মাংকি ম্যানের সাথে পরিচয়টা বড় অদ্ভুত।সেবার ব্রহ্মপুত্র মেইল সময়ের চেয়ে বেশ দেরীতে তিনসুকিয়া পৌঁচ্ছালো।যখন পৌঁচ্ছালো বিকেলের আকাশ জুড়ে কালো মেঘ।ষ্টেশনের বাইরে রাস্তায় দু’একজন লোক ছাতা নিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটছে। সমস্ত আকাশ এমন কালো মেঘে ছেয়ে গেছে, দেখে মনে হয় এখন সন্ধ্যা। সামনের গাছগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে কে যেন খুব যত্ম করে তাদের স্নান করিয়ে দিচ্ছে। আজ আমি সত্যিই অবাক হচ্ছি ; মনে হচ্ছে একেবারে নতুন কিছু দেখছি। নতুন এক দেশ এবং তার প্রকৃতির নতুন আবেশ। এই বৃষ্টিতে বাইরে যাওয়া সম্ভব হবে না।  রবীন্দ্রনাথ মনে পড়ে ‘নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে ওগো, আজ তোরা যাস নে ঘরের বাহিরে।’ এমনই কোন মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন কিনা জানিনা, মনে করার চেষ্টা করি বর্ষা নিয়ে শেলির বিখ্যাত কোন কবিতা। মনে করতে পারি না। বৃষ্টির রিমঝিম শব্দের মাঝে হঠাৎ হঠাৎ শোনা যাচ্ছে বজ্রের গর্জন। চারদিক একটা ধূসর মিহি চাদরে ঢেকে দিয়ে বৃষ্টি পড়ছেই। এর আগে কখনো তিনসুকিয়া আসিনি। অচেনা জাযগায় পরিচিত বৃষ্টিতে শিপ্রা বসু গান গেয়ে উঠে মন- আমার বাদল দিন আমারে যে একা রেখে যায়...। ভাবতে ভাবতে শৈশবের ব্যাঙ চাতরার কথা মনে পড়ে। পুরোনো পাড়ায়ও কি বৃষ্টি নামল? পথঘাট বৃষ্টির দাপটে নদী। ডুবছে মাঠ, ভাসছে বাজার, দোকান। কারও হারিয়েছে ছাতা, জলে ভাসছে কারও রাতে লেখা অভিমানের চিঠি। বর্ষা এমনই। কত কিছুর সঙ্গে এই অবিশ্রান্ত বৃষ্টি পতন জড়িয়ে থাকে। কত খণ্ড খণ্ড ছবি তৈরি করে, কত ছবি ভাসিয়ে নিয়ে যায়! দৃষ্টির দূরত্বে গায়ে গা লাগিয়ে বাড়িগুলো ভিজছে। ব্যাঙ টাতরা রোডের সেই বর্ষায় প্রায় অচল হয়ে যাওয়া কোনো কোনো দিন পরেশদার মুদি দোকান, অমরদের লন্ড্রি ছিল সিগারেট খাওয়ার আড়াল। চাল, তেলের ঘ্রাণ, ভারী লোহার গরম ইস্ত্রিও ফোঁস ফোঁস বাষ্পের শব্দের সঙ্গে মিশে যাওয়া সস্তা সিগারেটের কটূ তামাকের ঘ্রাণ আজও বর্ষাক্লান্ত দিনগুলোতে ফিরে আসে। বৃষ্টি থামে না। কারও ছাতার তলায় আশ্রয় নিয়ে হেঁটে বেড়ানো এখানে-ওখানে। শার্ট ভিজে যাচ্ছে, স্যান্ডেল ভিজছে, একা ভিজছে কোনো বাগানে সাদা গন্ধরাজ।

-এখনই বেরিয়ে না গেলে ওয়াকরো যাবার বাস পাবেন না। আধ ঘন্টার মধ্যে শেষ বাস ছেড়ে যাবে।

সহযাত্রীর কথায় কাক ভেজা হয়ে গাড়ির সাথে দরদাম করে একটায় উঠে বসলাম। গাড়ি দিয়ে যেতে যেতে মনে হলো বর্ষা একা করে দিতে পারে। করে দেয়ও। এই কোলাহলের শহরে জীবন কাটানো কোনো মানুষ বর্ষার বৃষ্টি দেখতে দেখতে একা হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই পেছনের দিনগুলোতে একা হওয়া যাওয়ার অনুভূতির মানচিত্র খুঁজে পাওয়া যেত না হয়তো। কিন্তু কিশোর বয়সে বর্ষা মনের মধ্যে অজানা এক বিষাদের ছবি তৈরি করে দিত, সেটা এখন অনেকটা সময়ের দূরত্বে দাঁড়িয়ে অনুভব করা যায়। স্মৃতি সেই বর্ষায় এক অবলুপ্ত স্থাপত্যের জলমগ্ন সিঁড়ি। কিছুটা ভেসে আছে এখনও, বাকিটা হারিয়ে গেছে। বাস ষ্ট্যান্ডে ঢুকেই শুনলাম ওয়াকরোর বাস মাত্রই ছেড়ে গেছে। আজকের শেষ বাস দশ মিনিট পরে ছাড়বে কিন্তু সেটা ওয়াকরো যেতেও পারে নাও যেতে পারে তবে নামচাই পর্যন্ত অবশ্যই যাবে। কি করবো বুঝে ওঠতে পারছিনা। নামচাই কেউ চেনা নেই তিনসুকিয়াতেও কেউ জানাশোনা নেই। তিনসুকিয়াতে হোটেল চোখে পড়েছে কিন্তু নামচাই কোন হোটেল আছে কিনা জানিনা। রাতে যদি নামচাইয়ে থাকতেই হয় কোথায় থাকবো এমন ভাবনার মাঝে একজন বললো-

নামচাই চলে যান, সেখান থেকে ওয়াকরো যাবার জন্য কমলার গাড়ি ছাড়াও বহু কিছু পেয়ে যাবেন যাবার জন্য কিন্তু কাল যদি উলফারা ধর্মঘট দেয় তবে তিনসুকিয়া থাকার চেয়ে নামচাই থাকলে নিরাপদ থাকবেন।

নামচাই হোটেল আছে?

একদম থানার পাশেই হোটেল। তবে মনে হয়না রাতে নামচাই থাকতে হবে আপনাকে ওয়াকরো যাবার কোন না কোন গাড়ি ঠিক পাবেন।

টিকিট কেটে বাসে চাপতেই বাস ছেড়ে দিল। সরকারী পরিবহন সংস্থার বাস, যাত্রী বলতে হাতে গোনা কয়েকজন। বাইরে তখনো বৃষ্টি ঝিরঝির ঝরছে। আমার পাশের সিটে যে লোকটি বসেছে তার কাঁধের ওপর চেপে বসা একটি বানর হয়ত পোষা কিংবা লোকটি এই বানর দিয়ে খেলা দেখিয়ে জীবিকা চালায়। 

-ভয় পাবেন না, মাংকি ম্যান কাটবে না।

লোকটির কথা শুনে আমি বিস্ময়ে তাকাই।

লোকটি হাসে। তারপর হুকুমের স্বরে বলে মাংকি ম্যান স্যারকে হাই বলো।

আমার দিকে তাকিয়ে বানরটি দাঁত খিচিয়ে ভ্যাংচি কাটে। তারপর হ্যান্ডসেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দেয়, আমি হাত মেলাই। মাংকি ম্যান চোখের তারায় আনন্দ নাচিয়ে ল্যাজ ঝাপটিয়ে, চার-হাত পায়ে লম্ফ-ঝম্প করে আমার সাথে কথা বিনিময় করে। নির্বাক সেই কথার স্রোতে কেবল ভেসে যায় আমার শ্রবণ ইন্দ্রিয়ে। বানরের কালো শুস্ক আঙ্গুল, ধারালো ধুসর রঙের নখ, রোম, নীল চোখ আর মানুষ হতে গিয়ে থমকে যাওয়া অবয়ব বৃষ্টিস্নাত বিকেল কে আরো বিষন্ন করে তোলে। বানর কি তবে মানুষের পূর্ব পুরুষের ইতিহাস বহন করে চলেছে তার থমকে যাওয়া অবয়বে? বাসটি তখন চা বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছে, দূর থেকে ভেসে আসছে সন্ধ্যার আযান। চা বাগান বৃষ্টিতে ভিজে যেন আরো সবুজ সতেজতা ছড়িয়ে মুগ্ধ নয়নে চেয়ে আছে।

নামচাই যখন নামলাম বৃষ্টি থেমে গেছে। যে দিকে চোখ যায় ঘুটঘুটে অন্ধকার, মনে হলো মধ্যরাতের কোন শহরে চলে এসেছি। যে শহর দিনের ক্লান্তি নিয়ে ঘুমিয়ে গেছে। মোবাইলে সময় দেখলাম সাতটা ত্রিশ, আমি অবাক হলাম। নামচাইকে ঠিক শহর বলা যায় না।

-আপনি কোথায় যাবেন?

- ওয়াকরো?

-আজ তো যেতে পারবেন না। কাল ধর্মঘট ডেকেছে আলফা।

-তাহলে এখন কি উপায়?

-চলুন গিয়ে দেখি থাকার কোন জায়গা পাই কিনা।

অনেক খোঁজাখুঁজি করে এক দোকান থেকে চড়া দামে এক প্লেট করে নডুলস খেলাম তিনজন আসলে খেলাম না বলে গিললাম বলা যায়। এত বাজে নুডুলস এর আগে বা পরে কখনো খাইনি। নামচাই বাজার থেকে একটু এগিয়েই থানা, থানার অপর প্রান্তে বিশাল এক বৌদ্ধ বিহার, তার পাশেই একটা টিনের ঘর শুনলাম এটাই হোটেল কিন্তু কাল ধর্মঘট থাকায় সব সিট বুকড হয়ে গেছে। কি আর করা হোটেলের সামনে ছোট্ট একটা মুরগির ঘরের মতন যেখানে মদ বিক্রি হচ্ছে সেখানে দাঁড়ালাম, একটু সামনে দুই টাকা হালি কমলা বিক্রি করছিল এক লোক তার কাছ থেকে পাঁচ হালি কমলা কিনলাম। মাংকি ম্যানের মালিক কোন ফাঁকে একটা ছোট মদের বোতল সাফ করে দিয়েছে টেরই পাইনি। বৃষ্টির জন্য ঠান্ডা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেকটাই বেশি। বৌদ্ধ বিহারের ঠিক সামনে এক পাগল।


"
 সে হাঁকছিল, ‘দু ঘরের মাঝে অথৈ সমুদ্দুর।’


ওর হাতে লাঠি এবং লাঠিতে পাখীর পালক বাঁধা। মাথায় লাল রুমাল। দূরে থানার পর্দা উড়ছে। পাগল বৌদ্ধ বিহারের সদর দরজা থেকে থানার দরজা পর্যন্ত ছুটে আসছিল বার বার আর ডিগবাজি খাচ্ছিল। সে কোন পথচারী বা যানবাহন দেখছিল না, সে এক পাগলিনীর জন্য যেন প্রতীক্ষা করছিল কারণ পাগলিনী অন্য পারে ঠিক পেচ্ছাবখানার পাশে বসে আছে, পাগলিনী নগ্ন এবং বধির, পাগল পথের উপর বসে পড়ল। বৌদ্ধ বিহারে গিয়ে অনেকক্ষন ডাকাডাকি করলাম কেউ সাড়া দিল না। মাংকি ম্যানের মালিক মদের নেশায় টলতে টলতে বৌদ্ধ বিহারের সদর দরজার পাশে শুয়ে পড়লো। নামচাই আরো শান্ত হয়ে পড়ছে। মদের দোকান, হোটেল সব বন্ধ হতেই বাতি নিভে গেল। কেবল থানা থেকে একটি আলো এসে পড়ছে রাস্তায় ও বৌদ্ধ বিহারে। আমার মনে হলোশতশত ভিক্ষুর পায়ের প্রতিধ্বনি কানের মধ্যে তরঙ্গের মতো নেচে যাচ্ছে। এই আগ্রাসী জোৎস্না রাতে, নিশি নামতে থাকা সময়ে, জনশূন্য সড়কে খুব ভয় লাগছে। ভয় কাটাতে আমি মাংকি ম্যানের সাথে কথা জুড়ে দিলাম।

কেমন লাগে খেলা দেখাতে? কতদিন আছো এই মালিকের সাথে।

নিস্তদ্ধ রাতের কথাগুলো বিরাট গতিতে ছুটে চলে। আচানক এই ভয়ার্ত ভূগোলে কথার জবাব দেয় মাংকি ম্যান, ‘খেলা দেখাতে আমার একদম ভালো লাগে না, মানুষ বড় বদ,আমার বয়স কয়েক হাজার। 

আমার ভয় আরো বেড়ে যায়। কে কথা বলে উঠলো, ভূত না প্রেত সেই আশংকায় আমার শরীর কাঁপতে থাকে। মাংকি ম্যান কথা বলতেই পারে না। পৃথিবীর ইতিহাসে বানর কথা বলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেনি। মনে হয় জোৎস্নার ভেতর জ্বিন পরী নামার গল্প আমি অনেক শুনেছি, তেমন কোন জ্বিন পরী এসে আমার সাথে কথা শুরু করে দিয়েছে নাকি সন্দেহ হল। তবুও আমি মাংকি ম্যানের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাই, কি রে তুই কথা বললি নাকি? মাংকি ম্যান নিশ্চুপ। সে দাঁতে আমার ব্যাগের ফিতা কাটতে থাকে। আমি কয়েকবার সন্দেহের চোখে তাকিয়ে মোবাইলের টর্চ জ্বেলে মাংকি ম্যানকে ভালো করে দেখলাম।

এমত ভাব নিয়ে চুপচাপ বসে রইলাম অনেকক্ষণ সময় যেন কাটছে না অন্ধকারে মৃত চোখ দুটোকে উজ্জ্বল করে আবার গল্প শুরু করলাম।

মাংকি ম্যান তুমি কি জানো বিজ্ঞান বলে তোমাদের থেকে নাকি বিবর্তন হয়ে আজকের মানুষ। কিন্তু আমরা এটা বিশ্বাস করি না কেননা আমাদের প্রথম নবী আদম আর আমরা হলাম আদম হাওয়ার ছেলে মেয়ে।তোমার কি মনে হয়? অনেকক্ষণ চুপ করে অপেক্ষা করি মাংকি ম্যান আর কোন কথা বলে না। কিন্তু সে খকখক করে কাশি দেয়। আজ এই জোৎস্নার ভেতর অলৌকিক রাত্রীতে মাংকি ম্যান অবিকল মানুষের মতো কথা বলছে, কাঁশছে, এটা কি মনের ভুল না অন্য কিছু আমি বুঝতে পারি না। মাংকি ম্যানের কথা শোনার জন্য আবার চালাকি করে বললাম, মানুষকে তুমি বদ বললে কেন? এবার কথা বলে মাংকি ম্যান। বলে, মানুষের ভীষণ অসুখ, নকল দাঁতের শৌখিনতা মানুষের মনে সেই কবে থেকে যেন। সে জানে বোঝে নকল দাঁতেরা খুব উজ্জ্বল হয়। পুরানো দাঁত পরে থাকতে বুঝি ভালো লাগে না মানুষের। উজ্জ্বল দাঁত পরে, হাসিটুকু উজ্জ্বল রেখে, সব সময় মানুষ তার নিজের গোড়ালি উঁচু রাখতে চায়। এবং এর ভিতরই থেকে যায় অসুখটা। কি আশ্চর্য সত্যিই তো মাংকি ম্যানের গলা, মধুর ধ্বনিতে কথা বলছে। মনে হচ্ছে পূর্নযৌবন কোনো পুরুষ বৌদ্ধ বিহারের লোহার গেইটে বসে আসে। আজ এই রাতে, ভয়, স্বপ্নের মতো পরিবেশ, নির্জনপথে সত্যমিথ্যা যাচাই করার মতো মনোবল আর আমার নেই। আমি এই ঘটনা কাকে বলব, কাকে এই রাতে জানাব, এই অত্যাশ্চর্য অলৌকিক ঘটনা। একটা বানর অবিকল মানুষের মতো কথা বলছে, কে বিশ্বাস করবে? আমি ভয়ে এটাকে সত্য ধরে নিয়ে কথা চালিয়ে যাই। আর নিদ্রাহীন মাঝরাতে তন্ন তন্ন করে আকাশময় খুঁজে বেড়াই কোনো মানুষ, যার বাঁশির আওয়াজে ভয় ভোলা যায়, কিংবা কোনো গৌরকান্তি যোগিনীমূর্তি যে তার বহতা জটাভার মেলে আমাকে চমকে দিয়ে বলে উঠবে, এটা সত্য- এই সত্যটা তুমি কাউকে বলো না।