"তোমার পায়ে ঘুঙুর না, নূপুর শোভা পায় বিনোদিনী।" জমিদার পুত্র রাঘবের কথাগুলো শুনে মনের মধ্যে একটা শিহরণ অনুভব করছিলো নর্তকী বিনোদিনী। তাদের হয়তো ভালোবাসার অধিকার নেই, কিন্তু প্রেম কি আসলেই অধিকার অনধিকারের ধার ধারে?
এইভাবেই চলছিল বেশ। বিনোদিনীর মাতাল করা নাচ আর একই সঙ্গে সকলের অজান্তে জমিদার বাড়ির সবচেয়ে ছোট ছেলে রাঘবেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিনোদিনীর প্রেমাখ্যান লেখা হতে থাকে। সবার আড়ালে, নিভৃতে, একান্তে এই অসম প্রেম চলতে থাকে। কিন্তু কথাতেই আছে, প্রেমের আগুনের তেজ এতটাই জোরালো হয় যে সেই আগুনের ধোঁয়া সবার দৃষ্টিগোচর হতে বেশি সময় লাগে না। এই আগুনের লেলিহান শিখার ব্যাপ্তি এতটাই যে, চেয়েও সেটাকে লুকানো যায় না। লোকমুখে কথা ঘুরতে ঘুরতে একসময় জমিদার নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের কানে এসে পৌছায়। রাগে পাগল হয়ে সেই মুহূর্তেই উনি ছেলে রাঘবেন্দ্রকে ডেকে পাঠান। রাঘবেন্দ্র বাবাকে এতো রেগে যেতে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। তার সাহসই হয় না বাবাকে সত্যি কথাটা বলার! ভয়ের চোটে সে এটা বলে বসে যে বিনোদিনীর সাথে তার কোনো প্রেম সম্পর্ক নেই। বিনোদিনীই বারবার তার কাছে ছুটে আসে, নিজেকে বিলিয়ে দেয় তার কাছে, বারবার জেদ করে তাকে বিয়ে করার ইত্যাদি। এসব শুনে জমিদার নিশিকান্ত চট্টোপাধ্যায় আরো রেগে যান। "ওই নর্তকীর এতদূর সাহস যে আমার ঘরে ঢোকার স্বপ্ন দেখে? আমার ছেলেকে প্রেম জালে ফাঁসানোর চেষ্টা করে?" রাগে পাগল হয়ে তৎক্ষণাৎ তিনি বিনোদিনীকে জবরদস্তি তুলে আনার আদেশ দেন।
"হুজুর, বিশ্বাস করুন, আমি রাঘববাবুকে কোনো প্রেম জালে ফাঁসাইনি। আমি কোনো চাল চালিনি। আমরা দুজন পরস্পরকে ভালোবাসি। আপনি জিগ্যেস করুন রাঘব বাবুকে... উনি সবটা বলবেন। বলুন না রাঘব বাবু, বলুন না..." অসহায়ের মতো বলে ওঠে বিনোদিনী। নিশিকান্ত বাবু রাঘবেন্দ্রর দিকে কড়া দৃষ্টিতে তাকান। রাঘবেন্দ্র আমতা আমতা করে বলে "কি... কিসব যেটা বলছো তুমি? আমি আর তোমাকে? পাগল নাকি? বাবা এ মিথ্যা কথা বলছে..."। বিনোদিনী অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে রাঘবেন্দ্রর দিকে। কত বিনিদ্র রাত তারা একসাথে জেগেছে। ভালোবাসার কথায় ভরিয়ে তুলেছে পরস্পরকে। একসাথে সারাজীবন থাকার প্রতিজ্ঞা করেছে আর আজকে রাঘবেন্দ্রর এ কি রূপ দেখছে সে! চাবুকের ঘা একের পর এক নেমে আসতে থাকে বিনোদিনীর গায়ে। চোখের জলও যেন শুকিয়ে গেছে তার। রাঘবেন্দ্রর দিকে স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে, অথচ রাঘবেন্দ্র তার সাথে চোখ মেলাতে পারছে না। বিনোদিনীর ঠোঁটের কোণে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। জ্ঞান হারানোর আগে একটাই শব্দ তার মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে "কাপুরুষ.."।
"বাবু, এই ছেঁড়া নূপুরটা কি করবো?"
"কুয়োতে ফেলে দে, আবার কি! ওই শালীর লাশ যখন কুয়োতে ফেলা হয়েছে, ওর নুপুর, ঘুঙুর সবই ওখানেই ফেলে দে..." বলে জমিদার নিশিকান্ত একটা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে অন্য কাজে মন দিলেন।
দুবছর পর:
জমিদার বাড়িতে আজকে চাঁদের হাট বসেছে যেন। আর হবে নাই বা কেন! জমিদার বাড়ির সবচেয়ে ছোট ছেলে রাঘবেন্দ্রর বিয়ে আজকে। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য! নতুন বৌয়ের মুখ দেখতে সবাই ব্যস্ত।
বিয়ের প্রথম রাতে নতুন বৌ নমিতার পায়ে অবিকল একই নূপুরটা দেখে চমকে উঠলো রাঘবেন্দ্র। অবিকল সেই একই নূপুর নমিতাকে কে দিলো? সে নমিতাকে জিগ্যেস করেও কোনো সদুত্তর পেলো না। নমিতার মনে নেই কে তাকে এটা দিয়েছে। কিন্তু সেই রাত থেকেই নমিতা অদ্ভুত আচরণ করতে শুরু করে। সারাদিন শুধু নূপুরটাকে নিয়েই ব্যস্ত সে। রাঘবেন্দ্রর দিকে তাকানোর ফুরসত পর্যন্ত নেই। এসবের মাঝেই একদিন মাঝরাতে একটা ছমছম আওয়াজে ঘুমাটা ভেঙে গেলো রাঘবেন্দ্রর! দেখে পাশে নমিতা নেই। সে কিছুটা অবাক হয়ে নিজেদের ঘরের বাইরে বেরিয়ে আসে কিন্তু নমিতাকে দেখতে পায়না। আবারো সেই ছম ছম আওয়াজ! আওয়াজটাকে অনুসরণ করে সে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে আর দেখে নমিতা অদূরের কুয়ো পারটায় দাঁড়িয়ে বিড়বিড় করে কিসব বলছে। "নমিতা..." বলে ছুটে গিয়ে তার কাঁধে হাত রাখতেই নমিতার মাথাটা পুরো উল্টোদিকে ঘুরে গেলো। আর এটা নমিতা নয়, নমিতার বেশে বিনোদিনী! রাঘবেন্দ্র যেন চিৎকারও করতে পারছিলো না। গলা থেকে একটাও স্বর বেরোচ্ছিলো না তার। "রাঘব... আমার নূপুরের আওয়াজ তোমার খুব পছন্দ ছিলো তাই না? দেখো না, তোমার বাবা আর একটা নূপুর ওই কুয়োতে ফেলে দিয়েছে... তুমি এনে দাও না!" ফাঁসা গলায় বলে উঠলো সে। রাঘবেন্দ্র যেন পালতেও পারছে না। হাত ধরে এক প্রকার টানতে টানতে তাকে কুয়োর কাছে নিয়ে গেলো সে। তারপর একটা পৈশাচিক হাসি হাসতে শুরু করলো। "তুমি আমার সাথেই থাকবে রাঘব, অন্য কেউ তোমাকে আমার থেকে কেড়ে নিতে পারবে না..." কথা শেষের আগেই একটা ছলাৎ করে আওয়াজ হলো।
প্রায় এক সপ্তাহ নিরুদ্দেশ থাকার পর অবশেষে জমিদার বাড়ির ছোট ছেলে রাঘবেন্দ্রর নিথর দেহটা তাদেরই বাড়ির কুয়ো থেকে উদ্ধার করা হলো। কেউ ভাবোতেও পারেনি যে সে এইভাবে মারা যেতে পারে। কিন্তু জমিদার নিশিকান্ত যেন সবটাই বুঝতে পারছিলেন। নমিতা কিন্তু আজও নিরুদ্দেশ! সে যে সেই রাতের পর কোথায় চলে গেছে, কেউ তার হদিশ পায়নি আজ অব্দি।
মন্তব্য (০)
লগ-ইন করুন মন্তব্য করতে।