মহালয়ার ভোরে কলকাতা থেকে যখন ট্রেনটা ছাড়ল, তখনও আকাশের গায়ে রাতের কালচে নীল রং লেগে ছিল।

জানলার বাইরে ছুটে যাচ্ছিল ঘুমন্ত স্টেশন, কুয়াশায় ঢাকা মাঠ, দূরের তালগাছের কালো অবয়ব। শরৎ এসে গেছে—এ কথা শহরে বসে বোঝা যায় না। কিন্তু বর্ধমান পেরিয়ে ট্রেন যখন গ্রামের দিকে ঢুকল, বাতাসে হঠাৎ একটা পরিচিত গন্ধ পেল অর্ক।

শিউলি।

বছর বারো পরে এই গন্ধই তাকে ফিরিয়ে আনছিল মাধবপুরে।

অর্ক সেন পেশায় স্থাপত্য-গবেষক। পুরোনো বাড়ি, জমিদারবাড়ি, মন্দির—এসবের ইতিহাস নিয়ে কাজ করাই তার পেশা। কিন্তু মাধবপুরে আসার কারণ ইতিহাস নয়।

কারণটা একটা চিঠি।

চিঠিটা এসেছিল তিন সপ্তাহ আগে।

খাম খুলতেই অর্ক দেখেছিল কাঁপা হাতে লেখা মাত্র তিনটি লাইন—

"অর্ক,

তুই যদি সত্যিই জানতে চাস, সেদিন রাতে কী ঘটেছিল,

তাহলে এবার পুজোর আগে মাধবপুরে ফিরে আয়।

— ইন্দ্রাণী"

ইন্দ্রাণী।

তার ছোটবেলার বন্ধু।

আর বারো বছর আগে, দুর্গাপুজোর অষ্টমীর রাতে, যে মেয়েটি নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিল।

তারপর থেকে ইন্দ্রাণীর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি।

পুলিশ বলেছিল, নদীতে পড়ে গিয়ে মৃত্যু হতে পারে। গ্রামের মানুষ বলেছিল, সে পালিয়ে গেছে। কেউ কেউ আবার ফিসফিস করে বলেছিল, মাধবপুরের পুরোনো রায়বাড়ির সঙ্গে ব্যাপারটার সম্পর্ক আছে।

কিন্তু অর্ক কোনোদিন বিশ্বাস করতে পারেনি।

কারণ সে জানত—সেই রাতে ইন্দ্রাণী তাকে একটা কথা বলেছিল।

"অর্ক, আজ রাতে যদি আমার কিছু হয়, রায়বাড়ির দক্ষিণ দিকের ঘরটা খুঁজিস।"

তারপরই সে হারিয়ে গিয়েছিল।

মাধবপুর স্টেশনে নেমে অর্ক দেখল, স্টেশনটা প্রায় আগের মতোই আছে।

শুধু চায়ের দোকানের বুড়ো মানুষটা নেই।

স্টেশনের বাইরে একটা সাদা অ্যাম্বাসাডর দাঁড়িয়ে ছিল।

গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রায় সত্তর বছরের এক ভদ্রলোক।

"অর্ক?"

"জি।"

"আমি হরিপদ। রায়বাড়ির দেখাশোনা করি।"

অর্ক অবাক হল।

"রায়বাড়ি এখনও আছে?"

হরিপদ মৃদু হাসলেন।

"কিছু বাড়ি ভাঙে না বাবু। মানুষ ভেঙে যায়।"

গাড়ি চলতে শুরু করল।

রাস্তার দুপাশে কাশফুল দুলছিল। পুকুরের জলে পদ্মপাতা। বাঁশবনের ফাঁক দিয়ে দূরে কোথাও ঢাকের আওয়াজ ভেসে আসছিল।

সবকিছু এত পরিচিত অথচ অদ্ভুতভাবে অপরিচিত।

মাধবপুরের শেষপ্রান্তে পৌঁছে অর্ক দেখল রায়বাড়ি।

বিশাল লোহার গেট।

গেটের ওপর শ্যাওলা।

দোতলা বাড়ির দেওয়ালে ফাটল।

বারান্দার স্তম্ভে পুরোনো কারুকাজ।

আর মাঝখানে বিশাল ঠাকুরদালান।

সেখানে দুর্গাপ্রতিমা তৈরি হচ্ছে।

অর্ক গাড়ি থেকে নামতেই হরিপদ বললেন,

"এবার পুজোটা একটু অন্যরকম হবে।"

"কেন?"

হরিপদ উত্তর দিলেন না।

শুধু বাড়িটার দিকে তাকিয়ে বললেন,

"এই বাড়িতে আবার শিউলির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।"

অর্ক থমকে গেল।

"শিউলির গন্ধ তো এই সময়ে স্বাভাবিক।"

"সব ঘরে নয়।"

সেদিন রাতে অর্ককে দেওয়া হল উত্তর দিকের পুরোনো ঘর।

ঘরটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। কাঠের খাট, একটা বড় আলমারি, জানলার পাশে পুরোনো টেবিল।

টেবিলের ওপর একটা কেরোসিনের বাতি রাখা।

অর্ক নিজের ব্যাগ খুলছিল, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল।

হরিপদ।

হাতে একটা পুরোনো বাক্স।

"এটা আপনার জন্য।"

"আমার?"

"বারো বছর আগে ইন্দ্রাণী রেখে গিয়েছিল।"

অর্কের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

বাক্স খুলতেই বেরোল একটা ছোট ডায়েরি।

পাতাগুলো হলদে হয়ে গেছে।

প্রথম পাতায় লেখা—

"যদি অর্ক কখনও ফিরে আসে, ওকে সবটা পড়তে দিও।"

অর্ক দ্রুত পাতা উল্টাতে লাগল।

প্রথম কয়েক পাতা ছিল সাধারণ কথা।

পুজোর প্রস্তুতি।

কলেজ।

বাড়ির লোকজন।

তারপর লেখা—

"রায়বাড়ির দক্ষিণ দিকের ঘরটা বাইরে থেকে বন্ধ থাকে। কিন্তু আমি গতকাল দেখলাম, রাত দুটোয় ওই ঘরের ভেতর আলো জ্বলছে।"

পরের পাতায়—

"বাড়িতে কেউ একজন রাতে হাঁটে। পায়ের শব্দ শুনি। কিন্তু কাউকে দেখি না।"

আর তার পরের পাতায়—

"অর্ককে আমি কিছু বলব না। ও ভয় পেয়ে যাবে।"

শেষ লেখা—

"আজ অষ্টমী। আমি জানি লোকটা কে। যদি আমি না ফিরি—দক্ষিণের ঘর।"

তারপর আর কোনো লেখা নেই।

অর্ক অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।

হঠাৎ—

ঠক।

ঠক।

ঠক।

জানলার বাইরে যেন কেউ কাঠের দরজায় আঙুল দিয়ে আঘাত করল।

অর্ক উঠে দাঁড়াল।

দরজা খুলে বাইরে এল।

বারান্দা ফাঁকা।

কিন্তু মেঝের ওপর কিছু একটা পড়ে আছে।

একটা শিউলি ফুল।

অর্ক সেটা তুলে নিতেই দূরে দক্ষিণ দিকের করিডর থেকে ভেসে এল পায়ের শব্দ।

ধীরে।

একটা।

দুটো।

তিনটে।

তারপর থেমে গেল।

পরদিন সকালেই অর্ক দক্ষিণ দিকের ঘরটা দেখতে গেল।

ঘরটার দরজা বাইরে থেকে তালাবন্ধ।

তালায় মরচে পড়েছে।

হরিপদ তাকে দেখে দ্রুত এগিয়ে এলেন।

"ওদিকে যাবেন না।"

"কেন?"

"বাড়ির পুরোনো অংশ। বিপজ্জনক।"

"ইন্দ্রাণীর ডায়েরিতে এই ঘরের কথা আছে।"

হরিপদ চুপ করে গেলেন।

তারপর বললেন,

"সব সত্যি জানা ভালো নয়।"

অর্ক এবার গম্ভীর হয়ে বলল,

"বারো বছর আগে কী হয়েছিল?"

হরিপদ তাকিয়ে রইলেন তার দিকে।

"আপনি তখন ছোট ছিলেন।"

"আমি ষোলো বছরের ছিলাম।"

"তবু কিছু জিনিস বোঝার মতো বয়স হয়নি।"

"এখন হয়েছে।"

হরিপদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

"তাহলে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।"

"কেন?"

"দিনের আলোয় এই বাড়ি অনেক কথা লুকিয়ে রাখে।"

সেদিন বিকেলে পুজোর প্রস্তুতি জমে উঠল।

রায়বাড়িতে আশপাশের মানুষ আসতে শুরু করল।

ঢাক বাজল।

ধূপের গন্ধে চারদিক ভরে গেল।

কিন্তু অর্কের মনে শান্তি এল না।

ডায়েরিটা বারবার খুলছিল সে।

একটা বিষয় তার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছিল।

ইন্দ্রাণী লিখেছিল—

"লোকটা কে।"

কিন্তু তার নাম লেখেনি।

কেন?

রাতে অর্ক নিজের ঘরে ফিরে এসে দরজা বন্ধ করল।

ঠিক তখনই বিদ্যুৎ চলে গেল।

সারা বাড়ি অন্ধকার।

দূরে কোথাও ঢাকের ক্ষীণ শব্দ।

তারপর—

পায়ের শব্দ।

এইবার স্পষ্ট।

করিডরে কেউ হাঁটছে।

অর্ক দরজা খুলে বেরিয়ে এল।

একটা ছায়া সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।

"কে?"

ছায়াটা থামল না।

অর্ক পিছন পিছন গেল।

সিঁড়ি পেরিয়ে নিচে।

তারপর দক্ষিণ দিকের করিডর।

ছায়াটা দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

তালা খুলল।

অর্ক স্তব্ধ।

লোকটা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।

অর্ক ছুটে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিল।

ভেতর থেকে কোনো শব্দ নেই।

হঠাৎ তার পায়ের কাছে একটা ছোট কাগজ এসে পড়ল।

কাগজে লেখা—

"বারো বছর আগে যেমন দেরি করেছিলে, এবারও করো না।"

অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

পরদিন সকালে সে পুলিশের পুরোনো রেকর্ড খুঁজতে গেল।

থানার পুরোনো কর্মচারী বিমলবাবু তখনও ছিলেন।

অর্ক নিজের পরিচয় দিতেই তিনি দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইলেন।

"তুমি সেই অর্ক?"

"হ্যাঁ।"

"ইন্দ্রাণীর বন্ধু?"

"হ্যাঁ।"

বিমলবাবু একটা পুরোনো ফাইল বের করলেন।

"কেসটা বন্ধ হয়নি।"

অর্ক অবাক।

"মানে?"

"মেয়েটার দেহ পাওয়া যায়নি। তাই নিখোঁজ মামলা হিসেবেই আছে।"

"কোনো সন্দেহভাজন?"

বিমলবাবু একটু থেমে বললেন,

"তখন রায়বাড়ির সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল।"

"সবাইকে?"

"প্রায় সবাই।"

"কেউ বাদ পড়েছিল?"

বিমলবাবু তার দিকে তাকালেন।

"একজন।"

"কে?"

"হরিপদ।"

অর্ক চমকে উঠল।

"কেন?"

"কারণ সে বলেছিল, অষ্টমীর রাতে সে বাড়িতেই ছিল। কিন্তু সেই রাতের একটা সময়ের হিসাব সে দিতে পারেনি।"

"কী সময়?"

"রাত দুটো থেকে তিনটে।"

অর্কের মাথায় যেন বজ্রপাত হল।

ডায়েরিতে লেখা ছিল—

"রাত দুটোয় দক্ষিণের ঘরে আলো জ্বলে।"

সন্ধের পর অর্ক রায়বাড়িতে ফিরল।

হরিপদ তখন ঠাকুরদালানে বসে প্রদীপ সাজাচ্ছিলেন।

অর্ক সরাসরি বলল,

"আপনি ইন্দ্রাণীর ব্যাপারে কিছু জানেন।"

হরিপদের হাত থেমে গেল।

"কী জানতে চান?"

"অষ্টমীর রাতে আপনি কোথায় ছিলেন?"

দীর্ঘ নীরবতা।

তারপর হরিপদ বললেন,

"দক্ষিণের ঘরে।"

অর্ক স্তব্ধ।

"কেন?"

"কারণ ইন্দ্রাণী আমাকে সেখানে ডেকেছিল।"

"তারপর?"

"তারপর সে আমাকে একটা সত্যি বলেছিল।"

"কী সত্যি?"

হরিপদ ধীরে ধীরে বললেন,

"রায়বাড়ির মালিক দেবাশিস রায় মারা যাওয়ার আগে একটা গোপন উইল করেছিলেন।"

"তার সঙ্গে ইন্দ্রাণীর কী সম্পর্ক?"

"ইন্দ্রাণী সেটা জানতে পেরেছিল।"

"কী ছিল উইলে?"

"এই বাড়ি আর সম্পত্তি বিক্রি করা যাবে না। কিন্তু দেবাশিস রায়ের ছেলে অমিতাভ সেটা করতে চাইছিল।"

অর্ক বুঝতে পারল।

"অমিতাভবাবু?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে ইন্দ্রাণী তাকে ধরে ফেলেছিল?"

"শুধু সেটাই নয়।"

হরিপদের গলা কেঁপে উঠল।

"ইন্দ্রাণী জানতে পেরেছিল, দেবাশিস রায়ের মৃত্যু স্বাভাবিক ছিল না।"

অর্ক নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিল।

"তারপর?"

"সেদিন রাতে ইন্দ্রাণী প্রমাণ নিয়ে দক্ষিণের ঘরে এসেছিল।"

"কী প্রমাণ?"

হরিপদ উত্তর দেওয়ার আগেই—

ঠাস!

দক্ষিণ দিক থেকে একটা শব্দ হল।

দুজনেই ঘুরে তাকাল।

তারপর একটা চিৎকার।

একজন মানুষের।

তারা ছুটে গেল দক্ষিণের ঘরের দিকে।

দরজা খোলা।

ঘরের ভেতরে কেউ নেই।

কিন্তু মেঝেতে পড়ে আছে একটা পুরোনো টেপরেকর্ডার।

তার পাশেই রক্তের মতো দেখতে লাল তরল।

অর্ক ঝুঁকে দেখল।

রক্ত নয়।

সিঁদুর।

টেপরেকর্ডারটা নিজে থেকেই চলছিল।

কর্কশ শব্দের মধ্যে একটা নারীকণ্ঠ ভেসে এল—

"অর্ক..."

অর্কের শরীর শিউরে উঠল।

"অর্ক, যদি তুই এটা শুনিস, বুঝবি আমি এখনও হারাইনি।"

তারপর কিছুক্ষণ নীরবতা।

"যাকে তুই বিশ্বাস করিস, সে-ই তোকে মিথ্যে বলেছে।"

টেপ বন্ধ হয়ে গেল।

অর্ক ধীরে ধীরে হরিপদের দিকে তাকাল।

হরিপদের মুখ সাদা হয়ে গেছে।

"এটা কীভাবে সম্ভব?"

তিনি কোনো উত্তর দিলেন না।

ঠিক তখনই বাইরে একটা ছায়া দৌড়ে গেল।

অর্ক ছুটে বেরোল।

করিডর পেরিয়ে উঠোন।

তারপর গেট।

কেউ নেই।

শুধু মাটিতে পড়ে আছে একটা পুরোনো লকেট।

লকেটটা খুলতেই ভেতরে ইন্দ্রাণীর ছবি।

আর পেছনে খোদাই করা—

"দক্ষিণের দেওয়াল।"

রাত বাড়ল।

পুজোর বাড়ি ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

অর্ক আবার দক্ষিণের ঘরে ঢুকল।

দেওয়ালগুলো পরীক্ষা করতে করতে হঠাৎ একটা জায়গায় হাত থেমে গেল।

দেওয়ালের একটা ইট অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা।

চাপ দিতেই সেটা নড়ে গেল।

ভেতরে ছোট্ট গোপন কুঠুরি।

তার মধ্যে একটা কাপড়ে মোড়া প্যাকেট।

প্যাকেট খুলতেই বেরোল পুরোনো কিছু কাগজ।

একটা উইল।

একটা অডিও ক্যাসেট।

আর একটা ছবি।

ছবিতে দেবাশিস রায়, অমিতাভ রায় এবং—

ইন্দ্রাণী।

কিন্তু ছবিটা দেখে অর্কের চোখ আটকে গেল অন্য একজনের ওপর।

ছবির এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটি—

হরিপদ।

কিন্তু ছবির পেছনে তারিখ লেখা ছিল—

১৯৯৮।

অর্থাৎ হরিপদ তখন এই বাড়ির কর্মচারী ছিলেন না।

তিনি ছিলেন রায় পরিবারের আইনজীবী।

অর্কের মাথা ঘুরে গেল।

ঠিক তখন পিছন থেকে দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ।

সে ঘুরে দাঁড়াল।

হরিপদ দাঁড়িয়ে আছেন।

হাতে একটা লণ্ঠন।

"আপনি?"

"হ্যাঁ।"

"আপনি আমাকে এতদিন মিথ্যে বলেছেন।"

হরিপদ শান্ত গলায় বললেন,

"মিথ্যে না বললে তুমি এখানে আসতে না।"

"ইন্দ্রাণী কোথায়?"

হরিপদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর বললেন,

"তুমি কি সত্যিই তাকে খুঁজতে এসেছ?"

"হ্যাঁ।"

"তাহলে একটা কথা মনে রাখবে—সব নিখোঁজ মানুষ মারা যায় না।"

অর্কের বুক ধক করে উঠল।

"মানে?"

হরিপদ লণ্ঠনটা নামিয়ে রাখলেন।

"ইন্দ্রাণী বেঁচে আছে।"

ঘরের বাতাস যেন হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

"কোথায়?"

"এই বাড়ির বাইরে।"

"তাহলে আমাকে চিঠি কে পাঠিয়েছে?"

হরিপদ মৃদু হাসলেন।

"ইন্দ্রাণী।"

"কিন্তু সে কোথায়?"

"তোমার কাছে।"

অর্ক কিছু বুঝতে পারল না।

হরিপদ টেবিলের ওপর রাখা অডিও ক্যাসেটটার দিকে ইঙ্গিত করলেন।

"সব উত্তর এতে আছে।"

পুরোনো টেপরেকর্ডারে ক্যাসেট ঢোকানো হল।

কিছুক্ষণ কড়কড় শব্দ।

তারপর—

ইন্দ্রাণীর কণ্ঠ।

বারো বছর আগের।

"অর্ক, আমি জানি না তুই কখন এটা শুনবি। কিন্তু যদি শুনিস, তাহলে বুঝবি আমি পালিয়ে যাইনি।"

অর্কের চোখ ভিজে উঠল।

"অমিতাভ রায় তার বাবাকে হত্যা করেনি। কিন্তু সে সত্যিটা লুকিয়েছে।"

হরিপদ চোখ নামিয়ে নিলেন।

"দেবাশিস রায় আত্মহত্যা করেননি। তিনি নিজের মৃত্যুর আগে আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর ছেলে সম্পত্তির জন্য তাঁকে চাপ দিচ্ছে।"

ক্যাসেট চলতে থাকল।

"কিন্তু সবচেয়ে বড় সত্যি অন্য জায়গায়।"

একটু নীরবতা।

"দেবাশিস রায়ের মৃত্যুর রাতে আমি একা ছিলাম না। আমার সঙ্গে ছিল—"

টেপ হঠাৎ থেমে গেল।

অর্ক চিৎকার করে উঠল,

"কী হয়েছে?"

হরিপদ ক্যাসেটটা বের করে দেখলেন।

"টেপটা কাটা।"

"কে কেটেছে?"

"যে চায়নি তুমি সত্যিটা জানো।"

ঠিক তখনই বাইরে ঢাকের শব্দ শুরু হল।

কিন্তু অর্ক জানত—এই সময়ে ঢাক বাজানোর কথা নয়।

দশমীর আগের রাত।

পুজোর বাড়িতে এমন ঢাক?

সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।

ঠাকুরদালানে কেউ নেই।

কিন্তু প্রতিমার সামনে একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে।

লাল শাড়ি।

খোলা চুল।

পেছন ফিরে।

অর্কের গলা শুকিয়ে গেল।

"ইন্দ্রাণী?"

মেয়েটি ধীরে ধীরে ঘুরল।

অর্ক স্তব্ধ।

ইন্দ্রাণী।

বারো বছর আগের সেই মুখ।

শুধু চোখ দুটো অনেক বেশি পরিণত।

"তুই এসেছিস।"

অর্ক কোনো কথা বলতে পারল না।

ইন্দ্রাণী এগিয়ে এল।

"আমার জন্য নয়, সত্যিটা জানার জন্য এসেছিস।"

"তুই এতদিন কোথায় ছিলি?"

"যেখানে আমাকে কেউ খুঁজবে না।"

"কেন পালিয়ে গিয়েছিলি?"

ইন্দ্রাণী হরিপদের দিকে তাকাল।

"আমি পালাইনি। আমাকে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল।"

অর্ক এবার হরিপদের দিকে ফিরল।

"আপনি?"

হরিপদ ধীরে ধীরে বললেন,

"আমি ওকে বাঁচিয়েছিলাম।"

"কার কাছ থেকে?"

"অমিতাভের কাছ থেকে।"

ইন্দ্রাণী বলল,

"অষ্টমীর রাতে আমি দক্ষিণের ঘরে প্রমাণ নিয়ে গিয়েছিলাম। অমিতাভ আমাকে দেখে ফেলে। সে আমাকে আঘাত করেছিল। আমি জ্ঞান হারাই।"

"তারপর?"

"হরিপদকাকু আমাকে খুঁজে পান। তখনও আমি বেঁচে ছিলাম।"

"তাহলে পুলিশকে জানাননি কেন?"

ইন্দ্রাণী চোখ নামিয়ে বলল,

"কারণ পুলিশের মধ্যে অমিতাভের লোক ছিল।"

অর্ক চুপ।

"হরিপদকাকু আমাকে শহরে পাঠিয়ে দেন। নতুন নামে থাকতে হয়েছিল। এত বছর।"

"তুই আমাকে একটা চিঠিও পাঠাসনি?"

"পাঠিয়েছিলাম।"

অর্ক তাকিয়ে রইল।

"কোথায়?"

"তোর বাড়িতে। পাঁচবার।"

"আমি পাইনি।"

ইন্দ্রাণী হরিপদের দিকে তাকাল।

হরিপদ বললেন,

"চিঠিগুলো পৌঁছয়নি।"

"কে আটকেছিল?"

"অমিতাভ।"

অর্কের মাথায় হঠাৎ একটা প্রশ্ন এল।

"কিন্তু অমিতাভবাবু কোথায়?"

ইন্দ্রাণী উত্তর দিল না।

হরিপদ বললেন,

"মারা গেছেন।"

"কবে?"

"তিন মাস আগে।"

অর্ক স্তব্ধ।

"তাহলে এতদিন এই বাড়িতে কে—"

তার কথা শেষ হওয়ার আগেই পিছন থেকে একটা গলা শোনা গেল।

"আমি।"

তিনজন ঘুরে দাঁড়াল।

ঠাকুরদালানের অন্ধকারে একজন দাঁড়িয়ে।

অমিতাভ রায়।

অর্কের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।

"কিন্তু আপনি তো—"

লোকটি হাসল।

"আমি অমিতাভ নই।"

আলো একটু সামনে আসতেই মুখটা স্পষ্ট হল।

অর্ক চিনতে পারল না।

লোকটি বলল,

"আমি অমিতাভের ছেলে।"

হরিপদের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

"রুদ্র।"

রুদ্র ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।

"বাবা মারা যাওয়ার আগে সব সত্যি আমাকে বলে গিয়েছিল। আমি জানতাম ইন্দ্রাণী ফিরে আসবে। তাই এই নাটক।"

অর্ক বলল,

"তাহলে টেপ?"

"আমিই কেটেছি।"

"আর আমাকে চিঠি?"

"সেটাও।"

অর্ক বুঝতে পারল না।

"কেন?"

রুদ্র মৃদু হাসল।

"কারণ আমার বাবার বিরুদ্ধে থাকা প্রমাণগুলো কোথায় আছে, সেটা শুধু ইন্দ্রাণী জানে। আর ইন্দ্রাণী জানে—তুমি ওর সবচেয়ে বিশ্বাসের মানুষ।"

"তুমি আমাকে ব্যবহার করেছ।"

"হ্যাঁ।"

রুদ্র পকেট থেকে একটা কাগজ বের করল।

"কিন্তু তুমি একটা ভুল করেছ, অর্ক।"

"কী?"

"তুমি দক্ষিণের দেওয়াল খুলেছ।"

অর্কের বুক কেঁপে উঠল।

"তুমি জানলে কীভাবে?"

রুদ্র হেসে বলল,

"কারণ ওই দেওয়ালে শুধু উইল ছিল না।"

সে হঠাৎ অন্ধকারের দিকে তাকাল।

"হরিপদকাকু, আপনি ওকে বলবেন?"

হরিপদ চুপ।

রুদ্র নিজেই বলল,

"ওখানে একটা পুরোনো ডায়েরি ছিল। দেবাশিস রায়ের।"

অর্ক তাকাল।

"সেটা কোথায়?"

রুদ্রের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

"তোমার কাছে।"

অর্ক চমকে নিজের ব্যাগের দিকে তাকাল।

তার ডায়েরি।

ইন্দ্রাণীর দেওয়া সেই ডায়েরি।

হঠাৎ তার মনে পড়ল—

প্রথম পাতায় লেখা ছিল,

"যদি অর্ক কখনও ফিরে আসে, ওকে সবটা পড়তে দিও।"

কিন্তু লেখাটা ইন্দ্রাণীর ছিল না।

হাতের লেখাটা অন্য কারও।

অর্ক দ্রুত ডায়েরি খুলল।

শেষ পাতায় একটা ভাঁজ করা কাগজ।

সে খুলতেই পড়ল—

"ইন্দ্রাণীকে বিশ্বাস করো। হরিপদকে বিশ্বাস করো। কিন্তু আমার ছেলেকে নয়।"

তার নিচে দেবাশিস রায়ের স্বাক্ষর।

আর তারিখ—

অষ্টমীর আগের দিন।

বারো বছর আগে।

অর্ক ধীরে ধীরে মাথা তুলল।

রুদ্রের মুখে তখন আর হাসি নেই।

হরিপদ বললেন,

"আজ এত বছর পরে সত্যিটা প্রকাশ্যে আসবে।"

রুদ্র পিছিয়ে গেল।

"সত্যি প্রকাশ্যে এলে আমার পরিবারের কী হবে?"

ইন্দ্রাণী বলল,

"যে পরিবার সত্যির ওপর দাঁড়ায়নি, তার ভেঙে পড়ার ভয় থাকে।"

বাইরে তখন ঢাক বাজছে।

ভোর হতে বেশি দেরি নেই।

আকাশের পূর্বদিকে হালকা আলো ফুটতে শুরু করেছে।

পরদিন মহাষ্টমীর সকালে মাধবপুর থানায় নতুন করে মামলা নথিভুক্ত হয়।

দেবাশিস রায়ের মৃত্যুর পুরোনো রহস্য, প্রমাণ লোপাট, ইন্দ্রাণীর ওপর হামলা—সবকিছু নিয়ে তদন্ত শুরু হয়।

রুদ্রকে গ্রেপ্তার করা হয়।

কিন্তু গল্পটা সেখানেই শেষ হয়নি।

কারণ অর্কের মনে একটা প্রশ্ন থেকেই গেল।

ইন্দ্রাণী কেন বারো বছর অপেক্ষা করেছিল?

সেদিন সন্ধ্যায় তারা দুজন রায়বাড়ির পুকুরঘাটে বসেছিল।

শিউলি ফুল ঝরে পড়ছিল জলের ওপর।

অর্ক বলল,

"তুই চাইলে বারো বছর আগেই ফিরতে পারতিস।"

ইন্দ্রাণী মৃদু হাসল।

"পারতাম।"

"তাহলে ফিরিসনি কেন?"

"কারণ আমি জানতাম, সত্যিটা একদিন না একদিন নিজেই দরজা খুলবে।"

"আর আমি?"

"তুইও বদলাসনি।"

অর্ক হাসল।

"তুই বদলেছিস।"

ইন্দ্রাণী কিছু বলল না।

দূরে ঠাকুরদালানে সন্ধ্যার আরতি শুরু হয়েছে।

ঢাকের শব্দে চারদিক কেঁপে উঠছে।

হঠাৎ অর্কের চোখ গেল পুকুরের জলে।

জলের ওপর ভেসে আছে একটা শিউলি ফুল।

সে হাত বাড়িয়ে ফুলটা তুলতে যাবে, এমন সময় ইন্দ্রাণী বলল,

"থাম।"

"কেন?"

"ওটা আমি ফেলিনি।"

অর্ক থমকে গেল।

"তাহলে?"

ইন্দ্রাণী পুকুরের ওপারে তাকিয়ে রইল।

সেখানে কেউ নেই।

শুধু পুরোনো বটগাছ।

আর তার নিচে একটা ছায়া।

অর্ক চোখ কুঁচকে তাকাল।

ছায়াটা নড়ল।

তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।

"ও কে?"

ইন্দ্রাণী কোনো উত্তর দিল না।

কিছুক্ষণ পরে বলল,

"সব রহস্যের উত্তর খুঁজতে নেই, অর্ক।"

"কেন?"

"কারণ কিছু রহস্য সত্যি নয়।"

"আর কিছু?"

ইন্দ্রাণী মৃদু হেসে বলল,

"কিছু রহস্য সত্যির থেকেও পুরোনো।"

দূরে তখন সন্ধ্যার আকাশে কাশফুলের মতো সাদা মেঘ।

শিউলির গন্ধে ভরে উঠেছে মাধবপুর।

আর রায়বাড়ির দক্ষিণের সেই ঘর—

যে ঘর বারো বছর ধরে বন্ধ ছিল—

তার জানলার ভেতর থেকে হঠাৎ একবার আলো জ্বলে উঠল।

তারপর নিভে গেল।

কেউ দেখল না।

শুধু অর্ক দেখল।

সে কিছু বলল না।

কারণ তার মনে হল—

কোনো গল্প কখনও সত্যিই শেষ হয় না।

কিছু গল্প শুধু দরজা বন্ধ করে অপেক্ষা করে।

পরের শরতের জন্য।

পরের পুজোর জন্য।

আর কোনো এক অচেনা রাতে—

আবার শিউলির গন্ধে ফিরে আসার জন্য।