকান্তর মা-বাবা দুপুরেই ছুটে এলেন। নিজেদের বাড়ির ওই হাল দেখার শশীকান্তর বাবা চন্দ্রনাথবাবু এসে দেখা করলেন আমার বাবার সঙ্গে। গত রাতে কি দেখেছি বাবা সেইকথা বললেন চন্দ্রনাথবাবুকে। শুনে চন্দ্রনাথবাবু কান্নায় ভেঙে পড়ে যা যা বললেন তাতে আমরা একেবারে হতবাক হয়ে গেলাম। আজ দুপুরে দিল্লি থেকে এক বাঙালি ভদ্রলোক নাকি ফোন করে চন্দ্রনাথবাবুকে জানিয়েছেন, তাঁদের একমাত্র সন্তান শশীকান্ত কোন একটা হোটেলে চাকরি নিয়ে তাঁদের না বলেকয়ে দিল্লি চলে গিয়েছিল। আজ সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে হোটেলে যাবার পথে শশীকান্ত মালবোঝাই ট্রাকের তলায় চাপা পড়েছে। তাঁরা নাকি আজ রাতের ট্রেনে দিল্লিতে যাচ্ছেন।সেই ভদ্রলোকটির বলা কথার সত্যিমিথ্যা যাচাই করার জন্য চন্দ্রনাথবাবুরা যখন দিল্লি যাবার তোড়জোড় করছেন তখনই সুবীরবাবু ফোন করে তাঁদের বাড়ি ভেঙ্গে পড়ার কথা জানিয়েছেন।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।